অস্তিত্বের অনুধাবন

অলিভার ২৯ জুলাই ২০১৮, রবিবার, ০৯:০০:০৬অপরাহ্ন অন্যান্য ১ মন্তব্য

 

একটি কলম আর আপনার মাঝে পার্থক্য কি? আরও ভালো করে বললে- আপনার মাঝে আর আপনাকে ঘিরে রাখা পরিবেশের যে কোন বস্তুর সাথে আপনার মৌলিক পার্থক্যটা কোথায়?

প্রশ্নটার উত্তর আপনি অনেক উপায়ে কিংবা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দিতে পারবেন। আর দশ জনকে প্রশ্ন করা হলে সম্ভাবনা রয়েছে যে উত্তরটারও দশ রকমেরই হবে। কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তরের যতই রকমফের হোক না কেন, উত্তরের মূলকথা সমসময় একটা বিষয়কে কেন্দ্র করেই হবে। আর সেটি হলো আপনার অস্তিত্ব।

হ্যাঁ, আপনার অস্তিত্ব। যেটা একদম খুব ভেতর থেকে আপনি অনুভব করতে পারেন। আর যার উপর ভিত্তি করেই আপনার ব্যক্তিত্ব, চিন্তাভাবনা, চলাফেরা, আচার-আচরণ তথা আপনার বাহ্যিক প্রকাশ ঘটে সেটি হলো আপনার অস্তিত্ব। আপনি আপনার অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন বলেই দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজ গুলো র্নিদ্বিধায় করে যেতে পারছেন।

কিন্তু কেউ যদি আপনার ভেতর থেকে আপনার অস্তিত্বটাকে আলাদা ফেলে, তখন?
তখন আপনি যে আপনাকে নিয়ে এত গর্ব আর দম্ভ করে চলাফেরা করেন তার অবস্থান আর একটি কলমের অবস্থান ঠিক একই স্থানে এসে পৌঁছবে। মূলত ঐ সময়টাতে আপনার দেহ কিংবা বলা চলে একটা ‘মৃতদেহ’ আর একটা জড় বস্তুর মাঝে বিশেষ কোন পার্থক্য থাকে না। দুটো বস্তুই অসাড়, ব্যবহার ছাড়া দুটো বস্তুই মূল্যহীন।

মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় যদি চিন্তা করা হয় তাহলে তাতে নানা ধরণের বিষয় উঠে আসবে। আর এইসব বিষয় গুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত আর বড় কারণটাই হবে ‘মৃত্যু’ বা মরণ। আর মানুষের এই মৃত্যু ভীতিকে আরও একটু বিশ্লেষণ করলেই বের হয়ে আসবে যে বিষয় সেটি হলো আমাদের মহামূল্যবান ঐ অস্তিত্ব।

তবে এতকিছুর পরেও মানুষ তার অস্তিত্বকে নিয়ে নানা ধরণের কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। কেউ কেউ নিজের অস্তিত্বকে দূরে ঠেলে ফেলার জন্যে নেশায় ডুবে গেছে আবার কেউ তার অস্তিত্বের তীক্ষ্ণতা বোঝার জন্যে নিজেকে মৃত্যুর কোলে সপে দিয়েছে। এ তো গেলো ব্যক্তি বিশেষের কথা, কিন্তু এর বাইরেও অস্তিত্বকে নিয়ে এক বিশাল জনগোষ্ঠি কাজ করেছে। তারা তাদের ধর্ম আর রীতিনীতিকে নিজ নিজ বিশ্বাসের সাথে জুড়ে দিয়ে নানা উপায়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। আর সে কারণেই কেউ কেউ নেশাকে ধরে নিয়েছে আত্মার দুষণ রূপে, আর কেউ নেশায় বুদ হয়েই আত্মার পরিশুদ্ধতা করার চেষ্টা করছে।

প্রতিটা নেশাজাত দ্রব্যই মানুষের অস্তিত্বটাকে নাড়া দেয় কিংবা কিছু সময়ের জন্যে তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। আর এতে করে নিজের বিশ্বাসটা লোপ পেয়ে যায়। আর ঐ সময়টাতে জাগতিক নিয়ম-কানুন আর তার কাছে কোন মূল্যবহন করে না। এ কারণেই অনেক বিপথগামী নেশায় বুদ হয়ে থাকে, কারণ সে যে অস্তিত্বের উপর নিজেগে গড়েছে তুলেছে তা নিজে মেনে নিতে পারে না, আর তা পারে না বলেই সেই অস্তিত্বকে সে নেশার মাধ্যমে ভুলে থাকবার চেষ্টা করে।

নিজের অস্তিত্বকে ক্ষণিক সময়ের জন্যে হারিয়ে ফেলবার তেমনই একটি দ্রব্য হলো ‘আইওয়াসকা’ (Ayahuasca)। সঙ্গত কারণেই এই দ্রব্যটি নিষিদ্ধ। এটি তৈরি হয় স্থানীয়ভাবে, কিন্তু সকল স্থানে এটি সহজপ্রাপ্য নয়।

এই দ্রব্যটি একজন মানুষের ভেতর তার যে অস্তিত্ব রয়েছে তাকে এমন ভাবে নাড়িয়ে দেয় যে সে নিজেকে একদম পারিপার্শিক সকল বিষয় থেকে আলাদা মনে করতে শুরু করে। নির্দিষ্ট পরিমানে এই দ্রব্য গ্রহণ করলে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এর কার্যকারিতা বহাল থাকে। এই সময়টাতে তার স্মৃতি দারুণ ত্বীক্ষ্ণ অবস্থায় থাকে। কিন্তু প্রতিটা বিষয় এতটাই এলোমেলো আর গতিসম্পন্ন থাকে যে তখন তাল মিলিয়ে চলাটা এক অসম্ভব কাজ বলেই মনে হয়। আর ঐ সময়টাতে নিজের বিশ্বাসের উপর অটল না থাকতে পারলে ভয়াবহ রকমের বিপত্তিও ঘটে যেতে পারে।

তবে মজার ব্যাপার হলো, যতক্ষণ দ্রব্যটি মানুষের শরীরে কিংবা তার রক্তে সচল থাকে, ততক্ষণ তার মস্তিস্কে তাকে চালিয়ে নেয়া অস্তিত্ব অনুধাবণের অংশটি বিকল হয়ে পড়ে থাকে। কিন্তু যখন দ্রব্যটির কার্যক্রম হ্রাস পেতে পেতে একদম বিলিন হয়ে যায় তখন মস্তিস্কের ঐ অংশটি নব-উদ্দ্যোমে একদম নতুনের মত করে নিজের অস্তিত্বকে অনুধাবন করতে পারে। দ্রব্যটি গ্রহণের পূর্বে তার এই অস্তিত্বের অবস্থানটি বিক্ষিপ্ত হলেও দ্রব্যটির আবেশ থেকে বের হয়ে আসলে অস্তিত্বের ঐ টুকরোগুলো কেন্দ্রীভুত অবস্থানে জমা পড়ে। ফলে নিজেকে এবং নিজের চিন্তাভাবনাকে আরও সুক্ষ্ণভাবে সে অনুভব করতে পারে। ব্যাপারটাকে লম্বা সময় ধরে চলতে থাকা একটি মোবাইল ফোনের সাথে তুলনা করা যায়, যেটি লম্বা সময় ধরে চলার কারণে কিছুটা ধীর গতি সম্পন্ন হয়ে আসে কিন্তু রিস্টার্ট করার পর পুনরায় একদম পুরোদমে নিজের কাজ শুরু করতে পারে।

তো আপনি, নিজের অস্তিত্বটাকে কতটুকু অনুভব করতে পারেন? নিজের অস্তিত্ব আর সেই অস্তিত্বকে ভর করে গড়ে উঠা আপন বিশ্বাসকে কিভাবে মূল্যায়ণ করেন? অন্ধকরে তলিয়ে যাবার আগে কিংবা বিষন্নতায় ডুবতে বসলে কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করে পুনরায় নিজের অস্তিত্বটাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেন?

তার থেকেও বড় প্রশ্ন- ‘আদৌ কি আপনি আপনার অস্তিত্বের এই কেন্দ্রীভূত শক্তি ব্যবহার করতে পারেন?’

 

 

 

 

৩৩০জন ৩২৮জন
0 Shares

একটি মন্তব্য

  • মৌনতা রিতু

    নিজের অস্তিত্ব ভুলে থাকতে খুব কম মানুষই চায়। আমি তো অন্তত চাই না। নতুন এমন কিছুর অভিজ্ঞতা নিতেও আমার প্রচন্ড ভয়। যা নিষিদ্ধ তা নিষিদ্ধই থাক।
    হুম, মানুষ মনে যা তাই সে কলমের খোঁচায় ফুটিয়ে তোলে অর্থাৎ মন থেকে কথা বা ভাবনা সব বের করে মুক্তি দিয়ে দেয়। কলমের সাথে মনের পার্থক্য প্রকাশ করার মধ্যে। তবু কি সব সেরকম প্রকাশ করা যায়!
    একটু আলাদা রকম পোষ্ট। ভালো থাকুন।

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য