ডায়রি ৭১ এবং টর্চার সেল

তির্থক আহসান রুবেল ৫ জুলাই ২০২২, মঙ্গলবার, ০২:৩১:৫৯অপরাহ্ন কবিতা ১১ মন্তব্য

ডায়রী’৭১
————
সেই শকুন, সেই কালো শকুন
আবারো ধারালো নখ নিয়ে
লোভী চোখের নজর দিয়েছে
লাল সবুজের পতাকায়।

সেই কালো কুকুরটা
যে ছোট শিশুর কঁচি শরীরের
কাঁচা মাংস খেয়েছিল একদিন
উদরপুর্তি করে,
সে আবারো ঘুরছে
পুরনো দিনের ছবি
নতুন করে দেখছে বলে।

সেই মুক্তিসেনা
যে বস্তা ভরা
বাঙ্গালীর চোঁখ পেয়েছিল
কনসেন্ট্রেশন ক্যম্পে,
যাদের হত্যা করা হয়েছিল
সেই কালো দিনগুলোতে ।
সেই যে অচেনা যুবক
যার পরনের লুঙ্গি খুলে
যাচাই করা হয়েছিল
তার ধর্ম,
তাকে হতে হয়েছিল
সভ্যতার প্রতীক।

সেই গাদ্দার
যে দেশ মাতৃকার টানে
শত্রুকূপ থেকে আকাশ যান নিয়ে
আসতে চেয়েছিল
এবং এসেছিল
মৃত্যুর পয়ত্রিশ বছর পর
আকাশ যানে চড়েই।

সেই যে ভাই
যে বলেছিল বোনকে নিয়ে
ঘুরতে যাবে গ্রামে,
বোনটি তার পুরোটা গ্রাম
ঘুরেছিল ভাইয়ের
মরদেহ খুজঁতে।

সেই যে প্রেমিক
যে তার প্রেয়সীকে বলেছিল
লাল শাড়িতে তোমায় সাজিয়ে
নিয়ে যাবো আমার করে,
মেয়েটি তার প্রেমিকের
রক্তমাখা শরীরটি জড়িয়ে ধরেছিল
তার শাড়িটি হয়েছিল রক্ত লাল।

সেই যে সবুজের বুকে লাল
কেড়ে নিতে চেয়েছিল
জল্লাদের দল,
আজো মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে
আমার বুকের জমিনে।

অডিও:  https://soundcloud.com/tirthok-ahsan-rubel/dairy-71

 

টর্চার সেল
————-
দেয়ালে এখনো ছোপ ছোপ রক্তের দাগ

নির্বাক দেয়াল থেকে
এখনো করুণ আর্ত্বনাদ ভেসে আসছে।
বাতাস যখন হুমরে পড়ছে দেয়ালে
শো শো শব্দ নেই তাতে
কানে বাজছে
মা, পানি পানি পানি
কিছুক্ষণ পিন পতন নিস্তব্ধতা।
তারপর আবার
শালা শুয়র কা বাচ্চা
বোল মুক্তি কাহা
ধুপ ধুপ কয়েকটি লাথির শব্দ।
মিশ্র একটা শব্দ আসছে
বোধহয় কাঁচা মাংস
লাল অগ্নি দন্ডের ছোঁয়া পেয়েছে
কাবাবের গন্ধে পুরো ঘর মৌঁ মৌঁ করছে
লোভী কতগুলো জিহবা বেয়ে লালা পড়ছে
ওগুলো মানুষের নয়,
কুকুর, হায়না এবং শকুনের।

আযরাইল ঘুরছে ঘরের এপাশ থেকে ওপাশে
কিছুটা বিরক্ত জল্লাদগুলোর উপর
কেন মারতে চাইছেনা এখনো।
কক্ষটি ইতিমধ্যে নাপাক হয়ে গেছে
কারণ যখন পানি পানি বলে
জ্ঞান হারিয়েছিল সে
তখন তার মুখে প্রস্রাব করা হয়েছিল।

তার জ্ঞান ফিরে আসে
গভীর রাতে
জানালা দিয়ে তার মুখে পড়েছে
একফালি পূর্ণিমার চাঁদ।
অবাক হয়ে চেয়ে থাকে সে।
মনে পড়ে যায়
এমনি এক পূর্ণিমার রাতে
সে ধরেছিল প্রিয়তমার মুখ
চাঁদের চেয়েও অনেক বেশী
উজ্জ্বল ছিল সে মুখ।
চাঁদের দিকে চেয়ে একবার সে
প্রিয়তমার মুখ আঁকতে চাইল,
পারল না, আবার চাইল
এবারও না, এবার অন্য কিছু চাইল
কিছু সময় চোঁখ বন্ধ রেখে খুলল
সাথে সাথে মুখে তীব্র লাথি
নাক ফেঁটে রক্ত গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে
গুলি ফোটার মত শব্দ হলো
আযরাইল সাহেব হাসিমুখে দাঁড়াল
মাত্র কয়েক মুহুর্ত্ব সময় পেল সে
এরই মধ্যে জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে
শেষ ইচ্ছেটা দেখতে চাইল
এবং দেখল
রাতের পুরোটা অন্ধকার গাঢ় সবুজ হয়ে গেছে
আর চাঁদটা টকটকে লাল এক সূর্য।

অডিও: https://soundcloud.com/tirthok-ahsan-rubel/torture-cell

 

প্রেক্ষাপট:

‘ডায়রী’৭১’

অনেকগুলো সত্য ঘটনা ছোট ছোট গল্পে রচিত।  যার মূল থিম ছিল একেকজন হয়ত তাদের ডায়রীতে সে সময়ের গল্পগুলো লিখতো। এখানে উল্লেখ্য যে, প্রায় প্রতিটি ঘটনারই ছবি ইন্টারনেটে এভেইলেবল। শেষ দুটো কবির কল্পনা। আর হ্যা, মিলি রহমান (বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্ত্রী) এই কবিতাটি শোনার পর মিনিট কয়েক থ মেরে বসেছিলেন। তারপর আমাকে বলেন, তুমি এই কথাটা কিভাবে আবিস্কার করলে! সত্যিই তো মতিউর বিমান নিয়ে পালিয়ে আসতে চেয়েছিল। সে শহীদ হবার ৩৫ বছর পর বিমানেই তার কবরটা তুলে নিয়ে আসা হয়।

‘টর্চার সেল’

এই কবিতাটা মূলত একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রেমিকের সর্বশেষ দিনের গল্প। সেদিন ছিল ১৫ ডিসেম্বর রাত। রাত থেকে সকাল হতে হতে তার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটাই এখানে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে আরেকটা কথা জানিয়ে রাখি, এই কবিতা থেকে ২০০৮ সালে আমি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করি। যা চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ সমালোচক পুরস্কার অর্জন করে। যেখানে বিচারক ছিলেন দুজন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার এবং দুজনই বর্তমানে না ফেরার দেশে চলে গেছেন: বাদল রহমান এবং খালিদ মাহমুদ মিঠু।

স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র:  

১৮৩জন ৫১জন
0 Shares

১১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ