আবহাওয়াবিদ আর জ্যোতিষীর মধ্যে পেশাগত ভাবে আমি খুব একটা অমিল খুঁজে পাইনা। উভয়েই ভবিষ্যৎ বাণী করে থাকেন কিন্তু মানুষ মাত্রই জানেন তাদের ভবিষ্যৎ বাণী অধিকাংশ সময়ে মেলেনা। যদ্দুর মনে পড়ে আমার ছোট বেলায় এক জ্যোতিষীর আগমন ঘটেছিলো আমাদের বাড়িতে। জ্যোতিষী আমাকে দেখেই চমকে উঠে বলেছিলেন এই ছেলেটা একদিন অনেক বড় হবে। জ্যোতিষীর ভবিষ্যৎ বাণীতে বিগলিত আমার বাবা মায়ের কাছ থেকে বেশ কিছু মাল কড়ি খসিয়ে সেই জ্যোতিষী কেটে পড়েন। কিন্তু এতো বছর পরে আমার বাবা-মা আমাকে দেখে হতাশ। তাদের মতে জ্যোতিষীর বাণী ফলেনি কিন্তু আমি হতাশ নই জ্যোতিষীর বাণীতে ভর করে আমি ত সত্যি বড় হয়ে গেছি! অনেক বড়। শৈশব কৈশোর পেরিয়ে এখন অন্য এক উচ্চতায় উঠে গেছি যেখান থেকে হাতি দিয়েও টেনে আমাকে নীচে নামানোর সাধ্য কারোর নেই, আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে… নাহ, আকাশে এখন আর আনন্দ স্থায়ী হয়না। চৈত্রের আকাশে আনন্দরা স্থায়ী হতে জানেনা। চৈত্রের আকাশ নারী মনের চাইতেও বৈচিত্রময়। ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলায়। কখন হাসে কখনো কাঁদে তাঁর ভবিষ্যৎ বাণী করতে আবহাওয়াবিদেরও বুকে কাঁপন ধরে। প্রেমিকারা যেমন তাদের প্রেমিকদের নিয়ে খেলা করতে ভালোবাসেন ঠিক তেমনি চৈত্রের আকাশ আবহাওয়াবিদদের নিয়ে খেলা করে তাদের পাতে ইট আর কাঁকড়ের যোগান দেয়। আমরা যেমন আমাদের প্রেমিকাদের দোষ দিইনা তেমনি ভাবে আকাশকেও দোষ দিতে চাইনা বরং দোষটা তাঁর ঘাড়েই চাপিয়ে দেই যিনি দোষ গুন নিরূপন করেন। বৈচিত্রময় চৈত্রের তেমনি এক আগুন লাগা সন্ধ্যায় বের হয়েছি রোজকার মতোই। মৃদু বাতাসে দোল খাওয়া চুলের মতোই বেতালে দুলছে পাঁজরের ভেতরে রাখা স্মৃতি গুলো। পাঁজর ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা স্মৃতি গুলো রোমন্থন করি কুশিয়ারার পাড়ে বসে একা একা। যে হাত ধরে পাড়ি দেবার কথা ছিলো রয়ে যাওয়া জীবনের বাকিটা পথ, সেই গুটিয়ে নেয়া হাত আজ আমার থেকে অনেক দূরে। চাইলেই এখন আর সেই হাত ধরা যায়না তবুও আমি থেমে থাকিনি জীবন রথে বেদম ছুটে চলেছি। জীবনের পতিত ভূমিতে স্বপ্ন ও শখের বীজ বুনেছি হরদম, চারা গজানোর আগেই তাঁর উপর পা মাড়িয়ে হেঁটে গেছি বহুদূর, তাও একা একা…

আমার প্রবাসী কাজিন লন্ডন থেকে দেশে বেড়াতে এলে তাঁর চেহারা দর্শন করতেই আমি আঁৎকে উঠি তাঁর মুখের বেহাল দশা দেখে। কাল ক্ষেপন না করেই প্রশ্ন করি কি’রে লন্ডনে শেভিংয়ের কস্টটা কি একটু বেশি যে শেভিংয়ের পুরো টাকা দিতে পারিসনি বলে নাপিত ব্যাটা অর্ধেক শেভ দিয়ে বাকি অর্ধেক দাড়ি তোর থুতনিতে রেখে দিয়েছে ? এখানে বলে রাখা ভালো যে আমার প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যার দৌড় শূন্যের কোঠায় কিন্তু আমার প্রবাসী ভাই-বোনদের সাথে কথা বলার সময় কেতাদুরস্ত ভাব ফুটানোর জন্য দু চারটা ইংরেজী শব্দ ব্যবহার না করলে যেন কথা বলার মধ্যে আরাম পাইনা। মাত্র কিছু দিন আগে গত হওয়া আমার দাদীর মুখেও আমি কখনো দোকান শব্দটি বলতে শুনিনি। এমনকি তিনি দোকানকে একান, দুকান বা তিনকানও বলেননি আজীবন তিনি শপ বলে গেছেন। মৃত্যুর ক’দিন আগেও তিনি আমাকে বলেছিলেন “হ্যারে সুমন তুই যখন বাইরে যাবি আসার পথে শপ থেকে আমার জন্য এক জার হরলিক্স নিয়ে আসিস” তেমনি ভাবে তিনি জানলাকে উইন্ডো, উঠোনকে ইয়ার্ড, বারান্দাকে ব্যালকনি বলতেন। অথচ আমার দাদীর বিদ্যার দৌড় ছিলো সে সময়কার মসজিদের ইমাম সাহেবের নিকট আমপারা আর কোর-আন শরীফ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই পরিবর্তন অবশ্য দীর্ঘ প্রবাস জীবনে কথার পালে ফিরিঙ্গীদের হাওয়া বৈ অন্য কিছু নয়। যা-হোক, আমার প্রশ্নের উত্তরে আমার কাজিন আশ্বস্ত করলো যে পাউন্ডের অপ্রতুলতার কারণে তাঁর চার কোণা বিশিষ্ট চৌকস চেহারার এই পরিণতি নয় বরং এটাই এখন হালের ফ্যাশন, নাম ফ্রেঞ্চ কাট !! ফ্রেঞ্চ ফ্রাই যেমন আমার খুব পছন্দের তেমনি ফেঞ্চ কাট নামটা শুনে তৎক্ষণাৎ আমার মনে ধরে গেলো। আমার কালো মুখটা নিমিষেই ফর্সা হয়ে যায় নামটা শুনে। মনের মধ্যে ফ্রেঞ্চ কাটের শখ হালকা ভর করলো, আমিও ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি রাখবো। কিন্তু আমার শখগুলি পূরণ হবার নয় তাইতো দাড়িরাও হরতাল ডেকেছে আমার থুতনিতে। হরতাল ভেঙ্গে যে ক’জন আশ্রয় নিয়েছে আমার থুতনির তলে তা দিয়ে আর যাই হোক ফ্রেঞ্চ কাটের মজা লওয়া শক্ত। তবে এই ভেবে আরাম পাই যে তেনারা যদি বাংলাদেশের অপরিকল্পিত জন্মহারের মতো বেড়েই চলতো তবে আর আমাকে ইন্টারনেটের বিল দিয়ে এই নোট লিখতে হতো না। রোজ ভোরে শেভিংয়ের মতো বেখরচার পাতায় সব চলে যেত, জলে যেত! সাশ্রয়ে আশ্রয় পেয়েই শান্তি লাগে। আমার সাথে ফ্রেঞ্চ কাট না-ই থাকুক আমি একা একা ভালোই আছি…

প্রথম যখন বাংলাদেশে চুলের ফ্যাশনে ষ্টেপ কাট যুক্ত হয় তখন শখের বসে আমিও সেই ফ্যাশনে আমার মাথা ভাসাই। কিন্তু তাতে বাধ সাধেন স্বয়ং আমার পিতৃমহাশয়! আমার এই ফ্যাশন দেখে তিনি হুংকার না ছাড়লেও ঠোঁটে ঠোঁট কামড়ে বিড়বিড় করে তাকে বলতে শুনেছি “মাথার উপর কি এমন জায়গার অভাব পড়েছে যে ওখানে দুতলা দালান তুলতে হবে!” দালানওয়ালা মাথা নিয়ে আমি আর বাবার সম্মূখে যাইনি। শখকে মাটি দিয়ে মাথাকে আবার একতলাতে নামিয়ে আনি। আমার বাবাও অনেক দিন লন্ডনে ছিলেন। লন্ডনের উঁচু দালানের ভেতর তিনি শান্তি পেতেন না। তাঁর মতে ঘরের চৌকাঠ পেরিয়েই যদি মাটি স্পর্শ করা না যায় তবে কি আর শান্তি মেলে ? সিঁড়ি ভেঙ্গে রোজ রোজ ঘরবন্দি হওয়া বাবার পছন্দ নয় বলে বাড়িতে দাদার তৈরী ইটের বাড়ির উপর আর ইট বসাননি। বরং পাকা ইটের ঘরের টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার শব্দ বাবার অনেক পছন্দ হলেও আমি বিরক্তিতে ঘামি। সবাই আমাকে একা রেখে চলে গেলেও বৃষ্টি নামক ঐ একখান জিনিষ আমাকে একা রাখতে দেয় না, সারাক্ষণ সঙ্গী হয়ে থাকে কখনো চোখে কখনো আকাশে, থেকেই যায় কোন এক জায়গায় যা দৃষ্টি থেকে দূরে নয়…

অপেক্ষা করা যে কি যাতনার যা অপেক্ষমান মানুষ মাত্রই জানেন। কিন্তু অপেক্ষার মধ্যেও যে একধরনের সুক্ষ্ণ সুখ থাকে তা ক’জনই বা জানেন ? আমি জানি বলেই অপেক্ষা করতে ভালোবাসি। এ অপেক্ষা আর কারো জন্য নয় আমার হরিণ কালো সুনয়না জয়িতার জন্য। পৃথিবীর সব জঞ্জাল পাড়ি দিয়ে আমি সকাল থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত জয়িতার জন্য অপেক্ষা করতে ভালোবাসি। এই অপেক্ষা করতে করতে সুমনের কন্ঠে শোনা হয়ে যায় আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ… জয়িতা আর দশ জনের মতো নয়, সকাল বেলা নিউইয়র্কের রাস্তায় অফিসগামী মানুষের মতো সেও এক হাতে নাস্তা করতে করতে কোচিং সেন্টারে পাঠ দান দিতে যায় তারপর ভার্সিটির ক্লাসের ধকল, ভার্সিটির ক্লাস শেষে ভার্সিটির বাসের হ্যান্ডেলে ঝুলে আবারো সেই কোচিং অতঃপর শ্রান্ত দেহ নিয়ে বাসায় ফেরত আসে। তাঁর ক্লান্ত মনে বিরক্ত ছড়াতে চাইনা বলে আমি অপেক্ষায় থাকি একা একা। এক সময় তাঁর শ্রান্ত দেহটা সতেজ হয় কিন্তু আমার অপেক্ষার শেষ হয়না। আমি অপেক্ষার সুখ সঙ্গী করেই রাস্তায় হাঁটি। পাশে কেউ থাকেনা কেউ হাঁটেনা। আমি জানি আমার এ পথ চলা অনন্ত কালের জন্য তাইতো হেঁটেই যাই আর মনে মনে গুন গুনিয়ে গাইতে থাকি, যদি তোর ডাক শোনে কেউ না আসে তবে একলা চলরে…

জবরুল আলম সুমন
সিলেট।

২৬৭জন ২৬৭জন
0 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য