মায়ের কাছে ছেলের চিঠি

নিতাই বাবু ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, রবিবার, ০২:২৬:৪১পূর্বাহ্ন চিঠি ২৭ মন্তব্য

ওঁ

শ্রীগুরু সহায়:

পরম পূজনীয় মা, পত্রের প্রথমে আপনি আমার ভক্তিপূর্ণ প্রণাম গ্রহণ করবেন। বাবাকে আমার প্রণাম জানাবেন। বড় দাদাকেও আমার প্রণাম জানাবেন। সাথে জানাবেন বাসার সকলকে শ্রেণিবিশেষ আমার প্রণাম ও স্নেহাশিস। আশা করি দয়াময়ের অশেষ কৃপায় বাসার সকলকে নিয়ে একপ্রকার ভালো আছেন। ভালো থাকার জন্য মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে সবসময় প্রার্থনা করি। আপনাদের সকলের আশীর্বাদে আমিও একপ্রকার ভালো আছি।

পর সমাচার:

মা, আপনার বারণ থাকা সত্ত্বেও চিটাগাং এসে মনে হয় বিপদেই পড়েছি! এখানে আমরা তিনজন যে-কাজের জন্য এসেছিলাম, সেই কাজে আমাদের না নিয়ে অন্য এক কঠিন কাজ আমাদের দেওয়া হয়েছে। প্রথম দিন সকালবেলা যখন কোমড়ে গামছা বেঁধে কাজে যাই, তখন কী কাজ আমাদের করতে হবে, সাব-কন্ট্রাক্টর আমাদের বুঝিয়ে দেয়। কাজটা হলো, পাহাড়ের নিচে থেকে উপরে বালু উঠাতে হবে। ঐ কাজে শুধু আমরা তিনজনই নয়, আরও অনেক লেবারই ছিল। সেখানকার লেবাররা সে কাজ দিব্যি করেও যাচ্ছিল। তা দেখে আমরা তিনজনই মনে করেছিলাম এ-কাজ করা কোনও ব্যাপারই না! কিন্তু মা, সে-কাজ আমরা করতে পারিনি। করতে পারিনি এইজন্য যে, উঁচু পাহাড়ের নিচ থেকে বালুর টোকরি মাথায় নিয়ে পাহাড়ের উপরে উঠার মতো সাধ্য আমাদের তিনজনের মধ্যে কারোর ছিল না।

যখন বালুর ভর্তি টোকরি মাথায় নিয়ে পাহারের আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে উপরে উঠতে লাগলাম, তখন আর পারছিলাম না। তবুও অনেক কষ্ট করে দু’এক ঘণ্টা বালুর টোকরি মাথায় নিয়ে পাহাড়ের সাথে যুদ্ধ করেছিলাম। এরপর হঠাৎ করে মাঝপথেই থেমে গেলাম।বালু ভর্তি টোকরি মাথায় নিয়ে আর ঠিক গন্তব্যে পৌঁছাতে পারিনি। আমিও পারিনি, আমার সাথে দু’জনও পারেনি। এমন কঠিন কাজ না পারার কারণে পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথের মাঝে বসেই কাঁদতে লাগলাম। আমার কান্না দেখে আমার সাথে আসা দু’জনও কাঁদতে লাগলো। আমাদের কান্না দেখে সাব-কন্ট্রাক্টর তাঁর অফিসে ডেকে নিয়ে বসতে দিলো। আমরা বসলাম। সাব-কন্ট্রাক্টর জিজ্ঞেস করলো, ‘এখানে এ-কাজ আমরা করতে পারবো কি না’। আমরা সাব-কন্ট্রাক্টরের প্রশ্নের উত্তরে বললাম, ‘না’। এরপর সাব-কন্ট্রাক্টর আমাদের পাহাড়ের উপরে অন্য এক কাজ করতে বললেন। সে কাজটা ছিল হাল্কা-পাতলা। এভাবে সেই পাহাড়ের সপ্তাহখানেক কাজ করেছিলাম।

তারপর আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় কক্সবাজার সংলগ্ন মহেশখালী। সর্বপ্রথম এখানেই আমাদের আনার কথা ছিল। কিন্তু যেকোনো কারণে দু’এক দিনের জন্য আমাদের রাখা হয় চিটাগং বায়োজিদ বোস্তামি মাজার সংলগ্ন এক পাহাড়ে। সেখানে এক বিত্তশালীর বাংলো নির্মাণ হচ্ছিল। সেই বাংলো তৈরির কন্ট্রাক্ট পেয়েছিল, আমাদের যিনি চিটাগং নিয়ে এসেছেন, তিনি। কিন্তু আমাদের সাথে কথা হয়েছিল, মহেশখালী রাস্তা নির্মাণের কাজের কথা। কন্ট্রাক্টরের সাথে আমাদের কথা ছিল দৈনিক মজুরি ১২ টাকা। তা তো আপনিও জানতেন। এখানে আসার আগে যা আপনাকে জানিয়ে ছিলাম।   শেষতক আমাদের মহেশখালীতেই আনা হলো। চিটাগং আসার আগে ভেবেছিলাম এই ১২টাকা থেকে ৫টাকা নিজের খরচ হলেও, বাদবাকি ৭টাকা আপনার কাছে পাঠাবো। যা আপনাকেও বলে এসেছিলাম। এখন আমরা কক্সবাজার সংলগ্ন মহেশখালীতে আছি। এখানে আমাদের কাজ হলো রাস্তা নির্মাণ করার কাজ।

মা, কক্সবাজার সংলগ্ন মহেশখালী। খুবই সুন্দর জায়গা। ছোট একটা দ্বীপ। যার লম্বায় ১৩ মাইল। পাশে ৬মাইল। একদিকে বঙ্গোপসাগর, আর বাকি তিনদিকে সাগরের শাখা প্রশাখা। এর মাঝেই মহেশখালী। চারদিকে পাহাড়। এখনকার মানুষের ভাষা আমাদের নারায়ণগঞ্জের মতো নয়। এঁরা কীভাবে যে কথা বলে, ওঁদের কথা কিছুই বোঝা যায় না। তবে মা, ওঁরা বাংলায় কথা বলে। কথা বলার সময়, একটু নাকে জোর দিয়ে ‘ন’ শব্দ বেশি বলে। ওঁদের আচার-আচরণ ভালো। ঢাকাইয়া মানুষের গন্ধ পেলে, ওঁরা খুবই আদর সমাদর করে। এই মহেশখালীতে আমাদের হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক লোক আছে। এখানে আদিনাথ মন্দির নামে একটি বিখ্যাত মন্দিরও আছে। আছে মগ জাতীয় বার্মিজ জনগোষ্ঠীও। সেখানকার মানুষ বার্মিজদের বলে মগ জাতি। সব মিলিয়ে মহেশখালী দ্বীপ খুবই সুন্দর জায়গা। কিন্তু এতো সুন্দর জায়গা, তবু্ও ভালো লাগে না। এর কারণ শুধু একটাই, সেটা হলো টাকা। টাকা নেই তো কিছুই নেই। এই টাকার জন্য নারায়ণগঞ্জ থেকে এখানে ছুটে এসেছি।

মহেশখালী বাজার থেকে নতুন বাজারের দূরত্ব প্রায় ১৩মাইল। এই ১৩ মাইল রাস্তা সিসি ঢালাই হবে। এই রাস্তা ঢালাই করা কাজেই আমরা এখানে এসেছি। আমাদের সাথে সেখানকার আরও বেশ কয়েকজন লেবার আছে। এখানে আমরা তিনজন থাকছি এক সরকারি পরিত্যক্ত গোডাউনে। নিজেরাই কোনরকম রান্না-বান্না করে খাচ্ছিলাম। কাজও করছিলাম।

কিন্তু মা, এখানে প্রতিদিন বৃষ্টি হয়। বৃষ্টির কারণে প্রতিদিন কাজ হয় না। কাজ নেই তো মজুরি নেই। আমাদের কন্ট্রাক্টর থাকে চিটাগং শহরে। তিনি সপ্তাহে একবার আসে। সপ্তাহে যার যে-ক’দিন কাজ হয়, সেই হিসাব করে যার যার পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে আবার চলে যায় কন্ট্রাক্টরের গন্তব্যে। কাজের মজুরি ছাড়া বাড়তি কোনও টাকা দেয় না। সারা সপ্তাহে কাজ হয় তিন থেকে চারদিন। এ-দিয়ে নিজের খাওয়া চলে না।

দুই তিনদিনের কাজের মজুরি দিয়ে সারা সপ্তাহ চলতে খুবই কষ্ট হয়। তাই সেখানকার এক লোক মারফত লবণের মিলে যোগাযোগ করে, আমরা তিনজনই দৈনিক ২৫টাকা মজুরিতে একটা কাজ নিয়েছি। এই কাজটাও রাস্তার ঢালাই কাজের চেয়ে আরও কষ্টকর! লবণের কাজ। সারা শরীরে ঘা হয়ে যায়। এখানেও সারা সপ্তাহ কাজ করতে পারছি না। বর্তমানে আমার সমস্ত শরীরে ঘা হয়ে গেছে, মা। কাজে যাবার আগে সারা শরীরে পান খাওয়ার খয়র মেখে কাজে যোগদান করি। শুধু আমিই না মা, আমার মতো সবাই খয়র মেখে কাজ কাজ করে। তবুও শরীরে ঘা হয়ে যায়। শরীরের ঘা’র যন্ত্রণায় কাজ করতে পারছি না।

চিটাগাং আসার সময় যে-সব পড়ার বইগুলো আমি সাথে এনেছিলাম, শত কষ্টের মাঝেও পড়ি। আশা আছে আর ক’দিন কষ্ট করে ভাড়ার টাকা যোগাড় করে নারায়ণগঞ্জ ফিরে আসবো। কারণ, আমার ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হবার আর মাসেক তিনমাস বাকি। আমি কিন্তু পরীক্ষা শুরু হবার হিসাব মনে রেখেছি। আপনার আশীর্বাদ থাকলে এই সময়ের আগেই আমি আপনার বুকে ফিরে আসবো, মা। আমি পরীক্ষা দিবো। পাস করবা। আমার এই চিঠি হাতে পেয়ে আপনি চোখের জল ফেলবেন না। যদি চোখের জল ফেলেন, তাহলে আমার জন্য হবে অমঙ্গল। আপনি শুধু আমার জন্য আশীর্বাদ করবেন। যাতে আমি সুন্দরভাবে সুস্থ শরীর নিয়ে বাসায় ফিরে আপনার শ্রীচরণে প্রণাম করতে পারি।

আর কী লিখবো মা, লেখার আরও অনেক ছিল। তবু্ও লিখলাম না, আপনার কষ্ট হবে বলে। আরও কষ্ট হবে বাবার, বড় দাদা-সহ বাসার সকলের। তাই আর বেশিকিছু লিখলাম না, মা। পরিশেষে বাসার সকলের জন্য মঙ্গল কামনা করে এখানেই শেষ করছি।

ইতি,

আপনার আদরের ছোট ছেলে অভাগা।

কক্সবাজার সংলগ্ন মহেশখালী থেকে।

১৭৫জন ৩৫জন
10 Shares

২৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য