সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

পৌরুষ প্রেম

দালান জাহান ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, বুধবার, ০৪:১৭:৫৮অপরাহ্ন ছোটগল্প ৪ মন্তব্য

গতো তিন দিন ধরে স্বরুপের ঘুম হচ্ছে না। ছেলেটার জন্য অনুশোচনার মতো একটা নতুন উপসর্গ যোগ হয়ছে তার জীবনে। সকালে সে দেখতে পায়, ছেলেটি তার ঘরের এক কোণায় বসে কাঁদছে স্বরূপ বিছানা ছেড়ে দ্রুত তার কাছে যায়, “সুমন তুমি কাঁদছো কেন? কী 

হয়েছে তোমার?” “যাও তুমি ছোঁবে না আমায়, তুমি আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছো!” স্বরূপ তাকে দুহাত ধরে তোলে এনে বিছানায় বসায়। 

কিন্তু ছেলেটি তার কপালে চুমো খাওয়ার জন্য ঠোঁট দুটো এগিয়ে নিয়ে আসে স্বরূপ ইতস্তত বোধ করে কিন্তু ছেলেটি তার কপালে চুমো খেয়ে হা-হা করে  হেসে ওঠে।  ঠাৎ রিংটোন বাজতেই ঘুম ভেঙে যায়। ঘুমের ঘোরেই ফোনটা রিসিভ করে সে। ওপার প্রান্ত  থেকে একটা সুরেলা কণ্ঠ ভেসে আসে, “আমার ছেলেকে আপনি কী বলেছেন ? ” স্বরূপ নিস্তব্ধ ও  নিশ্চুপ হয়ে যায়। মহিলা কণ্ঠ আরও তীব্র ঝাঁঝালো করে আবারও বলেন, “আমার ছেলেকে আপনি কী বলেছেন বলুন, আপনার জন্য আমার ছেলে ঘুমের ঔষধ  খেয়ে এখন মৃত্যুশয্যায়। আমার ছেলের কিছু হলে আমি আপনাকে ছাড়বো না আপনার নামে মামলা করব আমি।”

এই সাত সকালে মহিলার কথাগুলো যেন মরিচ বাটার মতো তার হৃদয়ে জ্বালাতন করছে। স্বরূপ আয়নার সামনে দাঁড়ায় নিজেকে গিয়ে ভালো করে দেখে। কিন্তু চাইলেই কী সব দেখা যায়? অনেক দেখাই থাকে চির অদেখা হয়ে।

স্বরূপ দ্রুত ব্যাগ গুছিয়ে শহরের দিকে রওনা হয়। আলমারি থেকে শখের নীল শার্টটা বের করে কিন্তু শার্টটার আয়রন নষ্ট হয়ে গেছে। শার্টটা তার একবার পড়তে ইচ্ছে করছে আরেকবার ইচ্ছে করছে না। কিন্তু আজ শার্টটা পড়তে খুব মন চাইছে তার। কিছু কিছু চাওয়ার ব্যাখ্যা কখনও হয় না। স্বরূপও নিজেও নিজেকে বোঝাতে পারছে না। 

এই শার্টটাই মধুমিতার শেষ স্মৃতি।

মধুমিতা স্বরুপের জীবনের এক উজ্জ্বল অধ্যায় যার পৃষ্ঠাগুলো আজও নিভৃতে পড়েন স্বরূপ ওরফে খবর উদ্দিন। মধুমতী ছিলো সনাতন ধর্মাবলম্বী আর স্বরূপ মুসলমান হওয়ায় তাদের সম্পর্কটা মেনে নেয়নি তাদের পরিবার। যদিও স্বরূপের আম্মু স্বরূপের দিকে তাকিয়ে তাদের বিয়েটা দিয়েছিলেন কিন্তু মধুমিতার বাবা-মা কিছুতেই মেনে নিলেন না। তারা থানা পুলিশ করলেন কিন্তু কোন লাভ হলো না।

ঝামেলা এড়াতে স্বরুপের মায়ের পরামর্শ মতে 

দ্রুত বাচ্চা নিলেন তারা। মধুমিতা যখন আটমাসের অন্তঃসত্ত্বা তখন একদিন মধুমিতার মা এলেন স্বরূপদের বাড়িতে দু’দিন থাকলেনও স্বরূপের সাথে ভালে মন্দ কথাও বললেন  এবং বোঝালেন এখন তারা এই বিয়েটা মেনে নিয়েছেন। মধুমিতাও মা’কে পেয়ে খুব খুশি হলেন। চলে যাওয়ার সময় তিনি স্বরুপ এবং স্বরূপের মা’কে রিকোয়েস্ট করলেন মধুমিতাকে সাথে দেওয়ার জন্য। স্বরুপের মা রাজি হলেন এবং স্বরুপকে বুঝিয়ে বললেন এখন আর কিছু করতে পারবে না। যদিও মধুমিতা যেতে চায়নি প্রথমে তবুও গেলেন সকলের কথা শোনে।

সেইযে গেলো মধুমিতা আজ পনেরো বছর যায়।  তাদের বাড়িতে তাদের আত্মীয়ের বাড়িতে সব জায়গায় খোঁজ করেও তাকে আর পেলো না স্বরুপ। মধুমিতাকে ভুলতে না পাড়ায় আজও তার সংসার হলো না। এই শার্টটা মধুমিতার স্মৃতি এটা পড়লেই মধুমিতার কথা খুব মনে পড়ে তার। আর বেড়ে যায় পুরনো ক্ষতটাও।  

নিছক একটা ফোন কলের জন্য একটা ছেলে এমন কাণ্ড করতে পারে এটা সে ভাবতেই পারছে না । তবুও সন্ধ্যা সাতটায় স্বরুপ সদর হাসপাতালে পৌঁছেন। কিন্তু মহিলার কথা মনে হতেই তার বুক ভয়ে ধড়ফড় করে ওঠে। যদি কিছু করে বসে , যদি সত্যিই ছেলেটা মরে যায়! যদি সকলের সামনে কলার চেপে ধরে!  যদি সত্যি সত্যি মামলা করে দেয়! পুলিশে দেয়। এমন শত ভাবনা তাকে গুলিয়ে ফেলে।  তাই মনে মনে একটা ফন্দি করে সুমনের নাম্বারে ফোন করেন স্বরূপ।

যথারীতি ফোনটা রিসিভ করেন সুমনের আম্মু। “হ্যালো, আমি স্বরূপ বলছি আপু, আপনার ছেলের কী অবস্থা এখন ? ” জি বলুন সুমন এখন সুস্থ আছে , ডাক্তার রেস্ট দিয়েছেন , হাসপাতালেই আছেন। আপনি কোথায় ? আমার ছেলের এই অবস্থা হয়েছে আপনার জন্য, আপনি আসলেন না যে।” দেখুন আমি একটু ব্যস্ত আছি  তাই আমার এক বন্ধুকে পাঠিয়েছি একটু বেড নাম্বার ওয়ার্ড নাম্বারটা বলে দিন প্লিজ। ” ‘ও আপনি ভয় পেয়েছেন , খুব ভালো ঘটনা ঘটিয়ে বন্ধু পাঠিয়ে বসে থাকেন।” এই বলে ওয়ার্ড নং বলে দিলে স্বরূপ চুপিচুপি পৌঁছায় সুমনের কেবিনে। 

সুমন শুয়ে আছে বেডে তার হাতে একটা স্যালাইন চলছে। স্বরূপকে দেখেই সুমন বলে উঠলো, “আপনি নিশ্চয়ই স্বরুপ ভাইয়া”? ” “তুমি কী করে নিশ্চিত হলে আমিই স্বরূপ?” “আমি জানি স্বরূপ ভাইয়া অবশ্যই আমাকে দেখতে আসবেন “! “তাই! তুমি খুব নিশ্চিত?”

কিন্তু না আমি স্বরুপের বন্ধু বুঝেছো? স্বরুপ আমাকে পাঠিয়েছেন! “

“না তুমি মিথ্যে বলছো, স্বরূপ ভাইয়া কখনও এমন করবে না, তুমি মিথ্যে বলছো! তুমি মিথ্যে বলছো!” এই বলে স্বরূপ তার মা’কে ডাকতে শুরু করেন। “মা মা দেখো কে এসেছে?  উনি নাকি স্বরূপ ভাইয়া নন।” ছেলের চিৎকার শোনে দৌড়ে আসেন তার মা। কেবিনে ঢুকতেই 

স্বরূপ ফ্রিজ হয়ে যান। সমুদ্রে হারানো বহু মূল্যবান কিছু আজও কেউ পেয়েছি কিনা জানা নেই কিন্তু পেলে তার আনন্দ যেমন হতো তারচেয়ে অধিক বেশি আনন্দে স্বরূপ থ হয়ে যান। দুজন দুজনের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে দীর্ঘ সময় এ দেখার যেন হয় না কভু শেষ।

যদি কেউ বলেন কবর থেকে একজন উঠে এসেছে পনেরো বছর পর এটাকে কী বিশ্বাস করা যায়! যে মানুষটি পনেরো বছর আগে হারিয়ে গেছে যার কোন খোঁজ নেই খবর নেই তার জন্য হৃদয়ে একটি কবর তৈরি করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। কিন্তু বিশ্ব বিস্ময়পূর্ণ। সেই মানুষটিই আজ চোখের সামনে বসে আছে সুমনের মাথায় হাত দিয়ে। 

স্বরুপের দুটো প্রশ্ন আদরের দু ঠোঁটে মিশে কেবলই চুমো খাচ্ছে সুমনের কপালে। কারও মুখে কোন কথা নেই স্বয়ং বিধাতার রহমতের মতো ঝর্ণার জল পড়ছে আর পড়ছে। 

৯৪জন ৩জন
0 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য