ঢাকা শহরে দোতলা বিআরটিসি আমার প্রথম পছন্দ, এটা কিন্তু তাদের সেবার জন্য না । তারা নতুন বাজার থেকে মোহাম্মদপুর রুটের জাত লোকাল। আমার গন্তব্য আড়ং মোড় হয়ে ধানমন্ডি।  এ রুটে কয়েকটি সিগনাল তাই প্রচুর সময় লাগে, তাই হাতে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে বের হই এবং সামনের সিটে মাথাদিয়ে ছোট খাটো একটা ঘুম দেই এটা মোটামুটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আজ বাস হঠাৎ ব্রেক দিলে জানালার সাথে মাথাটা বাড়ি লাগে পাশে তাকায় দেখে তো পুরাই “থ” । এক সুন্দরী গলায় আইডি ঝুলানো, কানে হেডফোন হাতে বিশাল স্যামস্যাং মোবাইল। অনাকাঙ্ক্ষিত সুন্দরী তাও আমার পার্শে। আমরা মফস্বল শহরে কোন মেয়ের পাশে বসতে বা কোন মেয়ে আমাদের পাশে বসতে চাইলে অনুমতি চাওয়াটা রেওয়াজ কিন্তু ঢাকায় বাসের খালি সিটে বসতে ছেলে বা মেয়ে কারোই অনুমতি লাগে না, এখানে এটাই রেওয়াজ।  আমার ব্যাথায় তার ঠোটের কোনে চাপা হাসি । রাগ উঠলেও করার কিছু নাই, সে তো আর আমার কেউ না।

যাহোক গল্পের শুরু এখন থেকেই,

-এই বাস কি আগারগাঁও দিয়ে যাবে ?
-না সূচক উত্তর দিলাম মনে হল খুশি হয়নি । আবার প্রশ্ন করলাম কোথায় যাবেন ?

-তাজমহল রোড , মোহাম্মদপুর।
-সমস্যা নাই। এই বাস যেখানে শেষ, আপনি নেমে ঐখান থেকে রিক্সা নিবেন ৩০ টাকা ভাড়া দিলেই নিয়ে যাবে। আরো কম ও লাগতে পারে।
– আর কতক্ষণ লাগতে পারে?
-কেবল তো ওয়ারলেসগেট আছি আরো এক ঘন্টার বেশী লাগবে। কপাল খারাপ হলে আরো বেশী ভালো হলে কম।
-আপনি নিয়মিত যান?
-হ্যা, আমার অফিস তো তাই যেতে হয়।
-আমি আজ প্রথম এলাম, চিটাগাং আমার বাসা ঢাকা গুলশান অফিসে ট্রান্সফার দিছে। যাত্রাবাড়ী নামছি সকালে, একটু আগে জয়েন করে ছুটি নিয়ে এই বাসে উঠলাম। এখন মামার বাসায় যাবো।  ঢাকা তেমন ঘুরা হয়নি , তেমন  কিছু চিনি ও না।
-এই ঢাকা আপনাকে সব চেনায় দিবে, সমস্যা নাই। আমার ও প্রথম এমন সমস্যা হয়েছিল। আমার চোখে যজ্ঞের ঘুম, মনে হচ্ছিলো ঠেলে ফালায় দেই। কারণ আগের রাতে একটা মিনিট ও ঘুম হয়নি।
– আপনার কাছে কি ফেসিয়াল টিস্যু হবে? আমার ব্যাগে সব ফেলে এসেছি । অনেক ভারীতো তাই অফিসে রেখে আসছি।
-রক্ত এবার মাথায় উঠে গেল, বেতনের টাকায় চলতে পারি না । গোল্ডলিফের জায়গায় ডার্বি খাই, আবার টিস্যু তাও ফেসিয়াল। বললাম এসব কিছু নাই। সুন্দর মুখটায় যেন কালো মেঘ জমে গেল । ভেতরে মায়া লাগতে শুরু করলো। বললাম ছেলেদের এসব লাগে না।
-আপনি বিরক্ত?
-নারে ভাই । দেড় ঘন্টায় জাহাঙ্গীর গেট আসলাম , ১ টার মধ্যে আফিসে আপডেট ফাইল জমা দিতে হবে। টেনশনে আছি।
এমন সময় ফোনটা ভ্রাইবারেট হতে থাকলো, অ-কাজের কাজী রাহাতের ফোন। পকেট থেকে ফোন বের করতে লাইন কেটে গেল । ব্যাক না দিয়ে ফেসবুকে ডুকে গেলাম । বাস ততক্ষণে বিজয় স্বরণী সিগনালে আটকে গেল। তাকে বললাম আড়ং এর কাছে আর একটা সিগনাল তার পরে আপনি পৌছে যাবেন। আমি খামার বাড়ি পাওয়ার আগে থেকেই এই গল্পটি লিখতে শুরু করলাম । মোবাইলের কী প্যাডে প্রেম জমে গেল । ভাবলাম আজ কিছু লিখার উপাদান পেয়ে গেছি।  আর গত এক বছরে এমন অনেক ছোট বড়, বলিকা , রমণী , যুবক থেকে বৃদ্ধ অনেক মানুষ কে পথ দেখায় দিছি, এটা আমার জন্য কমন বিষয়। মানিক মিয়া এভ্যিনিউতে বাস ডুকলে একবার তার দিকে তাকালাম একি মেয়ে আমার মোবাইলের  স্কিনে এক পলকে তাকিয়ে আছে।
আমি তার দিকে তাকাতেই সেকি বিস্ময়কর চাহুনী !!!


-প্রশ্ন করে বসলো এ ফোনে ফেসবুক চলে ? কি জোরে জোরে আবার লিখছেন ও ।
-বলালাম আমার এটাই আইওএস থেকে কম যায় না। মোবাইলে ইন্টারনেট জাভা ই কিন্তু পথিকৃৎ। এনড্রয়েড তো জাভার পরের সংস্করণ। আমি একটু পিছিয়ে আছি এই আরকি। মোটা হয়ে যাচ্ছিতো তাই দ্রুত চলতে পারি না 🙂
-মেয়েটা এবার হাসলো। বাস আড়ং সিগনালে থেমে আছে, আমি আজ বাসেই বসে আছি আজ বাস থেকে নামবো বাস রাস্তা পার হলেই, প্রতিদিন একটু আগায় ওভার ব্রিজ দিয়ে পার হই। সিগনাল আর বেশী সময় নিল না। ছেড়ে দিলে সিট ছেড়ে উঠতে উঠতে বললাব রিক্সা নিয়ে যাবেন , যেভাবে আগে বলেছিলাম।
-আপনার নামটা বলা যাবে? এতক্ষণ কথা বললাম নামটাই জানা হল না ?
-কেন নাম দিয়ে কি হবে?
-না এমনি । তাছাড়া আপনি অনেক সময় নিয়ে আমার সাথে হওয়া কথা গুলি লিখছিলেন।
-এটা আমার মুদ্রা দোষ।
– ফেসবুকে তো লিখছেন আইডি  নামটা তো বলেন।
-আমি কি লিখেছি আপনি সব পড়েছেন আমি কিন্তু খেয়াল করেছি। যতটুকু মনে পড়বে ততটুকু লিখে গুগলে সার্স দিলে আসা করি পুরো লেখাটা পাবেন । আইডিটা না হয় তখন খুজে নিয়েন। বাস এতোক্ষনে আসাদগেট পার হয়ে মোহাম্মদপুর বিআরটিসি ডিপোর কাছাকাছি। পাশের সিটের একজন বার বার তাকাচ্ছিল প্রথমে সে হয়তো ভেবে ছিল আমরা পূর্ব পরিচিত। মেয়েটি আমার নাম জানতে চাইলে তার মুখে দেখি কেমন জানি উৎসুক ভাব। বাস ডিপো গেটে থেমে গেছে, সবার সাথে নামলাম,রিক্সাওয়ালার সাথে কথা বলছি এমন সময় তার ফোন বাজলো “মামা আমি প্রায় চলে আসছি। রিক্সা ঠিক করতেছি” ওপার থেকে মামা বলছে শিয়া মসজিদের কাছে নামতে। তাকে একটা রিক্সা ২০ টাকা ভাড়ায় ঠিক করে তুলে দিলাম।
-নামটা এখনো বললেন না , আজব মানুষ আমার অফিস নিকেতনে  ___গ্রুপ __ বাড়ি , রোড__ । এইচাআরএ আছি আসবেন কিন্তু গল্প করা যাবে। কখনো অপরিচিত কারো সাথে এতো গল্প হয়নি। ধন্যবাদ, ভালো থাকবেন। ।

মেয়েটি সাত মসজিদ এর সামনে দিয়ে অনেক দূর যাবার পরে মনে হল, আরে আমি ও তো ওর নামটা জিজ্ঞেস করলাম না । নিজের অপরে বিরক্তি কাজ করল ।

ইতোমধ্যে অফিস থেকে আবার ফোন আসছে, “সপ্তাহে আসেন দুইদিন তাও ঠিকমত আসতে পারেন না। আপনাকে আর অফিসে আসতে হবে না”। বস অনেক জ্যাম ছিল ৫ মিনিটেই চলে আসবো রিক্সায় উঠেছি।
অফিসে পৌছালাম আড়াইটায়। ফাইল জমা দিয়ে বের হয়ে আবার বিআরটিসি কাউন্টারের দিকে হাটছি। আবার আরেকজন আলাদা মানুষ আরেকটি গল্প

৪৫০জন ৪৫০জন
0 Shares

২৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ