অতৃপ্ত জীবন…ভালবাসা-০১

মনির হোসেন মমি ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, রবিবার, ০৬:০৬:১৭অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি, বিবিধ ২ মন্তব্য

গভীর রাত ।অন্ধকারে চারদিকে ঝিঁ ঝিঁ পোকার আলোর খেলা।মাঝে মাঝে লজ্জাবতী চাদনীঁর আলো মেঘের সাথে আলিঙ্গনে উকি দেয় পৃথিবীর বুকে।তখন বৃক্ষের ছায়া মাটিতে পড়ে সৃষ্টি করে এক অতি সুন্দর চিত্রের।একটার পর একটা ক্যানভাস বদলাতে লাগলাম কোন ভাবেই মনের মাধুরীতে আসা ছবিঁ ক্যানভাসে নকল করতে পারছিনা।মাথাটা হঠাৎ ঝিম ধরল।প্রকৃতির ডাকে বাহিরে এলাম।চাদেঁর রূপে পাগল হলাম,,বড্ড ধূমপানের নেশা পেয়েছে।ঘরে ফিরে তন্ন তন্ন করে খুজতে লাগলাম সিগারেটের প্যাকেটটি।কোথায় পেলাম না।ছুটে গেলাম দোকানের খুজে রাত তখন দুটো এত রাতে দোকান খোলা থাকা আশা বৃথা।নিশ্চন্তে নীরবে অন্যমনষ্ক হয়ে অপেক্ষায় ছিলাম যদি কোন স্মুকার পথচারী এ দিক দিয়ে আসে।অবশেষে এক রিক্সাওয়ালার আগমন

-কিরে ভাই সিগারেট আছে?

-না- বিড়ি আছে,আমান বিড়ি।

-দে, ওটাই চলবে।বিড়িটা হাতে নিয়ে দিয়াশলাই দিয়ে ধরাইয়া এক টান দিতেই কাসি এসে গেল।প্রচন্ড কাশি জীবনে এমন কাশ আর কখনও হয়নি।ফেলে দিয়ে রুমে এসে জল খেয়ে নিজেকে অস্হির লাগায় শুয়ে পড়লাম।

পরদিন সকালে নিদ্রাহীন ঘুম থেকে উঠে চাপ কলে মূখ ধৌত করছি হঠাৎ নজরে এলো এক অপূবা`সুন্দরী মেয়ে।পিলে চমকে গেলো তাকে দেখে ।সে দাড়িয়ে ছিল হাতে বড় জগ নিয়ে।

-দিন ভরে দিচ্ছি।সে মৌনতায় সায় দিল।

দূপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা এলো।আজ হঠাৎ একটু আনটাইমেই চারুকলা থেকে বাড়ী ফিরে তুলি হাতে নিলাম।আকছিঁ মনের মাধুরী মিশিয়ে।নাহ! হচ্ছেনা।কেমন যেন কোথাও ভূল হচ্ছে।হঠাৎ বিদুৎ চলে যায়।দিয়াশলাই দিয়ে কুপিটা ধরালাম।তুলিটাকে দাত দিয়ে খেলার ছলে ক্যানভাসে আকাঁ ছবিটা নিয়ে চিন্তিত।বাহিরের মৃদু ঠান্ডা বাতাস ঘরে ঢুকে মনকে শীতল করে দিল।

-আসতে পারি?মেয়েলী কন্ঠে নিজেকে অপ্রস্তুত মনে হল।

-অবশ্যই ,আসুন।মেয়েটি একটি কুপি হাতে করে ঘরে ঢুকল।

-একটু আগুন লাগবে।দিবেন?

-অবশ্যই ।বলেই তার হাত হতে কুপিটা ধরতে গিয়ে হাতের কাপুনিতে পড়ে গেল  টেবিলের উপর ।টেবিলের উপর থেকে একেবারে ক্যানভাসের উপরে পড়ে কুপির তেলে ক্যনভাসে আকাঁ ছবিটার মুটিভটাই বদলে গেলো।মেয়েটি হত ভন্ম।কি বলবে বুঝে উঠতে পারছেনা।

-S0rry,ছবিটা মনে হয় নষ্ট করে দিলাম।

-ছবির জন্য চিন্তি নই,আপনার কুপির তেল যে সব পড়ে গেলো।

কোন রকম কুপিটা ঠিক করে আগুন নিয়ে সে চলে গেলো।মাথায় কিছুই আসছেনা এখন কি করি হাতেতো আর কোন ক্যানভাসও নেই যে ফের আকাঁ যাবে।ঐভাবেই সেদিন ওটা রেখে দিয়ে বাহিরে গাছের নীচে চেয়ার নিয়ে বসে বসে কানে এয়্যারফোণ লাগিয়ে গান শুনছি।পাশের বাড়ীর কে যেন হাত তুলে ডাকছে।এগিয়ে গেলাম শঙ্কিত মনে।অবাক হলাম সেই মেয়েটি কি যেন বলতে চাইছে।আরো কাছে গেলাম।

-কি ভাই আমাকে চিনতে পারেননি?

মাথা নেড়ে জবাব দিলাম।নাতো

-আমি সেই মেয়ে যে কিনা আপনাকে প্রায় এক বছর যাবৎ খুজছে।আমি বিউটি।

তার পরও চিনতে পারলামনা।অথচ সে আমাকে এক বছর যাবৎ খুজছে।অবাক হলাম আমার অপেক্ষায় কেউ একজন ছিল ভাবতে মনে কি যেন এক অজানা আনন্দের ঢেউ খেলে যায়।

-কিন্তু কেনো?

মেয়েটি কোন উত্তর দিল না,রাঙ্গা দুটো ঠোটের কোণে মৃদু হাসির আভাস দিয়ে চলেগেলো।সে রাতে আর চোখের পাতা এক করতে পারিনি।স্কুল জীবন থেকেই ভালবাসার মত সস্তা জিনিসটাকে বরাবর ঘৃণা করতাম।এ সব ফালতু লোকের কাজ।স্কুলের অনেক সহ পাঠি পাঠকরা প্রেম করত।তা আমার সাধ কখনই জাগেনি।স্কুল জীবনে বহু সৃতি মাঝে মাঝে উকিঁ দেয় মনের আয়নায়।

সিদ্ধিরগঞ্জ রেবতী মোহন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় যা বর্তমানে স্কুল & কলেজ।সেই ছোট বেলা যখন ক্লাশ এইটে পড়ছি।ইংরেজী শিক্ষক ছিলেন আসাদুজ্জামান আমরা তাকে মাক্কু স্যার বলে ডাকতাম।সকালে স্যারের বাসায় ইংরেজী প্রাইভেট পড়তে গেলাম।স্যার আমাদের পড়াচ্ছেন এমন সময় হঠাং বাহিরে বড় বড় শব্দে এক মহিলা বলছেন।

-কোন হারামীর বাচ্চা যে রাতে পায়খানার বাশের চঙ্গটা ভেঙ্গে ফেলেছে এখন যাওয়াই যায়না।বলাবাহুল্য তখন এ দেশের প্রায় সর্বত্র বাশেঁর তৈরী খোলা পায়খানা ছিল।এরকম অনেক বকাঝকার কথার ফুলড়ি ছাড়ছেন।আমাদের পড়ার রুম থেকে সব শুনা যাচ্ছিল।এমন সময় আমাদের স্যার বাহিরে গিয়ে মহিলা যা বল্ল তাতে আমরা অবাক।স্যার বলছেন….

-বাশঁ ভেঙ্গেছে তাতে কি ?কিন্তু লোকটা পরলটা কে?

সবাই অবাক।সত্যিইতো পড়লটা কে।কেউ আর স্বীকার করছেনা।তো স্যার আমাদের কাছে এসে বল্ল

-দেখেছিস কি ভাবে অসভ্য মহিলাকে চুপ করিয়ে দিলাম।সত্যি কি শুনবি…(আমরা সবাই আগ্রহ দেখালাম)রাতে যে লোকটা বাশঁ ভেঙ্গে পড়েছিল সেটা আর কেউ নয় আমিই।আমরাতো হাসতে হাসতে পেটে ব্যাথা ধরে ফেলেছিলাম।এই স্যার এবং শিক্ষকের মধ্যে আন্তরিকতা তা তখন ছিল এ্যাভেলেবেল।এখন সে রকম দেখা বড়ই কষ্টকর।

এমনও সময় গেছে যখন এস এস সি পরীক্ষার আমরা ভূলে গিয়ে দুষ্টমির ছলে অন্য বাসায় টিভি দেখছিলাম, আমাদের প্রিয় স্যার মনসূর রহমান আমাদের টিভি রুম থেকে কান ধরে বের করে বাসায় দিয়ে আসত।ছেলে মেয়ে অবাদে আমার বাসায় বিচরন ছিল।ছোট্ট্র একচি রুমে একজনা চকিতে থাকতাম।পাশে ছিল পড়ার টেবিল।টেবিলের উপর ছিল একটি ভাঙ্গা হাতে তৈরী টেপ রেকডার।বন্ধুরা সময় পেলেই চলে আসত আর গানের আড্ডায় মেতে উঠত দিন কি রাত।একদিন বিকাল বেলায় ..তখন সবে মাত্র S.S.C পরীক্ষা দিয়েছি ।আমার এক বান্ধবী M এসে হাজির ।চোখে মুখে হতাশার স্পর্ট ছায়া।

-কি রে কি হইছে?

-না কিছুনা…।ঠিক আছে বলবিনা যখন বলিসনা মনে মনে বল্লাম আর নিজের হাতের কাজ পেইটিংটা রং করতে লাগলাম।অনেকক্ষন M এসেছে কোন কিছুই বলছে না।বুঝেছি আমাকেই জানার জন্য চাপ দিতে হবে।তুলিটা রেখে ওর পাশাপাশি বসলাম।

-এবার বল,কি হয়েছে?

-সাইফুল কি কালকে বিদেশ চলে যাবে?

-হ্যা,তাতে তোর কি? …..কি কিছু হয়েছে?

আর কোন কথাই সে বল্লনা।কুটিপতি বাপের মেয়ে একটু রিজার্ভ টাইপের।সাইফুল সাধারন মাটির ঘরের ছেলে।ওদের দুজনের সন্পর্ক কোন ভাবেই M এর পরিবার মেনে নেবেনা।সাইফুল কিছু জমি বিক্রয় করে চলে যায় ইউরোপের একটি কান্ট্রিতে।অনেক দিন হয়ে গেলো প্রায় দুই/তিন বছর। সাইফুল M এর কোন খুজ খবরই রাখছেনা।একদিন খুব সকালে M এসে হাজির আমার বাসায়।কেমন যেন লাগছে ওকে।বেশ বুশের কিছুটা পরিবর্তন এসেছে।জানতে চাইলে উত্তর দিল আমাকে নিয়ে সে সাইফুলদের বাসায় যাবে।আমিতো অবাক আবার ভয়েও আছি।সাইফুলের মা কি না কি ভাবে তাছাড়া M এর ভাইয়েরা খবর পেলে আমাকে আস্ত রাখবেনা।আমি আপত্তি করার পরও কোন কাজ হলোনা।সে যাবেই।

-চল,যাওয়া যাক।আকা বাকা মেঠো পথ।দুর থেকেই দেখা যায় সাইফুলদের বাসা।বাড়ীর কাছাকাছি যেতেই সাইফুলের ছোট বোন আমাদের অভ্যার্থনা জানায়।টিনসেট ঘর মনে হয় দেনার ভারে নূয়ে গেছে ঘরের চাল।সাইফুলের মা আমাদের কাছে আসতেই M তার পা ছুয়ে কদম মুছি করল।আমিতো অবাক করে কি মেয়েটি।তারপর যা কথা হল তাতে মনে হল পৃথিবীতে ভালবাসা সত্যিই তাৎপর্যময়।মা তাকে জিজ্ঞাসা করল।

-আমার এ কুড়ের ঘরে তুমি থাকতে পারবে?

-নিজের ঘর মাটিতেও থাকায়।শুধু আপনার বুকে ঠাই দিয়েন।

সাবাস!ভালবাসা জিন্দাবাদ।মনের আনন্দে নেচে উঠি।সাইফুলের মা আমাদের সাইফুলের চিঠির ঠিকানা দিল এবং একটি প্রাইভেট ফোন নং দিয়ে বলল “যোগাযোগ করো”।

সাইফুলের সাথে ফোনে আলাপ করে জানতে পারলাম সেও চেষ্টা করেছিল M এর ঠিকানাটা পাওয়ার।চল্ল লাভের পাল্লা হাওয়া দিয়ে। এ ভাবে প্রায় ২/৩ বছর কেটে যায় ভাবনাহীন ভাবে।একদিন খবর পেলাম M কে পাত্র পক্ষ দেখে গেছে।M তাতে রাজি হয়নি।M আমাকে বল্ল টেলিফোনে তারা কোর্টমেরিজ করবে।সব কিছু ঠিকঠাক।সময়,স্হান, বিয়ের সব আয়োজন।সাইফুলের মা,বোন,বিদেশ অবস্হানরত সাইফুল অপেক্ষার পর অপেক্ষা করছি M কখন আসবে।নাহঃ শেষ পর্যন্ত আসেনি।নিরাশ হয়ে যে যার বাসায় চলে এলাম।

তখন থেকেই মনে এক প্রকার ঘৃণাবোধ জন্মাল ভালবাসার প্রতি।ভালবাসা কাউকে করে ফকির আবার কাউকে করে রাজরাণী।Mএর বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো।তার বিয়ের সকল সাজ সজ্জার কাজের জন্য আমাকে ডাক দিল।আমিও মন মরা অবস্হায় তার বিয়ের সমস্হ আলপনা আর ষ্ট্রেজ সাজালাম।M এর সাথে কিছু বলার ইচ্ছে ছিল তারপর ভাবলাম, থাক কি আর হবে কথা বলে যার যে ভাবে থাকতে ইচ্ছে হয় সে সেই ভাবেই থাকুক।হয়তো সেও নিরূপায়!।……..তা ছাড়া ভালবাসার সার্থকতা হয়তো এখানেই।

 

চলবে…..

 

 

 

 

 

 

 

 

৪১৬জন ৪১৫জন
0 Shares

২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য