মুখোশ

অলিভার ৪ জুন ২০১৭, রবিবার, ০১:০০:৪৯পূর্বাহ্ন গল্প ১৬ মন্তব্য

 

মাঝে মাঝে হারিয়ে যাবার প্রচণ্ড তৃষ্ণা পায় আমার। হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে পরিচিত এই ভুবন ছেড়ে। কিন্তু এটা নিছকই এক ছেলেমানুষি ইচ্ছা। যেখানে ভুবন বলতে আমার জানা শোনা রয়েছেই কেবল এই একটাই, সেখানে আর কোথায় গিয়ে হারাবো?

কিন্তু তবুও হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। সমাজবদ্ধ হয়ে ভদ্র মুখোশের ভিড়ে আমি যেন দিনকে দিন কেবল হাঁপিয়ে উঠছি। দৈনন্দিন জীবনে এখানে কারও বেঁচে থাকার ছোঁয়া দেখি না আর আমি। আমি শুধু দেখি একদল মানুষ কেবলই একটা ঘোরে পড়ে ছুটছে। মানুষের চামড়ার আড়ালে এরা যেন এক একটা চলমান যন্ত্র-মানব। যেন কলকব্জা গুলোর উপরে স্তর স্তরে চামড়া জুড়ে দিয়ে মানুষের রূপে নিজেকে টিকিয়ে রাখছে। এদের ছুটোছুটি দেখলে মনে হয় নিশ্বাসটাও যেন এরা নিজের জন্যে নেয় না। কেবল পচে গলে পিছু পড়ে যাবে বলেই ভয়ে ভয়ে নিশ্বাস টেনে চলেছে নিয়ম করে।

এদের খাবার আছে, সেই খাবারও নিয়ম করে গ্রোগ্রাসে গিলছে, কিন্তু এদের খিদে নেই। খাবারের স্বাদ এদের জিহ্বাকে স্পর্শ করে না। এদের মনে স্বাদকে উপভোগের সখ জাগে না, আহ্লাদ করে এরা দু’টুকরো রুটিও চিবায় না। এরা কেবল নিয়ম করে তিন বেলা খাবার গিলতে পারে। কেবল পরে সকাল, সন্ধ্যা আর রাতে মেকি আয়োজনে নিজের ভাগের খাবার সাবাড় করতে। আর পারে খাওয়া শেষে ফের নিজেকে ঘোরে টেনে নিয়ে ছুটতে।

তবে এদের জন্যে আমার আফসোস হয় না, দুঃখও হয় না। কেবল নিজের মনে বিষাদ জাগে। জীবনকে এরা কখনোই জীবনের মত করে দেখতে পারে না বলেই এই বিষাদ জাগে। সুশৃঙ্খল হতে গিয়ে এরা বিশৃঙ্খলার আনন্দ নিতে ভুলে গেছে বলে বিষাদ জাগে। ছন্দে চলার লোভে পড়ে ছন্দ পতনের বিরক্তি বোঝার ক্ষমতা হারিয়েছে বলে আমার বিষাদ জাগে। আমার বিষাদ লাগে, কারণ এরা উড়তে চায়, কিন্তু বাসাতকে স্পর্শ করতে চায় না বলে। বিষাদ লাগে, কারণ এরা সাতরে যায়, কিন্তু নিজেকে পানিতে ছোঁয়ায় না বলে। প্রকৃতির মাঝে কৃত্রিমতা যেন এদের গ্রাস করে নিয়েছে।

কোন একদিন হুট করে যদি এদের মোহের অবসান ঘটে, তবে আমি নিশ্চিত এরা নিজ নিজ বিছানা ছাড়বার আগেই আত্মহত্যার পথ খুঁজবে। মায়ামরা এই প্রকৃতি দেখে নিজেরাই ডুকরে কাঁদবে। সু-শৃঙ্খল জীবনে বাঁচতে গিয়ে এরা যে শৃঙ্খলে বন্দী দাশ ছিল তা অনুধাবন করে এরা নিজেদের আফসোসের আগুনে পুড়িয়ে মারবে।

এরা কখনো সূর্যোদয় দেখে না, এরা শুধু দিনের শুরু হতে দেখে। এরা কখনো সূর্যাস্তের কোমলতাও অনুভব করে না, এরা কেবলই দিনের সমাপ্তি দেখে। এরা সন্ধ্যার মায়ায় নিজেকে নিমজ্জিত করতে জানে না, রাতের নিস্তব্ধতার ছন্দ শুনতে পারে না। এরা জাগে না, এরা ঘুমায় না। এরা কেবলই ছোটে, শুধু ছুটেই চলে।

আর এসব দেখেই আমার হারিয়ে যাবার তৃষ্ণা বাড়ে। বাড়তে বাড়তে একদম অতিষ্ঠ করে তোলে। ছটফট করে, চিৎকার করে, ভাংচুর করে সেই তৃষ্ণা মেটাতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে ইকারাসের মত ডানা ছড়িয়ে দিগন্তের এই প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্ত পর্যন্ত দাপিয়ে বেড়াতে।

কিন্তু এসবের কিছুই আমার করা হয় না। আফসোসকে আবারও চেপে রেখে আমি সামনে এগিয়ে যাই। চুপিসারে আমিও আমার মিথ্যে মুখোশটা পড়ে নেই। সেই মুখোশের চোখ দিয়ে আমিও এক অদৃশ্য মোহের দেখা পাই। এটাই সেই মোহ, যা সবাইকে এই একঘেয়ে যান্ত্রিক গতিতে চালিয়ে নিচ্ছে। আর এভাবেই আমার আর হারিয়ে যাবার তৃষ্ণাটা মেটানো হয় না। অতৃপ্ত তৃষ্ণাকে মিথ্যে মুখোশে মুড়িয়ে আমিও বাকি সবার মত ছুটে চলি। ছুটে চলি এক মিথ্যে আশ্বাসের গন্তব্যে…

 

 

 

 

 

১৫৭৮জন ১৫৬৭জন
0 Shares

১৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ