ধাবমান যে প্রজন্ম : ২

আজিজুল ইসলাম ১৯ এপ্রিল ২০১৪, শনিবার, ১২:০৪:৩৬অপরাহ্ন গল্প, সাহিত্য ৩ মন্তব্য

দেশের লক্ষ-কোটি বাবা-মা আমাকে টানে যে। তাদের কথা আমার চিন্তায় আসে। ভয় পেয়ে যায় মিতা, বলে আমাদের ভুলে যেওনা আপু, আর, বাবা-মা —, আর বলতে পারেনা ও; কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে মুখ লুকায় বোনের কাঁধে।

 

ঝন্টুর কথা ভালো লাগে মিতার। গ্রামে বেশী কথা বলতে পারতোনা । তবু স্কুলে যাওয়া-আসার পথে, এবং কখনও হঠাৎ যদি দেখা হয়ে যেত, কথা হোত দ’একটাই, বেশী নয় । আগে কোন একদিন হরতালের সময় কোন বাস না পেয়ে পথে দাঁড়িয়েছিল মিতা। ভ্যান চালিয়ে যাচ্ছিল ঝন্টু ওদিক দিয়েই। কষ্ট হবে তাকে টানতে বলে মিতা উঠতে চায়নি, কিন্তু ঝন্টুর মতো ছেলের সাথে পারবে কেন ও! উঠতেই হয়েছে শেষমেষ। অনেক কথাই বলেছিল সেদিন তাকে ঝন্টু। হরতালের দিন ছিল বলে কথাগুলি রাজনীতি সম্পর্কিত-ই ছিল।

 

হরতাল কেমন বুঝছো মিতা ?

বুঝ্ছি, ঝন্টু ভাই, মানুষের কষ্ট শুধু শুধু । হরতালে মানুষ অথবা দেশের কোন লাভ হয়েছে বলে শোনা যায়না, শোনা যায় শুধু নেতাদের লাভ, হয়  অর্থের না হয় ক্ষমতার ।

ঠিক বলেছো মিতা, এটাই হয় আসলে হরতালে । দেখ, হরতাল আমার ইচ্ছা হলে আমি করবো, নাহলে না করবো । তবে চাপ দিবে কেন, বাস ও গাড়ী পোড়াবে কেন ? হরতালকারীদের দাবীর সাথে মানুষ একাত্ম হলে মানুষই তা পালন করবে । তবে দাবীর সাথে একাত্ম না হলে জোর করে হরতাল পালন করানোর দলগুলির যে প্রবণতা, সেটা থেকেই দলগুলির স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায় । বলে ঝন্টু ।

একদম ঠিক কথা বলেছেন ঝন্টু ভাই । মানুষের ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর নির্ভর করবে, হরতাল হবে কি হবেনা । আর হরতাল তথা রাজনীতিতে এতো ধ্বংসযজ্ঞ, এইজন্যই আসলে আমি রাজনীতিকে ভয় পাই ও দূরে থাকি । ছোট করে মিতা উত্তর দেয় ।

কিন্তু মিতা, ভয় করে কি তুমি হরতালের সহিংসতা থেকে রেহাই পাবে ? এই যেমন এখন তুমি বাস না পেয়ে দাঁড়িয়েছিলে, হরতালের কারনেইতো, না-কি? গাড়ী পোড়ানোর কারনে যারা আহত অথবা নিহত হচ্ছে, তারা কোন রাজনীতি করত, বলতে পারো?

তবুও আমার ভয় করে ঝন্টু ভাই । আপুর জন্য আমার অত্যন্ত ভয় করে ঝন্টু ভাই ।

শিরদাঁড়া খাড়া করে ভ্যান চালাতে চালাতে ঝন্টু একসময় বলে ওঠে, তোমাকে দু’টো টিপস  দেই মিতা –

(১) দরিদ্র, অসহায় শ্রমজীবি মানুষের ঘর্মাক্ত, মলিন মুখগুলির দিকে তাকিয়ে থাকবে, অনূধাবন করার চেষ্টা করবে তাদের দুঃখকষ্টগুলোকে ; আর

(২) জন্মসূত্রে আমাদের এদেশের উপর একধরনের ঋণ রয়েছে; এই ঋণ আমাদের শোধ করে যাওয়ার কথা । কি জবাব দিব আমরা আমাদের উত্তরসূরীদের নিকট, যদি রাজনীতি শুদ্ধ করে যেতে আমরা না পারি?

জগন্নাথে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই সবার নজরে চলে আসে মিতা। তার সহজ সরল কথা-বার্তায় সবাই তার সাথে বন্ধুত্ব পাতাতে আসে অথবা আসতে চায়। কিন্তু কোথা থেকে যেন একটা গ্যাপ সৃষ্টি হয়ে যায়, অন্তরঙ্গতাটা আর হয়ে ওঠেনা, যেন ধরা যায়না মিতাকে। ইউনিভার্সিটিটাও হয়েছে তার এমন জায়গায়, যেখানে শ্রমজীবি মানুষগনকে জমায়েত হতে হয় প্রতিনিয়তই। এসমস্ত স্থানে এলেই তার মনে পড়ে যায় ঝন্টু ভাইয়ের একনম্বর টিপসের কথা। তার বাবার মতো যেসমস্ত ড্রাইভার সাহেবগন বাস নিয়ে যাতায়াত করেন সদরঘাট থেকে গুলিস্থান হয়ে উত্তরা-টঙ্গী হয়ে গাজীপুর, তাদের এখান থেকেই যাত্রা শুরু করতে হয়। মিতা দেখে তাঁদের শ্রান্ত-ক্লান্ত ঘর্মাক্ত অবয়বগুলো। যেন তার বাবারা, ভাইয়েরা প্রখর রোদে জীবনের জন্য অবিশ্রান্তভাবে শ্রম করে যাচ্ছেন নিরন্তর। সার্বক্ষনিক প্রচন্ড জ্যমে থেমে থেমে চলতে বাধ্য হওয়া রিক্সাচালকগনের একজন একদিন তাকে হাত দেখিয়েছিলেন, রিক্সার ব্রেক চাপতে চাপতে যে হাত আর হাত হয়ে নেই, শক্ত হয়ে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। এসমস্ত মূহুর্তেই মিতার মনে হয় বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী যে কারণসমূহ, সেগুলি মোচনের কোন ব্যাবস্থা কি আছে ? কোন দ্বন্দগুলি আজ রাজনীতিতে, সমাজে বিদ্যমান যার জন্য সহজ-সরল-অসহায় মানুষ তার বাবা এবং বাবার মতো অসংখ্য মানুষ অকারনে মারা যান? এই দ্বন্দগুলি কি রাজনীতি-সমাজ শুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় যে দ্বন্দসমূহ তা, না-কি এগুলি একান্তই অকারণ দ্বন্দ, অর্থের এবং ক্ষমতার? বিষয়গুলির কোন কূল-কিনারা পায়না সে। অব্যক্ত এক বেদনা ছেপে ওঠে তার সমস্ত হৃদয়জুড়ে, বাবার জন্য ডুকরে কেঁদে ওঠে সে!

 

দুতিন বছর আগে মিতা টিপস দ’টি যখন পায় ঝন্টুর কাছ থেকে, তখন থেকেই ঝন্টুর উপর একটা অন্যরকম অনূভুতি কাজ করে বলে মনে হয় তার। ভ্যান চালাতে চালাতে কি অবলীলায় কথাগুলি বলে গেল তার ঝন্টু ভাই, ভাবলেই অবাক হয়ে যায় সে, মানসিকভাবে একটু দুর্বলও হয়ে পড়ে সে ঝন্টু ভাইয়ের উপর। তবে সেটা ঠিক কি কারনে, তা নিয়ে তার মধ্যেও সন্দেহ থাকে। হতে পারে সেটা মানব-মানবীর স্বাভাবিকভাবে তৈরী হওয়া যে সম্পর্ক তা, অথবা ঝন্টুর রাজনৈতিক সত্ত্বাকে শ্রদ্ধাপ্রদান অথবা দু’টোই। এটা নিয়ে সে কিছুটা ভেবেছে, তবে তার মনে হয়েছে, যেটাই হোক, ঝন্টু ভাইয়ের উপর তার দুর্বলতা রয়েছে। আরো তার মনে হয়েছে, ঝন্টু ভাই কি যেন খোঁজে। তার চোখের তারার দিকে তাকালেই বোঝা যায় তা।

 

একদিন বলেই ফেলে মিতা, কি খোঁজেন সারাক্ষন আপনি ঝন্টু ভাই?

 

এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ঝন্টু অথবা হয়তো সে নিজেও জানেনা যে সে কিছু খুঁজে ফেরে সারাক্ষন।

২৫৩জন ২৫৩জন
0 Shares

৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য