“বাংলাভাষা আর আমরা”

গালিবা ইয়াসমিন ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৯, বৃহস্পতিবার, ০১:৪৫:২৯অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৫ মন্তব্য

“বাংলাভাষা আর আমরা”
-গালিবা ইয়াসমিন
ঘটনা-১: গত (১২/০১/২০১৮) তারিখ এর কথা -একটা কাজে খুব সকালে “শিল্পকলা একাডেমি” যেতে হয়ে ছিল। আমার সাথে মাও গিয়েছিলেন। বাংলামোটর থেকে শিল্পকলায় পৌঁছানোর পর গেইটে এক বড় ভাইয়ের জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করছিলাম তখন গেইটে ডিউটিরত এক দারোয়ান আরেক দারোয়ান কে উদ্দেশ্য করে একটা বাজে কথা বলে, কথাটা শুনে আমরা গেইটে আর না দাড়িয়ে শিল্পকলার ভিতরে গিয়ে দাড়াই।
ঘটনা-২ : গতকাল (২০/০২/২০১৮) হাতিরপুল থেকে শাহবাগ যাওয়ার জন্য বাসে উঠি । বাসে বসে একজন যুবকের কন্ঠ খুব কানে আসছিল, সামনে তাকিয়ে দেখি খুব সুদর্শন এবং শিক্ষিত (গলায় এক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডি কার্ড ঝুলছিল) এক ছেলে হয়তো তার বন্ধুকে মুঠোফোনে কিছু বলছিল কিন্তু যা বলছিল তা বাসের সব যাত্রীর কানে যাচ্ছিল, সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিচ্ছিল।
ঘটনা-১ এ দারোয়ান যা বলেছিল তা মোটেও আমাদের উদ্দেশ্যে বলেনি কিন্তু এমন কথা শুনলে যে কারো অপমান বোধ হবে আর ঘটনা-২ এ তো যুবকটা বাসের সব যাত্রীদের লজ্জায় মাথা কেঁটে ফেলে দিয়েছে।
আমরা কেন ভুলে যাই আমাদের কোন অধিকার নেই নিজের কথা দিয়ে আসে পাশের মানুষদের বিরক্ত করার, মানুষ হিসেবে কি আমরা পারি না অযথা নিজের কথা বলার ভঙ্গিতে কোন মানুষকে অপমান না করতে!

এসব বাদ যদি দিয়ে আমি বলতে চাই তাহলে বলবো আমরা কি ভুলে গিয়েছি আমাদের মাতৃভাষার ইতিহাস! ভাষা আন্দোলনের রূপকার “ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত” এর কথা , আমাদের “সালাম-বরকত -রফিক-জব্বার” তাদের কথা,বুক ভরা সাহস নিয়ে ১৪৪ধারা ভঙ্গ করে বুকে বুলেট নেয়ার ইতিহাস ,২১শে ফেব্রুয়ারি – শহীদ মিনার- আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, কতো গুলো জীবন ,কত কিছু ত্যাগের পর আমরা এই ভাষা বুকে ধারণ করতে পারছি, কতো শহীদের বুকের রক্ত দিয়ে এ ভাষা আমরা কিনেছি!!!
সে ভাষা যে ভাষা আমাদের কাছে মায়ের দুধের মতো দামি সে ভাষায় এমন সব খারাপ শব্দ উচ্চারণ করতে কি আমাদের লজ্জা লাগে না!!
জানেন, মাতৃভাষায় গাল দেয়ার অর্থ নিজের এই মায়ের ভাষাকেই অপমান করা বোঝায়।
আজকাল আবার নতুন চল এসেছে কথায় কথায় দু’চারটে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার না করলে না-কি চতুর বা গোছালো বা রসবোধপূর্ণ হওয়া যায় না এবং সমাজে চলা যায় না । সবার কথা বলতে আমি নিজে কিন্তু এসবের বাহিরে না , মানুষকে বোঝানোর জন্য লিখা হয় কিন্তু তার মাঝে কিছু কথা নিজেকে নিজেই বোঝানোর জন্য লিখি।
আসল কথায় আসি – নিজের মাতৃভাষায় অন্য ভাষার মিশ্রণ করা নিজেদের অপমান করা বোঝায়। এই বিষয়টা অনেকটা এমন যে- নিজের ঘরের মানুষকে পর ভেবে, পরকে আপন মনে করে গলায় জড়িয়ে ধরা, এটা নিশ্চই কোন দিক দিয়ে চতুরতা (Smartness) না।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পেয়েছিল “গীতাঞ্জলি’র জন্য, “গীতাঞ্জলি” নিশ্চই ইংরেজি ভাষায় লেখেননি তিনি। অক্ষয়কুমার বড়াল,আখতারুজ্জামান ইলিয়াস,এ এম হারুন-অর-রশিদ,ইনামুল হক,ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর,ওমর আলী,কাজী নজরুল ইসলাম,খান মোহাম্মদ ফারাবী,গোলাম মোস্তফা,চণ্ডীদাস,জীবনানন্দ দাশ,তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়,দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,নির্মলেন্দু গুণ,প্রফুল্ল রায়,ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়,বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,ভারতচন্দ্র, রায়গুনাকর,মাইকেল মধুসূদন দত্ত,যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত,রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ,লালন শা্‌হ ,শওকত আল্‌,সমরেশ মজুমদা্‌র ,হুমায়ূন আহমেদ – আসা করি এসব মানুষদের আর নতুন করে আপনাদের সাথে পরিচয় করাতে হবে না , এক কথায় বলতে এরা সেই মানুষরা যারা বাংলা ভাষা বুকে ধারণ করে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে সাহিত্য চর্চা করেছেন ।
এদের মধ্যে “মাইকেল মধুসূদন দত্ত ” তার কথা কি কারো মনে আছে ! সে কিন্তু আমাদের মতো চতুরতা দেখাতে ভিনদেশী ভাষায় সাহিত্য চর্চা করতে চেয়েছিলেন কিন্তু তার পরিণতি আমরা সবাই জানি । শেষ সময়ে সে বাংলায় সাহিত্য চর্চা করেই এতটা নাম অর্জন করেছিলেন ।
আমাদের এ বাংলা ভাষা আজও এতটাই সমৃদ্ধশালী যে বিদেশিরা মুগ্ধ হয়ে আমাদের এ বাংলাভাষা শুনে । পৃথিবীতে সবচেয়ে শ্রুতিমধুর ভাষার মধ্যে বাংলাভাষা চতুর্থ। পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের কথায় কথায় ইংলিশ বলা প্রয়োজন আমি তা মনে করি না , ইংলিশ হচ্ছে একটা আন্তর্জাতিক ভাষা পুরো বিশ্বের সাথে যোগাযোগ করার একটা মাধ্যম মাত্র , তা নিয়ে নিজ ভাষার সাথে তাল গোল পাকানোর কিছুই নাই ,নিজ ভাষায় ভিন্ন ভাষার মিশ্রণ বোকামি ছাড়া কিছুই না ।
আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি আমরা জানি প্রত্যেক মাসে আমাদের যেকোনো একটা বিষয় নিয়ে ইংলিশে উপস্থিত বক্তৃতা দিতে হয় তখন আমাদের জামাকাপড় ,হাঁটাচলা আমাদের সব কিছু চতুরতা প্রকাশ করে । কই তখন তো আমরা ইংলিশে আরেক ভাষা মিশিয়ে নিজেকে আরও চতুর প্রকাশ করতে চাই না তাহলে কেন আমরা সাধারন কথা বলায় বাংলায় ভিন্ন ভাষার মিশ্রণ ঘটাতে চাই !?
আজকাল এদেশের মিডিয়া জগতে কিছু মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে যারা বাংলাদেশী হয়েও ঠিক মতো বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারে না আবার তারা নাকি পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করবে , কিভাবে ???
প্রিয় পাঠক , এখন আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন আমি এই বাংলা ভাষা নিয়ে এতো একঘেয়েমি কথা লেখার জন্য ওই দু’টো ঘটনা কেন টানছিলাম !
আশেপাশে ঘটে যাওয়া সব কিছু থেকে আমি শিক্ষা গ্রহণ করতে এবং মানুষকে শিখাতে পছন্দ করি ।
এছাড়াও
কারণ ১ঃ আমাদের এতো দামী ভাষা আমরা এভাবে এই ভাষার মান নষ্ট করতে পারি না,
২ঃ বাংলাভাষায় অযথা জনসম্মুখে গালাগাল করে নিজের ভাষাকে আর অপমান করবেন না ,দয়াকরে ,
৩ঃ বাংলা ভাষায় ভিন্ন ভাষার মিশ্রণ মোটেও আপনার চতুরতা প্রকাশ করে না,
৪ঃ বাংলাদেশী হয়েও যারা ঠিক মতো বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারে না তারা মোটেও পৃথিবীর বুকে এই বাংলাদেশকে তুলে ধরতে পারবে না।
৫ঃ নিজেকে চিনুন , নিজের দেশকে ভালোবাসুন এবং নিজের বাংলাভাষাকে ভালোবাসুন ।
মনে করলাম আমার ঘটনায় যারা দারোয়ান ছিল তারা নিচু সমাজের লোক তাই তারা সচেতন না , কথা বলায় তাদের ভুল হতেই পারে কিন্তু ঐ যুবক! সে তো শিক্ষিত, উনি কিভাবে এতো অসচেতন ছিলেন !!
ভুল যে আমার হয় না তা নয় , ভুল আমারও হয় , আমিও মেজাজ খারাপ হলে কথা না বলে গালিগালাজ করি কিন্তু আজও কেও বলতে পারবে না কখন আমার গালিগালাজের জন্য পরিবেশ নষ্ট হয়েছে অথবা আশেপাশের মানুষরা আমার গালিগালাজের কারণে বিরক্ত-অপমানিতবোধ করেছেন ।
আমরা মানুষ আর মানুষ মাত্রই ভুল , ভুল সবার হয় তাই যতটা পারবো অপরকে গালিগালাজ করে থেকে বিরত থাকবো , সচেতন থাকবো যেন আমার ভাষার ব্যাবহার কথা বলার ভঙ্গিতে কারো সমস্যা না হয় আর ভাষার মিশ্রণ করবো না , যখন যে ভাষায় কথা বলতে মন চাইবে শুধু মাত্র সে ভাষায় কথা বলবো , এতে আমাদের নিজেদের লাভ আমরা একসাথে অনেক ভাষা শিখতে পারছি ।
প্রতি বছর “২১শে ফেব্রুয়ারি” আসে ,আমরা “শহীদ দিবস” পালন করি, পুরো বিশ্ব “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” পালন করে -এই দিনটায়। আমরা সবাই বাচ্চা থেকে বুড়ো সবাই শহীদ মিনারে ফুল দেই আর “আমার ভায়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি ! ” এই লাইন দু’টা গুন গুন করতে থাকি । আবার আজকাল কিছু মানুষ আছে যারা এই দিনে প্রতিজ্ঞা করে বসি অন্তত এক দিনের জন্য হলেও তারা সারাক্ষন নির্ভেজাল বাংলা বলবে। কেনো এক দিনের জন্য! কেনো !! এটা কি সারাজীবনের জন্য হতে পারে না ! প্রতিজ্ঞা করার আগে একবার ভাবুন আপনি বাংলাদেশী , আপনার শরীরে বাংলামায়ের রক্ত, এই ভাষার জন্য আপনার ভাইয়েরা জীবন দিয়েছে ।
আসুন সবাই প্রতিজ্ঞা করি –
“আর নয় একদিন – দু’দিনের মিছে বাংলা বুলি ,
সবাই একসাথে প্রমিত বাংলা চর্চা করি ,
ভাষার মিশ্রণ থেকে দূরে থাকি ,
সবাই বাংলাদেশ এবং বাংলা ভাষাকে ভালোবাসি”।

-গালিবা ইয়াসমিন
(২১/০২/২০১৮)
১৫১জন ১৫১জন
15 Shares

৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য