পর্বতকন্যের ইতিকথা

প্রদীপ চক্রবর্তী ২৭ আগস্ট ২০১৯, মঙ্গলবার, ০৩:০১:৪০অপরাহ্ন উপন্যাস ১৪ মন্তব্য

#পর্ব_৩১

ক্লান্ত দুপুর আর ব্যস্ত শহরের অলিগলি শরৎ শোভায় নেমে এসেছে প্রখর রৌদ্রের জলতাপ। গঙ্গার পলি উর্বর নন্দিনী জমেছে তীরে,ভাসমান দ্বীপে পড়েছে হাজার পদচিহ্নের চাপ।
কয়েক রজনী ঘুমহীন চোখে আনমনা স্বপ্ন আর ভবঘুরে ছুটে চলা। কবে ক্লান্তি দূর হবে তা যে নির্বাক। দুপুর প্রায় গড়িয়ে স্রোতধারা গঙ্গার পলিতে বহমান।
গতিপথ তাহার সংকীর্ণ বিভাজন।
তবুও ক্লান্তির রুদ্ধদ্বার আজও আমার ললাটতটে গঙ্গার ন্যায় বহমান। অষ্টাদশ থেকে একবিংশ আমার চলমান জীবনপ্রবাহ।
আজ অষ্টমী,বলরাম দাদার বাড়িতে আরাধ্য দেবতা আগমনী দেবীর বেশ আড়ম্বরের সহিত পূজার্চনা চলছে।
আশি অতিক্রান্ত এক বাউল বৃদ্ধা সাথে সহযোগী কয়েকজন জন বাউল অনুরাগী। হঠাৎ করে বলরাম দাদার বাড়িত আগমন। একে একে জয়ধ্বনি দিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করছে। অঙ্গে তাদের সাদামাঠা বৈরাগ্য
বসন,কপালে তিলকফোটা,হাতে নানা বাদ্যযন্ত্র।
হিমালয়ের গিরিপথ নেমে নেচে নেচে কালীঘাটের তীর ধরে যাঁদের আগমন তাঁরা যে বাউলের মর্ম তত্ত্বে বিশ্বাসী। তাঁদের আগমনে যে আমিও আনন্দে ভরপুর।
তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সারাদিন ক্লান্তিচাপ থাকলেও যে তাঁদের আগমনে আমি সুপ্ততার আভাসে আনন্দিত।
এদিকে বিনোদ সুস্থ হয়ে চলাফেরা করছে। আজ তার শরীর বেশ ভালো। বিনোদ সুস্থ হওয়াতে পার্বতী একটু বেশ আনন্দিত। কেননা বিনোদের জন্য পার্বতী তার নিজ ভাইয়ের মত করে তার সেবাশুশ্রূষার যত্ন নিয়েছে।
একে একে করে বলরাম দাদার বাড়িতে লোক আসছে।
এদিকে বাউল অনুরাগীরা কখনো আগমনী দেবীর গান ও কখনো বাউলা গান গেয়ে যাচ্ছে। আজ আর কোথাও ঘুরতে যাওয়া যাবেনা।
তাই আমি আর বিনোদ বাউল অনুরাগীদের পাশে বসে গান শুনতে লাগলাম। আমাদের ঠিক বাম পাশে পার্বতী ও সাথে বলরাম দাদার সহধর্মিণী জয়তি চক্রবর্তী।
কখনো চোখের অপলকে হলুদ ভরা মরসুমি খামে কত কত চিঠি লিখেছিলাম পার্বতীর জন্য।
সেও যে বিদীর্ণ অমানিশা রাত্রিতে কত আকুল আবেগ আর চোখেরজলে লিখেছিল কত অজস্র চিঠি।
ইদানীং আর পার্বতীকে নিয়ে লেখা হয়নি চিঠি। বলরাম দাদার বাড়িতে পার্বতী আসার পর থেকে মাঝেমধ্যে বেশ কথোপকথন হয়। পার্বতীর প্রতিটি কথা আমার লেখা সদ্যজাত কবিতার অক্ষর। তাকে ভালোবেসে যে কত নাম দিয়েছি তা আজ না বলার থাক।
কিন্তু নিয়তি যে এই ভালোবাসার প্রতিদান দিবে না।
জেনেশুনেও আমি পার্বতীকে ভালোবাসি। পার্বতীও যে আমায় বিষণ ভালোবাসে। কেউ কাউকে ছেড়ে যাওয়ার সম্ভাষণ নয় একে অপরের পাশে থেকে অনুপ্রেরণা জাগানোর সম্ভাষণ ছিলো। আমাদের মধ্যে দুজনের ভালোবাসাটা বড্ড অবুঝ ছিলো।
পুলকিত নয়নের মাধুর্যতায় একে অপরকে ভালোবেসে ফেলতাম তা যে আমাদের নিত্য সঙ্গী হয়ে আছে।

#পর্ব_৩২

রোজ গার্ডেনে কত অর্কিড,কত রজনীগন্ধা আর কত শিউলি ফুল ফুটত। যার মোহনীয় গন্ধে আমরা মাতাল হয়ে পড়তাম। বিনিদ্র রজনী আর অমাবস্যার চাঁদ যখন অভিসারের সম্মুখে প্রস্থান করে তখন আমাদের কত রূপকথার কাব্যি অনায়াসে লিখে যায় পূর্ণতার খেয়াপারে। যেখানে গোধূলির আরক্ত আভা আর সারসের কান্নার বিভোরতায় বকুল ফুলের গন্ধে মেঘের সমাগমে যেখানে ডাহুক পাখিরা খুঁজে পেত প্রশান্তি।

শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে বলরাম দাদার বাড়ির সামনে চারটা পাঁচটা দোকান বসেছে দোকানীরা ছবি, শাঁখা, সিঁদুর, পলা – কিছু পুঁতির মালা,আর প্রসাদী প্যাঁড়া, ছানার আমৃত্তি নিয়ে দোকান সাজিয়ে বসে আছে। গান শুনে আমি আর বিনোদ সেখানে চলে গেলাম। হঠাৎ করে পেছন দিকে চেয়ে দিকে পার্বতী আমাদের পিছু পিছু হয়ে আসছে।
আমি আর বিনোদ সিদ্ধান্ত নিলাম আজ রাত্রিবেলা কালীঘাটে পূজো দেখতে যাব। আমাদের এই সিদ্ধান্তে পার্বতীর যেতে চাইলেও তাকে নেওয়া যাবেনা।
রাত্রি প্রায় আট ঘটিকা। বলরাম দাদার বাড়ি থেকে কালীঘাট যেতে প্রায় দুঘণ্টা সময়ের প্রয়োজন। টমটম করে যাওয়া যাবেনা। তাই বলরাম দাদার পাশের বাড়ির নিতাই কে নিয়ে ট্রেনের টিকেট করে নিলাম। হুগলি থেকে ট্রেন রাত নয়টার দিকে ছাড়বে।
তাই আমি আর বিনোদ সময় নষ্ট না করে তাড়াহুড়া করে স্টেশনে চলে গেলাম।
এদিকে বলরাম দাদার বাড়ির সকল আত্মীয়স্বজন আগামীকাল মহানবমীতে আগমনী দেবী দুর্গাকে দর্শন করার জন্য কালীঘাটের কালী মন্দির ও দুর্গা মন্দির দেখতে যাবেন।
আমি আর বিনোদ কাপড়চোপড় বেগে গুছিয়ে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। রাত্রিবেলা ট্রেনে বসে খাওয়ার জন্য পার্বতী আমাদের জন্য কয়েকটা নারিকেলের নাড়ু একটা বক্সের মধ্যে দিয়ে দিয়েছে। নারিকেলের নাড়ু আমার ছোটবেলা থেকে বেশ প্রিয়। রাত্রি তখন প্রায় আটটা পঁয়তাল্লিশ। ট্রেন ইতিমধ্যে স্টেশনে চলে এসেছে। তাই আমরা দুজন ট্রেন উঠে পড়লাম।
আমাদের কালীঘাটে পৌঁছাতে আর তিন থেকে চার ঘন্টা সময় লাগবে। ট্রেনে লোকে লোকারণ্য সবাই কালীঘাটের উদ্দেশ্য যাত্রা করছে পূজো দেখতে।
আগামীকাল কালীঘাটে গাজন উৎসব হবে।
ট্রেনে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা সন্ন্যাসী ও বাউল ফকিরের সমাগম। সবার গায়ে ভিন্ন ভিন্ন বসন। আর কাঁধে জুলি। আর হাতে ত্রিশূল। একেকজন একেক দেবতার অনুসারী।
কেউ গান গাইছে আপনসুরে,কেউবা বসে গাঁজায় দিচ্ছে টান আর কেউ কেউ লিখছে যত তন্ত্রমন্ত্রের উপাখ্যান। আমি আর বিনোদ এসব বসে বসে দেখছি।
আজ আকাশটা বেশ ফর্সা তারার  মিটিমিটি আলো।
আর শরতের হিমেল হাওয়ার নির্যাস পরশ।
বেশ উপভোগ্য।
রাত্রি প্রায় এগারোটা ছুঁইছুঁই। তাই বসে বসে একটা দুটা করে নারিকেলের নাড়ু খাচ্ছি। যেদিকে চোখ দিয়ে তাকাই সেদিকে পাড়ার অলিগলিতে আর শহরে জমে উঠেছে শরৎ আগমনী পূজায়।
ইতিমধ্যে আমরা কালীঘাট স্টেশনে পৌঁছে গিয়েছি। তাই সবাই একে একে ট্রেন থেকে নেমে পড়ছে।
আমি আর বিনোদ টমটমে সোজা রওয়ানা হলাম কালীঘাট মন্দিরের দিকে। ভাড়া মাত্র পাঁচ টাকা।

#পর্ব_৩৩

সকাল থেকে রাত্রি প্রায় বারোটা পর্যন্ত আকাশটা বেশ ভালো থাকলেও হঠাৎ করে বেশ বৃষ্টি ঝরেছিল মাঝরাতে। লোকমুখে শুনলাম যে প্রতিবছর দুর্গাপূজার অষ্টমীতে বৃষ্টি হয়। বৃষ্টি দিনের বেলা বা রাত্রিবেলা যেকোনো সময় পরিসর হয়ে থাকে। একান্ন পীঠস্থানের মধ্য কালীঘাটের মন্দির অন্যতম। যে মন্দিরে হাজার সন্ন্যাসী আর মুনিঋষির মিলনমেলা বহে। মন্দিরের প্রাঙ্গনে লোকে লোকারণ্য কোথাও বসার জায়গা নেই। সবাই মন্দিরের আশপাশ ঘিরে বসে আছে।
গভীর রাত্রি চোখে ঘুম পেয়েছে অনেক কিন্তু কোথাও ঘুমাবার জায়গা নেই। আমরা প্রায় দেড়ঘন্টার দাঁড়িয়ে আছি মন্দিরের একপাশে। আমাদের ঠিক পশ্চিম পাশে এক যুবক জওয়ান হাতে রাইফেল নিয়ে বসে আছে চেয়ারে। আর মনেমনে ভাবছিলাম হয়ত এই যুবক জওয়ান সেখানকার এক নিরাপত্তাকর্মী। আমাকে আর বিনোদকে দেখে বললো আপনারা কোথায় থেকে এসেছেন মহাশয়? আমি হুট করে বলে উঠলাম বাংলাদেশ থেকে। এই কথা বলার সাথে সাথে যুবক জওয়ান আমাদের সাথে আলিঙ্গন করে নিজের চেয়ার ছেড়ে দিয়ে দিয়েছে। আর বলছে আপনার এতদূর দেশ থেকে এসেছেন?
আমি বললাম হ্যাঁ।
আজ রাত্রিবেলা আমাদের থাকা খাওয়ার সবকিছু ব্যবস্থা করে দিয়েছে এই জওয়ান নিরাপত্তাকর্মী।
সত্যি বেশ প্রশংসা করতে হয়। আর মনেমনে ভাবছি যদি বাংলাদেশ থেকে এসেছি এই কথা না বলে যদি বলতাম কলকাতা থেকে এসেছি তাহলে হয়ত এত আদর আপ্যায়নের সুযোগ পেতাম না।
যাই হোক ভাগ্যে ভালো।
রাত্রি প্রায় তিনটে ছোটখাটো ঘরে ছোটখাটো বিছানায় আমি আর বিনোদ শুয়ে আছি। পুরো শহর আর পুরো মন্দির ঘিরে চলছে গান আর যাত্রাপালা। নানা জায়গার নানা প্রান্ত হতে আগত লোকের মহাসমারোহ ঘটে এই কলকাতায়। যে শহর তিলোত্তমা নগরী নামে আদি থেকে বেশ সুপরিচিত।
আমি যখন ক্লাস ফাইভে পড়তাম তখন বাবার সাথে কলকাতা এসেছি। কলকাতার অনেক জায়গায় বাবার হাত ধরে ঘুরেছি। কিন্তু কখনো কালীঘাটে আসা হয়নি। তাই একটু অপরিচিত লাগছে। বিনোদ তো আর কখনো আসেনি। চোখে ঘুম নেই। শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে ভোরের আলো রবি ধীরে ধীরে আলোর রশ্মিপাত ছড়িয়ে দিচ্ছে। তাই আমরা ঘুম থেকে উঠে পড়লাম। আমাদের ঘরের পাশ হতে সেই যুবক জওয়ান   ডাকছেন। তাই দরজা খুলে উনাকে ঘরে আসতে বললাম। এই যুবক জওয়ান আমাদেরকে বলছেন যে খাওয়াদাওয়া ও কোনকিছুর প্রয়োজন হলে ওনাকে জানাতে।
আমি আর বিনোদ স্নান করে নিলাম কালীঘাট মন্দিরের পুকুরে। একটু পর অঞ্জলি নিতে হবে। হাজার হাজার লোক আসবে অঞ্জলি নিতে। তাই আমরা ধূতি পান্জাবি পরে মন্দিরের দিকে রওয়ানা হলাম। অজস্র লোকের সমাগম। সবাই অপরিচিত। মন্দিরের অঞ্জলি নিয়ে প্রসাদ খেয়ে পুনরায় ফিরে এলাম আমাদের ঘরে।

#পর্ব_৩৪

আজ মহানবমী। বলরাম দাদার পরিবারে সাথে পার্বতীও আসবে কালীঘাটে পূজো দেখতে। ইতিমধ্যে সবাই বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছে।
তাই আমি আর বিনোদ তাদের অপেক্ষায় বসে আছি।
সবাই মিলে একসাথে পূজো দেখব এবং ঘুরে বেড়াব।
বিশেষ দিনে পার্বতীও থাকবে। স্টেশন থেকে বলরাম দাদা সবাইকে নিয়ে কালীঘাট মন্দিরে চলে এসেছেন।
আমরাও সেখানে ছিলাম। মন্দির পরিক্রমা করে সেখানে দুপুরবেলা প্রসাদ খেয়ে,পাঁচশো টাকা দিয়ে টেক্সি রিজার্ভ করে নিলাম কালীঘাটের আশপাশ মন্দির পরিক্রমার জন্য।
ভরদুপুর আর শরতের ভ্যাপসা গরমে দক্ষিণা হাওয়াতে পার্বতীর কেশরাশি উড়ছে এলোমেলো আকাশপানে।
মন্দিরের চারদিকে আগরবাতি ও রজনীগন্ধার সুবাস ছড়িয়ে আছে। বাহ্! কী মনোরম পরিবেশ। শারদীয় পূজার আমেজতা বইছে শহর জুড়ে। আগামীকাল পূজো শেষ হয়ে যাবে। তাই একবছরের জন্য আনন্দের রেশ উপভোগ করতে সবাই ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কালীঘাট তীরে অজস্র নদী এসে মিশেছে মোহনায়।
সকল নদী দক্ষিণ প্রবাহি। আর এ নদীতীরে গড়ে উঠেছে অজস্র বসতি। আর এ বসতির লোকজন সবাই হরিজন সম্প্রদায়। তাঁদের পাড়ায় মৃদঙ্গ,ঢোলের বাজনা শুনে চলে গেলাম আমরা সকলে মিলে। সেখানে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তাদের সাথে আমরা বিভিন্ন কনসার্টে আনন্দটা ভাগ করে নিলাম।
যাই হোক,রাত জেগে অবগাহনের তৃপ্তিতে ক্লান্ততা মুছে  আজকের দিনটা বেশ ভালো কাটলো। ধীরে ধীরে আকাশপানে সন্ধ্যা নামছে। অনেক জায়গা ঘুরে পূজো দেখে সবাই বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত নিচ্ছি। বিনোদ ও বলরাম দাদা স্টেশন চলে গিয়েছেন ট্রেনের টিকেট সংগ্রহ করতে।
আমি আর পার্বতী বসে বসে গল্প করছি। তার প্রতিটি কথা আমাকে নিয়ে আর এই প্রতিটি কথা আমাকে অনুপ্রেরণা জাগিয়েছে। পার্বতীর প্রতিটি কথাগুলো খুব অদ্ভুত। যতদিন যাচ্ছে তার বিবাহের দিন ততো নিকটে চলে আসছে। যদিও এখনো বাগদান,সম্প্রদান কিছুই সম্পূর্ণ হয়নি।
কিন্তু পার্বতী যে বিবাহের পীড়িতে বসতে চায় না।
তবুও যে তার পিতামাতার কথা অবাধ্য করতে রাজী নয়। পার্বতী যে আমায় বেশ ভালোবাসে তার এ ভালোবাসাতে রাতের ঘুমটা ছিঁড়ে যায় রোজ বিভৎস আর্তনাদে। দুজনের জীবন চলছে আজও অনুভবের জীবনসন্ধিতে। একে অপরকে দিয়েছি পাশে থাকার অনুপ্রেরণা। আর আমাদের দুজনের এ অনুপ্রেরণা কী হেরে যাবে নিয়তির কাছে?
আমরা যে নিয়তির কাছে নির্বাক।
আকাশের কৌতূহলী নক্ষত্র যেমন ঈশ্বরের কাছে সমর্পিত তেমনি করে আমাদের ভালোবাসার বন্দন আজও ঈশ্বরের কাছে সমর্পিত।
অনেক কথা স্নৃতির স্রোতে কখনো চোখেরজলে ভাসে।

#পর্ব_৩৫

আসছে বছর আবার হবে এই কথা বলে কালীঘাট থেকে বিদায় নিলাম আমরা। হয়তো এমন আনন্দ আর কখনো উপভোগ করতে পারব কি না তা জানা নেই।
আর কত দিবস রজনী আমায় কাটাতে হবে যে নিঃসঙ্গতা তাও যে জানা নেই। আর এই নিঃসঙ্গতার একাকীত্বটা কি কেউ কখনো বোঝবে?

ট্রেনে বসে বসে খামখেয়ালী আর একান্ত অনুভূতিতে  লিখছি পার্বতীকে নিয়ে বেদনাময় নিঃসঙ্গতার কথা।
আর একে একে মনের মধ্যে গ্রথিত হচ্ছে কত অব্যক্ততা।

নিঃসঙ্গতা বোঝো?
কত অহর্নিশ স্রোতশূন্যে দিবস রজনী পেরিয়েছ একাকীত্বের নির্বাকে।
রাঙিয়েছ কি তুমি আমায় ভালোবাসার গোধূলির রঙে?

স্বপ্নে বিভোর আনমনা নিরন্তর যার সাজঘর।
সে যে ইচ্ছেগুলো ডানা বাঁধে ধরণীর অতল গহ্বর।
শরৎ আভায় কাশফুলের গায়ে অঙ্কুরিত ভ্রূণের আনাগোনা। ভরদুপুরে মায়াবী মৃগদল খেয়াপারে তৃষ্ণা খুঁজে বারিপাতের বর্ষণে।

পূর্ব আকাশে মেঘদূত আজ ধূসর বর্ণহীন তাই পুরো শহর জুড়ে তুমি আমিই কেবল যাযাবর।
বহুকাল তুমি আর আমি এক হয়ে কখনো হেঁটে কখন বা কাল্পনিক ছায়াপথ ধরে ছায়ামানবী বেশে ঘুরেছি সমুদ্র সৈকতে। তখন দুজনের একাকীত্ব কি তা জানা ছিলোনা।
নিশি যাপন আর অনায়াসে লিখে যাওয়া মন্দারমনি পর্বতের রূপকথার মহাকাব্য। আজও যে তা নিঃসঙ্গতার ক্ষত পরাজয়ের অকুতোভয়ে ডাকা।
তা কি কেউ জানতো?
রাতের আকাশে সপ্তর্ষিমণ্ডলের আলোকদায়িনী আর অভিসারে শেষে মেঘমল্লার সাঁঝ শরৎ জ্যোস্নায় রাজকীয় রূপে স্বর্গোদ্যানে পারিজাত।
স্থাবরজঙ্গম আর পর্বতারোহীরা যুদ্ধজয়ে বিজয়নিশান উড়িয়ে ঘরে ফেরে। কিন্তু আমাদের নিয়তি যে আজও অবধি ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তা কি আমাদের মধ্যে কি কেউ একজন জানতো?
বহু পুরনো আর্টিফিশিয়াল আর খামখেয়ালি রৌদ্রতেজে অকপটে নিজেকে বিসর্জন দিয়েছি তোমার কাছে বহুবার। তোমার কাছে আমার প্রতিদানের অনুলিপি বিবর্ণতার পরিপাকে আবদ্ধ।

জানো,
তোমাকে আমার তুখোড় ভালোবাসার খামে রোজকার চিঠিতে অপার মুগ্ধতার নির্যাস প্রলেপে হৃদপিন্ডে ধারণ করে রাখতাম। সে তো বহু পুরনো কথা আর স্মৃতিময় হলেও তা যে অপ্রিয় সত্য। যেখানে তোমার কাছে আমার দুদন্ড ভালোবাসা জায়গির করলেও নিয়তি যে তা পরিহাস করে।
তুবও নিরুপায় হয়ে একাকীত্বের নির্বাকে আজও তোমার কাছে সরে দাঁড়াইনি শুধু চেয়েছি একমুঠো ভালোবাসা আর অনুপ্রেরণার কর্ণদ্বার হয়ে আমাকে রাখবে তোমার পাশে।
কই না তো!
তোমার দেওয়া একাকীত্ব যে আমাকে অনেকদূর পথ ঠেলে দিয়ে রেখেছে আজ অহংকার আর অভিমানের ছাউনিতে।
কখনো বুঝো নি আমার নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্ব।
বুঝো নি ক্লান্ত ঘুমহীন রাতের বিষাদময় স্বপ্নকান্না।

শিউলি ফুলের গন্ধ ভেবে তোমার ভেজা চুলে রোজ আদর করেছি। রাতের আলোক চাঁদে তোমায় খুঁজেছি।
অপেক্ষায় থাকতাম তুমি আমার গানের রাগিণী হবে বলে।
তুমি চাইলে শরৎ আকাশে বৃষ্টি ঝরে পড়তো।
তুমি চাইলে মেঘেরডাকে বৃষ্টি হয়ে পড়তে।
তুমি চাইলে যে ভালোবাসার মহাকাব্য লিখতে পারতে।
তুমি চাইলে যে আমার সদ্যজাত কবিতার প্রতিটি অক্ষর হতে।
না!
তাই তুমি নিঃসঙ্গতা বোঝো না।
রোজ রোজকার আমি একাকীত্বের নির্বাকে।

নিঃসঙ্গতার কথা লিখতে লিখতে কখন যে রাত পেরিয়ে ভোরের সূর্য আলো ট্রেনের জানালা দিয়ে প্রবেশ করছে। কেউ তা খেয়াল করে নি।
মনের অজান্তে পার্বতীকে নিয়ে অব্যক্ততা লিখলেও পার্বতী আমায় আজও বেশ ভালোবাসে।
মাঝেমধ্যে দেওয়া তার নিঃসঙ্গতার একাকীত্বটা হয়তো ঈশ্বর প্রদত্ত আশীর্বাদ।
..
ক্রমশ…

১৬৮জন ২৮জন
69 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য