জন্মেছি মেয়ে হয়ে ,বড়ো হয়েছি চারপাশে মেয়েদের কষ্ট দেখে, তারপরে প্রবাস জীবন শুরু হল, জীবনের মোড় ঘুরলো বিয়ের পর । প্রবাসে বসবাসকারি বন্ধু দের মধ্যে কষ্ট দেখলাম । প্রবঞ্চনা দেখলাম , আশা ভঙ্গ কঠিন জীবন দেখলাম। নানা রকম পড়াশুনা আর গবেষণার পর যে পেশায় কাজ পেলাম তাও মেয়েদের বিষয় নিয়ে ।

জীবনের খাতায় জমা হতে থাকলো নানান ঘটনার অভিজ্ঞতা । লেখব লেখব ভাবছি অনেক দিন ধরে।

বিয়ে নামক ঘটনা ঘটিয়ে সমাজ, পরিবার গিনিপিগের মতো পরীক্ষা চালায় আর দেখতে থাকে কেমন পারছে । কিন্তু কজন যানতে পারে আসল ঘটনা ? কতো জনেই বা জানায় তাদের দুঃখ কষ্ট ?

দেশের মানুষ জানে তাদের মেয়ে খুব ভালো আছে । বেশীর ভাগ মেয়ে মা/বাবাকে জানিয়ে কষ্ট দিতে চায় না। মা/বাবা দুঃখ পাবে বলে বা হয়তো তাদের রক্ত চাপ বাড়াতে চায় না ।

একে দেশ গরীব ছিল তখন যখনকার কথা লিখছি, ১৯৭০ এর দিকে । মেয়ে পার করাই বাবা/মার কাজ ।

হাসুর কোথা দিয়ে আরম্ভ করি। হাসু সবে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেছে । HSC তে first Division পাওয়া মেয়েটা তাও আবার scholarship পাওয়া । চোখে কতো স্বপ্ন। ভালো পাত্র পাওয়া গেলো । কিন্তু দেখা গেলো বিয়ের পরে সে ঐ লাইনে কোনদিন চাকরীও করেনি । সে ছিল হোটেলের ওয়েটার । সার্টিফিকেট টা কোন দিন ব্যাবহার করেনি । হাসু বুঝল তাঁকে প্রবঞ্চনা করা হয়েছে । সে অন্তত পড়াশুনা করা একটা ছেলে । কিন্তু হালিমা ! আহারে তার অবস্থা এবার শুনাবো ।

হালিমা ডাক্তার , তার স্বামী বলেছিল বিয়ে করতে যেয়ে ব্যারিস্টার , প্রবাসে এসে দেখা গেলো পাত্র মাত্র I. A পাস । তাঁকে বিয়ে করেছে টাকা কামানর জন্য । টাকা শুধু কামানো নয় প্রবাসে থাকা এই পাত্র গুলোর টাকা গুলো তাদের হাতে তুলে দিতে হবে ,তার মালিকানা কিন্তু স্ত্রী নয় স্বামী । প্রবঞ্চনার জন্য কোন অনুশোচনা তো তাদের থাকলোইনা বরং বলতে থাকে তুমি তো দেখতে ভালো না আমি বলেই বিয়ে করেছি ,এতো সুন্দর একটা দেশে আসতে পেরেছ আমার জন্য । এইটই তোমার ভাগ্য ।

বেশীর ভাগ মেয়েদের স্বামীরা তাদের স্ত্রীদের চেয়ে ৩০ ,২০, ১৮, ১৭, এই রকম বয়সের তফাৎ । দিন গুলো পার করাই শুধু হচ্ছে । তাদের মধ্যে বন্ধুত্বই হয় না, হয় টাকা কামানর মেশিন, ছেলে পেলে উৎপাদনের মেশিন আর স্বামীরা বয়েস হলে তাদের দেখা শুনার সেবাকর্মী ।

হাসুর সাথে দেখা হলেই বলতো তুমি তো ওমেন ইস্যু নিয়ে যব কর আর কতো ঘটনাই না জানো আর জানো না আমার বিয়ের পরে যে গল্প আরম্ভ হল তা।
লেখা আরম্ভ করে দাও না ।

তার থেকে তার স্বামী ১৮ বছরের বড় , সি .এ । তবে শুধু নামেই। সে লাইনে বাংলাদেশীদের কোন উপার্জন নাই। তেমন পড়াশুনা তাঁর ছিলোনা , বাচ্চা দেখা শুনার কাজ করতো হাসু। সংসার দেখাশুনা ,রাঁধাবারা, তিন বাচ্চার যত্ন শেষ করে কাজে যেতে হতো । টাকা সব তুলে দিতে হতো স্বামীর হাতে আর তার সাথে ভৎসনা সামান্য কারনেই। হাসুর বয়স যখন মাত্র ৪৫ স্বামী হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেলো। রেখে যায় নি কোন টাকা পয়সা। ৪০ দিন না পেরুতেই তাঁকে আবার কাজে যেতে হল , একলা একলা সারা জীবন তিন ছেলেমেয়ে কে বড় করতে হল ।

ফারিয়া , হ্যাঁ ফারিয়া যার স্বামী তার থেকে ৩০ বছরের বড়। কেমন হয় এই বিবাহিত সম্পর্ক ? এইটা তো রীতিমত পিদফিলের। এতো বয়সের তফাৎ যার ফলে স্বামী গুলো কিছুদিনের মধ্যে বুড়ো হয়ে যায় , তারপরে মৃত্যু। আবার সেই একই ধারা । সিঙ্গেল মাদার হয়ে সংসার এর হাল ধরা । তাঁকে দিনেও কাজ করতে হতো রাতেও। রাতে করতো একটা বয়স্কদের দেখাশুনা করা নার্সিং হোমে। দিনে চিলড্রেন দের নার্সারি তে। অতিরিক্ত কাজের চাপ ,টাকার টানাটানি তে ফারিয়ার নার্ভাস ব্রেক ডাউন এ ভুগছে এখন ।

বেচারা স্বামী যে বিয়ে করেছিল বেশী বয়সে তার কারন ও দারিদ্র। গরীব ঘরের ছেলে , বিদেশে এসেছিল টাকা রোজগার করে দেশে গিয়ে ব্যাবসা করবে। কিন্তু তা করতে গিয়ে কোথা দিয়ে যে সময় চলে গিয়েছে। বিদেশের মাটিতে কাজ পাওয়াই বড় কঠিন। বেশীর ভাগি ই অড যব। দেশেও গিয়েছিল বাস কিনে ভাড়া খাটাবে বলে। কিন্তু দেশের মানুষের ঠকবাজির কাছে সে পেরে উঠেনি। মানুষ টা অন্তত কঠোর পরিশ্রমী ছিল। মানুষটার সব চলে গিয়ে আবার প্রবাসে এসে নিঃস্ব হয়ে গেলো। প্রথম থেকে স্টার্ট করতে গিয়ে তার স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়লো ,বয়স হয়ে গেলো এবং কিছু দিন পরে মারা গেলো। ব্যাঙ্কের ঋণের বোঝা পরিশোধের আর সংসারের পুরো দায়িত্ব ফারিয়ার কাঁধে এসে পড়লো । কিন্তু আমাদের গরীব দেশের মানুষ এর চিন্তা টাই এরকম ,বিদেশে গিয়ে খাওয়ার অভাব তো হবেনা ! ফারিয়া তো আরও দুঃখী কারন ছোটো বেলাতেই মা মারা গিয়েছিল। বাবা আর একটা বিয়ে করাতে সেখানে তার জায়গা হলনা। নানীর কাছে মানুষ।

বিদেশের পাত্র দেখে এতো গ্যাপ দেখেও বিয়ে দিয়ে দিলো। বিদেশে এসে শুরু হয়ে গেলো ফারিয়ার যুদ্ধ।

ফারিয়ার গল্প হল। এবার রোকেয়ার গল্প। রোকেয়ার সাথে তার স্বামীর বয়সের তফাৎ ২১ বছর। তার স্বামীর বয়স রোকেয়ার বাবার বয়সের মতো। বিয়ে করার আগে রোকেয়া জানতো স্বামী C.A। বয়স বেশী হলেও বিদেশে থাকে তার উপর এতো বড় যব। এসে দ্যাখে স্বামী কোনোদিন কাজ করেনি। পাশটা ঠিক ছিল । কামায় তো নাই ইনকামের এর ইচ্ছাও নাই । সংসার  টা চলবে কি করে ?

কাজে নামতে তো হলই ,বাবার ফ্যামিলীর ও দায়িত্ব নিতে হল। মুখ ফুটে সে বলতেও পারেনি তার উপর কি কষ্ট যাচ্ছে। পরে বাবামা জানলেও কেন যেন বুঝতেও চাইত না মেয়ের উপর দিয়ে কি যাচ্ছে। বাবার ফ্যামিলীর দায়িত্ব নিতে গিয়ে ,সেলাই করা টাকা দিয়ে বাড়ি  কিনে সে বাড়িটাও চলে গেলো। বাবা বেঁচে থাকলেও স্বামী মারা গেলো ।

একেত মর্টগেজ তার উপরে রিমর্টগেজ করে বাড়ি  কিনা , আর লোণ শোধ করতে না পারার জন্য বাড়ি চলে যাওয়া, তারপরে পরিবার তার যে কি পরিণতি হয় , তার গল্প ভুরিভুরি এই শহরে ।

এই সমস্ত মেয়ে গুলো দেশে গিয়েও শান্তি পায়না। টাকা যদি দিতে পারো তুমি ভালো সন্তান। না দিতে পারলে ভালো না । বিদেশে আছো মানেই তুমি ধনী । বুঝালেও বুঝতে চায়না । মনে করে দিতে চায় না তাই মিথ্যা বলছে । জমি জমার ভাগও দিতে চায় না। বিদেশে তো আছোই আবার এগুলো নিয়ে যাবে । ছল চাতুরী করে নিয়ে নেয় আত্মীয়রা ।

ভালো একটা শাড়ি পরলেও দোষ , মনে করে বড়লোকি দেখাচ্ছে ।

আর একটা প্রব্লেম মনের মধ্যে নিজের দেশ ,মনটা দেশে থাকে শরীর তা বিদেশে কিন্তু তারা এই মেয়ে গুলোকে নিজের দেশের বলেও গ্রহণ করে না । হয়ে যায় “বিদেশি”।

তার মানে তারা হয়ে গেলো নিজের ভাগ্যের ফেরে বিদেশে হাড় ভাঙ্গা খাটুনির শ্রমিক আর নিজ দেশে আর বাঙ্গালি নও “ বিদেশি “ ।

ওমেন গ্রুপ করতে গিয়ে যে এরকম কতো গল্প শুনতে হয়েছে । নিজের দেশে একটা বাড়ি করে পরিশ্রমলব্ধ টাকা বাঁচিয়ে মনে করে বুড়ো বয়সে গিয়ে থাকবে। বাড়ি টা দেখাশুনা করার জন্য যাকে রেখে আসে সেই দখল করে নেয় , শেষ বয়সে গিয়ে থাকবে কি দেশে যাওয়ার কিছুদিন পরেই বলতে থাকে “ আর কতদিন থাকবে” ।

বাড়ির যায়গাতে বাড়ি থাকলো , বিদায় করতে পারলে বাঁচে তারা । দেশ দেশ করে দেশে যাওয়া কিন্তু আত্মীয় স্বজনের সে অনুভূতি টা বুঝতেই পারেনা। একটা শিয়াল যদি রাতের বেলায় নীলের বালতিতে পরে যাওয়াতে সে নীল হয়ে যায় তার পরে তার দলের বাকি শেয়ালরা আর নেয়না । প্রবাসীদেরও তায় অবস্থা , প্রবাসীর ছাপ পরাতে দেশবাসি আর গ্রহণ করে নেয়না।

পারিবারিক নির্যাতন এর উপর কাজ করার পর একটা জিনিস ভালো ভাবে উপলব্ধি করলাম মেয়েরা কতটা অসহায় । বাড়িটা যদি অশান্তির জায়গা হয় , আতঙ্কর জায়গা হয় , নিরাপত্তা না থাকে , পদে পদে অপমান আর অসহায়ত্বের একটা স্থান হয় সেই পরিবেশে কেমন করে একটা মানুষ থাকতে পারে ? কি ভাবে তা ছেলে মেয়ের উপরে মানুষিকভাবে প্রভাব ফেলে তা কয়টা মানুষ বুঝতে পারে ?

অতিরিক্ত কাজের চাপ , পরিবার থেকে অনেক দূরে , সম্পূর্ণ অন্য রকম কৃষ্টি , অন্য ভাষা ,সমাজ, বন্ধু বান্ধব হীন এক কষ্টকর পরিস্থিতি। তার মধ্যে যদি স্বামীটিও বন্ধু না হয় কি হতে পারে তা ভুক্ত ভোগীই জানে। অসুস্থ হলে পাশে কেউ থকেনা , সাহায্য করার জন্য ,বা একটু খাবার দেয়ার জন্য ।

এই পরিস্থিতিতে থাকতে থাকতে একটা মানুষ শক্ত মনের না হলে মানুষিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে ।

মা/বাবা হওয়া সহজ কিন্তু মাবাবার দায়িত্ব পালন করা কঠিন ব্যাপার । শুধু খাবার দিলেও হয়না । মা-বাবার ব্যাক্তিত কেমন তার উপরে বাচ্চার ভালো ভাবে বেড়ে উঠা নির্ভর করে । যে ছেলে মেয়ে মাবাবার অন্যায় আচরণের ভিতরে বড়ো হোয়ে উঠে তা তাদের সারা জীবনের উপরে স্থায়ী ভাবে ক্ষত সৃষ্ট করে যা কিনা তারা সারা জীবন ভুলতে পারেনা । এই জন্য অনেক দেশে এইটার উপর কোর্স করার বাবস্থা আছে যেটা “কি ভাবে ভালো মা-বাবা হতে হবে “এবং চিন্তা করা হচ্ছে তা বাধ্যতা মূলক করা হবে । আর অনেক দেশে যদি ধরা পড়ে বাবামা বাচ্চা কে অত্যাচার করছে তবে সেই বাবামার কাছ থেকে বাচ্চা নিয়ে নাওয়া হয় ।

এই প্রসঙ্গে হাসি এর কোথা মনে হোল । তার মার বিরুদ্ধে তার অনেক অভিযোগ ছিল । মা কাল বলে সবসময় বুলি করতো । “ কালানি” বলে বিদ্রূপ করতো আর আসল নাম ধরে না ডেকে এই নাম দিয়ে ডাকতো । প্রতিবাদ করলে অন্য ভাইবোন দের সামনে বলতো “ ওর বাহির যেমন খারাপ ভিতর তেমন খারাপ “ । “হাসি” নাম না দিয়ে “দুঃখী” নাম তার জন্য উপযুক্ত হোতো । মা প্রত্যেক ভাইবোনের মধ্যে দলাদলি ,একজনের কাছে আর একজনের সমালোচনা , মিথ্যা অপবাদ দেয়া এই ছিল সেই মায়ের কাজ। সবচেয়ে বড় দোষ ছিল বাচ্চা দের মারধর আর সন্তান দের মধ্যে পক্ষপাতিত্ত করা । ছেলেমেয়ের মানসিক স্বাস্থ্য এই পরিবেশের মধ্যে কি ভাবে ভালো হবে ?

সেই দুঃখী মেয়েটা যখন বড় হোল বিয়ে টাও হোল খারাপ । স্বামী টার ছিল বাইপোলার, বাচ্চা নেয়ার ব্যাপারে তার ছিল অক্ষমতা । ভালো করে না দেখা শুনা করে বিয়ে দিলে যা হয় আর কি । মেয়ে পার করাই বাবামার কাজ । তাও আবার একগাদা ভাইবোন । দুঃখী লেখাপড়ার যোগ্যতা দেখিয়েছিল এবং একটা প্রতিষ্ঠানের মানিজিং ডাইরেকটর হোয়ে অবসরে গিয়েছিল । যোগ্যতা দেখাতে পারলে যে তাঁকে অভিনন্দন দিতে হয় সে গুন টাও তার মায়ের ছিলোনা । বরং কেউ অবস্থা ভালো করলে মা হোয়ে তাকে হিংসা করতো ।

দুঃখীর তো হোল এই জীবন । একেতো স্বামী পাগল তার উপরে বাচ্চা নেয়ার সমস্যা , কি ভাবে তার সঙ্গে সংসার করা যায় ? কিন্তু সে কোথায় যাবে ? আমাদের এমন সমাজ কেউ বিবাহ বিচ্ছেদের স্বীকার হোলে তার কোন সন্মান নায় সমাজে । তাকে কেউ স্থান ও দায় না । সব দোষ হয় মেয়েটার । ডিভোর্স যেন একটা কুশটো রোগ , আপন ভাইবোন ও দূরে সরে যায় ।

এই হোল আমাদের দুঃখী দেশের দুঃখী মেয়েদের জীবন ।

প্রবাসের একটা বিরাট জনগোস্টী আমাদের গ্রাম বাংলার মেয়ে । পড়াশুনা বড় জোর প্রাইমারী কারো আবার তাও নাই । গ্রামের আবহে তাদের বড় হওয়া , গাছগাছালি ,লাউ ,ঝিঙ্গার মাচা দেখে , পাখপাখালির গান শুনে আর অবারিত ধানের ক্ষেত, সরষা ক্ষেত আর নদীর কুলকুল শব্দ এরই মধ্যে বড় হওয়া । সেই শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশ ছেড়ে এই একুশ শতকের টেকনোলজির শহরে এসে পড়লে কি অবস্থা হতে পারে কেউ কি তা ভেবে দেখেছে ? এর সাথে তারা কি ভাবে খাপ খাওয়াবে?

সময়ের সাথে সাথে মানুষের চিন্তা ধারা পরিবর্তন হয় , আজ আমরা যা ভাবি পরবর্তী প্রজন্ম তা ভাবে না। আর এই দেশ তো অনেক আগের পরিবর্তন হওয়া উন্নত একটা দেশ ! সেই অনেক আগের পরিবর্তন হওয়া দেশের সমাজ বাবস্থা আর পরিবর্তিত মন মানসিকতার সাথে এদের বা আমাদের চিন্তা ধারার অনেক ব্যাবধান। যেটা এদের কাছে স্বাভাবিক আমাদের কাছে নয় । আর এই পরিবর্তিত সমাজের মধ্যে আমাদের যে পরবর্তী প্রজন্ম তারাও এক দোটানার মধ্যে পড়েছে । বাড়ীতে এক পরিবেশ বাইরে আর এক পরিবেশ ।

এই দোটানার মধ্যে পড়ে তাদের কি অবস্থা হয় এবার তারি গল্প বলবো ।

এই দেশেও বিয়ের সম্পর্ক তা ৫০/৬০ এর দশক  পর্যন্ত ভালোই টিকত । ছাড়া ছাড়ি তেমন ছিল না । বয়স হোলে বিয়ে করতে

হবে এই রীতি ছিল । দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পড়ে পুরুষ মানুষ রা যুদ্ধে গেলে দেশের কাজে মেয়েরা কে নামতে হোল । পুরুষ রা যুদ্ধ শেষে ফিরে আসলেও মেয়েরা আর ঘরের কাজে আবদ্ধ থাকতে চাইলো না । কিছু মানুষ এর বিরোধিতা করলেও তারা কে ফেরান গেলনা ।

কিন্তু এখন কার পুরুষ রা এটা মনে করে মেয়েরাকে কাজ কোরতেই হবে। বিয়ের আগে একটা জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট খুলে সংসার চালানোর টাকা দুই জন মিলে চালাতে হবে । কেউ কারো বস না । কিন্তু বাচ্চা হোলে স্বভাবতই মেয়েরা বাচ্চা স্কুল না যাওয়া পর্যন্ত কাজ করতে পারেনা । গণ্ডগোল এর আরম্ভ তখন থেকে ।

মেয়েরা নিজেদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা হারায় ।

আর দেশ থেকে যাওয়া মায়েরা আশা করে ছেলের বউ ঘরে এসে ভিতরের সব কাজ করবে আর যেহেতু তারা এই দেশে বড় তারা তা মানতে রাজি না । তারা বাইরে কাজ করতে চায় । তাড়া শ্বশুর শাশুড়ির সেবা সহ সব কাজ করতে সময় পায় না । তারা চায় স্বাধীনতা । যা বহু দিন আগেই সে রেয়াজ শেষ হোয়ে গেছে । দ্বন্দ্বের আরম্ভ সেই খানে । দুই রকম পরিবেশে মানুষ হওয়া দুই রকম চিন্তা ধারা এক হতে গিয়ে যতো গণ্ডগোল ।

এই খানে আমি কোন পক্ষ নিতে চাই না। এইটা হল জেনারেশন গ্যাপ । আমারা যা ভাবি তারা তা ভাবেনা আর তারা যা ভাবে আমরা তা ভাবি না ।

 

 

এখন আমাদের আগের প্রজন্মের ধারনা একি হোল । হয় ছেলে মেয়েরা বিয়ে করেনা নাহয় ডিভোর্স হোয়ে বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসা ।

আমাদের এই দুঃখী মেয়েদের তো বিরাট সাহস করে এই সুদূর প্রবাসে আত্মীয় স্বজন ছেড়ে এসে বসত গোড়তে হয়েছে । ভাষা গত সমস্যা তো আছেই তারপরে আছে বাইরে বেরুনর আত্মবিশ্বাস এর অভাব । একলা আন্ডার গ্রউনড তো দূরের কথা , বাসও চড়ে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গা যাওয়া তাদের জন্য বিরাট সমস্যা ।

ভাষা জানা না থাকার দরুন অসুখের ব্যাপারটা ডাক্তার কে বুঝাতে পারেনা ,বাড়ি তে স্বামী মারধর করলে কোথায় গেলে সাহায্য পাবে ভাষার অভাবে সাহসের অভাবে কিছুই করে উঠতে পারেনা। বাড়ি বসে মাথা গুঁজে মার খায় আর একেকটা ডিপ্রেশন এর রুগী হয় । তার উপরে এই ছেলে মেয়ে নিয়ে সমস্যা ।

ছোটো ছোটো কাউন্সিল এর ফ্ল্যাটে থাকে ,কোথায় সেই লাউ এর মাচা আর কোথাই সরষে ফুলের ক্ষেত । চার দেয়ালে মধ্যে বন্দী জীবন ।

তাদের এই অবস্থা দেখে প্রায় আমাকে প্রশ্ন করতো আমার সাদা সহকর্মী রা কেন তারা এতো দুর্বল , মনের শক্তি কেন নাই । বুঝিয়ে বলতে হোতো “ পরিস্থিতির স্বীকার “ । ঠিক তুমি যদি তাদের অবস্থায় পড়তে তোমারও এই অবস্থা হোতো । তাদেরকে জীবন সম্বন্ধে কিছু বোঝার আগেই তাদের গোড়া কেটে ফেলে দেয়া হয়েছে। বোঝান হয়েছে মেয়েরা কে এমন করেই থাকতে হয়। তা না হোলে ভালো মেয়ের পর্যায়ে তুমি পরলে না । সব মেনে চলা হোল ধর্মের কাজ ।

এই খানে বলে রাখা ভালো শ্বেতাঙ্গ রাও পারিবারিক নির্যাতন এর স্বীকার। তবে তারা জানে কি কি আইন আছে , কোথায় গেলে সাহায্য পাওয়া যাবে । জানে তাদের অধিকার ।

প্রথমে যে হাসুর গল্প টা বলে ছিলাম সেই মেয়ে টা আমাকে বলেছিল সে শ্বশুর বাড়ি তে গেলেই সে বাড়ির মানুষ (শ্বশুর ননদ ) বিদেশে গিয়ে সেলাই অথবা যে কোন অড যব করে সব স্বামীর হাতে তুলে দিতে হবে আর স্বামীর টাকা অর্থাৎ তাদের ভাই এর কামাই তাদের হবে। নিজের বাড়ি করতে পারব না । ‘ কাজ কেন করেনা’  ,’ টাকার হিসাব কই’  এই নিয়ে প্রতিবার ঝগড়া চেঁচা মেচি, বাবামা তুলে গালি গালাজ । হাসু তো অবাক কি বলে বিয়ে হোল আর কি পরিণতি । কোথাই গেলো তার প্রথম বিভাগ পাওয়া, কোথায় উচ্চ শিক্ষা? কি করে সে সাহস সঞ্চয় করে প্রতিবাদ করেছে তার আশপাশের প্রবঞ্চক মানুষ গুলোর হাত থেকে । কারন তার ছিল পড়াশুনা। ভালো যব পাওয়ার সুযোগ আর হাতে টাকা । যা কিনা তাকে শক্তি দিয়েছে এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে । হাসু সোজা চিঠি লিখে জানিয়ে দিয়েছে যদি তারা এই রকম খারাপ ব্যাবহার করে আইনের আশ্রয় নিতে সে বাধ্য হবে ।

কিন্তু এই সহজ সরল মেয়ে গুলোর সেই সুযোগ কোথায় ? তাদের সাথে কাজ করতে যেয়ে হাসুর শাশুড়ির কোথা বড় মনে পরছিল । হাসু যখন তার শ্বশুর বাড়ির শ্বশুর , ননদ এর অত্যাচারের প্রতিবাদ করলো হাসুর শাশুড়ি তখন হাসুর পক্ষ নিয়ে বলেছিল “ আমি চেয়ে ছিলাম কেউ একজন তোমার মতো এগিয়ে আসবে আর আমানুস টাকে কথা শুনাবে”।

কেন হাসুর শাশুড়ি হাসুর পক্ষ নিয়ে ছিল ? কারন সেও এক দুঃখী । বাংলার ঘরে ঘরে এই দুঃখী মেয়ে । হাসু আস্তে আস্তে তার শাশুড়ির কাছ থেকে অনেক গল্প শুনেছে তার বিবাহিত জীবনের , তা থেকে সে জানতে পেরেছে তা হোল অল্প বয়সে বউ হোয়ে সে এ বাড়ীতে ঢুকে । এসেই এ বাড়ির সব মানুষের দায়িত্ব নিতে হয়েছে , সে দায়িত্ব হোল নিজের বিরাট পরিবারের রান্নার জোগাড় । প্রতি ২/১ বছর পর পর তাকে বাচ্চা জন্ম দিতে হয়েছে ১৬ বাচ্চার । প্রতিদিন ৪০ /৫০ জন কামলা খাটত জমির ফসল উৎপাদনের জন্য আর তার উপরে সব দায়িত্ব তাদের দুই বেলার খাবার রান্নার । তাও আবার সব কাঠ ,পাটখড়ি ঠেলা জ্বলন্ত উনানের পাশে বসে , জানালা ছাড়া আর ধুয়া বের না হওয়ার বাবস্থা থাকা রান্না ঘরে ,যেখানে পানির কোন বাবস্থাও ছিলোনা ।

 

তিনি ছিলেন নম্র প্রকিতির পরহেজগার মানুষ । এতো কিছুর পরও স্বামী নামক কর্তা বাক্তি টি সন্তষ্ট ছিল না ।তার গায়ে হাত তুলত , “ আমি যা ইচ্ছা তা করতে পারি” ক্ষমতা দেখান এই মানুষ টি আর একটা বিয়েও করে বসল ।

এর পরে আর কি ভাবে তাকে সন্মান করা যায়?

কিন্তু তার পরেও এই মেয়ে গুলোকে এই ভাবেই জীবনের দিন পাড়ি দিতে হয় এই রকম মানুষে সাথে ।

 

মানুষ মরে যায় তার সাথে তাদের গল্প গুলোও বিলীন হোয়ে যায়। তাই আমি তাদের জীবনের গল্প গুলো লিখে যাচ্ছি যেন তাদের সাফারিং বা কষ্টে ভোগা জীবনের গল্প বিলীন না হয়।

 

  

২৮০জন ৩৯জন
0 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য