মূল লেখায় যান

অঘটনঘটনপটিয়সী

অশোকা মাহবুবারম্য৩৯টি মন্তব্য

ছোটবেলা থেকেই টম বয় ছিলাম। যদিও এখন দেখে সেটা বোঝার কোনরকম কোনো ইঙ্গিত নাই। আজকালকার মায়েরা তাদের মেয়েদের ঘর থেকে একা বের হতে দিতেই ভয় পান। দোকানে পাঠানোর কথা মনেও করেন না। আর ছোট শিশুদের দোকানে তো পাঠানো ভাবতেই পারি না। আমি নিজেও মা হিসেবে ব্যাতিক্রম না। কিন্তু নিজের কথা মনে করলে মনে পড়ে সেই তিন চার বয়স থেকেই টৈ টৈ করে বাইরে ঘোরাটা অভ্যাস ছিল। দোকানে যাওয়ার জন্যই যেন ঐ পরিবারে জন্ম আমার। অথবা মুরুব্বিদের গা হাত টিপে দেয়া। ছোট মানুষ, টিপে তো দিতে পারতাম না, পারায় দেয়া বলত। এমনকি দূর দূরান্তের আত্মীয় স্বজন এলেও অধিকারবশতই হয় দোকানে পাঠাতেন নাহয় পারায় দিতে বলতেন। আজকাল নিজের ছেলেমেয়েদের দেখার পর শৈশবের কথা ভাবলে মনে হয় কি নির্যাতনটাই না গিয়েছিল আমাদের উপর দিয়ে! ন্যূনতম সম্মানটূকু তো দেয়াই হতো না তারউপর বিনে পয়সার শ্রম। আহারে! পুরাই ‘কাবিখা’ প্রকল্প!

তবে এই নির্যাতনের শোধ তুলে নিতাম ভিন্নভাবে। ‘দুষ্টের শিরোমণি লঙ্কার রাজা’ ছিলাম বিধায় শোধ তুলতে দেরী হতো না। নাকি দুষ্টামি থামাতেই সর্বদা শ্রমে নিযুক্ত রাখত মুরুব্বিরা? কনফিউজড!

 

বাড়িয়ালার একটি পেয়ারা গাছ ছিল বারান্দার পাশেই। সবে লকলকিয়ে বেড়ে উঠছে। সেই ইঁচড়ে পাকা গাছে আবার দ্রুতই ‘বাইরেটা সবুজ ভেতরটা লাল’ টাইপ পেয়া ধরে গেল। আমার আর খুশি দেখে কে। পাকামাত্রই পেয়ারা চলে যায় পেটের ভেতর। না ভাই বোনরা না বাড়িওয়ালার ছেলেমেয়েরা, কেউই তার ভাগ পায় না। ত্যাক্ত বিরক্ত বাড়িওয়ালা শেষপর্যন্ত গাছটাই কেটে দিল! আর আব্বাকে কি বলেছিল সে আর মনে নেই।

 

পাড়ার কাছাকাছি বয়সীরা সব ছিল আমার শিষ্য। শুধু একজন ছিল যে আমাদের চেয়ে একটু বড়। সেও ছিল পাশের বাড়ির বাড়িওয়ালার মেয়ে। আর তাদের বাড়িতেও ছিল বিশাল এক পেয়ারা গাছ! তারপরের ঘটনা তো ইতিহাস। নিষ্ঠুর তার বাপ এত বড় গাছটাও কেটে ফেলতে এক ফোঁটা দ্বিধা করল না! এরা আমার উপর রাগ হতো নাকি গাছের ওপর এখনো আমি ঠিক নিশ্চিত না!

 

যাই হোক, সেই বড় পেয়ারা গাছের বাসার তিনতলায় নতুন ভাড়াটিয়া এল। আরিব্বাপস! ছাদ ভর্তি তার সে কি বাগান। সব গোলাপের! কোনোটা লাল, কোনোটা হলুদ, কোনোপা বিশাল, কোনোটা এই এতটুকু। পাড়ার পিচ্চিদের তো রীতিমত মাথা খারাপ। লুকিয়ে লুকিয়ে ছাদে গিয়ে কিছু গোলাপ নিয়ে এসে সারাদিন খেললাম। কেউ জানতেই পেল না। কিন্তু একদিনে কি আর মন ভরে? এত এত গোলাপ যে! কিছুতেই লোভ সামলাতে পারলাম না। স্কুল থেকে ফিরেই ভর দুপুরে আগে চলে যেতাম ছাদে। তারপর দুটো একটা গোলাপ ছিঁড়ে নিয়ে জামার পকেটে নিয়ে দৌড়। এভাবেই একদিন সাহস এমনই বেড়ে গেল যে ইচ্ছামত বেশ কয়েকটা ফুল ছিঁড়ে নিয়ে চলে এলাম। তখন কি আর জানতাম যে সেই ভাড়াটিয়া আসলে গোলাপের প্রদর্শনীর জন্য রেয়ার সব গোলাপ কালেকশন করতেন! ফলে যা হবার তাই হল! বাসায় নালিশ এল, তারপর ঝাড়ির উপর ঝাড়ি। শেষ পর্যন্ত বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ। আর  না বলে গোলাপ ছেঁড়া? সেটাও বন্ধ। কারণ সেদিনের পরেই এক বিশাল হাউন্ড ছাদের সিঁড়িতে পালা শুরু করেছিল ভদ্রলোক। একজন শিশুর উপর কি অমানবিক অত্যাচার ভাবুন তো!

 

যাক, শৈশবের স্মৃতি যখন লিখছিই তখন সবিনয়ে একটি সত্যি ঘটনা লেখার লোভ সামলাতে পারছি না। যেহেতু হালের সেলিব্রিটি বিষয়ক। কলাবাগান বকশি বাজারে তখন বর্তমানের হার্ট থ্রব জয়া আহসানের নানা বাড়ি। আর আমরা ছিলাম নিচতলার ভাড়াটে। সমবয়সী হওয়াতে তখন জয়া বাড়ি এলেই খেলার সঙ্গী হতো আমার। প্রসঙ্গত বলে রাখি, পরবর্তীতে একই স্কুলে (অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়) এক ক্লাস উপরে পড়ত বিশিষ্ট অভিনেত্রী এই জয়া আহসান। তো তখন যখন সমবয়সী ছিলাম, যখন তখনও সেলিব্রিটি হয়ে ওঠেনি, সেসময় একদিন দুজনে মিলে ছাদে খেলছিলাম। জয়ার নানা ছাদে তখন হাঁস মুরগি কিছু একটা পালতেন। হঠাৎ মাথায় এল মুরগির বাচ্চাগুলোকে গোসল করাতে হবে। জয়াকে বললাম চলো, খালি ড্রামে পানি ভরে ওদের গোসল করাই। দুষ্টের রাজা ছিলাম বলেই হয়ত সবাই খুব ভালো শিষ্য হতো আমার। দোজনে মিলে সেই ড্রাম ভর্তি পানি নিয়ে মুরগির বাচ্চাগুলোকে ছেড়ে দিলাম। আহ, মনে হচ্ছিল যেন সুইমিং পুলে তারা সাঁতার কাটছে! যতদূর মনে পড়ে হাত দিয়ে ঘুরিয়ে পানিতে ঘুর্ণি তুলে তুলে ওদের সাঁতার দেখছিলাম মনের আনন্দে। তারপর যা হয়, দুপুরের ডাক পড়তেই দুজনে নিচে। বিকেলে নালিশ এল বাসায়, ড্রাম ভর্তি পানিতে মুরগির বাচ্চাগুলোকে রেখেই চলে আসায় সব কটি বাচ্চা মরে ভূত। আব্বা লজ্জায় বাড়িওয়ালার কাছে স্যরি টরি বলতে চলে গেলেন। আর আমি দেখলাম আম্মা রান্নাঘরে গিয়ে ঝাঁটা খুঁজছেন। নিজের পিঠ বাঁচাতেই তখন খাটের নিচে গিয়ে লুকিয়ে পরা ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছিলাম না। সে যাত্রা আম্মার ঝাঁটার বাড়িগুলো সব বিছানাকেই সইতে হয়েছিল বৈকি। কারণ আসল আসামী তো খাটের তলে!

আজ এটুকুই। অন্য গল্পগুলো নাহয় আরেকদিন হোক! সোনেলায় যাত্রা শুরুর গল্প হিসেবে ভুল ভ্রান্তিগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হলে বাধিত হব। সোনেলার জন্য ভালোবাসা।

 

মোট পড়েছেনঃ ১৮৪৭জনআজ পড়েছেনঃ ০জন

৩৯টি মন্তব্য

  1. কতটা দূষ্টু ছিলেন তা প্রতি অক্ষরে অক্ষরে জানিয়ে দিলেন। টের পেতে কিন্তু মোটেই কস্ট হচ্ছে না আমাদের। বললেন, সারাদিন বাড়ির বড়োদের সেবা করেছেন ( আপনার ভাষায় অমানবিক শিশুশ্রম)। তারপরে আবার এত দৌড়ঝাঁপ করার সময় পেতেন কিভাবে?! 😉

    শৈশবের কত চুরির কথা মনে করিয়ে দিলেন!! কিন্তু এখন ভাবতে মজাই লাগে। আসলে কি ওগুলো চুরি ছিলো! ওসবতো নির্দোষ দুষ্টুমি (?)। কেউ যে কেন বোঝেনা ভেবেই কনফিউজড হয়ে যাই।

    দারুন লিখেছেন। সোনেলা ব্লগ পরিবারে আপনাকে সুস্বাগতম। আমরা আপনাকে সানন্দে বরণ করে নিলাম। নিয়মিত লিখুন, থাকুন আমাদেরই একজন হয়ে।

    শুভ কামনা 🌹🌹

  2. প্রথমেই অভিনন্দন আপনাকে সোনেলার উঠোনে।

    রম্য গল্প বেশ শেষের দিকে জমে উঠেছে। শৈশব মানেই এখন স্মৃতি আঁকড়ে ডুবে যাওয়া।

    সুস্থ থাকুন সবসময় আর সোনেলার সাথেই থাকুন।

  3. ডানপিটে এক শৈশব স্মৃতী কথা দিয়ে শুরু হলো আপনার সোনেলা উঠোনে পদচারনা। প্রথমেই আপনাকে স্বাগতম আপনি এখানে। পড়ছিলাম আর চোখের সামনে দৃশ্যগুলো দেখছিলাম।
    মিলেও যাচ্ছিলো কিছু কিছু স্মৃতী। যেমন ওইযে বললেন ‘কাবিখা’প্রকল্পের কথা…… একদম!!
    লিখুন বেশি বেশি করে, আমরা আমরাই তো!!
    অভিনন্দন আপনাকে স্বাগতম🌹🌹🌹🌹

  4. স্বাগতম আপু সোনেলার উঠোনে, আশা করি আমাদের এই উঠোন আপনার খুট্টিকালের দুষ্টুমিতে ভরে উঠবে।

    এখন আসি আপনার প্রথম লেখাতে, ওরে বাবা এতো দুষ্টু ছিলেন, আপনার জ্বালায় এতোগুলো পেয়ারা গাছ কেটে সাফ, ইশ।
    আবার মুরগির বাচ্চাদের ড্রামে রেখে গোসল, আবার তাদের রেখে আসা সেখানেই, মাগো! 😮
    রেয়ার গোলাপ ছিড়ে গোলাপের মালিকের কি হাল করেছেন তাই ভাবছি, যা বুঝলাম আপনি সেই বয়সে ছিলেন দুষ্টের শিরোমনি লঙ্কার রাজা। 😂

    আপু আপনাকে অনুরোধ করবো সোনেলায় নিয়মিত লেখার জন্য, আশা করি ভালো লাগবে।
    যদি ব্লগে কোন সমস্যা ফেইস করেন আমাদের গ্রুপে আওয়াজ দেবেন, ইনশা আল্লাহ আমরা সবাই হাজির হয়ে যাবো।
    ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা অফুরান, লেখাটি প্রিয়তে নিলাম আপু। 😊

    1. অনেক ধন্যবাদ ভাইয়া এভাবে জোর আওয়াজে পাশে থাকার ঘোষণায়। আশা করি সবাই মিলে সোনেলা পরিবারটিকে নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারব।শুভ কামনায়।

  5. লেখা পড়ে ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে গেলো। আমার বাসায় কিছু খরগোশ আর গিনিপিগ ছিলো গোছল করাতে তাদের নিয়ে যেতাম পুকুরপাড়ে। একদিন একটা খরগোশ সেই যে সাঁতরে মাঝ পুকুরে গেলো তাকে বাঁচাতে গিয়ে আমি নিজেই পানিতে হাবুডুবু করছিলাম। সেই থেকেই সাঁতার শেখা।

    গল্পের মধ্য দিয়ে পাঠককে রম্যের স্বাদ দিলেন। ধন্যবাদ আপনার প্রাপ্য।

    সোনেলায় স্বাগতম। লিখুন আপনার মনের যত কথা।

    শুভেচ্ছা অফুরান।

    1. বাহ আপনার স্মৃতিগুলো তো চমৎকার। তবে আপনি আমার মত পাজি ছিলেন না। বরং খোরগোশকে বাঁচাতে নিজের জীবন বিপন্ন করেছিলেন। হ্যাটস অফ টু ইউ স্যার!

      ভালো থাকুন। শুভ কামনায়।

  6. আহারে! পুরাই ‘কাবিখা’ প্রকল্প!
    এ প্রকল্পটাই ছিলো সে সময়কার ছেলে মেয়েদের রুটিং মাফিক কাজ।সাথে মাঝে মাঝে বাবুল বিস্কুটও খাওয়ার টু-পাই কামাই হত। খুব ভাল লাগল। জয়াকে আমাগো মানে সোনেলা পরিবারের শুভেচ্ছা জানাইয়েন।লিখুন আরো।

    1. একদম ভাইয়া। এখন বুঝি কিভাবে সরলতার সুযোগ নিয়েছে বড়রা। এক ফোঁটা দাম তো দেয়নি অথচ কাম করিয়ে নিয়েছে ব্যাপক। অথচ আজকালকার বাচ্চাদের দেখুন। কি আদর কি আদর! ওদের দিয়ে পা টেপাবেন কি ওদেরকেই সেবা করতে দশজন লোক রাখা লাগে। আর কি তাদের সেন্টিমেন্ট, কি তাদের ইগো! আর আমরা এই বয়সে কিনা দুটাকার আইসক্রীমের জন্য ঘ্যানঘ্যান করতাম! কত বৈষম্য! কেন যে এত আগে জন্মেছিলাম। আফসোস! 😜😜

  7. সোনেলা পরিবারে স্বাগতম আপু।
    শৈশবের অনেক মধুর স্মৃতি শেয়ার করলেন। ভালো লাগলো। লেখাটা পড়ে নিজের শৈশবে হারিয়ে গিয়েছিলাম। শুভকামনা রইলো।

মন্তব্য করতে লগিন করুন অথবা নিবন্ধন করুন।