বাবা, তোমার কি মনে পড়ে একদিন তুমি আমাকে তোমার প্রশস্থ কাঁধে করে ঘুরে বেড়িয়েছিলে সারা শহরময়? আমি এক হাতে তোমার চুল আর অপর হাতে তোমার গলা শক্ত করে ধরে রেখেছিলাম। বাবা, তোমার সেই কাঁধ ছুঁতে এখন আর আমাকে চেয়ারে কিংবা টেবিলের উপর উঠে দাঁড়াতে হয়না যেকোন অবস্থায় দাঁড়িয়েই ছুঁয়ে ফেলতে পারি অথচ তোমার সেই প্রশস্থ কাঁধে চড়া ত অনেক দূরের কথা এখন আমি ছুঁতেও পারিনা, মনের মধ্যে কি এক সংকীর্ণতা কাজ করে সহজ করে বললে বলবো খুব লজ্জা লাগে, আচ্ছা বাবা সন্তানেরা বড় হলে কি লাজুক হয়ে যায়? বাবা, তোমার কি মনে পড়ে একদিন আমরা একটি গ্রামে ঘুরতে গিয়েছিলাম, বিশাল বড় এক সাঁকো পাড়ি দিতে হবে আমাদের, আমি তোমার হাত ধরতে চেয়েছিলাম তুমি তোমার হাতটি ছাড়িয়ে নিলে তারপর আমার হাত তুমিই শক্ত করে ধরলে। তুমি বলেছিলে আমি যদি তোমার হাত ধরে পাড়ি দিতে চাই তাহলে আমি যে কোন সময় তোমার হাত ছেড়ে দিতে পারি কিন্তু তুমি আমার হাত কখনোই ছাড়বেনা। বাবা, তোমার সেই হাতটা এখনো আছে, একই রকম আছে তবে কেন আমি এখন সেই হাত ধরতে পারিনা?

বাবা, তোমার কি মনে পড়ে ওই যে বৈশাখী মেলায় আমাকে একবার নিয়ে গিয়েছিলে। নাগরদোলা চড়ার জন্য আমি বায়না ধরেছিলাম কিন্তু তুমি আমাকে চড়তে দাওনি, তোমার মনের মধ্যে ভয় ঢুকে গিয়েছিলো যদি কোন দূর্ঘটনা ঘটে যায়। কিন্তু আমি নাছোড় বান্দা, নাগরদোলা না চড়ে বাড়ি ফিরবোনা তবুও তুমি তোমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলে। আমার মন ভোলানোর জন্য কত্ত কি কিনে দিলে, যখন যেটা চোখের সামনে পড়েছে সেটাই তুমি কিনে দিয়েছো তবুও আমার চাপা কান্না থামছেনা। একসময় তুমি আমাকে বাড়ি নিয়ে এলে। বাড়িতে আসার পর সবাইকে দেখে কান্নাটা আরো বেড়ে গেলো। কোন খেলনা’ই আমি নিচ্ছিলাম না, ছুড়ে ফেলছিলাম বার বার। মেলা থেকে কিনে আনা মাটির সব খেলনা আমি ভেঙ্গে ফেলেছিলাম অভিমান করে কিন্তু তুমি একটুও রাগ করোনি বরং তুমি আমাকে আবারো তোমার চওড়া কাঁধে চড়ালে তারপর আবার মেলায় ছুটলে। আমাকে নাগরদোলা চড়িয়ে আবারো তুমি আমার জন্য মাটির পুতুল, খেলনা কিনে তারপর ফিরলে একটি বারের জন্যও তুমি আমার দিকে চোখ লাল করে তাকাওনি।

বাবা, তোমার কি মনে পড়ে ক্লাস টু-তে আমি যখন প্রথম হই তখন তুমি বাচ্চাদের মতোই আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলে! আমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলেছিলে “বল বাবা তোর কি চাই, আজ তুই যা চাইবে আমি তা তোকে দেব” আমি কোন চিন্তা ভাবনা না করেই বলে ফেলেছিলাম আমার একটা হাতির বাচ্চা চাই! তুমি বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লে আমার অদ্ভুত চাওয়া শুনে, তুমি হয়তো ভেবেছিলে আমি বড় জোর একটা সাইকেল চাইবো তোমার কাছে কারণ এর আগের বছর ভাইয়া যখন ক্লাস ফাইভে প্রথম হয় তখন সেও সাইকেল চেয়েছিলো তুমি তার জন্য সুন্দর একটা সাইকেল কিনে দিয়েছিলে। কিন্তু আমি সাইকেল না চেয়ে হাতির বাচ্চা চাইবো তা কখনো হয়তো ভাবোনি। তুমি যখন মুখটা ভার করে আমার কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছিলে তখন আমি জিজ্ঞেস করছিলাম বাবা তুমি কোথায় যাচ্ছো হাতির বাচ্চা আনতে? তখন তুমি বলেছিলে “হাতির বাচ্চাকে খাওয়াতে হবেনা? হাতির বাচ্চার জন্য কলার বাগান কিনতে যাচ্ছি, কলার বাগান কেনা হয়ে গেলে তারপর হাতির বাচ্চা কিনে নিয়ে আসবো।”

তুমি সত্যি সত্যি বাসা থেকে বেরিয়ে গেলে আর আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি কখন তুমি হাতির বাচ্চা নিয়ে বাসায় ফিরবে। সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে আসছে কিন্তু তুমি বাসায় ফিরছোনা দেখে বার বার মা’কে জিজ্ঞেস করছিলাম বাবা এখনো ফিরছেনা কেন। মা তখন শুধু মুখ টিপে হাসছিলো। বাবা, তোমার কি মনে আছে রাত তখন অনেক হয়ে গিয়েছিলো কিন্তু আমি বারান্দা থেকে সরে আসছিলাম না, মা যতবারই আমাকে ঘরে নিতে এসেছে ততবার’ই আমি তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। আমি কেবল বলছিলাম বাবা আসুক তারপর বাবাকে নিয়ে ঘরে ঢুকবো। বাবা, তুমি যখন বাসায় ফিরেছিলে তখন অনেক রাত, গেটের বাইরে রিক্সার ঘন্টা শুনে আমি এক দৌড়ে উঠোনে চলে গিয়েছিলাম। সেটা রিক্সার ঘন্টা ধ্বনি ছিলোনা আমার জন্য কিনে আনা ছোট্ট সাইকেলের ঘন্টা ধ্বনি ছিলো। আমি খুশিতে পাগল হয়ে যাবার যোগাড়। সাইকেলটা পেয়ে আমি ভুলে গিয়েছিলাম হাতির বাচ্চার কথা। তুমি শুধু সাইকেল’ই আনোনি, সেই সাথে অনেকগুলো মিষ্টি ও একটা বড় উপহারের প্যাকেট নিয়ে এসেছিলে। উপহারের প্যাকেটে ছিলো তিনটি কাঠের হাতি! একটা বড় হাতি আর দুটো বাচ্চা হাতি।

বাবা, তুমি যদি হাতির বাচ্চা নিয়ে না আসতে তাহলে আমি সাইকেলে’ই তুষ্ট হতাম কিন্তু কাঠের হাতিগুলো এনে আমার জ্বালাটা বাড়িয়ে দিলে। আমি ত কাঠের হাতি চাইনি, আমি জলজ্যান্ত হাতির বাচ্চা চেয়েছি! আমি ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না শুরু করে দিলাম। তুমি আবারো আমাকে বুকে জড়িয়ে নিলে তারপর বললে কলার বাগান কেনা হয়ে গেছে আর কিছু দিনের মধ্যে হাতির বাচ্চা তুমি নিয়ে আসবে। তুমি সত্যি সত্যি আমাকে এক সপ্তাহের মধ্যে হাতি কিনে দিলে! একটা দুটো হাতি নয় অনেক গুলো হাতি ও হাতির বাচ্চা!! আমি, ভাইয়া আর মা’কে নিয়ে তুমি এক সপ্তাহের মধ্যে ঢাকা চিড়িয়াখানায় গেলে। সেখানে শুধু হাতিই ছিলোনা, জিরাফ, বাঘ, ভাল্লুক, সিংহসহ হরেক রকমের পশু পাখি ছিলো। তুমি আমাকে তখন ওগুলো দেখিয়ে বলেছিলে এই সবগুলো নাকি তুমি আমার জন্য কিনে রেখেছো! ক্লাস টু পড়ুয়া আমি এতোটা নির্বোধ ছিলাম তা ভেবে এখনো আমার খুব হাসি পায়। বাবা তোমারও কি হাসি পায় সেই ফেলে আসা দিন গুলোর কথা মনে করে?

বাবা, তোমার সেইদিনের সেই প্রশস্থ কাঁধ এখনো ঠিক তেমনি রয়ে গেছে, শুধু আমার জন্য এখন আর তোমার প্রশস্থ কাঁধ বরাদ্দ হয়না, এখন সেটা দখলে নিয়েছে তোমার নাতি-নাতনীরা। মানুষ বয়সের দিক থেকে যত বড় হয় তাদের মনও নাকি সাথে সাথে বড় হতে থাকে কিন্তু তোমার বেলায় আমার তা উল্টো হয়েছে। এখন আর কারণে অকারণে তোমার হাত ধরতে পারিনা, কি এক সংকীর্ণতা মনের মধ্যে কাজ করে। মুখ ফুটে আজ অব্দি কখনোই তোমাকে বলতে পারিনি বাবা আমি তোমাকে ভালোবাসি, প্রচন্ড ভালোবাসি, অনেক অনেক ভালোবাসি। অথচ তুমি ভালো করেই জানো মা-কে আমি যতটা ভালোবাসি তারচে বেশি তোমাকেই ভালোবাসি, তোমাকে আমি কখনোই বলতে পারিনি কিন্তু মা-য়ের উপর কোন কারণে যদি আমি রেগে যেতাম তখন আমি মা-কে বলে দিতাম যে আমি আমার বাবা’কেই বেশি ভালোবাসি। মা আমার কথা শুনে কখনো মন খারাপ করলে মা’কে আবার জড়িয়ে ধরে বলতাম মা, বাবাকে নয় আমি তোমাকেই বেশি ভালোবাসি। মা আমার কথা শুনে হাসতো কিন্তু ওই হাসিটা এখনো তোমার মুখে আমি ফুটাতে পারিনি।

বাবা, তোমার কি এখন আর একটি বারের জন্য ইচ্ছে হয়না সেই ছোট্ট বেলার মতো আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার কপালে একটি চুমু এঁকে দিতে, নাকি আমার মতো তোমারও মন সংকীর্ণ হয়ে গেছে? বাবা জানো, আজ বাবা দিবস !! বাবা দিবসে আসলে কি হয় তা কখনোই তুমি তোমার ঘরে টের পাওনি, আমরা’ই তোমাকে টের পেতে দিইনি আমাদের সংকীর্ণতা কিংবা অনভ্যস্ততার কারণে। বাবা, তুমি কি একটু আমার ঘরে আসবে ? আমাকে কি একটু জড়িয়ে নেবে ? আমি তোমার বুকে নাক মুখ ঘষে সব সংকীর্ণতা ঝেড়ে চিৎকার করে বলতে চাই “বাবা আমি তোমাকে ভালোবাসি, বা-বা, আ-মি  তো-মা-কে  ভা-লো-বা-সি”।

জবরুল আলম সুমন
সিলেট।
১৯ই জুন, ২০১২ খৃষ্টাব্দ।

বাবার দেয়া উপরহার
বাবার কিনে দেয়া হাতি তিনটির একটি হয়তো বার্ধক্য জনিত কারণে মারা গেছে, কারণ অনেক দিন থেকেই একটা হাতি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। কিন্তু দুটো রয়ে গেছে ঠিক প্রথম দিনের মতোই…
৪০১জন ৪০৩জন
0 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

️️ 🍂️️ 💝 ️️ 🌟 🌺 💐 💥 🌻 🍄 🌹 💐 ⭐️ 🎉 🎊