দেখে শেষ করলাম কোরিয়ান টিভি সিরিজটি। শেষ হয়ে যাওয়ায় মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেছে। কেন শেষ হয়ে গেল?

এই সিরিজটি ২০টা পর্বের হবার কথা ছিল। জনপ্রিয়তার জন্য ১টি পর্ব বাড়ানো হয়েছে। এই সিরিজের প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছে Kim Soo-Hyun ও Jun Ji-hyun( Gianna Jun)। ২৬বয়সী Kim Soo-hyun তার “Moon Embracing The Sun” এর মাধ্যমে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁ ছেছিলেন। Jun Ji-hyun মূলত বড় পর্দার নায়িকা, বলতে গেলে কোরিয়ায় অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকা। প্রায় ১৪বছর পর ৩২ বছর বয়সি Jun ছোটপর্দায় ফিরে এসেছেন  “My Love from the Star”এর মাধ্যমে।

Jun Ji-Hyun আমার দেখা প্রথম কোরিয়ান মুভি “My Sassy Girl” এর নায়িকা এবং আমার প্রথম পছন্দের কোরিয়ান অভিনেত্রী। “My Sassy Girl” ২০০১সালের অন্যতম ব্লকবাস্টার হিট,  এর বক্স অফিস সাফল্যকে “Titanic”এর সাথে তুলনা করা হয়েছিল এশিয়ান চলচ্চিত্র জগতে। এই মুভির ইংলিশ রিমেকও হয়েছে। থাক সেসব কথা।

Kim Soo-Hyun আর বাদবাকি কোরিয়ান হিরোদের মত তথাকথিত হ্যান্ডসাম না। কিন্তু এলিয়েন হিসেবে তার মত দারুণ বোধহয় আর কাউকে মানানো সম্ভব নয়। এই নায়ক পছন্দ নয় বলেই অনেকদিন সিরিয়ালটি ফেলে রেখেছিলাম। সিরিয়াল দেখার পর মনে হল, পরিচালক কোন ভুল করেননি।

“My Love from the Star”  হল মানুষ-এলিয়েনের প্রেমকাহিনী। ৪০০ বছর পূর্বে এক UFO থেকে পৃথিবীতে নেমে এসেছিল এলিয়েনরা। তখন এক এলিয়েন ফিরে যেতে পারেনি তার নিজভুমিতে, আটকা পড়ে যায় পৃথিবীতে। ঐ UFO প্রতি ৪০৪ বছর পরপর পৃথিবীর কাছাকাছি আসে। এই ৪০৪ বছর এলিয়েনটি মানুষের মধ্যে সাধারণ মানুষ হিসেবেই লুকিয়ে থাকে। এসব এলিয়েনরা দেখতে হুবহু মানুষের মত হলেও, তাদের অনেক সুপার-পাওয়ার আছে। তাদের বয়স বাড়ে না। তারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গা যেতে পারে, অর্থাৎ টেলিপোর্ট করতে পারে। সময়কে একমিনিটের জন্য আটকে রাখতে পারে। দৃষ্টি ও শ্রবণক্ষমতা মানুষের থেকে সাতগুণ বেশি। তবে সুপারহিরোদের মত মানুষের উপকার করে বেড়ায় না আমাদের এলিয়েন নায়ক। কারণ মানুষ খুব খারাপ, একবার সে একজনের উপকার করেছিল, সেই লোকই ওকে “অপশক্তির জাদুকর” বলে ধরিয়ে দিতে চেয়েছিল তখনকার রাজার কাছে। এরপর সে থেকে নির্ঝঞ্ঝাট জীবন কাটায় পৃথিবীতে মানুষের মত। প্রতি ১০বছর পর পর পরিচয় পরিবর্তন করে, কখনো উকিল, কখনো ডাক্তার। মানুষের সাথে কোনোরকম সম্পর্ক তৈরি করে না। অপেক্ষায় থাকে তার UPOএর জন্য। প্রিথিবীতে প্রথম যখন এসেছিল, সে তখন এক বালিকাবধূর জীবন বাচিয়েছিল। নানা ঘটনাচক্রে অনেক চেষ্টা করে সে মেয়েটিকে সে শেষমেশ বাঁচাতে পারে নি। এই ৪০০ বছরেও মেয়েটিকে সে ভুলে যায় নি। সেই একমাত্র মেয়েকেই সে ভালবেসেছিল, তাকে সে রক্ষা করতে চেয়েছিল, পারে নি।

এরপর থেকে কোন আবেগ-অনুভুতির সম্পর্ক থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করত সে। কিন্তু এরপর বন্ধুত্ব হয়ে যায় Jang Young-mok নামের এক উকিলের সাথে। এই Jangই নায়কের পরিচয়বদলে এবং যাবতীয় প্রয়োজনে থাকতো বন্ধু হিসেবে। সময় ঘনিয়ে এসেছে , আর মাত্র ৩মাস। এরপরেই নায়কের UFO চলে আসবে। নিজ গ্রহের ফিরে যাবে তখন নায়ক। ২০১২ সাল, নায়ক এখন Do Min Joon নামের এক লেকচারার। সে এখনো সেই বালিকাকে ভুলে যায় নি। বারো বছর আগে অর্থাৎ ২০০০ সালে সেই মেয়েটির মত দেখতে একটি মেয়ে সে দেখেছিল,  সেই মেয়েটিকে এক সড়ক দুর্ঘটনা থেকে বাঁচিয়েছিল নায়ক। ফিরে যাবার আগে সেই মেয়েটির সাথে একবার দেখা করতে চায় সে। মেয়েটির বিপদের মুহূর্তগুলো টেলিপ্যাথিক ভাবে সে অনুভব করতে পারে আগে থেকেই। নায়কের পাশের ফ্ল্যাটেই উঠেছে তখন বিখ্যাত সুপারস্টার Cheon Song-Yi। নায়ক পাশের ফ্ল্যাটের এই উচ্ছৃঙ্খল সুপারস্টারের উপর বিরক্ত।  নায়ক আবিষ্কার করে Song-yi সেই মেয়েটি যাকে ১২ বছর আগে সে বাঁচিয়েছিল কারণ মেয়েটি দেখতে ঠিক সেই বালিকা-বধুর মত। Song-Yi কি শুধু দেখতে একরকম নাকি পুনর্জন্ম? কৌতূহলেই নায়ক Song-Yiর আশেপাশে থাকে। একসময় মেয়েটিকে ভালবেসে ফেলে সে, কিন্তু সে পৃথিবীতে থাকতে পারবে মাত্র ৩মাস। সে তার ভালবাসা কখনো প্রকাশ করে না, শুধু Song-Yiকে সে নানা বিপদের সময় রক্ষা করে। সে আবার ভবিষ্যৎ দেখে যে একটি নির্দিষ্ট জুতা পড়ে থাকা অবস্থায় Song-Yi বিপদে পড়বে। তাই সে জুতা চুরি করে রেখে দেয়…  😛

এরমধ্যে নানা মজার ঘটনা ঘটে, ভয়াবহ ঘটনাও ঘটে। Song-yiর জনপ্রিয়তা পড়ে যায়। প্রচন্ড খারাপ সময় যায়, তখন ওর পাশে এসে দাঁড়াতে চায় Lee Hwi-kyung, যে Song-Yi কে ভালবাসে ১৫বছর ধরে। কিন্তু Song-Yi তাকে কখনোই মেনে নেয় না, সে অপেক্ষা করে সেই অপরিচিত লোকের যে তাকে বাঁচিয়েছিল ১২বছর আগে। Lee Hwi-Kyungএর কোন সাহায্য Song-Yi নিতে রাজি না। সে সাহায্যের জন্য নির্ভর করে প্রতিবেশী Do Min-Joon, যে তাকে পাত্তা দেয় না।

সময়কে থামিয়ে Do Min joon  তার ভালবাসা প্রকাশ করে যাতে Song-Yi টের না পায়। কিন্তু Song-Yi তারপর প্রেমে পড়ে যায় Do Min Joonএর, যদিও Do Min Joon আপেক্ষিকভাবে বয়সে অনেক ছোট। Song-Yiকে বারবার প্রত্যাখ্যান করে Do-Min-Joon। কোনভাবেই তাদের মিল সম্ভব না। বাধ্য হয়েই Do Min Joon Song-Yiর কাছে নিজের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করে। Do Min Joon চালাকি করছে ভেবে বিকারগ্রস্থ Song-Yi আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, “তুই এলিয়েন হলে আমি ভ্যাম্পায়ার। ৩০ বছর বয়সেও আমার স্কিন কত্ত ফ্রেশ” 😛

একটা সময় দুজনই বুঝতে পারে, তারা কোনভাবেই একে অপরকে ছাড়া থাকতে পারবে না। কিন্তু Do Min Jooকে ফিরে যেতে হবে।

সিরিয়ালটির শেষ কি হবে- তা নিয়ে টেনশন হচ্ছিল। “Twilight”এর মত হবে আশা করছিলাম। তবে যে এন্ডিং হয়েছে, সেটার জন্য সিরিয়ালটি মনে গেঁথে থাকবে আজীবন। Happy বলা যায় না, Sadও বলা যায় না, দুটোর মাঝামাঝিও বলা যায় না। পুরোপুরি open-ended ও বলা যায় না। সেটা বুঝার জন্য অবশ্যই সিরিয়ালটি দেখতে হবে।

সিরিয়ালটি এমনভাবে আমাকে এফেক্ট করবে বুঝিনি। বলতে গেলে ২১ঘন্টার ২০ঘন্টাই কাটিয়েছি মুগ্ধতার, ১৬ঘন্টা হেসে, আর এখন ভেবে ভেবে…।সিরিয়ালটি যখন দেখছিলাম শুরুর দিকে Song-Yi কে ভীষণ হিংসা হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, Do Min Joonএর আমারো যদি কোন এলিয়েন প্রেমিক থাকতো… সিরিয়ালের শেষে এসে মনে হয়েছে, থাক…  Audrey Niffeneggerএর “The Time Traveler’s Wife” এর মতই Song-Yiর অবস্থা…

সিরিয়ালের সব গুলো পর্ব দেখুন / ডাউনলোড করুন এখান থেকে ।

১১২জন ১১১জন
0 Shares

২৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য