অনেকক্ষন ধরে রুপক আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। নিজেকে চিনতেই পারছেনা সে। এ কয়দিন ব্যাস্ততার জন্য দাড়ি কামানো হয়নি। চুলগুলোও বেশ বড় হয়ে গেছে। আসলে ব্যাস্ততা বলতে তেমন কিছুই না। বেকার মানুষদের নানা অকাজে ব্যাস্ত থাকতে হয়। সেও তেমন কোন একটা অকাজেই ব্যাস্ত ছিল। আয়নার ভেতর থেকে কে যেন তার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। কেউ তার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকলে খুব রাগ হয় তার। সে কোন রুপবতী মেয়ে নাকি? সে একটা ছেলে তার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকার কি আছে? আয়নার ভেতরের মানুষটাকে কষে একটা চড় দিতে পারলে ভাল লাগত। রুপক মনে মনে ঠিক করল যেভাবেই হোক ঐ মানুষটাকে একটা চড় দিতেই হবে। সে আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেই নিজের গালে কষে একটা চড় দিল। তারপর চোখ বন্ধ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। গাল ভর্তি দাড়িওয়ালা বিভৎষ্য লোকটা এখন আর তার দিকে তাকিয়ে নেই। এই ভেবে ভাল লাগছে।

 

বারান্দায় কয়েকটা হাসনাহেনা ফুলের গাছ সুন্দর ভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এক কোনায় একটা ইজি চেয়ার পাতা আছে। আরেক কোনায় একটা খাচাঁর ভেতর দুইটা পাখি ঝুলছে। পাখি দুইটার নাম লাভ বার্ড না কি যেন। তারা একটু পর পর ঝাপ্টাঝাপ্টি করছে। ওসব রুপক’র বাবা রায়হান উদ্দিন’র কাজ। তিনি চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পর গাছপালা আর পক্ষীদের নিয়ে ব্যাস্ত সময় পার করছেন। রুপক গরম কফির মগ নিয়ে বারান্দায় চেয়ারে গিয়ে বসল। সকালের উষ্ণ রোদ এসে তার পা ছুয়ে দিচ্ছে। এদিকে টেলিফোন বাজঁছে অনেকক্ষন হল। কিন্তু রুপকের উঠে যেতে ইচ্ছে করছে না। কিছুক্ষন আগ পর্যন্ত চার বার তার বড় বোন নাফিজা ফোন করেছে। কোন কাজের কথা নয়। সব অর্থহীন কথাবার্তা বলার জন্য। যেমন – কেমন আছিস ভাই? কি করছিস? ইত্যাদি টাইপের বকবক। এবারও নিশ্চয় আপাই ফোন করেছে। রুপক চেয়ার ছেড়ে টেলিফোনের কাছে এগিয়ে গেল। রিসিভারটা তুলে কানে ধরতেই…

– কিরে এতক্ষন ধরে টেলিফোন করছি শুনতে পাসনি?

– শুনতে পেয়েছি, কিন্তু ধরতে ইচ্ছে করেনি।

– এটা কেমন কথা? টেলিফোন ধরতে ইচ্ছে করবে না কেন?

– এমনি ধরতে ইচ্ছে করেনি।

– এই তোর শরীর ঠিক আছে তো?

– হুম ঠিক আছে।

– কি করছিলি?

– বদনা ভরে মদ গিলছিলাম।

– একটা থাপ্পর দিয়ে সবগুলো দাঁত ফেলে দেব বেয়াদপ। আমি তোর বড় বোন না? বড় বোন মায়ের মত। তাদের সাথে সম্মান দিয়ে কথা বলতে হয় এটা জানিস না? স্যরি বল।

– স্যরি।

– এইতো ভালো ছেলে। এই শোন! তখন বলতে ভুলে গেছি। তোর দুলাভাই রাতে আসার সময় আমার জন্য একটা সাদা শিফনের শাড়ি এনেছে। কি যে সুন্দর! তুই না দেখলে বিশ্বাসই করবি না।

– আপা আমি বিশ্বাস করছি। কোন কাজের কথা থাকলে বল।

– এমন করছিস কেন! শোন না! তোর দুলাভাই শাড়ির সাথে রঙ মিলিয়ে অনেকগুলো কাঁচের চুড়ি আর টিপও এনেছে। অনেক রাত হয়ে গিয়েছিলতো তাই ফুল আর আনতে পারেনি।

– আপা তুই ফোনটা রাখতো।

– তুই রেগে যাচ্ছিস কেন?

– কেন রেগে যাচ্ছি তুই বুঝতে পাচ্ছিস না?

– নাহ! অকারনে কেন রেগে যাচ্ছিস?

– তুই একটু পর পর ফোন করে অর্থহীন বকবক করছিস। আর আমার সেটা বিষ পানের মত নীরবে গিলতে হচ্ছে। এজন্য রেগে যাছি।

– তুই এ কথা বলতে পারলি! যা তোকে আমি আর জীবনেও ফোন করব না।

– থ্যাংক ইয়্যু আপা। তোর ফোন করতে হবে না। মাস দুয়েক পর পর আমরাই তোর খবর নেব। ঠিক আছে আপা? এখন রাখি?

– জানিনা…

– না জানলেও চলবে। আমি ফোনটা রাখলাম।

 

রুপক রিসিভার নামিয়ে রাখল। কফিটা ঠান্ডা হয়ে গেছে। ঠান্ডা কফি খেতে কেমন লাগে কে জানে। সে ঠান্ডা কফির মগ নিয়ে আবারও বারান্দায় গিয়ে বসল। কফির মগে চুমুক দিয়ে সে মুগ্ধ! ঠান্ডা কফি এত মজার হয়। রুপক চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল। এখন কিছুটা সময় হাসনাহেনার মিষ্টি গন্ধে মাতাল ভাবে কাটুক।

 

ভাইয়া একটা চিঠি এসেছে। রুপক চোখ খুলল। টুনি হাতে একটা চিঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে রুপকের মামাতো বোন। গ্রামের বাড়ি থেকে এসেছে। পড়াশোনায় অসম্ভব ভালো মেয়েটা। টুনির ইচ্ছা সে শহেরে কোন একটা কলেজে ভর্তি হবে। রুপকের মা হোসনে আরা বেগম টুনিকে এখানে নিয়ে এসেছেন। একটা ভাল কলেজে ভর্তিও করিয়ে দিয়েছেন। টুনি এখন এখানে থেকেই পড়াশোনা করছে। টুনি খুবই মিশুক টাইপের একটা মেয়ে। যে কারো সাথে মুহুর্তের মাঝেই মিশে যাওয়ার অসীম ক্ষমতা তার। ওকে দেখলেও গ্রামের আটঁ-দশটা মেয়ের মত মনে হয়না। শহুরে মেয়েদের মতই চলাফেরা, কথাবার্তায় অল্প কয়দিনেই অভ্যস্থ হয়ে গেছে মেয়েটা। ওর চেহারের মাঝে এক ধরনের মায়া আছে। রুপকের ছোট ভাই-বোন নেই। থাকলে ওদের চেহারা কেমন হত কে জানে! রুপকের কেন জানি টুনিকে দেখলেই তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। এই মেয়েটাকে সে খুবই পছন্দ করে। আদরও করে। এইটা কার চিঠিরে টুনু?

ভাইয়া আমার নাম টুনি। তুমি টুনু বল কেন? হুহ!

আদর করে বলি। আচ্ছা যা আর বলব না।

আদর করে বললে ঠিক আছে। তোমাকে আরো একবার টুনু বলার পারমিশন দিলাম।

ওরে পিচ্চি মেয়ে দে চিঠিটা কার দেখি। রুপক টুনির হাত থেকে খামটা নিল। খামে প্রাপকের নাম নেই। শুধু ঠিকানা লেখা। এদিকে পেরকের নাম লেখা রুপন্তি। কিন্তু কোন ঠিকানা নেই। আশ্চর্য! এমন চিঠি কে পাঠাল?

ভাইয়া এই রুপন্তিটা কে শুনি?

এই রুপন্তিটা কে আমি কি করে জানব? চিঠিতো আমার নামে আসেনি।

ভাইয়া চিঠি তোমার নামে আসেনি তা ঠিক। কিন্তু আমার কেন জানি মনে হচ্ছে চিঠিটা তোমার কাছেই লেখা হয়েছে।

আমার কাছে চিঠি লিখার মত এমন কেউ নেই বুঝলি? আচ্ছা তোর আজ কলেজ নেই? কয়টা বাজে খেয়াল আছে?

ভাইয়া আজতো শুক্রবার।

তাই নাকি! আজকাল দেখি কিছুই মনে থাকে না আমার। মাথা বো্হধয় পুরোটাই গেছে। আরো এক বালতি কফি খেতে পারলে মনে হয় ঠিক হয়ে যেত।

এই মাত্ররই না কফি খেলে। আবার!! আমি আনতে পারব না।

প্লিজ নিয়ে আয়না। খেতে খেতে তোর সাথে গল্প করি।

চিঠির গল্প করবে?

হুম।

আচ্ছা! তাহলে যাচ্ছি। হুহ!

এই টুনু কফিটা কিভাবে আনবি শুনে যা।

এতে শোনার কি আছে? অন্য সময় যেভাবে আনি এখনও সেভাবেই আনব।

আরে না। সে ভাবে আনলে হবে না। অন্যভাবে আনতে হবে। শোন গরম কফির মগ তিন মিনিট ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা হলে তারপর আনবি।

তাহলে গরম করার দরকার কি? ঠান্ডা পানিতেই ন্যাসকাফ বানিয়ে আনি।

ঠান্ডা পানিতে আনলে হবে না। গরমটাই আস্তে আস্তে ঠান্ডা হতে হবে।

ভাইয়া তোমার পাগলামী দেখলে আমার মাঝে মাঝে মরে যেতে ইচ্ছে করে।

ইচ্ছে করলে মরে যাবি কোন সমস্যা নেই। আমি পরে তোকে কয়েকটা মরার সহজ টেকনিক শিখিয়ে দেব। এখন যাতো কফি নিয়ে আয়।

হুহ…!

টুনির হুহ করে মুখ বাকাঁনোর দৃশ্যটা দেখতেও রুপকের খুব ভাল্লাগে। মেয়েটা হুহ! করে মুখ বাকানোর দৃশ্যটাকেও একটা শৈল্পিক পর্যায়ে ফেলে দিয়েছে। এজন্য অবশ্যই একদিন ওকে পুরস্কিত করতে হবে।

 

হলুদ খামের উপর “রুপন্তি” লেখা নামটা রুপকের পছন্দ হয়েছে। কিন্তু খামের ভেতরে কি লেখা আছে এখনও সে কিছুই জানে না। সে চিঠিটা পড়বে কি পড়বে না বুঝতে পারছে না। কারন চিঠিটা কার কাছে লেখা তা সে জানে না। রুপক ভাবতে লাগল রুপন্তি নামে তার পূর্ব পরিচিত কেউ আছে কিনা……

ভাইয়া এই নাও তোমার ঠান্ডা কফি।

থ্যাংক ইয়্যু টুনু। ঘর থেকে মোড়াটা এনে বস। রুপক কফির মগে চুমুক দিল। এই কফিটা আগের চেয়েও ভালো হয়েছে। এর পর থেকে কফি খেলে এভাবেই খেতে হবে।

টুনি মোড়া এনে রুপকের পাশে বসল। ভাইয়া তুমি এখনও চিঠিটা পড় নি?

না পড়ি নি। পড়ব কিনা ভাবছি।

সামান্য একটা চিঠি পড়া নিয়ে এত ভাবার কি আছে?

অনেক কিছুই আছে। চিঠিটা কার কাছে লেখা হয়েছে সেটা আমি জানিনা। ধর এখন চিঠিটা আমি পড়লাম। পড়ে দেখলাম যে এমন একজনের কাছে চিঠিটা লেখা হয়েছে। যেটা আমার পড়া উচিত হয়নি। যেমন ধর চিঠিটা বাবার প্রাক্তন প্রেমিকা বাবার কাছে লিখেছে। কিন্তু ভুল বশত আমি পড়ে ফেলেছি। তখন আমার নিজের কাছেই খারাপ লাগবে।

ভাইয়া তোমার কাছে সব সময় শুধু দুষ্টোমি। ভাল্লাগে না একদম!! চিঠিটা না পড়লে বুঝবে কি করে কার কাছে লেখা? আর যদি তা না-ই জানো তাহলে যার চিঠি তার কাছে পৌছে দেবে কি করে?

তোর কথায় যথেষ্ট যুক্তি আছে। কিন্তু…

আহ! ভাইয়া পড়তো। তোমার সব কিছুতেই ‘কিন্তু’ খোঁজার একটা বদ-অভ্যাস হয়ে গেছে।

ঠিক আছে পড়ছি।

 

প্রিয় বন্ধু তুমি,

শুরুতে জানাই কাঠ গোলাপের শুভ্র শুভেচ্ছা। কাঠ গোলাম আমি কখনো দেখিনি। আমার বন্ধু ফারীহা যখন আমাকে চিঠি লিখে তখন এই কথাটা লিখে। জানো, আমার আপু কাঠ গোলাপ দেখেছে। এটা নাকি গোলাপ ফুল থেকে আরো অনেক সুন্দর। আমি আপুকে বলেছি আবার যখন দেখবে তখন যেন আমাকেও দেখায়। আপু বলেছে আচ্ছা। আমার আপুর নাম রুপন্তি। আপু অনেক বড় ক্লাসে পড়ে। আর আমি ক্লাস থ্রি’তে পড়ি। আমার নাম হেমন্তি। হেমন্তি নাম আমার পছন্দ না। আমার কি কি ভালো লাগে জান? আমার ছবি আকঁতে ভালো লাগে। স্কুলে যেতে ভালো লাগে। কার্টুন দেখতেও ভালো লাগে। কিন্তু আপুর জন্য আমি একদিনও ডোরেমন দেখতে পারিনা। আমি ডোরেমন দেখতে গেলে আপু শুধু বকাবকি করে। তখন আপুর উপর খুব রাগ হয় আমার। রাগ হলে আমি আপুর নাম দিয়ে চিঠি লিখি। আপুর ঘরে যে একটা টেলিফোন আছে না। তার নাম্বার আমি মুখস্ত করে রেখেছি। চিঠি লিখলে এই নাম্বার আমি লিখে দেই। যাতে আমার বন্ধুরা আপুকে খুব করে বকে দিতে পারে। ০২৪৭৫৪৭৮৩। তুমিও আপুকে বকে দিও। কেমন?

Eতি

আনিকা আফরোজ হেমন্তি।

ক্লাস থ্রি

রোল নং ০২

 

হি হি হি………

পাগলের মত হাঁসির কি হল?

ভাইয়া তোমার কাছে ক্লাস থ্রিতে পড়ুয়া একটা বাচ্চা মেয়ে চিঠি লিখছে। তাও আবার বড় বোনের নামে নালিশ করে এজন্য হাসছি। হি হি হি…

আজ কালের পিচ্চিগুলাও যা পাকা হইছে না। এই থাম! এভাবে কেউ হাসে?

ভাইয়া এইটুকু মেয়ের মাথায় আপুকে শাস্তি দেয়ার এমন আইডিয়া এল কোত্থেকে? এইটা ভেবেইতো আমার হাসি থামাতে পারছিনা। হি হি হি……

 

(গল্পটা ১০ পর্ব পর্যন্ত যাবে)

#১৬

৪৫৪জন ৪৫২জন
0 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ