গল্প-কথা

সাবিনা ইয়াসমিন ৩ জুন ২০১৯, সোমবার, ০৬:৩৪:৩২পূর্বাহ্ন গল্প ৩৪ মন্তব্য

–  মা একটা গল্প বলো,

–  কিসের গল্প শুনবে ? ভুতের ?

– না, রাতে ভুতের গল্প শুনলে ভয় পাবো। অন্য গল্প বলো।

– একদেশে দুই ভাই ছিলো। ছোটবেলা থেকেই তারা আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখতো। ওরা নিজের খেলনা, সাইকেল, আর দরকারি জিনিসপত্র গুলো নিজেরাই বানিয়ে নিতো। ধিরে ধিরে তারা যত বড়ো হয়ে উঠতে লাগলো, আকাশে ওড়ার ইচ্ছেটাও প্রবল হয়ে উঠছিলো। তারপর ওরা ঠিক করলো….

– ওরা দুইভাই এ্যারোপ্লেন আবিষ্কার করেছিলো। এই গল্পতো আমি জানি। অন্যটা বলো।

– এটা আগে বলেছি ! আচ্ছা শোনো, একদেশে ছিলো এক চিত্রশিল্পী। সে ছবি আঁকতে খুব পছন্দ করতো। ছোটবেলায় সে খুব অদ্ভুদ অদ্ভুদ কাজ করতো। একবার সে এক টুকরো কাঠ দিয়ে…

– কাঠ দিয়ে একটা বড় টিকটিকি বানিয়ে দেয়ালে আটকে রেখেছিলো। ওটাকে সবাই জীবন্ত মনে করে ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। আর ঐ চিত্রশিল্পীর নাম ছিলো লিউনার্দো ভিঞ্চি। যারা ছবি আঁকে তাদের চিত্রশিল্পী বলে। আম্মু, তুমি এই গল্পটাও অনেকবার বলেছো।

– কি বিপদ ! তাহলে তুমিই বলো, কিসের গল্প বলবো।

– রাজা রানী আর পরীদের গল্প বলো।

– হু বলছি, একদেশে এক রাজা ছিলো আর অন্যদেশে এক রানী। রাজা ছিলো খুব গরীব। তার ভালো জামা-কাপড় ছিলোনা। হাতি-ঘোড়া, বাড়ি-ঘর, এমনকি বসার চেয়ার টেবিলও ছিলোনা। তাই রাজা একদিন মনের দু্ঃখে জঙ্গলে চলে গেলো।

– রাজা এতো গরীব ? তাহলেতো সে ঠিকমতো খেতেও পায়না। ( চোখের পানি মুছতে মুছতে মেয়ের জবাব )

– আরে ধুর ! বোকা মেয়ে, গল্প শুনেই কাঁদতে হয়না। সেখানে অনেক পরীরা থাকতো। তারাতো রাজাকে পেয়ে খুব খুশি। জঙ্গলে গিয়ে রানীর সাথে রাজার দেখা হলো। রাজা রানী ঠিক করলো তারা ঐ জঙ্গলেই থাকবে। ওই কথা শুনে বনের পশুরা একটু বিরক্ত হলো।

– কেন ? তারা কি রাজাকে পছন্দ করতো না ?

– কিছু কিছু পশু করতো না। যেমন, বাঘ। বাঘ যখন হরিণের মা্ংস খাওয়ার জন্যে হরিণকে মারতে চাইতো ,তখন রাজা বাধা দিতো। আবার কিছু শকুন ছিলো। ওদের অন্য পাখিরা ভয় পেতো। রাজা ওদের বন থেকে তাড়িয়ে দিয়ে দূর পাহাড়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলো।

– শকুন কি পাখি না ?

– শকুন একটি পাখি। সব পাখি ভালো হয়না। তুমি টিভিতে দেখেছো ? হাঙর দেখতে একদম মাছের মতো, তারপরেও কতো হিংস্র। শকুন তেমনই এক পাখি।

– হুম, আম্মু গল্প শুনবো না। একটা গান শোনাও। আমি তোমার গান শুনতে শুনতে ঘুমাবো। পরীর গান গেয়ে শোনাও।

– আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী

সাথী মোদের ফুলপরী,

ফুলপরী লালপরী, লালপরী নীলপরী

সবার সাথে ভাব করি ,সবার সাথে ভাব করি…..

মেয়ে ঘুমিয়ে গেছে সেহেরী খাওয়ার পর। গল্প-গান শুনে। আমার ঘুম পাচ্ছে না। আটচল্লিশ ঘন্টা ধরে জ্বরের সাথে ভাব বিনিময় করছি। একবার আমি জ্বরকে পরাজিত করছি, পরেরবার জ্বর দ্বিগুন শক্তিতে আমায় পরাস্ত করছে। ওষুধ খাওয়ার পর ঘন্টা পার হতে দেরি হয়, জ্বরের আগমনে বিলম্ব হয়না। জ্বরের ঘোরে ডুবে যাওয়ার আগে একটা গল্প বলি….

একদেশে ছিলো এক রাজা। আরেক দেশে ছিলো এক রানী। তাদের কোনো অভাব অনটন ছিলোনা। তারা তাদের রাজ্যে নিজেদের মতো করেই সুখে শান্তিতে বাস করতেন। তাদের মধ্যে একটা অদ্ভুদ মিল ছিলো। তারা দুজনেই হঠাৎ হঠাৎ অকারনে অন্যমনষ্ক হয়ে পড়তেন। তখন নিজেদের সবকিছু ত্যাগ করে ঘুরে বেড়াতেন রাজপথে, পথে-প্রান্তরে।

একদিন দৈবযোগে তাদের দেখা হয়ে গেলো। প্রচন্ড গরমে অস্থির রাজপথের এক উত্তপ্ত রৌদময় দিনে। কে কার সামনে গিয়ে দাড়িয়েছে তা কেউ খেয়াল করেনি। একজোড়া মানুষের দু-জোড়া চোখের মিলন এক অলৌকিক গল্পের সূচনা করেছিলো সেদিন। কি ছিলো সেই চোখে !

অনেক সুন্দর কিছু দেখলে সবাই মাশাহ্আল্লাহ বলে উঠে। কিন্তু অলৌকিক সৌন্দর্য যদি সামনে এসে দাঁড়ায় তখন ? এক পলক দেখার পর রানীর দৃষ্টি নিবন্ধিত হয়েছিলো মাটির দিকে। অফুষ্ট স্বরে বলা শব্দ মালায় কেবল সৃষ্টিকর্তাকে ডেকে বলেছিলো, সুবহান আল্লাহ্ ! মানুষ এতো সুন্দর হয়  !!

জ্বরের প্রকোপ বাড়ছে,,,সাথে মাথার ভিতর তিব্র যন্ত্রনা। ঘুম আসছেনা। অথচ সব কিছু ঘোলা আর ঝাপসা হয়ে পড়ছে। মাথায় পানি ঢালবো ? না শাওয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে থাকবো ? একটা গান মনে পড়ছে….

মন একবার ভালোবাসে যারে

তার কথা আর কেউ জানার আগে,

মনের কথা মন বলতে পারে…

গানটা কি ঠিকমত গাইতে পারছি ? নিজের গলার আওয়াজ নিজেই শুনতে পাচ্ছি না কেন !!

– সমাপ্ত –

 

৫৮৩জন ৩১২জন
48 Shares

৩৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য