মূল লেখায় যান

এই জীবনে বইমেলার মুখোমুখি

নীলাঞ্জনা নীলাএকান্ত অনুভূতি১২টি মন্তব্য


বইমেলা । প্রাণের মেলা । কবি-সাহিত্যিক-লেখকদের মেলা । বন্ধু-বান্ধবদের উচ্ছ্বাস-আনন্দর মেলা । কয়টা বই কেনা হয় , সে হিসেব-নিকেশের পরিসংখ্যান আমার জানা নেই । যদিও আজকাল সব খবর পাওয়া খুব সহজ হয়ে গেছে । একসময় হাতেগোণা কিছু লেখক-সাহিত্যিকদের লেখা প্রকাশিত হতো । এখন অপরিচিতর ভীড় বেশী , তবে মেধাবীদের আর সেই দৌরাত্ম্য নেই । এটা আমার মত । এই অনলাইনে বিশেষ করে ফেসবুকে আসার পর দেখেছি এমন অনেক মেধাবী কবি-গল্পকার আছেন , যাদের আজ পর্যন্ত কোনো লেখা কোনো কাগজের পাতায় বন্দী হয়নি । আবার অনেক আছেন যারা নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন । আবার অনেকেই আছেন লিখতে লিখতে মাথা ধরিয়েও দেন । একসময় আমিও এমন করতাম । খুব সহজ স্বীকারোক্তি । যখন বুঝলাম যে আসলে এভাবে লেখার কোনো মানেই হয়না । আর লেখা মানেই বিষয় খোঁজা । হাতেগোণা কিছু বিষয়ই আছে , যা থেকে আমরা সরে আসতে পারলেও সরে আসিনা । এর মধ্যে সবথেকে বড়ো প্রমাণ , প্রেম আর নারী নিয়ে লেখা । একঘেঁয়ে হয়ে গেছে , তাও ভুরি ভুরি লেখা । আর প্রেম মানেই একটি অবয়ব , একজন মানুষ , আর একটি সত্ত্বা । যতোই বলিনা কেন প্রেম নিয়ে লিখি , কিন্তু আসলে এটা আমার নিজের জীবন নয় । কাকে ফাঁকি দেই জানিনা , তবে এই কথায় আমরা সবথেকে ফাঁকি দেই নিজেকে । ভালোবাসা অন্যায় নয় , কোনো পাপ নয় । ক্ষতি না করে ভালোবাসা যায় । আমি ভালোবাসি একজনকে নয়…কয়েকজন এ জীবনে আছে , থাকবে । এদেরকে না ভেবে , আমার পক্ষে শ্বাস নেয়া সম্ভব নয় ।

কোথা থেকে কোথায় চলে এলাম ! বইমেলা থেকে ভালোবাসায় । তার মানে কি ? ভালোবাসা আছে বলেই আমরা এখনও অনেক কিছু ভাবতে পারি , লিখতে পারি , সম্পর্ক গড়ে তুলতেও পারি । যাক বইমেলা নিয়ে নিজের জীবনের কিছু কথা বলতেই আজকে ফেলে আসা সময়ের মুখোমুখি হলাম ।

পৃথিবীতে প্রথম বইমেলা শুরু হয় ৫০০ বছর আগে জার্মানীর ফ্রাঙ্কফুর্টে । আর এখন পর্যন্ত সবথেকে বড়ো বইমেলাটি এখানেই হয়ে আসছে । এনসাইক্লোপিডিয়া থেকে জেনেছি , আমাদের বাংলাদেশে প্রথম বইমেলা শুরু হয় ১৯৭২ সালের ৮-ই ফেব্রুয়ারী তারিখে । কলকাতা থেকে ৩২টি বই নিয়ে আসেন চিত্তরঞ্জন সাহা , এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বর্ধমান হাউজ প্রাঙ্গনে বটতলায় চট বিছিয়ে বইমেলার উদ্বোধন করেন । একটানা ৪টি (১৯৭২-‘৭৬) বছর একাই চালিয়ে নিয়ে যান । তাই তাঁকেই বাংলা একাডেমীর বইমেলার উদ্যোক্তা হিসেবে অভিহিত করা হয় । ১৯৮৪ সালের আগ পর্যন্ত বইমেলা অনাড়ম্বরভাবেই (যদিও প্রতিবছর নয়) অনুষ্ঠিত হতো । ১৯৮৪ সাল থেকে সাড়ম্বরভাবে অমর একুশে বইমেলার সূচনা হয় । ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি সম্মান জানাতেই প্রতিবছর ফেব্রুয়ারী মাসে এই বইমেলা হয়ে থাকে ।

এতোকিছু বলার কারণ আমার বইয়ের প্রতি বেজায় লোভ আর যেমন কেনার , তেমনি কোনো বই উপহার পেলে সবথেকে খুশী হতাম , এখনও হই । ১৯৯০ সালে এস.এস.সি দেবার পর কলেজে যখন ভর্তি হই । তখন এমন হলো বড়োদের বই পড়ার আর কোনো গোপনীয়তা রইলো না । যদিও চুরী করে অনেক আগেই মামনির লাইব্রেরীর প্রায় অনেকগুলো বই পড়া হয়ে গিয়েছিলো । এর মধ্যে ছিলো বিমল মিত্র , আশুতোষ মুখোপাধ্যায় , ফাল্গূণী মুখোপাধ্যায় , শংকর , বেগম রোকেয়া , বনফুল , নিহারঞ্জন রায় , সমরেশ বসু , জহির রায়হান , অগাথা ক্রিষ্টি , লিও তলস্তয় , শেক্সপিয়র , প্রমুখ । আরোও অনেকের নাম ভুলে গেছি । আমার গল্পের বই পড়া শুরুর বয়সের কথা মনে নেই । তবে জীবনের প্রথম বইয়ের কথা মনে আছে , তখনও জীবনের স্কুল শুরু হয়নি । বাপি ঢাকা থেকে এলো আমার জন্যে জামার কাপড়/জামা ভুলে গেছি । আর দুটো বই । একটা হলো কালীপ্রসন্ন সিংহের “হুতোম প্যাঁচার নকশা” আরেকটি জানি কাজী নজরুল ইসলামের একটি বই । বইটি বয়সের তুলনায় যথেষ্ট উঁচুমাত্রা বিশিষ্ট ছিলো । বড়ো হয়ে জেনেছি ওই বইটা ছিলো “Satire type” মানে ব্যঙ্গধর্মী গ্রন্থ । মাথা খারাপ করিয়ে দিয়েছিলাম মামনিকে করা হাজারও প্রশ্নে । বাপিকে বই পড়তে দেখিনি , এই অভ্যেসটা আমার মায়ের থেকে পাওয়া । রূপকথার গল্প আমার মোটেও ভালো লাগতো না । ওসব শুনতেই মজা , আমার বরিশালের মা(দিদিমা) আর ঠাকুমার থেকেই শুনতাম ওসব গল্প । সেই যে বই পড়া শুরু হলো , এরপর আর থামেনি । জীবনে সেই সময় একটাই ব্যাপার লুকিয়েছিলাম মামনি আর বাপির কাছে , সেটা হলো বই পড়া গোপনে বইয়ের ফাঁকে রেখে । রাশিয়ার একটা রূপকথার বই “মালাইকাঠের ঝাঁপি” খুব ভালো লাগতো । আমাদের বাংলা রূপকথার মতো না , তাই ভালো লেগেছিলো ।

আমার বইয়ের প্রতি এতো টান দেখে আমার বড়ো মাসীর মেঝো ছেলে শোভনদা বলেছিলো বইমেলার কথা । শোভনদার সাথেই প্রথম বইমেলায় যাওয়া ১৯৮৯ সালে । চোখের সামনে এতো এতো বই ? কোনটা কিনবো ? কোনটা না । ব্যাগে ৫০০৳ ছিলো । বিশাল বড়োলোক । যাক বেশ কিছু বই কিনেছিলাম , মনে নেই নামগুলো । এরপর শোভনদা না থামালে বোধ হয় কিনেই চলতাম টাকা শেষ না হওয়া পর্যন্ত । বইমেলা থেকে ফেরার পথে শমি কায়সারকে দেখে কি ইচ্ছে কথা বলার । একটা ছুটও লাগালাম । এখন ভাবি সেই ছুট কি আর ফিরে আসবে ? ইচ্ছেই তো আর নেই । আসলেই আমরা যখন যা চাই , সে সময় পাইনা । যখন পাই , তখন দেখা যায় আরোও অনেক কিছু পেয়ে গেছি । ওখান থেকে গেলাম এলিফ্যান্ট রোডের ওখানে গীতালি ক্যাসেট রেকর্ডিং সেন্টারে (নামটা ঠিক নাও হতে পারে), ওখানে বেশ কিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত-আধুনিক গান রেকর্ড করতে দিয়ে এলাম । আর একটা খালি ক্যাসেট কিনলাম , সবার কন্ঠ এটার ভেতরে রাখবো বলে । ওহ বলতে ভুলে গেছি , সেই বছরেই বাপি আমাকে রিমোট কন্ট্রোলড ডাবল ডেকসেট কিনে দেয় একটা । আর তাই আরোও অনেক উচ্ছ্বাস । যাক বাসায় ফিরে এলাম অনেক বই আর ক্যাসেট নিয়ে । কি করে সবার কন্ঠ এটায় রাখবো , ভেবে পাচ্ছিলাম না । কারণ কয়েকজন ছাড়া আর কেউ আমাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করবেনা । যাক চেষ্টায় কি না হয় ! ওই ক্যাসেটে আমার পৃথিবীর ছোট্ট ওই নীড়ের মধ্যে অবস্থিত সকলের কন্ঠই আবদ্ধ করে রেখেছিলাম । কেউ গান গেয়েছিলো , কেউ কবিতা , কেউ কৌতুক ইত্যাদি বিভিন্ন কিছু । আর মাসী-মেশোদের দূর থেকে ভেসে আসা কথা । আমার বড়ো মাসীর বড়ো ছেলে বাবুনদাকে ডেকেছিলাম , বেশ ঝাড়ি । কিন্তু একটা কথা আটকে গিয়েছিলো ওখানে । “আমার টাওয়েলটা কোথায় ?”

যাক ফিরে আসি বইমেলায় । এরপর আবারও গেলাম ১৯৯১ সালে । তখন ভারতীয় লেখকদের বইও আসতো । যাক বাংলা বই বলে কথা , সবারই বই পড়তাম , কিনতাম । আমার জীবনে বড়োদের বই (সেই সময় বইয়ের ভাগ সকলেই মেনে চলতো) উপহার হিসেবে পাই , তার নাম ছিলো “আবাস ।” ভুলে গেছি কার লেখা ।

যাক বই জমানো শুরু হলো । আমাদের বাসায় দুটো লাইব্রেরী ছিলো । একটি মামনির আরেকটি আমার । মেঝো মাসীর মেঝো ছেলে রানা আমার বইয়ের লাইব্রেরীর নামকরণ করলো , “গ্রন্থিকা ।” বেশ কিছু বই পড়তে নিয়ে আর ফিরে আসেনি । তাই রানা বুদ্ধি দিলো একটা খাতা কিনে বই যে নেয় , তার নাম আর সেই তারিখ লিখে রাখতে । এছাড়া বইয়ে লাইব্রেরীর নাম এবং পুস্তক নাম্বার উল্লেখ করতে । ১৯৯৩ সাল , আমার জীবনের আরেকটি বছর বইমেলায় । ওহ ১৯৯১ সালে আমার কলেজের বাংলার শিক্ষক শ্রদ্ধেয় আবু রায়হান সেলিম স্যার আমাকে বললেন জাতীয় কবিতা উৎসবে যেনো অংশ নেই । উনি আমার নাম দিয়ে রাখবেন । কিন্তু যেতে পারিনি । সেই বছরই জানলাম জাতীয় কবিতা উৎসবের কথা । একটি কথা বলে রাখতে চাই , আজ অব্দি আমি কবিতা উৎসবে যেতে পারিনি । ফিরে আসি আবারও ১৯৯৩ সালে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে গেলাম । এতো আনন্দ করেছিলাম , তখন এমন কোনো অতিরিক্ত ফালতু ভাবনার জন্ম হয়নি । বেশ ছিলাম । বইমেলা , ফুচকা খাওয়া । বড়ো মাসীর ছোট ছেলে মুন্না আমার একদিনের ছোট , ওর সাথে ঘুরতে যাওয়া । তবে ওর কিছু বন্ধু-বান্ধবও ছিলো । নাম ভুলে গেছি অনেকেরই । স্নিগ্ধা , বিলু , আশু আর মুন্নার ছাত্র সিধু । এমনও হয়েছে একদিন ঠেলাগাড়ীতে চড়েছি । এত্তো মজা পেয়েছিলাম । হুম জীবনে অনেক কিছু পেয়েছি , যা একটি মেয়ে কমই পায় । দেশের মতো জায়গায় আমার মতো মফস্বলের একটা মেয়ে ট্রাকের পেছনেও উঠেছে , আবার ট্র্যাক্টরেও ।

সেইবার বইমেলায় যে পরিমাণ বই কিনেছিলাম , দেশের লেখক থেকে শুরু করে দেশের বাইরের লেখকও ।

জীবনের চড়া-উৎড়াই পার করে ১৯৯৮ সালে আবার ঢাকায় আসি , ইডেন কলেজে মাষ্টার্সে ভর্তি হই । এরপর যে দু’ বছর ছিলাম বইমেলা ছাড় পায়নি । এমনকি পৌষমেলাও । আমি , সুস্মিতা , মধুছন্দা , লাকি এতো মজা করেছি যে না-পাওয়া অনেক কিছুই ভুলিয়ে দেয় ওসব আনন্দর কথা ভাবলে । আমরা না-পাওয়া ভাবি বেশী , তাই অনেক পেয়েও স্বস্তি পাইনা । এটা আমাদের মজ্জাগত । কিন্তু অনেক কিছুই তো বদল করে নিয়ে চলি জীবনে , এটাও করা যায় । আসলে আমার মধ্যে গভীরতা কম(নাকি বুঝতেই দেই না আছে) যার জন্যে সব পরিস্থিতিকে খুব হাল্কা করে নিতে পারি । যারা এমন হাল্কা করে নিতে পারে জীবনকে , তাদেরকে আমরা তাচ্ছিল্য করি , অবহেলা দেই । মানুষ কি আসলে এমনই ? পেয়ে ধরে রাখেনা আর না পেলে আপসোস করে । অতীত ভুল সংশোধনের জন্যে , আপসোসের জন্যে নয় । যা আমাদের জীবনে আনন্দ এনে দেয় , আমরা তার খবর না করে যে আনন্দ খুঁজছি , সেটাই খুঁজে বেড়াই । যাক অনেক বক্তব্য হলো । বাঙ্গালী স্বভাব সে কি আর বদলায় ? এক বিষয় ছাড়িয়ে অন্য বিষয়ে । এটুকুই থাক , এরপর দেখা যাবে বইমেলা বৈশাখী মেলায় পৌঁছে গেছে ।

হ্যামিল্টন , কানাডা
১০ ফেব্রুয়ারী , ২০১৪ ইং ।

মোট পড়েছেনঃ ৭৮৬জনআজ পড়েছেনঃ ০জন
ঘরে বসেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন

১২টি মন্তব্য

  1. আসলে আমার মধ্যে গভীরতা কম(নাকি বুঝতেই দেই না আছে) যার জন্যে সব পরিস্থিতিকে খুব হাল্কা করে নিতে পারি ।
    এই হাল্কা করে নেয়ার গুন কিন্তু অনেক কঠিন..এরকম থাকুন সবসময়.
    খুব মন দিয়ে পড়া লেখায় অনেক ভালো লাগা.. -{@

মন্তব্য করতে লগিন করুন অথবা নিবন্ধন করুন।

অনলাইনে ডাক্তার দেখাতে চান?