মূল লেখায় যান

প্রবীণ পরিচর্যার প্রচলিত প্রথা এবং তা পরিবর্তনের ভাবনা

নার্গিস রশিদএকান্ত অনুভূতি২০টি মন্তব্য

জন্মের পর আমাদের জীবন চলার পথ আরম্ভ হয় । প্রথমে শৈশব ক্রমান্বয়ে কৈশোর , যৌবন , মধ্য বয়স তারপর সর্ব শেষ বার্ধক্য । বাচ্চাদের সামনে বিরাট ভবিষ্যৎ থাকে আর তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা অনেক আশা করতে থাকি । কিন্তু বার্ধক্য যখন চলে আসে আর কিছু তাদের কাছ থেকে আশা করার থাকেনা ।

বৃদ্ধরা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে চিরাচরিত ভাবে উত্তর না পাওয়া সেই একই প্রশ্নের সম্মুখীন হয় আর তা হল “ জীবন মানে কি ?”

বেশীর ভাগ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, পাক-ভারত উপমহাদেশে, চায়না এবং আফ্রিকার দেশ গুলতে এই ধারনাই প্রচলিত যে বুড়ো হলে সন্তান রাই তাদের বুড়ো বাবা মা দের দেখা শুনা করার দায়িত্ব নেবে ।

কিন্তু বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক সময় এটা আর হয়ে উঠেনা । দেখার ইচ্ছা থাকলেও হয় না । তার পেছনে অনেক বাস্তব কারন আছে।
প্রধান কারন হল আগে নারী দের কাজ ছিল বাড়ীর ভিতরে । যেমন রান্নাবান্না ,বাচ্চা জন্ম দান আর তাদের দেখাশুনা এবং বয়স্ক দের দেখভাল করা ।

তা ছারা চাকুরীর ব্যাপারে সন্তান দূরে থাকে বা বিদেশে থাকে । অনেক গরীব পরিবারের পক্ষে টাকার অভাবে ভালো যত্ন দিতে পারেনা ।
তা ছাড়া প্রায় পত্রিকা তে দেখা যায় বয়স্ক দের প্রতি অবহেলার খবর ।

যেহেতু মেয়েরা এখন সংসারের ইনকাম এর জন্য অর্থনৈতিক দিকটার দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে ,নিতে বাধ্য হয় বা নিতে বলা হয় সরকার থেকে বা পরিবার থেকে , তখন তাদের জন্য দুই দিক সামলানো কঠিন হোয়ে পড়ে ।
অনেক সময় বেশ কিছু শারীরিক জটিলতা থাকে বয়স্ক দের যা কিনা করার জন্য স্কিল নার্স দরকার । যা বাড়ীর সদ্যসদ্যের দ্বারা সম্ভব নয় ।

অনেকের ধারনা ওয়েস্টার্ন দেশ গুলো মাবাবা কে বুড়ো বয়েসে দেখেনা । অভিজ্ঞতা থেকে বলছি নার্সিং হোম গুলো এত ভালো সেবা দেয় বয়স্ক দের সেই জন্য তাঁরা সেখানেই থাকতে পছন্দ করেন । স্বাধীনতা আর সন্মানের সাথে থাকা টা তো আছেই । তা ছাড়া সেই একই সমস্যা সন্তান দের ব্যাসতো জীবন । ইচ্ছা থাকলেও সময় থাকে না । সব কিছুই সেই লজিকের কথা “ কার্জ কারন সম্পর্ক যুক্ত” ।
এই সমস্ত দেশ গুলোতে দেখা যায় আরও কিছু সুন্দর ব্যাবস্থা প্রবীণ দের জন্য । যেমন যারা বাড়ীতেই থাকতে চান কিন্তু কিছু সময়ের জন্য কত গুলো যায়গা থাকে যেখানে সকলে তাঁরা একসাথে বসেন , গল্পগুজব করেন তার সাথে খাওয়া দাওয়ার বাবস্থা থাকে । থাকে বেড়ানর ব্যাবস্থা । হালকা ব্যায়ামের ব্যবস্থা ।
প্রবীণ দের জন্য থাকে হোম ডেলিভারি খাবার সরবরাহর ব্যাবস্থা ।

তা ছাড়া তো আছেই নানা রকম যন্ত্র পাতি যা তাদের চলাচলের ব্যাপারটাকে সহজ কোরে দায়। যেমন recliner chair, হুইল চেয়ার , mobility equipment। রাস্তাতে চলাচল ,বাসে, ট্রেনে আর এম্বুলেন্সে সহজে চলাচল আর উঠা নামার সুন্দর বাবস্থা ।

সব চেয়ে ভালো বাবস্থা একটা যা কিনা মৃত্যু যন্ত্রণা কে সহজ করতে সাহায্য করে ।যাকে বলে Palliative care. মৃত্যু আসবেই এবং সেটাকে মেনে নিতেই হবে । জীবনের শেষ সময় টিতে দরকার হাতেনাতে সাহায্য আর emosonal সাহায্য। উন্নত দেশ গুলোর হাসপাতাল গুলোতে তার সুন্দর ব্যাবস্থা আছে । যাকে বলা হয় যন্ত্রণা হীন মৃত্যু ।

আমাদের দেশে আছে নানা রকম সীমাবদ্ধতা । এখনো আমরা উন্নত দেশের সাথে তুলনা করতে পারবনা । যেহেতু আমরা উন্নত দেশের দিকে যাচ্ছি তাই আমরাকেও এসব নিয়ে ভাবতে হবে ।

চায়না , জাপান এ একই ব্যাপার । বাড়ীতেই যতদিন পারা যায় থাকে । বেগতিক হলে নার্সিং হোমে যায় । সেদিনই এই দেশ দুটোতে আমাদের দেশের মতোই নিয়ম প্রচলন ছিল । সন্তান দেখবে বাবামাকে । কিন্তু ঐ একই ব্যাপার ছেলেমেয়ে কাজে নিয়ে দূরে থাকে বাবামাকে দেখভাল এর সময় দিতে পারেনা । বাবামাকে ভালবাসে না বা তাদের দায়িত্ব নিতে চায় না তা কিন্তু না ।

এমন একটা সময় আসে যখন কিনা ২৪ ঘণ্টা দেখভালের দরকার হয় । ডাক্তার এর দরকার হতে পারে যখন তখন ।
প্রয়োজন হতে পারে নিয়মিত থেরাপিসট ।
এই সব কাজ সামলানোর জন্য শ্রম ভাগাভাগির দরকার । একলা কেউ সামলাতে পারবেনা ।

এখন সময় এসছে ভাবনা চিন্তা বদলানোর । আগর চিন্তা নিয়ে বসে থাকলে চলবেন । বুড়ো বয়স টা সবার আসবে । বুড়ো বয়স তা সন্মানের মধ্যে পাড়ি দেয়া দরকার । আমদের দরকার সবকিছুর সুবিধা সম্পন্ন ভাল নার্সিং হোম এর বাবস্থা । যেখানে থাকলে সন্তানও স্বস্তিতে থাকতে পারবে আর বয়স্করাও ভালো দেখভালের মধ্যে থাকবে ।

তার জন্য দরকার টাকা পয়সা । তা দেয়ার বা যোগাড়ের বাবস্থা আমরা কেই করতে হবে । যদি প্রথম থেকে উপার্জন করার পর থেকেই তা থেকে ইন্সুএরেন্স এর ম্যাধধমে বা ট্যাক্স প্রদানের মাধ্বমে এর ব্যাবস্থা করা যায় ,তবে তার সমাধান করা যায় ।

সরকারের সমাজ কল্যাণ দফতর কে এ ব্যাপারে এগিয়ে আস্তে হবে।আমরাকেও পুরানো ভাবনা থেকে বেরিয়ে আস্তে হবে ।
যেমন ভাবে বাচ্চা দের দেখাশুনা করার জন্য নার্সারি এবং সবার চিকিৎসার জন্য হেলথ সেন্টার থাকে তেমন ভাবেই বয়স্ক দের দেখা শুনার জন্য নার্সিং হোমের প্রয়োজন এখন সময়ের দাবী ।

বেসরকারি ভাবেও নার্সিং হোম খোলার বাবস্থা করা যেতে পারে । যা কিনা থাইল্যান্ড আরম্ভ করেছে । পশ্চিমের উন্নত দেশ গুলো এই দেশের নার্সিং হোমে গিয়ে বুড়ো বয়সে থাকে ,কারন ভালো ভাবে দেখাশুনার করার জন্য নাম আছে থাইল্যান্ড এর মানুষ দের । থাইল্যান্ড যেমন হলিডে করার জন্য একটা সুন্দর গন্তব্য স্থান , ঠিক এই দেশ টা নার্সিং হোম করেও সুনাম অর্জন করেছে ।

থাইল্যান্ড ,ভারত মানব সেবা বিষয় টিকে ব্যাবসাতে পরিণত করেছে । চিকিৎসা করা তার সঙ্গে হলিডে, এ ব্যাবসা যেমন চলছে তেমন নার্সিং হোমের ব্যাবসা টাও ভালো । আমাদের দেশের মানুষ এটা ভেবে দেখতে পারে ।

আমাদের দেশের মানুষ সম্পত্তি করে ছেলে মেয়েদের জন্য রেখে যায়। এই প্রথা তেমন প্রচলন নায় পশ্চাৎত্ব দেশে ।সন্তান রা নিজেদের সম্পত্তি নিজেরাই কোরে নায় । নার্সিং হোমের খরচ দরকার মতো সেই বাড়ী দ্বারা চালানো হয় অনেক সময় ।
এই ব্যাবস্থা আমাদের দেশে করা যায় কিনা দেখা যেতে পারে ।

ধনী দেশ গুলোতে দরিদ্র প্রবীণরা নার্সিং হোম বিনাপয়সাতে থাকতে পায় । তা ছাড়া প্রবীণ হোলেই যে কেউ ফ্রি মেডিসিন ,ফ্রি বাস আর ট্রেন পাস পায়, পায় শীতের সময় ঘর গরম করা এলাউন্স । আমাদের দেশেও এই সুযোগ দেয়া এখন সময়ের দাবী ।

বয়স্ক দেরও অধিকার আছে সন্মানের সাথে শেষ দিন গুলো গুজরান করা । এটা তাঁদের প্রতি হবে মানবিক সুবিচার । সরকার ,সমাজ পরিবার সবার এ দিকটাতে নজর দিতে হবে ।

মোট পড়েছেনঃ ১৭৪৩জনআজ পড়েছেনঃ ০জন

২০টি মন্তব্য

  1. হ্যাঁ সবার নজর দেয়া উচিত। পরিবার আগে এগিয়ে থাকবে। আমরা মেয়েরা ভাবি আমাদের দায়িত্ব নয়; আর ছেলেরা বউদের কারনে এডিয়ে চল। সরকার যদি সুনজর দেয় ভাতার ব্যবস্হা করে তাহলেও অনেকখানি এগিয়ে যাবে।
    সুন্দর পোষ্ট। শুভ কামনা রইল।

  2. একদম ঠিক বলেছেন। মান্ধাতার আমলের ধ্যান-ধারণা নিয়ে বসে থাকলে নিজেদেরই ক্ষতি। সবকিছু বদলেছে, নারী বাইরে চলে এসেছে, পুরুষের সাথে পাল্লা দিয়ে কাজ করছে তাহলে বৃদ্ধ বাবা-মা নিয়ে কেন এভাবে বোঝা বানাবো?? বয়স্কদের নিয়ে ভাববার সময় এসেছে, সরকার এসবের জন্য অনেক ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে, বেসরকারি ভাবেও এগিয়ে আসতে হবে। অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। সোনেলায় সুস্বাগতম। নিয়মিত লিখুন আর অন্যদের লেখাও পড়ুন, সুচিন্তিত মন্তব্য দিয়ে পাশেই থাকুন। শুভ রাত্রি

  3. সময় উপযোগি এবং মানবিক পোস্ট। সরকারের উচিত এ ব্যাপারে ভাবা। তাহলে বয়স্কদেরও দুশ্চিন্তা থাকবেনা।
    এমন পোস্ট দিয়ে সোনেলার সাথে থাকবেন। এমন আশা করছি।
    শুভ কামবা

  4. আপনার লেখা টি পড়লাম আর মনে মনে আফসোস করলাম, যদি সত্যিই এমন ব্যবস্থা করা যেত তাহলে হয়তো কোন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা পিতামাতার লাস রাস্তা ঘাটে বেওয়ারিশ হয়ে পড়ে থাকতো না। অথবা কোন বৃদ্ধ মাকে গোয়াল ঘরে ঘুমুতে গিয়ে শেয়ালের কামড় খাওয়া লাগতো না। আমরা অনেক কিছু নিয়েই ভাবতে পছন্দ করি, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। আগে আমাদের পিতামাতার গুরুত্ব বুঝতে হবে, বয়স্ক মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষা নিতে হবে। তবেই আমাদের দেশে আগামীতে এত সুন্দর সব ব্যবস্থার সম্ভাবনা থাকবে।

    সোনেলা ব্লগ পরিবারে আপনাকে স্বাগতম। আপনার মুল্যবান লেখা আরও পড়ার ইচ্চে পোষণ করছি। নিয়মিত লিখুন। ভালো থাকুন। শুভ কামনা 🌹🌹

  5. সোনেলায় স্বাগতম আপনাকে।
    সবার মন্তব্যের নীচেই দেখুন ‘ জবাব ‘ লেখা আছে। জবাব এ ক্লিক করে মন্তব্যের জবাব দিন। তাহলে মন্তব্যকারী নোটিফিকেশন পাবেন যে আপনি তার মন্তব্যের জবাব দিয়েছেন।

    আমার এই মন্তব্যের নীচেই দেখুন ‘ জবাব ‘। জবাব এ ক্লিক করে উত্তর দিন।
    শুভ কামনা, শুভ ব্লগিং।

      1. সবার মন্তব্যের ঘরেই ‘জবাব’ অপশন আছে । জবাবে ক্লিক করে মন্তব্য লিখে ‘মন্তব্য প্রকাশ করুন’ ঘরে ক্লিক করুন। তাহলেই সবার মন্তব্যে আলাদা আলাদা করে জবাব দিতে পারবেন। অফুরন্ত ধন্যবাদ ও শুভকামনা। শুভ ব্লগিং

  6. স্বাগতম আপনাকে সোনেলার উঠোনে।
    নিয়মিত লিখুন, অন্যদের লেখা পড়ে তাদের মন্তব্যের মাধ্যেমে উৎসাহ দিন।

    খুব ভালো একটি বিষয় নিয়ে লিখেছেন। এমন লেখার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে।
    আপনার প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতালব্দ লেখায় সোনেলা সমৃদ্ধ হবে এই আশাবাদ ব্যক্ত করছি।
    শুভ কামনা,
    শুভ ব্লগিং।

  7. সোনেলার উঠোনে স্বাগতম। প্রথমেই অনবদ্য একটি লেখা দিয়ে যাত্রা শুরু করলেন দেখে প্রীত হলাম। আসলেও তাই, যদি সত্যি এমন হতো যে বৃদ্ধ বয়সেও আমাদের আর ভোগান্তি হতোনা সে অসুস্থ কিংবা মৃত্যু যাই হোক কতইনা ভালো হতো!

    বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই, সবকিছু মেনে নিয়েই জীবন পরিচালনা করতে হয়। মানুষ হিসেবে আমাদের মনুষ্যত্ববোধ সদা জাগ্রত থাকুক এটাই কাম্য।

    শুভকামনা আপনার জন্যেও।

  8. এমন যুগোপযোগী লেখা পড়তে পেরে ধন্য হলাম।
    আপনি খুব সুন্দর প্রস্তাবনা রেখেছেন, আপনার সাথে সহমত পোষণ করছি। সকলের মনোভাব পরিবর্তন প্রয়োজন সেই সাথে ব্যবস্থাপনা।
    সুদিনের হাতছানি দিচ্ছে লেখাটি।
    ধন্যবাদ আপা

মন্তব্য করতে লগিন করুন অথবা নিবন্ধন করুন।