প্রতিটা বাচ্চাই আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্ম নেয়। আমার দুই সন্তানও দুই রকমের বৈশিষ্টের অধিকারী। তাদের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী মা হিসেবে আমার কেমন আচরন হওয়া উচিৎ তা নিয়ে আসলে আমার আজকের এ লেখা। কারণ, বাচ্চার বৈশিষ্ট্যমতে যদি মা হিসেবে আমি তাদের সাথে সেরকম আচরন না করি তবে তাদের আমি গড়ে তুলতে হয়তো পারব না। আমি পারবও না তাদের মধ্যে আমার চিন্তা, আমার স্বপ্ন ঢোকাতে।
আমার দুই ছেলে। বড় ছেলে এবার ক্লাস নাইনে পড়ে। ছোটো ছেলে ক্লাস সেভেনে।
স্বভাব মতে তারা দুজনেই ভিন্ন রকমের। বড় ছেলে চুপচাপ। একেবারে চুপচাপ। শান্ত স্বভাবের। বই পড়া ও আর্ট তার প্রিয় বিষয়। গান শোনে পুরানো দিনের। ‘এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন, কবে যাব কবে পাব ওগো তোমার নিমন্ত্রণ। ‘
তারপর ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে সাত সাগর আর তেরো নদীর পাড়ে।’ শুনে হাসি আমি মনে মনে। কম্পিউটারেই সে এসব গান ছেড়ে দিয়ে কম্পিউটারেই লেখে।

ছোটোছেলে তার একদম বিপরিত। কথা বলে প্রচুর। বই পড়েই না বলা চলে। সারাদিন খেলার চিন্তা। তবে সেও আর্ট করে চমৎকার। কিন্তু আর্টও করাতে হয় জোর করেই। সে অপেক্ষায় থাকে কখন তার বাবা আসবে আর দাবা খেলা শুরু হবে। তাকেও বই কিনে দেই প্রচুর। কিন্তু তাকে বইমুখি করতে পারলাম না।

এবার আসি তাদের পড়াশুনা নিয়ে। মেমনের পড়ার ধৈর্য্য হলো যতোক্ষ তার চোখে ঘুম আসে নাই। পড়ার ব্যাপারে মা যেটা বলেছে সেটাই তার কাছে সঠিক বলে সে মনে করতো। এক প্রকার ওটাই বেদবাক্য এমন। তার সকল আলোচনায় মাকে অংশগ্রহন করতেই হবে। মাকে তাই পড়তে হয়েছে এ বয়সে এসে প্রচুর। একেক সময় একেকরকম উদ্ভট প্রশ্ন নিয়ে হাজির হতো। আমি তো ঘেমে যেতাম সে সব প্রশ্ন শুনে। ছেলের সামনে যেনো লজ্জায় পড়তে না হয় তাই পড়তাম।
ওর ক্লাসের পড়াও ঠিক এরকম। আমিই নোট করেছি বেশির ভাগ। গ্রামার বা ব্যাকরণের সংজ্ঞা অবশ্যই বুঝে ও মুখস্ত করাইছি উদাহরণ সহ।
মেমনের মুখস্তশক্তি কম। সে বোঝে বেশ ভালো। তাই যে কোনো জিনিস তাকে নানাভাবে ডেলিভারি দিতে হইছে। সে পরে তা নিজের মতো করে লিখে দিয়েছে।
মেমন যে কোনো জিনিস ঠান্ডা মাথায় বুঝতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। তাড়াহুড়ো তার মাথায় তেমন কিছু ঢোকে না। কোলাহলে সে পড়তে পারে না।
বাইরের কোলাহল, শপিং এমন সব বিষয়গুলো তার অপছন্দ। এমনকি কোথাও দাওয়াতের বিষয়টাও। তাকে জোর করলে সে বিরক্ত বোধ করে। তাই আমি আর জোর করি না। তবে হ্যাঁ, তার এ আচরনটা আমাকে ভাঙতে হবে। নতুবা একসময় সে বাইরে তেমন মিশতে পারবে না। যেটা আমার হয়। আমি সবার সাথে তেমন মিশতে পারি না। এটা প্রচন্ড বিব্রতকর একটা জিনিস। আমি ঠিক এরকম। অমুক ভালো না। তারমানে তার মুখ দেখতেও আমার আপত্তি। যা একেবারেই ঠিক না।

আমার ছোটো ছেলে রিয়ান পড়াশুনা করার সময় তার মনে হয় কখন তার ছুটি হবে। কখন সে বাইরে যাবে খেলতে। কখন সুযোগ বুঝে মাকে সে বলবে টিভিতে খেলা দেখতে হবে। হ্যাঁ, মাঠে খেলতে না গিয়ে টিভির সামনে হা করে বসে থেকে খেলা দেখার কোনো যুক্তিকতা আমি দেখি না। যদি পারো মাঠে গিয়ে খেলো। খেলার সব সরঞ্জাম আমি তাকে দিয়েছি। পড়া বাদ দিয়ে বা নিজে খেলাধুলা বাদ দিয়ে টিভির সামনে বসে সারাদিন খেলা দেখলে মুস্তাফিজুর বা মাশরাফি হওয়া যাবে না।
আর ক্রিকেট খেলার তো শেষ নেই। একটার পর একটা ম্যাচ চলতেই থাকে। বাচ্চাদের দেখি ঘাড়ে স্কুল ব্যাগ নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা মোড়ের দোকানগুলোতে দাঁড়িয়ে খেলা দেখতেছে।
খেলা দেখবে না কেনো অবশ্যই দেখবে। কিন্তু তারও একটা লিমিট থাকা উচিৎ।

আর এতে করে বাচ্চারা নিয়মিত স্কুলেই যাচ্ছে না। ক্লাস ফাঁকি দিচ্ছে। আমি অবাক হয়ে যাই বাচ্চাদের প্রতি আমার দেশের স্কুলগুলোর শিক্ষক ও অভিভাবকদের অবহেলাগুলো দেখে। একটা স্কুল পড়ুয়া বাচ্চার বুদ্ধি কতোটুকুই বা ম্যাচিউর হতে পারে! সে বাচ্চা তার সহপাঠি যা করবে তাইই করবে। বা যা তার জন্য উন্মুক্ত তা সে করবে। গতানুগতিক স্কুল বাসা থেকে সে অন্যকিছু আশা করবে এবং সুযোগ পেলে তা করার চেষ্টা করবে। বাসা থেকে একটা বাচ্চা স্কুল ও কলেজের উদ্দেশ্যে রেডি হয়ে বের হলো কিন্তু সে সেখানে না পৌছে অন্য কোথাও গেলো আবার যথাসময়ে সে ঘরে ফিরে এলো। মা মনে করলো সন্তান তার ঠিকই পড়াশুনা করে বাসায় ফিরলো। কিন্তু মাঝখান থেকে একটা জীবন ও জীবন গড়ার শ্রেষ্ঠ সময় তার কাছ থেকে সরে গেলো। যখন টের পাওয়া গেলো আর সময় থাকলো না।
আমার দুই ছেলেকে যখন ক্যাডেটে ভর্তির জন্য স্প্রস্তুত করাচ্ছিলাম তখন আমি তাদের স্কুল বন্ধ করে দিছিলাম।কারণ স্কুল করে ক্যাডেটের পড়া একটু টাফ হয়ে যায়। আমি বাসায় রেখে তাদের পড়াতাম। অবাক ব্যাপার যেটা তা হলো তারা মাসে হয়তো একবার স্কুলে যেতো। তখন হয়তো বলতো কেনো আসে নাই! আমি তাদের আর কোনো কিছু পদক্ষেপ নিতে দেখি নাই। স্কুলে শুনেছি হোম ভিজিট বলে একটা বিষয় যোগ আছে। স্কুলের শিক্ষকরা বেশ কয়েকদিন অনুপস্থিত থাকা বাচ্চাদের বাড়িতে গিয়ে হোম ভিজিট করে। কিন্তু আদৌ কি হয় এ হোম ভিজিট?
এমনকি প্রতিটা বাচ্চার ভর্তির সময় অভিভাবকদের ফোন নাম্বার পর্যন্ত রাখা হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় আজ পর্যন্ত কাউকে শুনি নাই বাচ্চা স্কুলে যায় নাই বরে কোনো টিচার তার অভিভাবকদের ফোন দিয়েছে। তবে কেনো অভিভাবকদের এই সব তথ্য স্কুল কতৃপক্ষ সংগ্রহ করে রাখে?
হুম, স্কুল কর্তৃপক্ষ বলতে পারে এতো এতো বাচ্চার মধ্যে কোন বাচ্চা স্কুলে আসলো আর আসলো না তা দেখার দায়িত্ব তাদের নয় তবে হয়তো বিষয়টা অন্য কথা।
সব সন্তানের বৈশিষ্ট্য কখনো একরকম হতে পারে না। তবে সন্তান তার বেড়ে ওঠার সময়টাতে সে যা কিছু গ্রহণ করবে তাই সে একসময় উগলে দিবে।
আমার রিয়ান বই পড়তে তেমন একটা শেখেনি। আর সে নিজস্ব সৃজনশীলতা বিষয়টা কম উপলব্ধি করে। আর এজন্য আমি মা হিসেবে দায়ী। তার কারন, সে যখন বেড়ে ওঠে তখন আমার বাসায় প্রচুর লোক। বাচ্চা আমার নানান জনের সংস্পর্শে বেড়ে ওঠে। আর তারপর একসময় আমি মেমনকে গড়তে ওকে ছেড়ে দিলাম এই ভেবে যে মেমন পার হয়ে গেলে রিয়ানকে ধরতে পারব। এমন করে করে বাচ্চাকে আমি অনেকটা বাধ্য হয়ে ফোন ও খেলার দিকে ঝুঁকে দিছি।
ছোটো একটা শিশুর বেড়ে ওঠার সময়টাতে তার মধ্যে আসলে আমরা একটা সংস্কৃতিরও জন্ম দেই। সে বয়ে নিয়ে চলে আমার সংস্কৃতি। একটা বাচ্চা যখন কেবল সবকিছু নিতে শেখে তখন সে শিশু যদি বিভিন্ন ধরনের কাজের মানুষের হাতে বেড়ে ওঠে তবে তার মন মানসিকতা অতোটাও কি ব্রড মাইনডেড হয়ে বেড়ে ওঠে?
আমাদের আজকের প্রজন্ম আধুনিক হয়েছে ঠিকই কিন্তু হারিয়েছে ম্যানার্স। তারা আজ বড় রুক্ষ হয়ে বেড়ে উঠতেছে। বাচ্চাদের যেনো আমরা বুঝতেই পারতেছি না।
প্রতিটা মা হোক সন্তানের সব থেকে বড় বন্ধু। মায়েরা সন্তানের সামনে বসে টিভি সিরিয়াল ও অন্যের সমালোচনা বন্ধ করে সন্তানের সাথে কথা বলুক। গল্প করুক। প্রতিটা বাড়িতে গড়ে উঠুক এক একটি লাইব্রেরী। সন্তান বের হয়ে আসুক ফোনের জগৎ থেকে।
তারা আসলে মানুষ নামের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করুক।
সকলকে ধন্যবাদ।

৪১৬জন ৪১৪জন
0 Shares

৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ