দুর্গাপূজা আমি যেভাবে দেখেছি…
দুর্গাপূজা আমি যেভাবে দেখেছি…(১)
“দুর্গাপূজা মানে
বছর ব্যাপিয়া প্রতীক্ষা,
দুর্গাপূজা মানে
উদযাপনের তীব্র আকাঙ্খা।
দুর্গাপূজা মানে
যেন নব চাহিদার জন্ম,
দুর্গাপূজা মানে,
শত নির্ঘুম রাতের স্বপ্ন।
দুর্গাপূজা মানে
দামাল ছেলের উড়ুউড়ু মন,
দুর্গাপূজা মানে
নারীর হাতের উচ্ছল কাঁকন।
দুর্গাপূজা মানে
শতভক্তের আনন্দঘন আনাঘোনা,
‘দুর্গাপূজা শেষ’ মানে
পুনরায় প্রহর গোনার সূচনা।”
কবিতাটি আমার প্রথম কোথাও প্রকাশিত কবিতা। ভাবতে ভাল লাগছে যে, এ কবিতাটি যখন লিখি তখন আমি ক্লাস টেন এ; অথচ ভক্তিতে গদগদ হয়ে অযৌক্তিক কিছু বলিনি। অথচ নাস্তিক হয়েছি আরো অনেক পড়ে। কবিতাটির কবিতা হয়ে উঠা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে, কিন্তু এটা আরো একটা কারণে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ- আমার দূরসম্পর্কের এক মামা কবিতাটির জন্য আমাকে ২০ টাকা দিয়েছিলেন। আমার সে কী আনন্দ আর গর্ব! সবচেয়ে বড় ঘটনাটা দুর্গাপূজার সময়কারই। তাই এই মুহূর্তে আমি স্মৃতিকাতর। তখনকার পটকা আর ঢাকের আওয়াজ পাচ্ছি, নাকে পাচ্ছি বারুদ আর নতুন কাপড়ের গন্ধ। এখনো মনে হচ্ছে এই শহর থেকে কোন আত্মীয় আসল বলে, তারপর ব্যাগ খুলে আমার জন্য আনা নতুন পোশাক বের করে দিবে, আমি খুশীতে নাচতে নাচতে বাড়ী আসব। মাকে দেখালে মা একগাল হেসে বলত, “আমার বাবাকে (আমি) সবাই ভালবাসে। আমার ছেলেকে কে আদর করে না!”
আমাদের কালী বাড়ীতে পূজা হত। আরতীর সময়ে বিশেষ করে সন্ধ্যায় মন্ডপে বাঁশের কঞ্চি নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতাম কখন বড় দাদারা ক্লান্ত হবেন, আমি একটু ঢাক বাজাব! দশমীর দিনে এসে হাতে ফোস্কার উপর কাপড় বেঁধে বাজানোর জন্য জেদ ধরতাম।মনে পড়ছে কোন মন্ডপের মুর্তি কেমন হল, কোন মন্ডপে কয়টা অসুর, অতিরিক্ত কয়টা বানর বানিয়েছে সে হিসাব রাখতাম মুখে মুখে। আমি কিন্তু আগ বাড়িয়ে মুর্তি দেখতে যেতাম না,পরে মজা পাব না বলে। মনে পড়ে বন্ধুদের কারো পোশাক আমার চেয়ে সুন্দর হলে কষ্ট পেতাম। খুশি হতাম আমার পোশাক অন্য কারো তুলনায় সুন্দর দেখতে হলে। তখনও আমার মনে দামের ব্যাপারটা আসেনি, মাপকাঠি ছিল শুধু সৌন্দর্য। কতগুলো বিশেষ গান আর ধর্মীয় ক্যাসেট মাইকে বাজত- এখন মনে মনে বাজে। গ্রামে ইলেক্ট্রিসিটি আসেনি তখনো, অথচ লাইটের আলোয় উজ্জ্বল হত মন্ডপের ভিতর বাহির। সন্ধ্যার সময় মানুষের ঢল কাকে বলে বুঝতাম। ওরে আনন্দ। মজা, মুর্তি আর মেয়ে দেখতে পূজা মন্ডপে আসত মুস্লিমরাও। আমাদের সবার গায়ে নতুন পোশাক, তাদেরটা মলিন। করুণা হত তাদের জন্য। সান্ত্বনা দিতাম মনকে এই বলে যে তারাতো ঈদের সময় সাজে,পড়ে। আর রাগে গা জ্বলত যখন পরে তারা দুর্গা, লহ্মী আর সরস্বতীর শরীর আর সাজসজ্জা নিয়ে বাজে মন্তব্য করত।
নবমীর রাত্রে ঘুরাঘুরি শেষে বাড়ী ফিরতাম, তখন আর আনন্দ নয়, বিষাদ ভর করত মনে -কালই যে দশমী! সব শেষ হবে! তারপরদিন সকাল থেকে সবাইকে দু:খী মনে হত আমার- আমার মতই। এবং এক সময় বিসর্জনও সমাপ্ত হত। আমি মনে মনে, সত্যি বলছি, কত কাঁদতাম!
আমি দুর্গাপূজা যেমন দেখেছি.. (২)
দশমীর দিনে আমাদের গ্রামে একটা রীতি আছে ভালমন্দ কিছু রান্না করার। যাদের সামর্থ আছে তারা মুরগী আনে বাজার থেকে হাতে ঝুলিয়ে, বুক-সিনা ফুলিয়ে। আর যাদের ঘরে মুরগী পালন করা হয় তারা ঘরের মুরগীই কেটে দেয়। যাদের পুকুর আছে তারা জাল ফেলে মাছ ধরে, মাছ দিয়ে আয়োজন সারে। এসব আয়োজন করতে করতেই তারা আসলে প্রস্তুতি নেয় বিসর্জনের বিষাদকে মেনে নেওয়ার জন্য। খাওয়া দিয়েই যেন ভুলে থাকতে চায় চারদিনের এই মিলন মেলার সমাপ্তির বেদনাকে। তারপরও কি সম্ভব হয় ভুলে থাকা, পাষাণ হওয়া?
দুপুরের পর থেকে কালী মন্দিরে কিছু কিছু মানুষ জমতে শুরু করে। তারা প্রতিমাকে স্টেজ থেকে নামিয়ে রাখে। আর পুকুরে বিসর্জনের আগে পুকুর প্রদক্ষিনের জন্য বাঁশ আর তেলের ড্রাম দিয়ে বিশেষ ধরণের ভেলা বানায় মুরুব্বীরা।
এদিকে নবমীর মধ্যরাতেই মোটামুটিভাবে মন্দিরপ্রাঙ্গন জনমানবশুন্য হয়ে পড়ত। এমনকি অস্থায়ী দোকানগুলো, আমাদের পাড়ার এই দুর্গাপূজার যেটা একদম অদ্বিতীয় বৈশিষ্ঠ্য, ওগুলো পর্যন্ত গুটিয়ে নেওয়া হত। এসব দোকান আসলেই অনেক মজার ছিল। চারদিনের জন্য এসব দোকানের মালিক আসলে বালক বা যুবকরাই। আর এসব প্রধান আকর্ষন হল ছোলা। ছোলা বাদে আরো পাওয়া যায় মোমবাতী, আগরবাতী, লজেন্স, সন্দেস, পটকা, আতসবাজি ইত্যাদি। আরো একটা জিনিস পাওয়া যেত,যেটার কথা না বললেই নয়, সেটা হল বেলুন। বয়স হওয়ার পর বেলুনগুলোকে আমি আবিস্কার করলাম ‘কনডম’ নামে! আর ওগুলোকে আমরা ডাকতাম ‘ফতানা’ নামে। তবে এত দামী কমদামী জিনিস ফেলে আমরা কেন যে এক প্লেট ছোলা খেতে মুখিয়ে থাকতাম, তাও কেবল এই দুর্গাপূজার দিনগুলিতে, আমি আজো নির্ণয় করতে পারিনি। ও হ্যাঁ, ঐসব বেলুনের কী কাজ সে ব্যাপারে একটু পরেই আসছি।
পঞ্চমীর দিন এক মা তার ছেলের কাছ থেকে পত্র পেয়ে অভিমানে, দু:খে আর পূজা মন্ডপে যায়নি। ছেলে শহরে কী একটা বেসরকারী চাকরী করত। চিঠিটাতে লিখা ছিল:
“আসবো না মাগো পূজায় বাড়ি,
বেসরকারীতে চাকরীতে নেই ছুটি,
বোনাস পাবোনা একটা টাকার নোটও।
মুরগী জোড়া বেচে দাও মা,
কবুতর জোড়া তা-ও,
খুকুর জন্য জামাখানি মা,
কোনমতে কিনে নাও।
বাবার জন্য পাঞ্জাবী ধুতি,
তোমার জন্য শাড়ী,
বেতন পেলেই কিনে নেব মা,
শীঘ্রই পাঠাব বাড়ী।
দুইশত টাকা ডাকে পাঠালাম,
বিশ টাকা দিও চাঁদা,
রাগ করোনা, লক্ষ্মীটি মা,
চাকরীতে যে আমি বাঁধা।”
বিকালের দিকে গ্রামের সব বয়সের সকল মানুষ জমায়েত হতে শুরু করে কালীবাড়ী সংলগ্ন বিশাল পুকুরটার চারপাশে। সেই জমায়েত এ ঐ অভিমানী মাকেও দেখা যেত পুকুরের কোন একটা পাড়ে, পাশে বসা কবিতার সেই খুকুসহ।
। পুকুরের উত্তর পাড়ে চেয়ার টেবিল নিয়ে গ্রামের শিক্ষিত, গুনী আর মুরুব্বিদের আসর বসত। ছোটবেলায় আমার কাছে ঐসব ব্যক্তিদের বিশেষ কিছু মনে হত। ইচ্ছা হত আমিও একদিন তাদের মত ঐ আসরে বসব, মাইকে ভদ্রভাষায় বক্তৃতা দেব! আর মাইকে আমার কন্ঠ শুনে মা গর্বভরে পাশের সখীকে বলবে,” শোন, শোন, আমার বাবার গলা না?”
ঐ উত্তর পাশের মাইক থেকেই বিসর্জন অনুষ্ঠান পরিচালনা করা হত। পাড়ার গায়ক গায়িকারা ধর্মীয় গান গাইতেন। সাধারণ গানের শেষে গাওয়া হত বিভিন্ন বিদায়ী গান। মন না কেঁদে পারত না তখন। তারমধ্যে একটা গানের দুইটা লাইন ছিল এরকম:
“যেই নবমীর ছায়া নামে সাধের আকাশ জুড়ে,
সবার যেন মন ছেয়ে যায় বিষাদেরও সুরে।’
– এমনিতেই প্রাণ কাঁদে, তার উপর এমন গানের কথা কানে গেলে কান্না আসত না এমন পাষাণও কেউ আছে!
পাষাণও কেউ আছে!
একসময় ভেলাতে তোলা হত প্রতিমাগুলো একে একে। আমি যখন দেখতাম সামনে থেকে দেখতে এত সুন্দর প্রতিমাগুলোর পিছনের অংশ এত কদাকার, আমার খুব খারাপ লাগত। এসময় প্রতিমাগুলোকে আমার শুধুই মাটির তৈরী মুর্তি মনে হত।
পুকুরের চারপাশে উপস্থিত ছেলেরা তখন শেষবারের মত আনন্দ নিতে ব্যস্ত। তারা সেই কনডম তথা বেলুন ফুলিয়ে পুকুরে ছেড়ে দিত। তারপর নিজেরাই আবার কার আগে কে ঢিল মেরে ঐসব বেলুন ফাটাতে পারে সেই প্রতিযোগীতায় নামত। অতি সাহসীরা হাতেই পটকা ফুটাত। আর কেউ কেউ মুখে কেরোসিন নিয়ে আগুনের হলকা বের করে আমাদের চমকে দিত। তখন ভাবতাম,এও সম্ভব!
এভাবে সময়ের ব্যবধানে পুকুরের চারপাশে ঠিক সাতটা চক্কর দিয়ে ভেলাটাকে পুকুরের মাঝখানে নিয়ে যাওয়া হত। তারপর হঠাত করে ভেলাটাকে উল্টিয়ে দেওয়া হত এবং ছোটখাট প্রতিমাগুলোকে ধাক্কা মেরে ফেলা হত জলে। একেই তাহলে বিসর্জন বলে! নাকি জলাঞ্জলী? চোখে কি জল এল?
উত্তর পাড় থেকে সঞ্চালক ঘোষনার সাথে সাথে এরপর শুরু হত সাঁতার প্রতিযোগীতা। দারুণ মজা পেতাম এতে। হয়ত দেখা যেত এত লম্বা দূরত্ব সাঁতরাতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে না পেরে উল্টা দিকে সাঁতরে পাড়ে উঠে যেত! কী হাসাহাসি তখন! সঞ্চালক এরপর ঘোষনা করতেন গত চারদিন ধরে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগীতায় বিজয়ীদের নাম। দৌড়, হা-ডু-ডু, চেয়ার দখল, বিস্কুট খাওয়া, হাঁড়ি ভাঙ্গা ইত্যাদি অনেক রকমের খাঁটি গ্রাম বাংলার খেলার প্রতিযোগীতার আয়োজন করতেন পূজা আয়োজক কমিঠি। আমরা যারা সাধারণ ছেলেপুলে- আমাদের ঈর্ষা হত বিজয়ীদের পুরষ্কার নিতে দেখে। হাততালি দিতে অবশ্য আমি কার্পন্য করিনি কখনো।
বিসর্জন অনুষ্ঠান সমাপ্তি ঘোষনার সাথে সাথে আমি আমার সহপাঠীদের নিয়ে বের হতাম বয়োজেষ্ঠ্যদের প্রণাম করার জন্য। এটা আমাদের গ্রামের রীতি- ছেলেপুলেদের কাছে অত্যন্ত আনন্দের ব্যাপার। কারণ, বুড়োবুড়িরাও এইদিন চকলেট, লজেন্স নিয়ে বসে থাকতেন। আমরা প্রণাম করতে গেলে আমাদের হাতে দিতেন। যাদের সামর্থ আছে তারা মিষ্টি বা জিলাপি বিতরন করতেন। আমার জন্য ব্যাপারটা যতটা না প্রণাম করার উপলক্ষ, তার চেয়ে বেশী ভাল লাগত মানুষজনকে দেখে। তাছাড়া, মেধাবী ছাত্র হিসেবে সুনাম থাকার ফলে,খেয়াল করতাম, পাড়ার মানুষজনের কাছ থেকে আলাদা একটা কদর পেতাম। আমি এই প্রশংসাটা সবসময়ই উপভোগ করতাম। এভাবেই বিষাদ মোটামুটি কেটে যেত। তারপর মন বুঝে যেত। এবার আগামীবারের জন্য অপেক্ষা করার পালা। অপেক্ষা শুরু হত..
আজ সেই স্মৃতিবিজড়িত দশমীর দিন ছিল। পুরো গ্রাম ঘুরে ঘুরে প্রণাম আজকেও করেছি। আদরও পেয়েছি আগের মতই। তবে সময়ের ব্যবধানে আজকে আমি বড় হয়ে গেছি, যখন দেখলাম, আজকে আমাকে প্রণাম করার জন্য ছোটরা পায়ে হাত রেখেছে। তখন হাসতে হাসতে এবং হয়ত সুযোগ্য উত্তরসুরী পেয়ে গর্বে তাদের টেনে নিয়েছি বুকে, মিলিয়েছি হাত। আর খালি মনে হয়েছে, সময় হয়েছে, সামনের বার থেকে আমাকেও পকেটে লজেন্স নিয়ে রাস্তায় বের হতে হবে!! সময় নিষ্ঠুর বড়। নাকি অশেষ দয়ালু? কী জানি!
!!
(বি:দ্র: ব্যবহৃত ২য় কবিতাটি আমাদের কালীবাড়ির একটা ম্যাগাজিনে প্রকাশিত পুলক দে’র একটা কবিতা। কবিতা তখন আমার অসম্ভব ভাল লেগেছিল। তাই এখানে একটু কল্পনার আশ্রয় নিয়ে হলেও ব্যবহার করতে পেরে ভাল লাগছে।)

৭টি মন্তব্য
সনন্দ আপনি আপনার অনুভবের জায়গায় ।
বেশ গুছিয়ে লিখছেন , আপনকে নিয়মিত লেখক মনে হচ্ছে ।
বেশ বড় লেখা । তারপরেও পড়লাম আপনার লেখার
বুননের কারনে । এমন আনন্দ আমিও দেখেছি ছোটবেলায় আমাদের গ্রামে । কত নিবির আনন্দের দিন ছিল তখন।
আপনি নিয়মিত লিখলে মন্দ হয় না ।
অসাধারন বর্ণনা ।
মনে হচ্ছে যেন দেখতে পেলাম সবকিছু।
শুভকামনা ।
পড়ে ভাললাগল । কিন্তু মনে যে দুর্গা পূজার নেশা লাগিয়ে দিলেন । বাসার একেবারে সামনেই ক্লাবের পুজা হয় । তাই সবার পুজা ষষ্ঠী থেকে শুরু হলেও আমার পুজা শুরু হয় পাল আসার দিন থেকে । কি যে উত্তেজনা লাগে বুঝাতে পারব না । যদিও পুজায় শেষ কবে বসেছি বা ভবিষ্যতে বসব কিনা তায় জানিনা । কিন্তু পুজা আসলে মনে আনন্দের ছোঁয়া লাগবেই ।
মনে পরে গেল পিছনে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ।
অনেক দিন পরে এত বড় একটি লেখা পড়লাম। সুন্দর গুছিয়ে লিখেছেন।