কবি শামছুদ্দিন খাঁ…

জবরুল আলম সুমন ৫ অক্টোবর ২০১২, শুক্রবার, ০২:১০:০৪পূর্বাহ্ন গল্প, বিবিধ, রম্য, সাহিত্য ৬ মন্তব্য

মাথার উপর ফুল স্পিডে ফ্যান ঘুরছে তারপরও শামছুদ্দিন খাঁ’র কপাল বেয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরে পড়ছে। ফ্যানের বয়সটা একটু বেশি হয়ে গেছে বলে বাতাসের চেয়ে শব্দটাই বেশি। ফ্যানটা যেন আর্তনাত করে বলছে কবি শামছুদ্দিন খাঁ এবার আমাকে অবসরে পাঠাও অনেক ত হলো আর কত ? কিন্তু ফ্যানের এই আর্তনাত কবি শামছুদ্দিন খাঁ’র কানে পৌছেনা তিনি উদাস হয়ে একটার পর একটা সিগারেট টেনেই যাচ্ছেন। তাকে যে করেই হোক মাথা থেকে আজ একটা কবিতা নামাতেই হবে। আগামীকাল শুক্রবার সাপ্তাহিক স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর। সেখানে নামি দামি অনেক কবি থাকবেন, পত্রিকা খুললেই যাদের লেখা নাকের ডগায় ভাসে। প্রতি আসরেই নতুন একজন অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয় এরই ধারাবাহিকতায় সংস্কৃত কলেজের শিক্ষক শ্রী অমলেন্দু বাবুকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবার। তিনি একজন জাঁদরেল সাহিত্যিক। তার রচিত বেশ কিছু গল্প উপন্যাস আর কবিতার বই ছাপা হয়েছে। আর সাপ্তাহিক রস-বিরস সাহিত্য ম্যাগাজিনের সম্পাদক ত নিয়মিত, তিনিই আসরের সঞ্চালক। এই আসরে পঠিত কবিতার মধ্যে আলোচকদের মতে শীর্ষ তিনটা কবিতা রস-বিরসে ছাপা হয়ে থাকে। তাই এই কবিতা পাঠের আসর নবীন কবিদের জন্য বিশেষ গুরুত্বের। শামছুদ্দিন খাঁ অনেক দিন থেকেই আসরে নিয়মিত। কিন্তু দিনে দিনে কাক পক্ষীদের মতো নবীন কবিদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সব আসরে তিনি কবিতা পাঠের সুযোগ পান না। আর মাঝে মধ্যে পেয়ে থাকলেও তা সমালোচনার কিল গুঁতো খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে। তবুও তিনি দমে যান নি।

সম্প্রতি পাড়ার এক উঠতি কবির সাথে বাজি ধরেছেন এই মাসের মধ্যেই রস-বিরসে তার কবিতা ছাপা হবেই তা না হলে তিনি আর ওমুখো হচ্ছেন না। তাই এবার যদি ভালো একটা কবিতা নিয়ে আসরে উপস্থিত হতে পারেন তাহলে আর মান ইজ্জত আর থাকবে না। কিন্তু এই ভর দুপুরে কবিতার কোন লাইনই মাথায় আসছেনা, তাছাড়া ফ্যানের ঘ্যানর ঘ্যানর শব্দটাও ভারি যন্ত্রণা দিচ্ছে। এই অবস্থায় কি কবিতা বের হয় ? কিন্তু তিনি নাছোড় বান্দা কবিতা না নামিয়ে আর উঠবেন না বলে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন। বাংলা একাডেমির অভিধান ও সংসদ বাংলা অভিধান থেকে বেছে বেছে বেশ কিছু কঠিন শব্দ টুকে রেখেছেন, এবার দুই চারটা লাইন যদি মাথার মধ্যে আসে তাহলে ওই শব্দ গুলো ঢুকিয়ে দিয়ে অন্যদের এক হাত দেখে নেয়া যাবে।

বাবার গুঁতো খেয়ে মেট্রিক পাশ করে কলেজে প্রথম বর্ষে ভর্তি হন শামছুদ্দিন খাঁ। কিছু দিনের মধ্যে একই বর্ষের রূপবতী ছাত্রী শিমুলের সাথে মনের আদান প্রদান হয়ে যায়। শিমুলকে প্রতিদিন একটা করে চিঠি লিখতেন শামছুদ্দিন খাঁ। চিঠি জুড়ে থাকতো স্বরচিত কবিতা। তখন থেকেই শামছুদ্দিন খাঁ’র কবি হয়ে উঠা। কিছুদিন পরে দুজনেই সিদ্ধান্ত নিলেন পালিয়ে যাবার, হলোও তাই। পালিয়ে বিয়ে করার পর ঘোর বিপদে পড়লেন শামছুদ্দিন খাঁ, হাতের টাকা ক্রমেই কমে আসছে কিন্তু কোন চাকরি বাকরি জুটাতে পারছেন না পরে অবশ্য পরিচিত একজনের সহযোগীতায় একটা অফিসে টাইপিষ্ট পদে একটা কাজ জুটে যায়। অফিসে বসে ফাঁক পেলেই টাইপ রাইটারে নিজের রচিত কবিতা টাইপ করে বিভিন্ন পত্রিকায় পাঠান, কিন্তু অত্যান্ত পরিতাপের বিষয় অনেক আজে বাজে কবিতা ছাপলেও কবি শামছুদ্দিন খাঁ’র কোন কবিতা অদ্যাবদি ছাপা হয়নি তাই মনের মধ্যে এক ধরনের জেদ জন্মে গেলো যে করেই হোক তার একটা কবিতা ছাপা চাই, অবশ্য এর পেছনে শিমুলের ইন্ধনও আছে। শিমুল প্রায়ই টিপ্পনি কেটে বলে রাত বিরাতে কিসব ছাই পাশ লেখো একটাও ছাপা হতে দেখিনি কোন দিন। তখন আর শামছুদ্দিনের মাথা ঠিক থাকেনা।

গতকাল বিকেলে অফিস থেকে বাসায় ফিরতি পথে পাড়ার আরেক উঠতি কবি শাছুদ্দিনকে ডেকে থামালো তারপর কাছে এসে ঝুলা থেকে কাকের কন্ঠ নামক একটা পত্রিকা শামছুদ্দিনের চোখের সামনে মেলে ধরে চোখ মুখ বাঁকা করে তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো আরে শামছু ভাই ভেতরে পাতায় একটু চোখ রাখুন তাহলেই বুঝবেন কাকের কন্ঠ আজ কি মাল প্রকাশ করেছে… শুক্রবারে আসরে যাচ্ছেন ত ? এবার কিন্তু একজন খাঁটি জ্যোতিষীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কবিতা থেকেই যার জন্ম। একলাইন পড়লেই কবিতার নাড়ী ভূড়ি সব ধরে ফেলতে পারেন। আসরের জন্য নতুন একটা কবিতা লিখেছি শুনবেন নাকি ? আমার এই কবিতাটা অবশ্য মঙ্গান্তর পত্রিকায় প্রকাশ পাবে। ব্যবস্থাও করে ফেলেছি। মঙ্গান্তরের সম্পাদক সাহেব আমার খুব পরিচিত একজন। শামছুদ্দিন খাঁ আর কোন কথা না বাড়িয়ে হন হন করে হাঁটা দিলেন। ব্যাটার এই কান্ড প্রথম নয় এর আগে আরোও দুবার ঘটিয়েছে। একবার দ্বিতীয় আলো পত্রিকায় তার একটা কবিতা ছাপা হলে ব্যাটা বাসা পর্যন্ত চলে এসেছিলো পত্রিকাটা নিয়ে। গুনে গুনে দশটা সিগারেট শেষ করার পর সামছুদ্দিন খাঁ’য়ের ঠোঁটে হাসির ঝিলিক দেখা গেলো। শামছুদ্দিন খাঁ কবিতার খাতা বন্ধ করে এবার উঠলেন।

কবিতা পাঠের আসর শুরু হয়ে গেছে। আসরের অথিতি ও কবিরা গোল হয়ে বসে আছেন। আজ মোট বিশ জনের কবিতা জমা পড়েছে। সঞ্চালকের ডাকে একেকজন করে উঠে দাঁড়িয়ে স্বরচিত কবিতা পাঠ করছেন। পাঠ শেষে আলোচকরা নানান রকমের মন্তব্য করে যাচ্ছেন। এসব মন্তব্যে কোন কোন কবি মাথা নীচু করে বসে আছেন, অনেকেই বেশ আতংকের মধ্যেই আছে বুঝা যাচ্ছে কিন্তু শামছুদ্দিন খাঁ’র চোখে মুখে আজ কোন আতংকের ছাপ নেই। শুরু থেকেই চোখ মুখ উজ্জ্বল। এবার ডাক পড়লো শামছুদ্দিন খাঁ’র। শামছুদ্দিন খাঁ তার ঝুলা থেকে কবিতার খাতা বের করে পড়তে লাগলেন…

নেশা
– শামছুদ্দিন খাঁ

চোখে কেন লাগছে নাকো নেশা
মনে মনে ভাবছে কেসর খাঁ।
বক্ষ কেন উঠছে নাকো দুলি,
নারীর পায়ে বাঁকা নূপুরগুলি
কেমন যেন বলছে বেসুর বুলি,
তেমন করে কাঁকন বাজছে না !
চোখে কেন লাগছে নাকো নেশা
মনে মনে ভাবছে কেসর খাঁ।

শামছুদ্দিন খাঁ কবিতা পাঠ করে বসে পড়লেন এবার আলোচনা-সমালোচনার পালা। প্রথমেই কবি আজগর চৌধুরী উঠে দাঁড়ালেন। শামছুদ্দিন খাঁ’র দিকে এক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন আপনার নাম কি শামছুদ্দিন খাঁ ? শামছুদ্দিন খাঁ হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালেন। তারপর কবি আজগর চৌধুরী বলা শুরু করলেন… কবিতার মধ্যে নিজের নামের একটা অংশ ঢুকিয়ে দিয়েছেন এটা আমার ভালো লাগেনি। কবিতার প্রথমেই ছন্দপতন এটাও দৃষ্টি কটু পড়তে গেলে আছাড় খেতে হয়। মাঝ খানের তিনটা লাইনে ছন্দ থাকলেও ভাবনা গুলো এলো মেলো, অবশ্য নেশার খপ্পরে পড়লে ভাবনা ঠিক থাকার কথাও নয়। এই বলে কবি আজগর চৌধুরী বসে পড়লেন কিন্তু এতো কড়া সমালোচনায়ও শামছুদ্দিন খাঁ’র কোন ভাবান্তর হলো না তিনি আগের মতো হাসি খুশি আছেন। এবার আরেক কবি হাতিম আলী উঠে দাঁড়ালেন…

কবি আজগর সাহেবের বলার পর আর আমার বলার কিছু থাকেনা তারপরও আমি এই কবিতার অন্য একটা দিক নিয়ে কিছু বলছি। আলোচ্য কবিতায় “নারীর পায়ে বাঁকা নূপুরগুলি, কেমন যেন বলছে বেসুর বুলি, তেমন করে কাঁকন বাজছে না !” এখানে কাঁকন কেমন করে বাজছে তা পরিষ্কার নয়। আর “বক্ষ কেন উঠছে নাকো দুলি” এটা ত বুঝাই যাচ্ছে নেশাটা এখনো লাগেনি বলেই বক্ষ দুলছেনা। আগে নেশা লাগান তারপর বক্ষ আপনা আপনি দুলে উঠবে। এই বলে কবি হাতিম আলী বসে পড়লেন এবার আসরের প্রধান অথিতি শ্রী অমলেন্দু বাবু উঠে দাঁড়ালেন… নূপুরেরা কখনো বেসুরো হয়না, তারা জন্ম থেকেই একে অন্যের সাথে গা ঘেঁষে বাস করে তাই তারা যখন গায় এক সাথেই গাই, এক সাথেই বলে। তাই নূপুরের বেসুর বুলিটা এখানে সার্থকতা পায়নি। আগামী বার যখন লিখতে বসবেন তখন আরো মন দিয়ে লিখবেন দেখবেন একসময় কবিতা হাতের মুঠোয় চলে এসেছে এই বলে শ্রী অমলেন্দু বাবুও বসে পড়লেন।

আসরের সঞ্চালক আরেক জনের নাম ঘোষণা করতে যাওয়ার আগেই শামছুদ্দিন খাঁ উঠে দাঁড়ালেন। সঞ্চালক চোখ মুখ শক্ত করে শামছুদ্দিন খাঁ’কে ইশারা করলেন বসে পড়ার জন্য কিন্তু শামছুদ্দিন খাঁ না বসে শ্রী অমলেন্দু বাবুর দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। এবার সঞ্চালক অনেকটা ধমকের সুরে শামছুদ্দিন খাঁকে বসার জন্য নির্দেশ দিলেন। শামছুদ্দিন খাঁ তাতে কর্ণপাত না করে শ্রী অমলেন্দু বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন আপনার কবিতা দেখে আলোচনা করেন না, আপনারা কবি দেখে আলোচনা করেন। শ্রী অমলেন্দু বাবু চোখে মুখে বিরক্তি ফুটিয়ে বললেন আপনি যদি এরকম বাজে একটা কবিতা লিখে আনেন তাহলে সেটাকে ত আমরা ভালো বলতে পারিনা। তখনি শামছুদ্দিন খাঁ তার ঝুলা থেকে কবি গুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের সঞ্চয়িতা বের করে শ্রী অমলেন্দু বাবুর দিকে এগিয়ে গেলেন। তারপর সঞ্চয়িতার ২২৬ নম্বর পৃষ্ঠা বের করে বললেন এটা আমার রচিত কবিতা ছিলো না। কবি গুরুর এই কবিতা থেকে এইটা মেরেছি আপনাদের পরীক্ষা করার জন্য। এবার আবার একটু আপনারা এই কবিতার সমালোচনা করুন। দেখি এবার কি বলেন। শামছুদ্দিন খাঁ’র কথা শুনে আসরের সবাই থ হয়ে আছে। সঞ্চালকও মাথা নীচু করে দিয়েছেন। কবি আজগর চৌধুরী, কবি হাতিম আলী মুখে কোন কথা ফুটছে না। শ্রী অমলেন্দু বাবু ফ্যাল ফ্যাল করে শামছুদ্দিন খাঁ’র মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। শামছুদ্দিন খাঁ এবার একটা তৃপ্তির হাসি দিয়ে আসর থেকে বের হয়ে এলো। আর মনে মনে ভাবতে লাগলো যাক এবার ব্যাটাদের উচিত একটা শিক্ষা দেয়া হয়েছে।

জবরুল আলম সুমন
সিলেট।
১৩ই জুলাই ২০১১ খৃষ্টাব্দ।

২৬৭জন ২৬৭জন
0 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য