অভিবাসী নারী

রিমি রুম্মান ১২ জানুয়ারী ২০১৯, শনিবার, ১২:০৬:১৫অপরাহ্ন গল্প ৫ মন্তব্য

প্রতিদিনের মতো আজও ঘড়ির অ্যালার্ম বাজতেই হুড়মুড় করে উঠে বসে সাথী। বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠে কয়েক সেকেন্ড। তখনো বাইরের আকাশ ফরসা হয়ে ওঠেনি। ভোরের দিকে এমন ঘুম ভাঙানিয়া অ্যালার্মের শব্দ ভয়াবহ বিরক্তিকর মনে হয়। হৃৎস্পন্দন থেমে যাওয়ার পূর্বক্ষণের মতো প্রবলবেগে বুক ধড়ফড় করে, যেন নিভে যাওয়ার আগে প্রদীপ শিখার প্রজ্বলন। তবুও বসে থাকার জো নেই। এমনটিই প্রতিদিনকার রুটিন সাথীর। ফ্রেশ হয়ে নাশতা তৈরি করে ঘুম থেকে ডেকে তোলে ছেলেদের। স্কুলের জন্য ইউনিফর্ম, জুতা পরিয়ে তৈরি করে ওঁদের। অতঃপর বড় ছেলেকে বাসে তুলে দিয়ে আসে। ফিরে এসে দ্বিতীয় দফায় ছোট ছেলের ব্যাকপ্যাক কাঁধে ঝুলিয়ে, হাত শক্ত করে ধরে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ততক্ষণে চারপাশ সকালের নরম আলোয় মাখামাখি হয়ে উঠে। অচিন সব গাছের সবুজ পাতায়, বাড়িগুলোর ছাদে সকালের নরম রোদ ঝুলে থাকে। লনের চেরি ফুলের গাছটায় একটি অতিথি পাখি ডেকে চলেছে অবিরত। কেমন অচেনা সুরে। দিনের শুরুতে সুরটি শুনতে অসুখী আর বিমর্ষ লাগছিল সাথীর। পাখিদেরও বুঝি মন খারাপ হয়! বিষণ্নতায় পেয়ে বসে! এমন সুরে পাখির ডাক শোনেনি সে আগে। উঁচু নিচু রাস্তা ধরে হেঁটে গেলেও খুব বেশি দূরের নয় স্কুলটি। দলে দলে সব শিশুই তাদের বাবা কিংবা মায়ের হাত ধরে ব্যাকপ্যাক কাঁধে হেঁটে যাচ্ছে দ্রুতলয়ে স্কুলের দিকে। ছেলেকে স্কুলের ফটকে বিদায় দিয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ অন্য শিশুদের স্কুলে যাওয়া দেখে সাথী। দিন শুরুর এই সময়টায় সদ্য ঘুম থেকে জেগে উঠে আসা শিশুদের নিষ্পাপ ঢুলুঢুলু মুখ দেখতে বেশ ভালো লাগে। শিশুদের কেউ শ্বেতাঙ্গ, কেউ কৃষ্ণাঙ্গ, কেউবা বাদামি চামড়ার। ভালো লাগে বাবা কিংবা মায়ের হাত ধরে স্কুল গেটে আসা শিশুদের আদরমাখা সাময়িক বিদায় দেখতে। বাবা-মায়ের গালে টুক টুক করে চুমু দিয়ে হাত নেড়ে বাই বলে স্কুল গেটের ভেতরে চলে যাওয়া দৃশ্য দেখতে।

কিন্তু আজ ভারি তাড়া। অনেক কাজ জমে আছে। ঘরে ফিরে স্বামীকে নাশতা দিয়ে দুপুরের রান্নার আয়োজন করতে হবে। ঘুম ভেঙেই রোজ ঝড়ের বেগে যে ব্যস্ততা, তা শেষ হলে কিছুটা স্বস্তি মেলে এই সময়ে। স্বামী কাজে চলে গেলে প্রগাঢ় একাকিত্ব আর নির্জনতার এই সময়টা বেশ প্রিয় সাথীর। সকাল আর দুপুরের মাঝামাঝি একান্ত নিজের বলে কিছু সময়। রুদ্ধশ্বাসের সকাল, এক হাতে সংসারের সব কাজ সামলানোর সকাল! তবুও এই শহরে কোনো ক্লান্তি নেই তাঁর। যেন বিধাতা এই শহরের মানুষগুলোকে এভাবেই তৈরি করেছেন। রোজকার মতো আজও ঘরের সব কটি পর্দা সরিয়ে দেয় সে। দিন শুরুর এই সময়ে রোজ স্বাস্থ্যকর নির্মল বাতাসে শ্বাস নেওয়ার জন্য তৃষিত থাকে সাথী। বাইরে চমৎকার ঝলমলে নিরুত্তাপ রোদ। আকাশ গাঢ় নীল। বিদেশ বিভুঁইয়ের ব্যস্ততায় বহুদিন মাসের হিসেব মনে থাকেনি সাথীর। কিন্তু আজ বেশ মনে আছে। এই নীলাকাশ শরতের। কাল পত্রিকায় দেখেছে, শরৎ শুরু হয়ে গিয়েছে। জানালা সামান্য খুলে দেয় সে। হালকা শীতল বাতাস হুহু করে ঢুকে পড়ে ঘরে। মেঝেতে সকালের নরম রোদ এসে শুয়ে থাকে বুক পেতে। রেকর্ডারে রবীন্দ্রসংগীত ছেড়ে দিয়ে ঘরের আনাচ-কানাচ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠে সাথী। গত একমাস যাবৎ এমন বিরামহীন পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যস্ত থেকেছে সে। মনে হয়, এটা ঠিকমতো করা হয়নি, ওটা আরেকটু সুন্দর করা যেতো।

ইদানীং কারণে–অকারণে মন বেশ ভালো থাকে সাথীর। আগের দিনগুলোর মতো হুটহাট রাগ ধরে না। কাজ শেষে স্বামী বাসায় ফিরে চা চাইলে চট করে রেগে বলে উঠে না, ‘পারব না, বানিয়ে খাও’। বিকেলে দুজন মিলে বেলকনিতে বসে বৈকালিক চা-নাশতা সারে। গল্প হয় নানান বিষয়ে। ভাগ্যিস এমন বেলকনি সমেত বাড়ি কিনেছিল। এই শহরে বাক্সের মতো দেখতে কাঠের বেশির ভাগ বাড়িগুলোর ভেতরটা কেমন যেন নিকষ অন্ধকার লাগে। আলো–বাতাস আসে না। দম বন্ধ হয়ে আসে। বাড়িটি কেনার সময় চারদিকে এমন খোলামেলা, ভেতরে আলো-বাতাসের খেলা, বেলকনি, এসব দেখে এক নজরেই মন ভরে গিয়েছিল সাথী-ফারহান দম্পতির।

কলিং বেলের আচমকা শব্দে পরিচ্ছন্নতার কাজে বিরতি দিয়ে সাথী এগিয়ে যায় দরজায়। পাশের ফ্ল্যাটের আনু খালা। দরজা খুলতেই আনু খালা হাতের বাটিটি এগিয়ে ধরলেন সাথীর দিকে। বললেন, ভাপা পিঠা বানিয়েছিলাম কিছু। কাল খেতে চেয়েছিলে যে! তাই নিয়ে এলাম। সাথী কিঞ্চিৎ লজ্জিত হয়। আনু খালা এত মায়াময়! বিদেশের বাড়িতে মায়ের মমতায় এমন কাউকে পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার বটে! সাথীর মনে পড়ে যায়, গতকালই কথা প্রসঙ্গে এক বুক কষ্ট আর আক্ষেপ নিয়ে বলেছিল, মায়ের হাতের তুলতুলে নরম ধোঁয়া ওঠা ভাপা পিঠা খাওয়া হয়নি কতকাল! অথচ আজ সকালেই কিনা নিয়ে এসে হাজির!

আনু খালা এ দেশে এসেছেন ৩০ বছর আগে, তরুণী বয়সে। নানান রকম পিঠা তৈরি করে বাঙালি গ্রোসারিতে বিক্রি করতেন একসময়। বেশ ভালোই অর্থ আয় করতেন। সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য এনেছেন। এখন অবশ্য বয়সের কারণে আর পেরে ওঠেন না। আনু খালা নাগরিকত্ব নেননি আজও। নেননি মানে নিতে দেওয়া হয়নি। খালুর ভাষ্য, নাগরিকত্ব নিয়া কী করবা? পাসপোর্ট ধুইয়া কি পানি খাইবা? এ নিয়ে খালার ভেতরে রাজ্যের ক্ষোভ, দুঃখ, হতাশা। মাঝে মাঝেই দুঃখ করে বলেন, চোখের সামনে চারপাশে চেনা–অচেনা কত মানুষ আসল দেশ থেকে এই এত বছরে। আমার পরে আসছে, অথচ নাগরিক হওয়ার পর বাবা-মা, ভাই-বোন সবাইরে নিয়া আসছে। দেখলেই মন জুড়াইয়া যায়। অথচ আমার কাউকেই আনতে পারলাম না তোমার খালুর অনিচ্ছার কারণে। বিশ্বাসহীনতা কিংবা বিষণ্নতার দীর্ঘশ্বাস নেমে আসে আনু খালার বুক চিরে।

আনু খালার এখন শুধু দুই বোন বেঁচে আছেন দেশে। মা-বাবা ও বড় ভাই গত হয়েছেন। এক জীবনে মানুষ বুকের ভেতরে কতই না ক্ষত বয়ে বেড়ায়! আনু খালা এমন একজন খাঁচার ভেতর ডানা ঝাপটানো বন্দী পাখির মতো। পড়াশোনা জানা মানুষ। তবুও স্বামীর ইচ্ছার বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। একদিন কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, সংসার জীবনের শুরুর দিকে নানান বিষয়ে মতের মিল না হলেই স্বামীর সঙ্গে তর্ক–বিতর্কে জড়িয়ে পড়তেন। দুই মেয়ের জন্মের পর দিনকে দিন বিবাদ চরমে গিয়ে ঠেকত। মেয়েরা যখন বুঝতে শিখল, এক তুমুল বৃষ্টির রাতে এমন কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে পুলিশ এসে হাজির। মেয়েদের একজন ভয় পেয়ে ৯১১ কল করে বসেছিল। স্কুলে কারও কাছে শিখে এসেছে হয়তো। এ নিয়ে অনেক ঝক্কি ঝামেলাও পোহাতে হয়েছে। কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছিল ব্যাপারটা। অভিমানে, ক্ষোভে একদিন সাথীকে দুঃখ করে বলেছিলেন, দুটি সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে সংসারে অশান্তি কে চায়, বলো? জগতে খুব কম স্বামীই বন্ধু হতে পারে, বুঝলা?

অথচ এর আগের সপ্তাহেই অ্যাপার্টমেন্টের সিঁড়িতে আনু খালার স্বামী রহমান খালুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল সাথীর। ছয়তলার বৃষ্টি ভাবি নাগরিকত্ব পরীক্ষায় পাশ করে এসেছেন শুনে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন, যত দ্রুত সম্ভব বাবা-মা, ভাইবোনের জন্য আবেদন কইরা ফালাও। কখন কোন আইন বদল হইয়া যাইব, কে জানে। হলওয়ে ধরে হেঁটে যেতে যেতে সাথী আরও শুনতে পেল বৃষ্টি ভাবিকে উদ্দেশ্য করে খালুর কণ্ঠস্বর, ‘সময় থাকতে হুঁশিয়ার, বুঝলা হা হা হা…’। সাথী ভাবে, নিজের ঘরের বউকে যে মানুষ আজও নাগরিকত্ব পরীক্ষা দিতে দেয়নি, স্ত্রীর মা-বাবা, ভাইবোনদের আসতে দেয়নি, সেই মানুষটি কী অবলীলায়ই না অন্যের বউকে এমন উপদেশ দিয়ে যাচ্ছেন! অথচ তারপরও আনু খালা এই মানুষটিকেই সর্বান্তকরণে ভালোবেসে সংসার করেছেন, একটি জীবন পার করে দিয়েছেন!

দেয়ালে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দ্রুত হাত চালায় সাথী।
লিভিং রুমের কোনায় দীর্ঘদিন যাবৎ দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্পটি বেশ সেকেলে লাগে। এটি সরিয়ে নতুন কিনে আনা চমৎকার আধুনিক ল্যাম্পটি সেখানে সাজায়। রেকর্ডারে বাজতে থাকা গানের সঙ্গে মিলিয়ে গুনগুনিয়ে গান ধরে। প্লাস্টিকের ফুলগুলো ফেলে দিয়ে সেখানে দোকান থেকে কিনে আনা তাজা ফুল সাজাতে হবে। আহা দেশে তাঁর বাবার বাড়ির ছাদ ফুলের সৌরভে মৌ মৌ করত। ড্রামের মাঝ বরাবর দুই ভাগ করে কেটে তাতে মাটি ঢেলে সেখানেই ফুলের গাছ লাগানো হয়েছিল। সঙ্গে ছিল ছোট বড় নানান মাপের টব। শহরের যান্ত্রিকতার মাঝেও এক চিলতে সবুজের সমারোহ ছিল এতটুকুন ছাদে। মায়ের কাছ থেকেই সাথী প্রকৃতি ও সবুজ ভালোবাসার স্বভাবটি পেয়েছে। কিন্তু শীতের দেশে এই এক সমস্যা, বারোমাস বেলকনির সবুজ বাঁচিয়ে রাখা যায় না।
সাথীর অভিবাসী জীবনে বেদনায় প্রশান্তি খোঁজার উপকরণ শৈশব, কৈশোরের টুকরো টুকরো স্মৃতি। এক বর্ষা ঋতুর সময়কার ঘটনা খুব মনে পড়ে। ঝকঝকে নীলাকাশ আচমকা নিকষ কালো মেঘে ছেয়ে গিয়েছিল সেদিন। আকাশে-বাতাসে বজ্রপাতের গুড়ুম গুড়ুম শব্দ। শহরের দিগ্ভ্রান্ত মানুষের দিশেহারা হওয়ার দশা তখন। সবাই গৃহমুখী। ঝুম বৃষ্টি নামলে ঈষৎ চিন্তিত মা ফুলের টবগুলো ঘরে নিতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। গাছগুলোকে তো বাঁচাতে হবে আগে! এই বিদেশে এমন ঘন ঘোর বর্ষা দেখা হয়নি কতকাল! দূরের এই দেশে বসে কবি আবিদ আজাদের সেই লাইনটি মাঝে মাঝেই মনে পড়ে সাথীর, ‘তোমাদের উঠোনে কি বৃষ্টি নামে, রেলগাড়ি থামে?’

সামনের মাসেই এই প্রথমবারের মতো বিদেশের বাড়িতে আসছে সাথীর আপন ছোট বোন তিথি। সাথী-তিথি দুই বোনকে ছোটবেলা থেকেই মা নিজ হাতে ডিজাইন করে বানিয়ে একইরকম জামা পরাতেন। ফিতা দিয়ে দুই বেণি বেঁধে দিতেন। প্রতিবেশীরা বলত, জোড়া কবুতর। বাবার আদরের রাজকন্যা সাথী-তিথি। বড় হওয়ার পর বাবার কঠোর মনোভাব, বিদেশে থাকা পাত্রের সঙ্গে মেয়ে বিয়ে দেবেন না কোনোভাবেই। চিরকাল নয়নের কাছাকাছি রাখবেন মেয়েদের। অনেক সম্বন্ধ ফিরিয়েও দিয়েছিলেন। কিন্তু কেমন করে যেন ফারহানকে পছন্দ হয়ে যায় সাথীর রক্ষণশীল বাবার। আসলে এটাই বোধ হয় নিয়তি। নিয়তির লিখন খণ্ডাবার সাধ্য কারও নেই। আমরা ভাবি এক, অথচ স্রষ্টার অদৃশ্য অঙ্গুলি হেলনে হয় আরেক। মানুষের জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে নিয়ে এমন ধারণাই প্রচলিত আছে। তাই বলে এ নিয়ে কোনো ক্ষোভ নেই সাথীর। বিয়ে মানেই বিচ্ছেদ। বাবা-মায়ের সঙ্গে বিচ্ছেদ। ভাইবোনের মধ্যে বিচ্ছেদ। এমন কী কখনো কখনো স্বদেশের সঙ্গেও বিচ্ছেদ। এ বিচ্ছেদ মানে সম্পর্কচ্ছেদ নয়। এ বিচ্ছেদ মানে বিচ্ছিন্নতা, দূরত্ব। প্রেম ও যাতনার মাঝে যে দূরত্ব, ঠিক তেমন। ভালোবাসা ও অশ্রুর মাঝে যতটুকু দূরত্ব, ঠিক ততটুকু।

সাথীর আজও মনে আছে, একবার ছোট বোন তিথির সে-কী জ্বর! জ্বরের ঘোরে অচেতন প্রায়। বিষণ্ন সাথী বাড়ির পেছনের জামগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে দুহাত তুলে অঝোরে কেঁদেছে। বোনের সুস্থতার জন্য আকুতি জানিয়েছে সৃষ্টিকর্তার কাছে। পাশের বাড়ির প্রদীপ বলেছিল, ওখানে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যা আর রাত্রির সন্ধিক্ষণে প্রার্থনা করলে তা পূর্ণ হয়। সাথী ভুলে গিয়েছিল প্রকাণ্ড সেই জামগাছের নিচে কেউ ভুলেও যেতো না ভয়ে। ভূতের ভয়! সে রাতে বাড়িসুদ্ধ মানুষ হন্যে হয়ে খুঁজে খুঁজে শেষে ভোরের দিকে ঘুমন্ত সাথীকে আবিষ্কার করেছিল জামগাছের তলায়। বোনের সেরে ওঠবার জন্য প্রার্থনারত সাথী কখন যে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েছিল, বুঝতে পারেনি। সে কী হুলুস্থুল কাণ্ড! এমন কত টুকরো টুকরো স্মৃতি!

ছোট ছেলের স্কুল ছুটির সময় ঘনিয়ে আসে। দশ মিনিটের পথ ইদানীং যেন পাঁচ মিনিটেই হেঁটে যায় সে। মানুষ যখন আনন্দে থাকে, তখন বোধ হয় শরীর, পা দ্রুত চলে। সব কাজে গতি ফিরে আসে। পৃথিবীটাকে সুন্দর মনে হয়। অনেক দিন বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হয়। আজ ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে পাশের সুপারমার্কেট থেকে ক্যান্ডি, চিপস যা চেয়েছে তাই কিনে দিয়েছে সাথী। বিস্ময়ে ছেলে রোশান জানতে চেয়েছে, তোমার কী হয়েছে আজ, মা ? রাস্তার দুপাশের সবুজ ম্যাপল গাছের ছায়ায় হাঁটতে হাঁটতে সাথী ভাবে, কী হয়নি তাঁর! ছোট বোন তিথি এলে কী মজাই না হবে! আবার তাঁরা একরকম শাড়ি পরে বেড়াতে যাবে সেই ছোটবেলার মতো। পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে হাঁটবে। এই বিদেশের মাটিতেও সবাই নিশ্চয়ই অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে বলবে, ‘জোড়া কবুতর’!
‘মা, আজ বিকেলে কিন্তু পার্কে নিয়ে যেতে হবে’—রোশানের আবদারে সাথীর ভাবনায় ছেদ পড়ে।
‘দুদিন পর তোমার তিথি খালামণি আসবে, আমার যে এখনো অনেক কাজ বাকি, বাবা।’
‘কিন্তু তুমিই তো বলেছ, স্কুল টেস্টে শতভাগ নম্বর পেলে সব কথা শুনবে। তুমি কি তোমার প্রমিজ ব্রেক করবে, মা?’
সাথীর মনে পড়ে ছেলেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা। সে তো হাজার প্রতিবন্ধকতা এলেও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবার পাত্রী নয়! সে ছোট্ট রোশানকে কথা দেয় বিকেলে পার্কে নিয়ে যাওয়ার।

শুক্রবারের বিকেলটা বেশ নির্ভার লাগে সাথীর। পরদিন ছেলেদের স্কুল বন্ধ থাকে। খুব ভোরে ওঠার তাড়া থাকে না অন্তত। শুক্রবারের বিকেলে পার্কে অন্যদিনের তুলনায় ভিড় থাকে বেশি। একদিকে শিশুদের ছুটোছুটি, অন্যদিকে মায়েদের পার্কের একপাশে বেঞ্চিতে বসে গল্প করা, সব মিলে আনন্দোৎসবের মতো পরিবেশ। কেউ ব্যাগে করে চিপস, জুস নিয়ে আসে। কেউবা ঘরে বানানো পিঠা। সকলে মিলেমিশে ভাগাভাগি করে খায়, গল্পে মশগুল থাকে। দেশের গল্প, ঘরের গল্প। কখনো সুখের কখনো বা দুঃখের গল্প।

ছয়তলার বৃষ্টি ভাবি বললেন, সাথী, আপনার বোন আসছে জেনে ভালো লাগছে খুব। ফারহান ভাই সহজ, সরল ভালো মানুষ বলেই সহজে আপনার বোনকে আনতে পারতেছেন। আমার জামাই কোনোভাবেই আমার ভাইবোনকে এ দেশে আনার পক্ষে না। বলে, ওঁরা আসলে আমার নাকি পাখনা গজাবে। আমি নাকি ধরাকে সরা জ্ঞান করব। কিন্তু আমি তাঁর কথা শুনব কেন? গত সপ্তাহেই তাঁকে না জানিয়ে লুকিয়ে ভাইবোনদের জন্য আবেদন করে এসেছি, যা হওয়ার হবে। সে তো ঠিকই তাঁর ভাইবোনদের এ দেশে এনেছে। আমার বেলায়ই যত আপত্তি তাঁর।
বৃষ্টি ভাবির ফরসা মুখ সূর্যালোকের মাঝে আচমকা নিকষ অন্ধকার নেমে আসার মতোই মলিন হয়ে উঠল। বৃষ্টি ভাবির স্বাভাবিক শ্বাস–প্রশ্বাস ধীরে ধীরে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হওয়ার বিষয়টি টের পায় সাথী। ছোট্ট শ্বাস নিয়ে তাকায়। সন্ধ্যা ঘনিয়েছে। রাতের আকাশে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে ভাসমান এক চাঁদ। পার্কের ভাবিদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ছেলে রোশানকে নিয়ে বাড়ির দিকে ফিরছে। চারপাশে শহরের ব্যস্ততম মানুষের চলাচল। প্রশস্ত রাস্তা। তবুও সাথীর মনে হতে থাকে সামনে সংকীর্ণ এক পথ। সে কোনো গহিন ঝোপঝাড়ের অরণ্যের সরু পথ ধরে হাঁটছে, যে পথে বহু বছর হাঁটেনি কেউ। যেন হিমশীতল বাতাসের ঝাপটা ছুঁয়ে গেল তাঁর মুখে। কত কী ভেসে উঠে স্মৃতিতে!
নাগরিকত্ব পাওয়ার পর সাথী তাঁর বাবা–মাকে এ দেশে বেড়াতে আনতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। ফারহান তখনই আনতে রাজি হল না। বলল, আরেকটু গুছিয়ে নেই, তারপর না হয় এনো। এরপর সাথী লজ্জায় আর কখনো ফারহানকে বলেনি তাঁর বাবা-মাকে এ দেশে আনার কথা। সে ছোট হতে চায়নি স্বামীর কাছে। চেয়েছে গুছিয়ে ওঠার পর ফারহান নিজে থেকেই বলুক। সেই গুছিয়ে ওঠা হয়েছে যদিও, কিন্তু তত দিনে সাথীর বাবা-মা ইহজগৎ ছেড়ে গেছেন। চলে গেছেন অচিন দেশের অচিন পাড়ে। কত নিঃসঙ্গ দুপুর অন্তরে অতৃপ্তি পুষে অশ্রুজলে বুক ভাসিয়েছে সাথী এই দূর প্রবাসে। শেষে বোন তিথিকে আনার জন্য আবেদন করার সময়েও ফারহানের উদাসীনতা ছিল অসীম। আজ নয় কাল, কাল নয় পরশু করে করে গড়িমসিতে তিনটা বছর কেটে যাওয়ার পর সাথী সত্যই বেঁকে বসে একদিন। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মতোই ক্ষোভের প্রকাশ ঘটায়। ফারহানের ওপর রাগ করে এক রাতে বাড়ি ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রা ছিল সেই দিন। রাতের নিউইয়র্কের রাস্তায় নিয়নের আধো অন্ধকারে এলোমেলো, উদভ্রান্তের ন্যায় হেঁটে বেড়িয়েছে সে। সেদিন ফারহান সম্ভবত ভীত হয়ে সাথীকে খুঁজতে গাড়ি নিয়ে বের হয়। শহরের রাতের মানুষেরা কেউ জানতেও পারেনি সে রাতে এক দম্পতির মাঝে বয়ে যাওয়া এমন উথালপাতাল ঝড়ের রেশ। প্রবল ঝড়ের পর লন্ডভন্ড শহর নির্মাণ যেমন সহজ কর্ম নয়, তেমনি সাথীকে ফিরিয়ে আনাও সহজ কর্ম ছিল না ফারহানের জন্য। পরদিনই আবেদন করবে, এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে তবেই বাড়ি ফিরিয়ে এনেছিল সাথীকে। শেষে বোন তিথিকে এ দেশে আনার জন্য আবেদন করা হয়। সেও এক যুগেরও বেশি সময় আগের কথা।

এই আলো ঝলমলে নগরীতে এসে তিথি হয়তো সন্তানদের নিরাপদ সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভেবে স্থায়ীভাবে বসবাস করবে। হয়তো কোনো দিনই জানতে পারবে না, বড়বোন সাথীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া সেই বিক্ষুব্ধ ঝড়ের রাতের কথা। জানতে পারবে না এই শহরে আনু খালা কিংবা বৃষ্টি ভাবির মতো আরও অনেকেই, যারা বাইরে থেকে ফারহানকে সহজ, সরল ভালোমানুষ বলে ধারণা করে। জানবে না রহস্যঘেরা মহাবিশ্বের কেউ, একজন অভিবাসী নারীর ভেতরের ক্ষোভ, যন্ত্রণা, কিংবা হতাশার সেই সব দিনের কথা।

৪২২জন ৪১৮জন
0 Shares

৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ