অতৃপ্ত জীবন….প্রবাসী০৬

মনির হোসেন মমি ৫ ডিসেম্বর ২০১৩, বৃহস্পতিবার, ০৫:২৮:৪৪অপরাহ্ন বিবিধ ১৩ মন্তব্য
সামনে যে ব্রীজের মত ওটাই ব্লকে পৌছার রেল রোড

আজ রবিবার।সিঙ্গাপুর হলিডে সারা সিঙ্গাপুরে টাক্কা থেকে শুরু করে বেরিষ্টার রোডের শেষ পর্যন্ত চলে আনন্দ উল্লাস।আর সেই সময় আইন শৃংখলা বাহিনী থাকেন সচেতন কোথাও কোন অঘট যাতে না হয় সে দিকে থাকে বিশেষ নজর।আইন শৃংখলা বাহিনী বলতে কোন বিশেষ বাহিনী নয় সে দেশের পুলিশ বাহিনী।অত্যাধুনিক টেকনোলজি যুক্ত প্রাইভেট কারে টহল দেয় প্রতিটি রাস্তায় ১৫/২০ মিনিট অন্তর অন্তর।আর সিসি ক্যামেরাতো আছেই।হলিডের কারনে কোম্পানীর কোন কাজে যেতে হয়নি তাই শনিরবার রাতে যেই দোকানে গত দুই তিন বছর পার্ট টাইম কাজ করতাম সেই দোকানে রাত ভর অডারী মাছ মাংস কাটা কাটি করে সকালে আবার দোকান খুলতে হবে।কেউ যদি প্রশ্ন করে আমার লেখা পড়ার কথা বিশেষ করে বিদেশী কেউ যদি প্রশ্ন করত, কি আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা তখন নিজেকে একজন ডিগ্রী পাস কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র পরিচয় দিতে যেমন ইতস্তঃ লাগত তেমনি শুনে বিদেশীরাও অবাক হত।কারন তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া কোন ছাত্রই লেবারের কাজ করার কল্পনাও করতে পারেন না তখন বলি “আই এম এ গ্রাডুয়েশনস লেবার”।শিক্ষিা আর মাছ মাংসের দোকানধারী পরিশ্রমের কথা মাথায় এলে নিজেকে সামলানো দায় হয়ে পড়ে।তখন হয়ে যাই একটু অন্যমানুষ নিজেকে সপে দেই রঙ্গীন জগতে।তবে কন্ট্রোলের মধ্যে থাকার চেষ্টা করি।আজও তাই হলো ,আজ যে দিবা ওয়ালীর প্রথম দিন।এই দিনটি এলে দোকানের চাইনিজ মহিলা মালিক আমাদের বিশেষ আপ্যায়নের সুযোগ দেন।তার আগে বলে নেই দিবা ভালীর পরিচয়।http://www.youtube.com/watch?v=2ppm7al4Y6c তামিল হিন্দুদের এটি একটি বড় উৎসব।মুলত এখানে তামিলের সংখ্যাই বেশী সিঙ্গাপুরে ৯.২%।প্রতি বছর নভেম্ভর মাসের ১১ তারিখে সাধারনত হিন্দু ধর্মাবালীরা প্রচুর ল্যাম্প জ্বালিয়ে এই উৎসব শুরু করে।সকাল থেকেই শুরু হয় মেইন রোডের একপাশ দিয়ে বিশাল লোকের লাইন।সবাই দল বদ্ধ ভাবে লাক্স্মী পুজাঁস্হত কেন্দ্রে পায়ে হেটে যান।যাত্রাপথে হিন্দু ধর্মাবলীরা ডেঞ্জার কিছু করে থাকেন।কারো মাথায় বিশাল এক ছাতার মত ছাউনী ।প্রায় ৪০/৫০কেজি ওজনে বিভিন্ন ধাতব পদার্থ দিয়ে তৈরী ছাউনীটির ভার থাকে মানুষের চামরার উপর ।কারো কারো জিহবা ছিদ্র করে সেখান দিয়ে পুজার বস্তু বহন করে।কোন কোন মহিলারা ভেজা শরীলে মাথায় কলস নিয়ে পুজার উদ্দ্যেশ্যে হাটতে থাকেন বিশাল পথ।কেউ ক্লান্ত হলে রেষ্টের কোন সুযোগ নেই।তাতে মরন হলে দেবীকে উৎসর্গ করা হয়।সিঙ্গাপুর আর যাই হোক যার যার ধর্ম পালনে রয়েছে উদারতা।সর্বক্ষন পুলিশের তৎপরতা দেখা যায় ।পাবলিক রাগ হলেও পুলিশের কোন মান অভিমান নেই।সে তার কর্তব্য পালন করছেন ১০০ ভাগ শততায়।মাঝে মাঝে ভাবি আমাদের দেশে কবে এমন পুলিশ হবে?রাত ১১টায় আমরা ক’জন সেই দোনাকদার চাইনিজ মহিলা আমাদের সাথে করে নিয়ে যায় অরচার্ডে মারকেটের সিনেমা হলে।তখন দি লর্ড অব দি রিং এর প্রথম পর্ব সবে মাত্র মুক্তি পেয়েছিল।বিশাল হলের পর্দায় ডিজিটাল সাউন্ডে মন ভরে যায়।আর ছবিটি ছিল প্রচুর ভিজুয়াল ইফেক্ট এ ডিজিটাল যুগ না হলে এত সুন্দর করে পরিচালক ছবিটি উপস্হাপন করতে পারতেন না।যাক ছবি শেষ হয় প্রায় ভোর রাত।হল থেকে আমরা সবাই বের হয়ে পড়ি কিন্তু একজনকে দেখছিনা।চাইনিজ মহিলা সহ আমরা সবাই চিন্তিত।কোথায় গেল জামাল ভাই।জামাল ভাই আর আমাদের এই চাইনিজ মহিলা কন্টাক স্বামী-স্ত্রী।চাইনিজ মহিলা একটু একটু বাংলা বলতে পারে তার ভাঙ্গা কন্ঠে বলতে থাকে—কই গেলু হারমী?ফোনটা বনধ।এমন সময় ঐ মার্কেটের এক সিকুরিটি এসে আমাদের প্রশ্ন করছেন আমাদের মধ্যে জামাল নামের কাউকে চিনি কি না।আমরা আসস্থ হলাম তার নাম শুনে।আমরা সায় দিতে লোকটি তার সাথে যেতে বললে আমরা তার সাথে যেতে যেতে কথা বলছি—কোথায় জামাল?–আসুন,আসলেই দেখতে পাবেন।চাইনিজ মহিলাটি কিছুটা ভয় পাচ্ছেন কারন সিঙ্গাপুরের আইন কানুন কতটা কঠোর তা সে ভাল করেই জানেন।যাক সেও আমাদের সাথে আসছে।লিফটে আন্ডাগ্রাউন্ড ফ্লোরে সিকুরিটি সি সি ক্যামেরার রুমে অবাক হলাম ভিডিও দেখে জামাল ভাই টপের ভিতর বিশাল এক গাছের আড়ালে থেকে পয়জন নিষ্কাষন করছেন মানে দুই নম্ভর কাজটি সেরে আর বেরুতে পারেননি সিকুরিটি তাকে আটক করেন।চাইনিজ মহিলার রিকোষ্টে অনেক দেন দরবার করে জামাল ভাইকে নিয়ে চলে আসি।

এবার যেই কোম্পানিতে এসেছি তার মালিকায় মালেশিয়ার ওরা পাচঁ ভাই মিলে একটি ইলেকট্রিক্যাল সাব-কোম্পানী দেয়।নাইলেক কোম্পানীর সাব কন্টাকে কাজ করে।তারা একটি কাজ পেয়েছে নাইলেক কোম্পানী হতে সাব নিয়েছে।উডল্যান্ডের ব্লগে ব্লগে লোক পৌছে দেয়ার ফ্লাই ওভার ।এক কামরা বিশিষ্ট সম্পূর্ণ কম্পিউটারাইজ সিষ্টেমস রেল গাড়ীর মত।সেখানে যে ইলেকট্রিক্যাল ওয়ারিং আছে তার সাব কন্টাকদার আমাদের কোম্পানী।প্রচন্ড রৌদ্র, সিঙ্গাপুর প্রায় সব সময়ই ৩৮/৪০ ডিগ্রী তাপমাত্রা বিরাজ করে।প্রচুর তাপমাত্রার মাঝে তৈরীকৃত ফ্রাইওভারের ব্রীজে রেল লাইনের মত রাস্তায় পাশ দিয়ে ৩৩০০০হাজার বোল্টের তারের ওয়ারিং করা।সেখানে যে কোন রংয়ের পোষাক পড়ে একদিন কাজ করলে রৌদ্রের তাপে তা আর খুজে পাওয়া যায়না।রৌদ্রের তীব্রতায় রং ফেকাসে হয়ে ডিসকালার হয়ে যায়।প্রথম ছয় মাসের মত স্লাভ দিয়ে তৈরী ওয়ারিং ক্যাবেল ট্রে এর উপর ৫/৬ কেজি ওজনের স্লাভ কাভার ফিটিং করা।এক দিকে রৌদ্রের তাপ অন্য দিকে সিমেন্টের স্লাভের কাভারের ওজনে হাতে পড়া কটনের কয়েকটি হ্যান্ড গ্লোভসও ছিড়ে যেত কয়েক ঘন্টায়।ছিড়ে হাতে তালুতে ফোসকা পড়ে যেত।প্রায় বছর খানেক কাজ করতে হল এখানেই তার পর চলে যাই মেরিনার একটি সাইটে।সেখানে ৭০ তলা একটি বিল্ডিংয়ে পুরো ক্যাবল ট্রে ওয়ারিং এর দায়ীত্ত্ব পড়ল আমার উপর।আমার সাথে ১৫জন তালিম বাংলা সম্মেলিত একটি গ্রুপ করে লিডার বানিয়ে দিল আমাকে।অফিসে গিয়ে কাজের ধরন ড্রইং সব কিছু বুঝে নিয়ে কাজ শুরু করি।সফলতার সহিত কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে এলাম।ইনস্পেকসনসে আসে সরকারী অফিসারা তখন আমি ট্রে এর ৯০ডিগ্রী ব্যান্ড তৈরী করছি।আমাকে দেখে অফিসার কিছু প্রশ্ন করে আমি কোন দেশের?এখানে কোথায় এ কাজের উপর প্রশিক্ষন নিয়েছি কি না ইত্যাদি প্রশ্নের প্রথমটির উত্তর দিলাম আমি বাংলাদেশী দ্বীতৃয়টির উত্তর আর আমাকে দিতে হয়নি আমার বস মিথ্যে একটি উত্তর দিয়ে দেন “সিঙ্গাপুর পলিটেকনিক্যাল”।কাজের প্রশংসা করে চলে যায় অন্যত্র।

একদিন আমি একা প্রায় ২৫/৩০ ফিট উচুতে মই এর উপর উঠে কাজ করছি ইলেকট্রিক্যাল ওয়ারিং এক্সিট লাইটের পয়েন্ট তৈরী।যখন মইতে উঠি তখনই কেমন যেন সন্দেহ লাগছিল মইটি ছিল পুরনো আর নড়বড়ে পয়েন্টের একপাশ দিয়ে যখন তার টান দিলাম সঙ্গে সঙ্গে ২৫/৩০ ফিট মই হেলে মাটিতে পড়ে গেলাম পায়ে সেফটি সু ছিল পড়ার সময় ডান পায়ের গোড়ালীটা আগে পড়ল মাটিতে।মাটিতে পড়ে তৎক্ষনাত কিছু ক্ষতির অনুভব করতে পারিনি একটু দূরে বসা ছিল আমার বন্ধু সূলভ এক চাইনিজ সে জিজ্ঞাস করল আমি কোন ব্যাথা পেয়েছি কি না।আমি তাকে আশস্হ করতে চেয়েও পারলাম না আমার সব কিছু ঠিক আছে শুধু ডান পা টি যেন কি হল,দাড়াতে গিয়ে আর দাড়াতে পারলাম না আবার মাটিতে বসে পড়লাম..মনে হয় ডান পায়ের গোড়ালীর জয়েন্ট ছুটে গেছে।মনে তৎক্ষনাত ভাবনা এসে যায় “তাহলে আমি কি পঙ্গু হয়ে গেলাম !!!……………………………………

সিঙ্গাপুর সুপ্রিমকোর্ট

চলবে…

 

 

২০১জন ২০১জন
0 Shares

১৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য