নিশির গল্প ২

নীরা সাদীয়া ২৬ এপ্রিল ২০১৭, বুধবার, ০৩:৪৯:৫৭অপরাহ্ন গল্প, সাহিত্য ১৪ মন্তব্য

fb_img_1482752958479
স্যার খুব রোমান্টিকভাবে নিশীর দিকে তাকাতেন।আমরা ছোট হলেও এটুকুতো ঠিক বুঝতাম। নিশীও বোধহয় ব্যপারটাতে মজা পেত, এখানে এতগুলো মেয়ের মাঝে স্যার তার দিকে ভিন্নভবে তাকাচ্ছেন,তাই। এরই মাঝে তার বাবা তার হাতে ধরিয়ে দিলেন মোবাইল ফোন। অথচ এ বয়সে আমরা ফোনের কথা ভাবতেও পারিনি। যাই হোক, তার ফোন থাকাতে স্যারের ও সুবিধা হল। স্যার প্রতিদিন তিনশত টাকার কার্ড কিনছেন, আর সারারাত নিশীর সাথে গল্প করছেন। এদিকে স্যার তাঁর ঘরে তাজমহলের ছবিও টানিয়েছেন। আমরা খুব দুষ্ট ছিলাম,তাই এসব দেখে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করতাম! নিশীও পড়ার ফাঁকে স্যারের চেহাড়া, হাসি,পোশাক ইত্যাদির নানা রকম প্রশংসা করত,যা আমরা কোন স্যারের সাথে করার কথা ভাবতেও পারিনি। কেননা, আমরা তখনো যুগের হাওয়ায় গা ভাসাতে শিখিনি।

কিছুদিনের মধ্যেই আমরা গণিত পড়াও শুরু করলাম অন্য একজন স্যারের কাছে। এবারেও নিশী ছিল আমাদের সাথে। কিন্তু তারই সাথে ছিল আরো কিছু অপরিচিত ছেলে সহপাঠী। ফলে যা হবার তাই হল। অল্প কিছুদিনের মাঝেই আবার নিশীর রোমিও জুটে গেল এখানেও। সে রোমিও এবং তার বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যেত, বাসা থেকে তাদের জন্য কি কি সব রান্না করে আনত,আরো কত কি…..! রোমিওরাও খুব খুশি এমন জুলিয়েট পেয়ে। আমরা শুধু তাকিয়ে সব দেখতাম। কিছু বলতে পারতাম না, পাছে আবার ভেবে নেয়,আমরা তার জনপ্রিয়তা সহ্য করতে পারছি না। এই ভেবে যদি উল্টাপাল্টা কিছু বলে দেয়।

হঠাৎ একদিন নিশীর কালো আঁখি জুড়ে নেমে এল বর্ষণ। রোমিওদেরতো মাথা নষ্ট,তাদের জুলিয়েট কাঁদছে! আহা, এ কি করে হয়! তারা দৌঁড়ে এল:

: কি হয়েছে নিশী, বলো আমাদের!
: তোমরা শুনে কিছুই করতে পারবা না, তোমরা যাও এখান থেকে।
: একবার বলেই দেখ কি করি!
: আমি বদরুল স্যারের কাছে ইংরেজি পড়তাম। সেই স্যার আমাকে পছন্দ করতেন। তাই আমি স্যারের কাছ থেকে পড়া ছেড়ে চলে এসেছি। কিন্তু এই লোকটার সম্মানের কথা ভেবে আমি চুপ ছিলাম। এখন তার কাছে না পড়ার কারণে তিনি রোজ আমার পথ আগলে দাঁড়িয়ে থাকেন। আমাকে নানান হুমকি দেন। আমার রিকশা আটকান, এখন আমি কি করব?
: তুমি কোন চিন্তা করো না, আমরা ব্যপারটা দেখছি।

এরপর শুরু হল তান্ডব। আমরা পড়তে যাই, তখন ঐসব ছেলেরা এসে স্যারের বাসায় তান্ডব চালায়। স্যারকে থ্রেট করে। একটা কলেজের অধ্যাপক আজ বনে গেলেন একজন জোকার। তিনি বাচ্চা একটা মেয়ের জন্য পথ আগলে দাঁড়িয়ে থাকেন! কী অবাক কান্ড। স্যার কতই না ভালবাসেন নিশীকে! ঐ বয়সে আমরা এতটুকুই বুঝেছিলাম।

আরেকদিন যা হল, স্যার নিশীকে বললেন, ” তোমার যা বলার তুমি সোজাসুজি আমাকে এসে বলে যাও। কথা শেষ করে যাও,তবে আমি তোমাকে আর বিরক্ত করব না।” এতে মেয়েটা সমাধানের পথ দেখতে পেয়ে স্যারের বাসায় এল। স্যারের বাসায় আরো থাকতেন তার বাবা মা,ভাই বোন। স্যার নিচতলার একটি খালি রুমে আমাদের পড়াতেন। সেখানে চেয়ার,টেবিল ছাড়াও ছিল একটি বিছানা ও বুকশেলফ। তো, স্যারের ডাকে নিশী এল, তখন স্যার আমাদের বললেন,
“ওর সাথে আমার কিছু পার্সোনাল কথা আছে,তোমরা আজ চলে যাও।”
আমরাও বাহিরে চলে এলাম, কিন্তু অতিদুষ্ট হবার কারণে ঘরের পাশেই অবস্হান করলাম, দেখি কি কান্ড ঘটে! স্যার কি তবে হাঁটু গেড়ে বসে হাতে ফুল নিয়ে নিশীকে প্রপোজ করবেন! এসব মজা করতে করতেই হঠাৎ দেখি, স্যারের ঘরের জানালাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক। এরপর দরজাও বন্ধ হতে যাবে,এমন সময় নিশী দৌড়ে বেরিয়ে এল আর আমাদের হাত ধরে টেনে বলল, “তোমরা যেওনা,তোমরা থাক প্লিজ”
স্যারও বাইরে এলেন, এসে আমাদের বললেন, আমাদের থাকার দরকার নেই। আমরা যেন চলে যাই। স্যারের মুখভঙ্গি খুব অদ্ভূত লাগছিল। এমন চেহাড়া আমরা কখনো দেখিনি, যেন প্রতিটি মেয়েকে ইঞ্চি ইঞ্চি করে মেপে মেপে দেখছেন!তার চোখ ভরা যেন নেশা, কোন মেয়েকে যেন আস্ত গিলে ফেলবেন, যেভাবে ক্যপাসুল মুখে দিয়ে পানি দিয়ে গিলে খায়,তেমন। তখনি ভয় পেয়ে ঠিক করে নিলাম, এখানে আর পড়ব না। কিন্তু এখন নিশীকে ফেলে যাই কিকরে? তাকে বা নিয়েই যাই কিকরে? একটা অস্বস্তিতে পরলাম। এরই মাঝে নিশী এমন জোরে হাউমাউ কান্না জুড়ে দিল, যে চারপাশের মানুষ চলে আসতে থাকল। এবার স্যারের মান বাঁচানো দায় হয়ে পরেছে! তাই স্যার নিশীকে ছেড়ে দিয়ে ওপরে চলে গেলেন। যাই হোক, স্যার তবু হাল ছাড়েনি। একটা দিনের জন্য হলেও নিশীকে চাই। তাই তার বাবার কাছে দিলেন বিয়ের প্রস্তাব। তার বাবা কৌশলে পরে ব্যপারটা মিটিয়ে নিলেন। সেও রক্ষা পেল স্যারের হাত থেকে।

তারপর কিছুদিন ভালই চলছিল। কিন্তু কিছুদিন পরেই খোঁজ হল এক খালার, যে খালাকে সে আগে কোনদিনও দেখেনি। খালা তার পুরো পরিবার নিয়ে চলে এলেন নিশিদেরে বাসায় থাকবেন বলে,কারণ তিনি অসহায়। নিশীর বাবার অঢেল পয়সা, বিশাল বড় বাড়ি,তাই কেউ অমত করল না। খালার সাথে এসেছিল এস এস সি ফেইল করা গন্ডমূর্খ এক খালাত ভাই….

চলবে……

 

৪৬৭জন ৪৬৭জন
0 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ