আমি ভেতো বাঙ্গালি।(ম্যাগাজিন)

রিতু জাহান ৩০ মার্চ ২০১৭, বৃহস্পতিবার, ১২:৩১:০১অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ২৮ মন্তব্য

সংস্কৃতি বলতে সাধারণত বোঝানো হয় বিশেষ সমাজের সাহিত্য, সংগীত, ললিত কলা, ক্রীড়া, মানবিকতা, জ্ঞানের উৎকর্ষ ও আরো অনেক শান্তি ও সৌন্দর্যের সমাহার। এর পরও ব্যাপক দৃষ্টিতে দেখলে সংস্কৃতি হলো মানুষের জ্ঞান, আচার -আচরণ, বিশ্বাস, রীতিনীতি, নীতিবোধ, চিরাচরিত প্রথা, সমষ্টিগত মনোভাব, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং অর্জিত কীর্তিসমূহ।

বাঙ্গালি সংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে উঠেছিল এই অঞ্চলের হাজার হাজার বছরের পুরানো সংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে। যেমন বলতে পারিঃ খাদ্যাভ্যাসের কারণে বাঙ্গালিদের নাম ‘ভেতো’বাঙ্গালি। আর ভাত মানেই ধান। আমরা গ্রাম বাংলার লোক সংস্কৃতি বলতে দেখি নতুন ধান উঠার উপরেই এর উৎসব আনন্দ। আর এই ধান রোপন, ধান কাটাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে হাজারও পুঁথি, লোক গীতি। এ বঙ্গদেশে কালের বিবর্তনে হাজার পর্যটক এসেছে, আর্য, মুসলমান শাসক গোষ্ঠী, ইংরেজ, ফরাসী, পর্তুগীজ, আরো অনেক অনেক, তারা কিন্তু এ দেশে ধান আনেনি। ধানের চাষ শুরু হয়েছিল এ অঞ্চলে অন্তত পাঁচ হাজার বছর আগে। এই বিভিন্ন শাসক গোষ্ঠী এ দেশ শাষণ ও ভোগ দখল করার পাশাপাশি তারা দিয়ে গেছে বাঙ্গালিদের মাঝে মিশ্র সব সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস। কিন্তু বাঙ্গালির মুল সেই শিকড় গ্রাম্য সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে পারেনি পুরোটা। বাঙ্গালি চিরকাল ভেতো বাঙ্গালি বলে পরিচিত।  বাঙ্গালিদের সেই ভাত খাওয়ার অভ্যাস, ধান কাটার উৎসবে সেই প্রাণখোলা আনন্দে তেমন কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। তবে এ কথাও সত্য যে, অর্ধশতকে তাদের খাদ্যাভ্যাসে এসেছে বড় রকমের পরিবর্তন। আর গ্রামের চির চেনা উৎসবেও এসেছে নতুন মাত্রা।

বঙ্গীয় সমাজ প্রধানত গ্রামীন বলে উপনিবেশিক আমলের মাঝামাঝি কাল পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে খানিকটা সংস্কৃত, ফারসি এবং ইংরেজি সাহিত্য ও সংস্কৃতি দিয়ে কিছুটা প্রভাবিত হলেও তা ছিল মূলত লৌকিক। নাগরিক সম্প্রদায়ের শিকড় ও গভীরভাবে গ্রামে প্রোথিত হওয়ায়, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি গ্রামের দিকে ফিরে তাকানোর একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। কারণ, বাংলার মানুষের জীবন যাত্রা খুব স্পষ্ট ভাবে ফুটে ওঠে বাংলার এই গান ও উৎসবের মধ্য দিয়ে। তাই এই বাংলায় আজ হাজারও পশ্চিমা  সংস্কৃতি ঢুকে পড়ার পরও আমি আমরা বলতেই পারি, আমার এই বাংলার উৎসব, গান, সিনেমা, নাটক, পালাগান, জারিসারি উত্তরাধিকার সূত্রেই ঐশ্বর্যমণ্ডিত। বহু শতাব্দী ধরে বাঙ্গালি সংস্কৃতি পরিশীলিত এবং বৈদগ্ধ্য লাভ করে তা আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়েছে।

বাংলায় ধর্মীয় দিক থেকে তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব আচার আচরণ আলাদা হলেও বাঙ্গীয় সংস্কৃতিতে অনেক উৎসবই আছে যা ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একি কাতারে এসে আনন্দ প্রকাশ করে। তেমনই পহেলা বৈশাখ বাংলার সংস্কৃতিতে এক অন্যতম উৎসব। পহেলা বৈশাখ মানেই বাংলা নববর্ষ।
এই নববর্ষ পালনের সূচনা হয় মূলত আকবরের সময় থেকেই। এক সময় নববর্ষ পালিত হতো আতর্ব উৎসব বা ঋতু ধর্মী উৎসব হিসেবে। তখন এর সংগে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কৃষির, কারণ কৃষিকাজই ছিল ঋতু নির্ভর। আর এই কৃষিকাজের সুবিধার্থেই মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের২০/১২ মার্চ বাংলা সময় সন প্রবর্তন করেন। এবং তা কার্যকর হয় তার সিংহাসন আরোহন সময় থেকে। হিজরি চন্দ্র সন ও বাংলা সৌর সনকে ভিত্তি করে বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। নতুন সনটি প্রথমে ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল, পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিতি লাভ করে। আসলে তখন কৃষকরা জমিদারদের এবং ভূ-স্বামীদের খাজনা পরিশোধ করতো এবং তখন তারা অনেকটা ঋণমুক্তি থেকেই এই সময়ে একে অপরকে মিষ্টি মুখ করাতো এবং আনন্দ প্রকাশ করতো। তাই আমরা দেখি অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল ‘হালখাতা’। এটি পুরোপুরিই একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার। তাই দেখা যায়, তারিখ-ই-এলাহীর উদ্দেশ্য ছিল আকবরের বিজয়কে মহিমান্বিত করে রাখা এবং একটি অধিকতর পদ্ধতিগত উপায়ে রাজস্ব আদায়ে সহায়তা করা। আবুল ফজল আকবরনামা গন্থে বলেছেন যে, হিজরি বর্ষপন্জির ব্যবহার ছিল কৃষক শ্রেণির জন্য একটি ক্লেশকর ব্যাপার, কারণ চন্দ্র সৌর বর্ষের মধ্যে ১১/১২ দিনের ব্যবধান এবং এ কারণে ৩১ চান্দ্রবর্ষ ৩০ সৌরবর্ষের সমান ছিল। সে সময় চান্দ্রবর্ষ অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করা হতো, কিন্তু ফসল উঠতো সৌরবর্ষ অনুযায়ী। এখানে যদি আমি সহজ করে বলি, তবে অগ্রহায়ন মাসকে বলতে পারি সেই ফসল তোলার উৎসব। অগ্র মানে প্রথম, হায়ন মানে বর্ষ বা ধান্য; পূর্বে এই মাস থেকেই বর্ষগণনা শুরু হতো বা এই সময়ে প্রধান ফসল ধান কাটা হতো। তাই এই মাসের নাম অগ্রহায়ন। আর তখনকার প্রেক্ষাপটে বাংলার গ্রাম্য সমাজ অর্থাৎ কৃষিভিত্তিক সমাজে এটাই হলো উৎসবের মাস।
কিন্তু অপরদিকে জমিদার ও ভূ-স্বামীদের জন্য চান্দ্রবর্ষ অর্থাৎ বাংলা নববর্ষ উৎসব পুণ্যাহের দিন। বাংলা ঋতুপ্রধান দেশ। এখানে আমরা দেখি চার মাসই প্রায় বর্ষা থাকে। আর বর্ষা মৌসুমে কৃষকের কাজ থাকে না বললেই চলে। তখন খাজনা বা কর পরিশোধ করা ছিল অনেকটাই কষ্টের আর তাই আবুল ফজল কৃষকদের জন্য তখন এটা ক্লেশকর বলে আখ্যায়িত করেছেন। আর অন্যদিকে জমিদার ও ভূ-স্বামীরা এসব কর ও খাজনা থেকে আয়োজন করতেন জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের। তবে এখানে এভাবেও যদি দেখি যে, তারা কৃষকদের ও তাদের মনোরঞ্জনের জন্য ও এসব উৎসবের আয়োজন করতেন। তাহা হইলে এখানে আমরা ইতিহাস পড়লে দেখতে পাই, বাংলায় মুসলিম শাসক গোষ্ঠিই এই নববর্ষের এক নতুন রুপ দিয়েছে। মুসলিম শাসক সম্রাট আকবরের নির্দেশেই বৈশাখকে বঙ্গাব্দের প্রথম মাস হিসেবে ধরা হয়। তাই এই বৈশাখ মাসের প্রথম দিনই বাংলা নববর্ষ। মুঘল রাষ্ট্র কাঠামোয় বাংলাদেশ একটি সুবাহ বা প্রদেশ হলেও বাংলার সুবাদারেরা এর সংস্কৃতিক স্বতন্ত্রে যত্নবান ছিলেন। এ সময়েই প্রচলিত হয় বাঙালির প্রধান উৎসবাদি। বাংলা সাল, বাংলা মাসের নাম ও এই পহেলা বৈশাখ এ নববর্ষ উৎসব মুঘলদের অবদান। বাঙালি সমাজে প্রবর্তিত নানা উৎসব, নানা খাদ্য, নানা বেশভূষা যা বাঙালিত্বকে আরো বর্ণাঢ্য করে তোলে।
তারিখ-ই- ইলাহির মাসগুলির নাম ছিল খুব বড় এবং কঠিন, যেমনঃ ফারওয়ারদিন, আরদিচিহিম, নুরাতান, খোরদাদ, তির, আমুরদাদ, শাবেওয়ার, মিহির, আখার, দীয়, বাহমান ও ইস্কান্দার। যা অনেকটাই আরবি মাসের সাথে পুরোপুরি মিলে যাবার মতো। পরে তা পাল্টে এবং সহজ করে মানুষ যা সহজে মনে রাখতে পারবে এমনভাবে নক্ষত্রের সঙ্গে বাংলা বারো মাসের নাম রাখা হয়। তবে কেন বর্তমানে মৌলবাদ সমাজের এটা নিয়ে এতো আপত্তি। কারণ, ধর্মে কোথাও লেখা নেই উৎসব করা যাবে না। সে সব অনুষ্ঠান আয়োজনে থাকতো, ঘোড় দৌড়, ঘুড়ি ওড়ানো, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, নৌকা বাইচ, পায়রা ওড়ানো, বহুরূপী সাজ ইত্যাদি।
এই আমি যখন ছোট তখন আমিও দেখেছি নানাকে অনেক উৎসবের আয়োজন করতে। আমার নানার ছিল ঘোড় দৌড় প্রতিযোগিতার নেশা। তার ছিল দুইটা সাদা ও খয়েরী রং এর ঘোড়া। নানা আমাকে খুব ভালবাসতেন। সে যেখানেই যেতো আমাকে সংগে নিত। তার ছিল সব কিছুতে উচ্ছল আনন্দ। নানাদের বাড়ির ঠিক সামনের খালে বসতো, নৌকা বাইচ। কি তার উদ্যাম কি তার তারুণ্য। ছোট বড় বৃদ্ধ মেতে উঠতো সব দুঃখ বেদনা ভুলে। তখনকার লোকজ মেলা গুলোতে ছিল গ্রামের মাটির গন্ধ, মানুষের সুখ দুঃখ নিয়ে বিভিন্ন পালাগান ও পুঁথিপাঠের উৎসব। ছিল ধান কাটা শ্রমিকদের বিদায়ের এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান। আমরা সারা রাত খড়ের গাদার উপর বসে সেসব অনুষ্ঠান দেখতাম। পরবাসী ধানকাটা শ্রমিকদের বিদায় দেখতাম। মেলায় ছিল বাদাম গাছের পাতায় মোড়ানো ছোলাবুট খাওয়ার আনন্দ। ছিল বাইস্কোপ। ছিলো কিশোরীদের প্রাণখোলা খিলখিল হাসি। আমি পায়ে হেঁটে চলে যেতাম সেসব মেলা দেখতে।
এখন আর কোনো মেলা কেন যেন আমায় টানে না। কারণ তখন ছিল না হালফ্যাশনের সংগে পাল্লা দিয়ে জামা কাপড় বানানোর প্রতিযোগিতা, ছিল না কৃত্রিমতা। কালের বিবর্তনে পেশা ও উৎসবেও এসেছে নতুন মাত্রা। এখন এক একটা উৎসব মানে নতুন নতুন কাপড়, বাজারের বড় ইলিশ, মা ইলিশ নিধন, পান্তা ইলিশ খাওয়ার প্রবণতা আর গৃহস্বামীর মাথায় হাত।  নতুন নতুন সব ধুলা উড়ানো উদ্ভট কিছু উশৃঙ্খল ছেলেমেয়ের গান ও সাথে উদ্ভট সব নাচ।

আমার কাছে পহেলা বৈশাখে জাটকা ইলিশ দিয়ে সেজেগুজে পান্তা খেতে যাওয়া, আর বিকেল গড়ালে পাশ্চাত্য সংগীতে মেতে উঠা মানেই গ্রাম বাংলার সাধারণ কৃষককে কটাক্ষ করা ছাড়া আর কিছুই না। বাংলার লোকসংস্কৃতির এ  উৎসব হোক, তবে তা আনন্দের, গ্রাম বাংলার রুপ রেখার উপরেই। বৈষম্যমূলক না।
,,,,,,,,মৌনতা রিতু,,,,,,,,,।

তথ্য সূত্রঃ বাংলা পিডিয়া।

২১২জন ২১২জন
0 Shares

২৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ