IMG_20160219_111430

প্রকাশিত হয়েছে প্রীণন ফারুকের প্রথম উপন্যাস ‘গোধূলির আকাশ জুড়ে রক্তিম অরুণ’ উপন্যাসটির নামকরণ নিয়েই প্রথমে একটা ধাক্কা খেলাম! গোধূলির আকাশ জুড়ে রক্তিম অরুণ কীভাবে থাকে! গোধূলি তো সূর্য অস্ত যাওয়া কালীন সময়কে বোঝায় আর অরুণ বলতে নতুন সূর্য, সকালের সূর্য অর্থেই বেশি ব্যবহৃত হয়। তাহলে কী সূর্য অস্ত যেতে ভুলে গিয়ে আবার উদয় হয়ে যাচ্ছে!

এক নিঃশ্বাসে বইটি পড়ে শেষ করার পর আমার বিস্ময় কেটে গেলো। ‘গোধূলির আকাশ জুড়ে রক্তিম অরুণ’ গ্রন্থটি আসলে কোন এক মাওলার চরের উপাখ্যান। মাওলার চরের কোন ভৌগলিক পরিচয় নেই গ্রন্থে, কিন্তু বুঝতে বাকি থাকে না, এ মাওলার চর বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া, অন্ধকারে থাকা গ্রামগুলোরই প্রতীক। যেখানে শিক্ষার আলো পৌঁছেনি বরং কিছু ভণ্ড ধর্মান্ধতার বেড়াজালে আবদ্ধ করে প্রজন্মকে শিক্ষার্জনে বিরত রাখতে নানা ছলচাতুরীর আশ্রয় নেয়। মাওলার চরের মতো শত শত গ্রাম আছে এদেশে, যেখানে বিরাজ করে ঘোর অন্ধকার। ‘অন্ধকার’ শব্দটি দিয়েই উপন্যাসটির শুরু হয়; কিন্তু শেষটা হয়েছে আলোকিত অবস্থায়।

অন্ধকারকে দূর করতে গিয়ে উপন্যাসের মুল চরিত্র রোদ্দুরের বাবার অর্ধ গলিত কাটা মুন্ডু পড়ে থাকে তাল গাছের নিচে আর মা স্বামী হত্যার রহস্য উম্মোচনে দৌড়ঝাপ করতে গিয়ে একদিন দেখা গেলো রহস্যজনকভাবে নিজ ঘরের ভেতরে রশিতে ঝুলে আছেন। বাবা যে আলোর রশ্মির সন্ধান দিয়েছিলেন পরবর্তী প্রজন্ম রোদ্দুরের হাত ধরে তা মাওলার চর গ্রামটিতে ছড়িয়ে পড়ে। আর তাঁর সহযোগী হিসাবে তাঁকে পথ দেখিয়ে চলে আরেক সংগ্রামী নারী সোনালী।

প্রতিক্রিয়াশীলতার ঘোর অন্ধকার থেকে একটি মাওলার চরকে আলোর পথে ধাবিত করার নিরন্তর সংগ্রাম ও চেষ্টা ফুটে উঠেছে সোনালী, রোদ্দুর, মণি, ইউসুফ প্রভৃতি চরিত্রগুলোর মাধ্যমে। হিল্লা বিয়ে বন্ধ, স্কুল প্রতিষ্ঠা, শহিদ মিনার, বৈশাখী মেলা, বাউল গানের আসর ইত্যাদির মাধ্যমে প্রগতির আলো হাতে তাদের নিরন্তর সংগ্রাম মাওলার চরের মানুষের মাঝে জাগরণ তৈরি করে। সিরাজুদ্দি, সুলু মুন্সীদের পশ্চাদপদতার বিরুদ্ধে নিয়ত সংগ্রাম করে গেছে তারা। আধুনিক শিক্ষা ও প্রগতিবিরোধী মনোভাব, ধর্মের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে নিয়ত এক সংগ্রামের উপন্যাস ‘গোধূলির আকাশ জুড়ে রক্তিম অরুণ’।

ধর্ম ও প্রতিক্রিয়াশীলতার সবচেয়ে বড় শিকারটির নাম নারী। ধর্মের বুলি আওড়ানো সমাজের প্রতিনিধি সিরাজুদ্দিরা রাতের আঁধার নামলে সবার অগোচরে ব্যাভিচারে মত্ত হয় আবার পরস্ত্রীতে আসক্ত এবং প্রতিশোধের নেশায় প্রগতির পক্ষে নারীর সংগ্রামকে থামিয়ে দিতে তাঁর উপর কলঙ্ক চাপিয়ে হিল্লা বিয়ের মাধ্যমে নিজের কব্জায় আনারও আপ্রাণ চেষ্টা চালায়।
এ গ্রন্থে লেখক নারীর ক্ষমতায়ন, নেতৃত্ব ও প্রগতিশীলতাকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। একজন সোনালী, একজন মণি আবির্ভূত হয়েছে হাজার হাজার পুরুষের চেয়েও অধিক শক্তি ও ক্ষমতা নিয়ে, নিয়ন্ত্রণ করেছে পুরো মাওলার চরকে। ধর্মান্ধতা ও প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা নেতৃত্ব দিয়ে গেছে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে।

আমাদের দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ বিদেশের শ্রম বাজারে শ্রম দেয়, গ্রামে পড়ে থাকে তাদের স্ত্রী-সন্তানরা। স্বামীসঙ্গবিহীন নারীদের কঠিন জীবন ও অবাধ যৌনতার নির্মম বাস্তবতাকে অত্যন্ত নির্মোহ দৃষ্টিকোণ থেকে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক এ গ্রন্থে। যৌনতা জীবনের একটি অংশ। জীবনের উপস্থাপন করতে গিয়ে যৌনতারও উপস্থাপন করা হয়েছে কিন্তু কোথাও শিল্পের সীমানাকে অতিক্রম করেন নি লেখক। আবার লেখক তাঁর সুনিপুণ লেখনীশৈলীর মাধ্যমে মাওলার চরের আধারে ঢেকে থাকা রাতের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেছেন “মাওলার চরের দিনগুলো কখনো কর্মমুখর কখনো অলস;কিন্তু মাওলার চরের রাতগুলো সবসময়ই কর্মমুখর!”
বয়ঃসন্ধিকাল নিয়েও লেখকের অসামান্য পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা উপন্যাসটিকে বিশেষ মহিমা দান করেছে। সাধারণ পাঠকের কাছে তা একটু বাড়াবাড়ি মনে হলেও একজন লেখক যখন লিখতে বসেন তখন নির্মোহ দৃষ্টিকোণ থেকেই তা তুলে আনেন।

উপন্যাসের প্রধান দুটো চরিত্র সোনালী ও রোদ্দুর সম্পর্কে চাচী-ভাতিজা। কিন্তু অনাথ রোদ্দুর ও নিঃসন্তান সোনালী এক সময় পরিণত হয়ে যায় এক পবিত্র সম্পর্ক মা-ছেলেতে। কিন্তু গল্পের আকস্মিক নাটকীয়তায় ও অনিবার্য বাস্তবতায় তাদের সম্পর্কটি পুনর্নির্মিত হয়ে যায়, পরিণত হয় রক্ত-মাংসের চিরন্তন মানব-মানবীতে। উপন্যাসটি পড়লেই এ সম্পর্কের বাঁক-বদলটি উপলব্ধি করা যাবে। দলিলুদ্দির অবমাননাকর আচরণ আর সিরাজুদ্দির সুপ্ত আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে সোনালীর এই সিদ্ধান্তটি প্রতিবাদ হিসাবেই ফুটে উঠেছে।

উপন্যাসটিতে লেখকের আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহারে বেশ মুন্সিয়ানা লক্ষণীয়। ময়মনসিংহের খাঁটি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেছে অধিকাংশ চরিত্র। মাওলার চরের অতীত ও বর্তমানের বিভিন্ন প্রসঙ্গ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবেই এসেছে। যারা গ্রামে থেকেছেন কখনো, তারা যখন গ্রন্থটি পড়বেন তখন মনে হবে এটা যেন তাদেরই গ্রামের প্রতিচ্ছবি। খুবই চেনা ও জানা এসব। লেখক তাঁর অসামান্য দক্ষতায় তা তুলে এনেছেন ‘গোধূলির আকাশ জুড়ে রক্তিম অরুণ’ গ্রন্থে। গ্রাম্য নানা কিংবদন্তি, গ্রাম্য নারীদের ঝগড়া, রাজনীতি-কূটনীতি, প্রতিক্রিয়াশীলতা, ভণ্ডামি প্রভৃতি বিষয়গুলো নিখুঁতভাবে উপন্যাসটিতে তোলে এনেছেন।

‘গোধূলির আকাশ জুড়ে রক্তিম অরুণ’ গ্রন্থটির মূল চরিত্রের নাম মাওলার চর। সিরাজুদ্দি-সুলু মুন্সীদের কারণে অন্ধকারে নিমজ্জিত মাওলার চরকে সোনালী, রোদ্দুর, মণি, ইউসুফ নামক সূর্যদের কারণে আলোকিত মাওলার চরে রূপান্তরের গল্প এ উপন্যাস। আর তাই মাওলার চরের গোধূলিতে রাত্রির অন্ধকার কড়া নাড়ে না; উদিত হয় রক্তিম অরুণ, নতুন সূর্য, নতুন ভোর, নতুন সকাল।

লেখক ও উপন্যাসটির সার্বিক সাফল্য কামনা করি।

বিঃদ্রঃ ফেসবুকে যে ক’জন বন্ধুর লিখা আমাকে মুগ্ধ করে প্রীণন ফারুক তাদের একজন। তাঁর লেখার হাত অসাধারণ! পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা অনেক তীক্ষ্ণ। বিশ্লেষণী ক্ষমতাও অনেক নিখুঁত। আরো একটি বিষয় হলো তাঁর ক্ষুরধার লেখনির মাধ্যমে অনেক অপ্রিয় সত্যও বেরিয়ে আসে। আলোচ্য উপন্যাসটিতেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। “গোধূলির আকাশ জুড়ে রক্তিম অরুণ” তাঁর প্রথম উপন্যাস। কিন্তু উপন্যাসটি পড়তে নিলে মনেই হবে না এটি তাঁর প্রথম উপন্যাস।

অসাধারন এই উপন্যাসটি পাওয়া যাবে অমর একুশে গ্রন্থমেলায়।
স্টল-দাঁড়কাক
লিটল ম্যাগ চত্ত্বর
ঘরে বসে পেতে বিকাশ নম্বর : ০১৭১৭ ৭১৪৮০৪

৩৯২জন ৩৯২জন
0 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ