ভালোবাসি তোমায় (২৬তম খন্ড)

ইঞ্জা ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬, শুক্রবার, ০৭:১০:১১অপরাহ্ন গল্প ২৬ মন্তব্য

 

images (2)

 

শাওয়ার নিয়ে অবণী মাথা মুছতে মুছতে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে উকি দিলো, ওর রুমের জানালাটা রাস্তার দিকে, পুরা রাস্তাটাই দেখা যায় ওর জানালা দিয়ে, এই মূহুর্তে তুষার না পড়লেও রাস্তার আসে পাশে উঁচু হয়ে আছে তুষারের স্তুপ, রাস্তায় প্রায় সময় তুষার পরিষ্কার করার কারণে তেমন তুষার জমতে পারেনা। এই তুষার পড়ার আগ মূহুর্তে অভী অবণীকে নিয়ে সাংহাই ত্যাগ করে, অবণী এগিয়ে গিয়ে নিজের লাল ওভারকোটটা হাতে নিয়ে সোফায় বসে পড়লো, ওভারকোটে হাত ভুলাতে ভুলাতে অভীর কথা ভাবতে লাগলো, নিজের উপরেই রাগ হলো ওর, এইভাবে কি ওর রাগ করা উচিত ছিলো, অভীর গার্লফ্রেন্ড থাকতেই পারে, অভী তো ওকে কখনো ভালোবাসেনি যা ভালোবেসে ছিল সে নিজেই যা কখনো অভীকে বলতেই পারেনি কিন্তু যখন অভীর গালে সেই মেয়েটির লিপেস্টিকের দাগ দেখলো তখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি, সে বুঝে গিয়েছিলো অভী আর কখনো ওর হবেনা, বড় একটা নিশ্বাস ফেললো অবণী, সব ছেড়ে ছুড়ে চলে এলাম এইতো ভালো হলো, কষ্টটা না হয় আরো বাড়তে পারতো, নিজের মনকে প্রবোধ দিলো অবণী, দুই চোখের কোনায় তখন অঝোর ধারা।

সেল ফোনে রিং শুনে চোখ মুছে বেড টেবিলের কাছে গিয়ে ফোন তুলে নিয়ে স্ক্রিনে চোখ রেখে দেখতে পেলো রবিন ফোন দিচ্ছে, রিসিভ করে হ্যালো বলতেই অপরপ্রান্ত থেকে রবিন বললো, হাই, বিরক্ত করলাম নাতো?
না না বিরক্ত কিসের, বলুন।
কেমন আছেন?
জি ভালো।
কন্ঠ শুনে মনে হচ্ছেনা আপনি ভালো।
না আমি ঠিক আছি, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
কেন, হঠাৎ ধন্যবাদের কি করলাম?
আপনার কারণেই এতো ভালো একটা চাকরি পেলাম।
ধন্যবাদের দরকার নেই আর একান্তই যদি ধন্যবাদ দিতে চান তাহলে আমার সাথে যদি আজ রাতের ডিনার করেন মনে করবো ধন্যবাদ আমার পাওয়া হয়ে গেছে।
তাই, তাহলে তো ডিনার করতেই হয়, তা আপনি কি পিক করবেন নাকি আমি আসবো, জিজ্ঞেস করলো অবণী।
নাহ আমিই আসবো, আপনি তো এখনো কোনো কিছু চিনেননা, তা কি খাবেন বলুন, জিজ্ঞেস করলো রবিন।
আপনার যা খুশি।
ঠিক আছে, সন্ধ্যায় আমি আসবো আপনাকে পিক করতে।
ঠিক আছে, দেখা হবে।
জি দেখা হবে, বাই।
বাই।

কখন এসেছো তোমরা, ছোট মা?
এই তো আধা ঘন্টা হয়, তা মিষ্টি কই তোর?
ফিক করে হেসে দিয়ে অবণী ফ্রিজের ভিতরে রাখা চকলেট নিয়ে এসে একটা নিজ হাতে খুলে ছোট চাচীর মূখে ভরে দিলো।
ছোট বাবা কই, অবণী জিজ্ঞেস করলো।
ফ্রেস হয়ে একটু রেস্ট নিচ্ছে এখনই আসবে বলতে বলতেই চোট চাচা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসলো।
অবণী ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো।
ছোট বাবা তুমি শুনেছো আমার চাকরি হয়েছে?
না শুনিনি, তুই বল শুনি।
অবণী অবাক চোখে চোখ বড় করে একবার ছোট চাচা আরেকবার ছোট চাচীকে দেখতে লাগলো।
ছোট চাচী হেসে দিয়ে বললো, মেয়েটাকে কেন জ্বালাতন করছো?
চাচা হেসে দিয়ে বললেন, রবিনের মুখে শুনা আর আমার মেয়ের মুখে শুনার মজাই আলাদা।
অবণী হেসে বললো আচ্ছা শুনো, রবিন সকালে ফোন করে চাকরির বিষয়ে জানিয়ে রেডি থাকতে বললো আর কিছুক্ষন পরে এসে নিয়ে গেলো কানাডা শীপিং লাইনের অফিসে, ওখানে ইন্টারভিউ দিলাম আর ওদের পছন্দ হলো আমাকে তাদের ম্যানেজার হিসাবে, ছয় মাস তারা অবজার্ভ করবে ওরায়ার যদি ভালো কাজ করছি দেখি তাহলে ওরা আমাকে নিউইয়র্কে পাঠাবে ওদের ওখানকার ইনচার্জ হিসাবে, বেতন আপাতত সাত হাজার কানাডিয়ান ডলার সাথে গাড়ী দেবে যদি আমি একমাসের মধ্যে ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে পারি, এক নিশ্বাসে বলে গেল অবণী, চাচাকে চিন্তা করতে দেখে জিজ্ঞেস করলো, ছোট বাবা তুমি খুশি হউনি?
তা খুশি হয়েছি কিন্তু ছয় মাস পরে যদি আমেরিকায় ট্রান্সফার করে তাহলে তো তুই এইখান থেকে চলে যাবি।
ছোট বাবা তুমি চিন্তা করোনা, আমি মাঝে মাঝে আসবো তোমাদের কাছে।
ঠিক আছে, এখনো তো ছয় মাস আছে, দেখা যাকনা কি হয়?
ছোট বাবা, সন্ধ্যায় রবিন আসবে, আমাকে নাকি ডিনার করাবে, যাবো?
যাবি অবশ্যই যাবি, ছেলেটার কারণেই তোর চাকরিটা হলো, যা যা ছেলেটা খুশি হবে।
ঠিক আছে।

এইখানে একটা রেস্টুরেন্ট আছে যেখানে ভালো ইন্ডিয়ান ফুড পাওয়া যায়, গাড়ী ড্রাইভ করতে করতে রবিন বলল।
আপনার যেখানে খুশি সেখানেই নিয়ে যাবেন, আমার কোন চয়েজ নেই।
স্টেক কেমন লাইক করেন?
অনেক টেস্ট করেছি খারাপনা।
তাহলে এইখানকারটা চেক করুন, অন্য গুলোর টেস্ট ভুলে যাবেন।
তাহলে চলুন সেইখানেই যাওয়া যাক।
এই চলেই এসেছি আর পাঁচ মিনিট।
রেস্টুরেন্টের নাম “কাসাব্লাঙ্কা “, রেস্টুরেন্টের পাশেই পার্কিংয়ে গাড়ী পার্ক করে দুজনেই নামলো।
আজকের ওয়েদার ভালো না হলে এতক্ষণে তুষারপাত হতো, রেস্টুরেন্টের দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করার সময় রবিন বললো।
ওয়েটার একটা তাড়াহুড়ো করে এসে নড করে বললো, গুড ইভনিং মি. রবিন এন্ড ম্যাম।
আমরা ওই কোনার টেবিলে বসতে পারি কি, কোনার এক টেবিলের দিকে নির্দেশ করে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলো রবিন।
সিউর মি. রবিন সিউর, প্লিজ আসুন ইংরেজিতে জবাব দিলো ওয়েটার।
রবিন অবণীকে নিয়ে এগিয়ে গেল টেবিলের দিকে, টেবিলের সামনে এসেই রবিন একটা চেয়ার টেনে ধরে অবণীকে বসার আমন্ত্রণ জানালে অবণী চেয়ারে গিয়ে বসলো আর অপর পাশেই রবিন বসে জিজ্ঞেস করলো, এনি ড্রিংক্স ফর দা লেডি?
সরি আমি ড্রিংক করিনা, অবণী জানালো।
ওকে, তাহলে ড্রিংক্স বাদ, ওয়েটার মেনু প্লিজ, ওয়েটার মেনু এগিয়ে দিলো রবিন আর অবণীর দিকে।
অবণী মেনুতে কিছুক্ষন চোখ বুলিয়ে বললো, আই উইল হ্যাভ টি বোন স্টেক।
ভেরী গুড, তাহলে আমি নেবো টেন্ডারলিয়ন স্টেক।
এনি ড্রিংক্স স্যার এন্ড ম্যাম, ওয়েটার জিজ্ঞেস করলো।
সোডাওয়াটার, অবণীকে জিজ্ঞেস করলো রবিন, অবণী সায় দেওয়াতে সোডা ওয়াটারই দিতে বললো।

খাবারের অর্ডার নিয়ে ওয়েটার চলে গেলেই, অবণী বললো, বেশ সুন্দর প্লেইস।
হুম বেশ মনোরম রেস্টুরেন্টা, তা এখন বলুন আপনার কথা, শুনি।
কি শুনবেন?
আগেই শুনেছি আপনি ঢাকায় ভালো জব করতেন কিন্তু তা ছেড়ে চলে এলেন কানাডায়, কেউ কি চলে আসে এমন চাকরি ছেড়ে?
তেমন কিছু না, চলে এলাম, ইচ্ছে হলো।
নাকি কাউকে ভালোবাসতেন?
অবণী চমকে উঠলো, জিজ্ঞেস করলো কেন এমন মনে হলো?
রবিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, এমনিই প্রশ্ন করলাম, দুঃখিত।
না না ঠিক আছে, আপনি তো ভালো জব করেন, বিয়েতা করেননি কেন এখনো?
হয়ত মনের মতো কাউকে পায়নি বলে।
তাই?
হুম।
আপনার তো জম্মই এই দেশে কিন্তু খুব ভালো বাংলা বলেন কি ভাবে?
আসলে ঘরে আমরা সবাই বাংলায় কথা বলি আর তাই বাংলার চর্চাটা ভালোই হয় আমাদের।
খুব ভালো লাগলো, যে ভাষার জন্য আমাদের ভাই বোনেরা শহীদ হয়েছেন সেই ভাষার চর্চা করেন শুনে ভালো লাগলো, অবণী খুশি হয়ে বললো।
আসলে আমার বাবা আর মা দুজনেই আপনার মতই করে বলে আর আমার জম্ম কানাডাতে হলেও প্রথমে আমি বাঙ্গালি তারপর আমি কানাডিয়ান।
ধন্যবাদ আপনাকে এমন সুন্দর চিন্তাধারা ধারণ করেন বলে।

কি চিন্তা করছো তুমি, মোনালিসা জিজ্ঞেস করলো।
না চিন্তা করছিনা, উপভোগ করছি এই পাহাড় আর লেইকের সৌন্দর্য, আগে কখনো আমি ভাটিয়ারীতে আসিনি, এমন পরিবেশ বাংলাদেশের অন্য কোথাও আছে বলে আমার মনে হয়না, ধন্যবাদ তোমাকে এই জায়গাটার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য, অভি সুনাম করলো।
আমাদের চট্টগ্রামে আরো সুন্দর সুন্দর জায়গা আছে, ফয়েজ লেইকও বেশ সুন্দর আর পার্বত্য চট্টগ্রাম তো সুন্দর পরিবেশের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
হুম আমার ইচ্ছে আছে ভবিষ্যতে এইসব জায়গা ঘুরে দেখার।
কিন্তু এমন জায়গাই আনলাম যেখানে মানুষের মন ভালো হয়ে যায় কিন্তু তুমি কেমন যেন মনমরা হয়ে আছো, কনভেনশনে এওয়ার্ড পেয়েছো, তোমার শীপ গুলোর উদ্বোধন সুন্দর ভাবে হয়েছে, তোমার মন তো এমন থাকার কথানা, তুমি নিশ্চয় অন্য কিছু নিয়ে ভাবছো?
না না কিছু ভাবছিনা, চল আরেকটু হাটি, বেশ লাগছে এইখানে।
তাহলে চলো বলেই হাত বাড়িয়ে দিলো মোনালিসা।
অভি হেসে হাতটি ধরে এগুলো, খেয়াল করলো দূরে অনেক গুলো ছেলে মেয়ে হাসাহাসি করছে, দৌঁড়াচ্ছে, অভি মোনালিসার হাত ছেড়ে দিয়ে ওইদিকে হাটতে শুরু করলো, এর এমন গেদারিং খুব ভালো লাগে, কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো, হটাৎ একটা মেয়েকে দেখে চমকে উঠলো,মনে হলো যেন অবণী, মেয়েটিও অভিকে দেখে থমকে দাঁড়ালো তারপর পিছন ফিরে হাঁটতে লাগলো দ্রুত গতিতে, অভি দ্রুত গেল মেয়েটির পিছন পিছন কারণ অভি চিনতে পেরেছে মেয়েটিকে, মেয়েটি অবণী নয়, অবণীর বোন ফাল্গুনী।
অভি পিছন পিছন আসছে দেখে ফাল্গুনী একটা বাসে উঠে বসে পড়লো আর অভিও দ্রুত বাসে উঠে ওর পিছন পিছন এলো আর বললো, ফাল্গুনী তুমি এইভাবে পালিয়ে এলে কেন?
ভাইয়া আমি অসুস্থ ফিল করছি।
কেমন লাগছে, চলো ডাক্তার দেখাই।
না নআআ ডাক্তার লাগবেনা।
কোথায় উঠেছো, তুমি এইখানে কি ভাবে?
ইউনিভারসিটি থেকে শিক্ষা সফরে এসেছি, আজ চলে যাবো, ভাইয়া আমি একটু ঘুমাবো, পরে কথা হবে।
অভি বুঝতে পারলো, ফাল্গুনী কথা বলতে চাইছেনা আর ওই সময়েই অন্যান্য স্টুডেন্টরা হুরমুর করে গাড়ীতে উঠছে দেখে অভি অপ্রস্তুত হয়ে গাড়ী থেকে নেমে গেল, বাসটা ছেড়ে চলে যাওয়া পর্যন্ত দেখে দাঁড়িয়ে রইল, খেয়াল করলো ফাল্গুনী বাসের জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলো।

মোনালিসা এতক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে সব খেয়াল করছিলো, কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, কে মেয়েটা?
জি সম্পর্কে ছোট বোন।
তাহলে তোমাকে দেখে এমন পালালো কেন?
জানিনা, আচ্ছা চলো, সন্ধ্যা হয়ে আসছে, ফেরা যাক।
ঠিক আছে চলো বলেই হন হন করে গাড়ীতে গিয়ে উঠলো, গাড়ী আঁকা বাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে চালিয়ে নিয়ে চলেছে মোনালিসা আর অভি চিন্তায় মগ্ন, ফাল্গুনী কেন ওকে দেখে এইভাবে পালালো, কেনই বা কথা বলতে চাইলোনা, হতভম্ব হয়ে গেছে অভি ফাল্গুনীর এই ব্যবহার দেখে।
তুমি এখনো ওই বিষয়টা মাথা থেকে ফেলতে পারলেনা?
অভির চিন্তায় ছেদ পড়তেই চমকে উঠলো, কিছু বলছিলে?
বলছিলাম বিষয়টা মাথা থেকে ফেলো।
হুম তা ঠিক বলেছো।
মেয়েটা তোমার কেমন আত্মীয় হয়?
আম্মার বান্ধবীর মেয়ে, অবণীর কথা এড়িয়ে গেল।
কুলসির কাছাকাছি এসে মোনালিসা বললো, চলো সামনে ভালো একটা স্যানেক্স শপ আছে, হাল্কা কিছু খেয়ে নিই।
না থাক হোটেলেই চলো, ওখানেই কিছু খাবো।
ঠিক আছে হোটেলেই যাওয়া যাক।
দুজনেই ফিরে এলো অভির হোটেলে, গাড়ী রেখে লিফটে করে রিশেপ্সনে চলে এলো আর রিশেপ্সনের উল্টো পাশে সিঁড়ি দিয়ে উপরে চলে এলো যেখানে হাল্কা কিছু খাওয়া যায়, দুজনেই একটা টেবিল দখল করে বসলো আর ওয়েটারকে কফি আর সেন্ডউইচের অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল হটাৎ মোনালিসা বলে উঠলো, অভি ওই মেয়েটা দেখ ওই কোনায় বসে আছে।
কোন মেয়ে বলে অভি মাথা ঘুরিয়ে কোনার টেবিলের দিকে তাকালো আর দেখলো ফাল্গুনী একা বসে সেল ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে।

___________ চলবে।
ছবিঃ Google.

৫৮৪জন ৫৮৩জন
0 Shares

২৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ