জীবনের গল্প–২

নিতাই বাবু ১৫ জুলাই ২০২০, বুধবার, ০৩:২২:২৭পূর্বাহ্ন স্মৃতিকথা ২৮ মন্তব্য

জীবনের গল্প-১ এখানে ☚

জীবনের গল্প-১-এর শেষাংশ: থাকতাম মিলের শ্রমিক ফ্যামিলি কোয়ার্টারে। সময়টা তখন হতে পারে ১৯৭৩ সালের নভেম্বর নাহয় ডিসেম্বর মাস।

 

গ্রামের বাড়ি থেকে নারায়ণগঞ্জ আসার পর প্রায় মাসখানেক পর্যন্ত আমার কোনও বন্ধুবান্ধব ছিল না এবং মিলের ভেতরে থাকা শ্রমিক কোয়ার্টারের কোনও সমবয়সী ছেলে আমার সাথে কথাও বলতো না। আমিও মিলের ভেতরে থাকা ওঁদের সাথে বেশি মিশতাম না। কারণ আমার নোয়াখালীর ভাষা ওঁরা কেউ বুঝতো না। আমি কিছু বলতে গেলেই আরও চার-পাঁচজন হিহিহি করে হাসতো। ওঁরা আমাকে দেখলেই নোয়াখাইল্লা নোয়াখাইল্লা বলে হাসাহাসি করতে। আবার আমার চেহেরাটা বেশি সুশ্রী ছিল না বলে, ওঁরা আমাকে দেখে ভেংচি দিতো।

আসলে ওঁদের কোনও দোষ ছিল না। দোষ ছিল আমার কুশ্রীত চেহারার। আমার মুখমণ্ডল আরও দশজনের চেয়ে অন্যরকম ছিল। মানে কুশ্রী। চেহারা কুশ্রী হওয়ার কারণ হলো, আমার বয়স যখন চার বছর; তখন নাকি আমি গুটিবসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় তিনমাস পর্যন্ত মৃত্যুর সাথে লড়াই করে রোগমুক্ত হয়েছিলাম। শুনেছিলাম মা-বাবা ও বড়দাদা আর বোনদের মুখে। এই তিন মাসে গুটিবসন্ত রোগে আমাকে নাকি কঠিনভাবে আক্রান্ত করে ফেলেছিল। সেসময় আমাকে নাকি বাঁচিয়ে রাখার কোনও উপায়ই ছিল না। তবুও মহান সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় নাকি বেঁচে গিয়েছিলাম।

আমার শরীরে নাকি বসন্ত রোগের সাত জাতের মধ্যে সাত জাতই দেখা দেয়েছিল। আগেকার মানুষে বলতো, একজন মানুষের যদি একসাথে সৈয়দ, দাউদ, বরণ রোগ দেখা দিতো, তখন নাকি ওই মানুষটার মরণই হতো। তাই কথায় আছে, “সৈয়দ, দাউদ, বরণ, এই তিন জাত উঠলে হয় মরণ।” আমার শরীরে উঠেছিল সাত জাত। এগুলো হলো, “সৈয়দ, দাউদ, বরণ, ছালাকাটা, মসুরিকাটা লুন্তি ও বসন্ত।” এই রোগ ছিল ছোঁয়াচে রোগ। একবার এক গ্রামে বা মহল্লায় দেখা দিলে, তাহলে পুরো গ্রামের ঘরে ঘরে এই রোগ ছড়িয়ে পড়তো এবং শতশত মানুষ মারা যেতো। কিন্তু আমি বেঁচে গিয়েছিলাম, আমার মা-বাবার আপ্রাণ চেষ্টার কারণে এবং মহান সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায়। বলে বলে রাখা ভালো যে, আমার এই রোগের কারণে অন্যকোনো পরিবারের মানুষ তখন এই ছোঁয়াচে রোগে  আক্রান্ত হয়নি। এই রোগের রুগী শুধু আমি একাই ছিলাম।

আমার শরীরে যখন এই রোগ দেখা দেয়, তখন আমি গ্রামের বাড়িতেই ছিলাম। সাতদিন পর্যন্ত আমার মা গ্রাম্য কবিরাজ থেকে ঝাড়ফুঁক, ঔষধ ও পানি পড়া খাওয়ানোর পরও যখন আমি ভালো হচ্ছিলাম না, তখনই আমার মা নিকটস্থ পোস্ট অফিস থেকে বাবাকে টেলিগ্রাফ করে পাঠায়। বাবা তখন মায়ের পাঠানো টেলিগ্রাফ পেয়ে সাথে সাথে ধারদেনা করে নারায়ণগঞ্জ থেকে বাড়িতে এসে মা-সহ আমাকে অতি কষ্টে আমার সুচিকিৎসার জন্য নারায়ণগঞ্জ নিয়ে যায়। মা আমাকে নিয়ে উঠলো, আদর্শ কটন মিলের শ্রমিকদের ফ্যামিলি কোয়ার্টারে থাকা পরিচিত একজনের বাসায়। আমাকে নিয়ে যাঁর বাসায় গিয়ে উঠল, ওই লোক ছিল আমার বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং বাবার সাগরেদ। আমার এই ছোঁয়াচে রোগ হওয়ার পরও ওই লোক তাঁদের একটা রুম আমাদের জন্য ছেড়ে দিয়েছিল। যাতে আমার কোনো সমস্যা না হয়। ওই বাসায় থাকা খাওয়ার কোনও সমস্যা ছিল না। সমস্যা ছিল শুধু আমার চিকিৎসার সমস্যা। তখন আমার অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে, আমাকে দেখে সবাই বলেছিল, আমাকে আর বাঁচানো যাবে না। নিশ্চিত মৃত্যু। আমার মা-বাবাও আমার আশা একরকম ছেড়ে দিয়ে নিকটস্থ ১নং ঢাকেশ্বরী কনট মিলের শ্রমিক কলোনিতে থাকা একজন কবিরাজের শরণাপন্ন হলেন। তিনি শুধু এই রোগেরই চিকিৎসা করতেন। গ্রামের বাড়ি থেকে আমাকে নারায়ণগঞ্জ আনাও হয়েছিল এই কবিরাজকে দেখানোর জন্য।

তখনকার সময়ে এদেশে এই রোগের কবিরাজি চিকিৎসা ছাড়া অন্যকোনো সুচিকিৎসা ছিল না। আমাকে যে কবিরাজ চিকিৎসা করেছিল, তিনি ছিলেন একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তিনি মাশীতলা দেবী’র সাধন করতেন এবং যেখানেই এই রোগ দেখা দিতো, সেখানেই দৌড়ে যেতেন। বিনা পয়সায় চিকিৎসা করতেন। উনার চিকিৎসায় এই রোগ থেকে সেরে ওঠলে নামমাত্রও কিছু নিতেন না। আমার এই রোগ হওয়ার আগে থেকেই ওই সাধকের পরিবারের সাথে আমার মা-বাবার খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাই এই চিকিৎসক আমার সু-চিকিৎসার জন্য এবং আমাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমাদের বাসায় বসেই মা শীতলা দেবী’র পূজা করতেন এবং আমাকে চিকিৎসা করতেন। উনি প্রচুর মদপান করতেন। শীতলা দেবী’র পূজা সেরে উনি মদ পানের সাথে আমার শরীরও নাকি চেটে খেতেন। শুনেছি মায়ের মুখে।

সেসময় এই গুটিবসন্তের কারণে আমার সমস্ত শরীরই পচন ধরে গিয়েছিল। শরীরের পুরো অংশই ছিল মাংসবিহীন। চৌকির উপর কলাপাতা বিছিয়ে তিলের তেল কলাপাতায় মেখে সেখানে আমাকে শোয়াইয়ে রাখতো। এমনিতেই এই রোগ হলে একরকম চুলকানির মতো রোগ। এই রোগ হলে সমস্ত শরীরই চুলকায়। শরীর চুলকানির কারণে আমি নাকি সবসময়ই আমার দুইহাত দিয়ে মুখমণ্ডল-সহ সারা শরীর সারাক্ষণ খামচাতাম। এজন্য আমার হাত পা চৌকির চার পায়ার সাথে বেঁধে রাখা হতো। যাতে আমি হাত পা দিয়ে শরীর না খামচাতে পারি। তবুও মাঝে মাঝে হাত দিয়ে খামচানোর ফলে, আমার মুখমণ্ডলের মাংস (ত্বক) হাতের নখের খোঁচায় এদিক-সেদিক হয়ে গিয়েছিল। সাথে দু’চোখের মনিতেও গুটিবসন্ত উঠেছিল। তিনমাস মৃত্যুশয্যা থেকে সেরে উঠার পর অন্তত বছরখানেক আমি অন্ধ মানুষের মতো দু-হাত নেড়ে-চেড়ে চলতাম। ওই কবিরাজের সাজেশন মতো পুকুরে জন্মানো বড় আকারের শামুকের জল প্রতিদিন তিনবেলা কয়েক ফোঁটা করে দেওয়ার পর আমার চোখ আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মুখমণ্ডল থেকে সরে যাওয়া মাংস(ত্বক) আর সমান হয়নি। আমার চেহারা এখনো কুশ্রী।

এই কুশ্রী চেহারা আর নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষার কারণে আদর্শ কটন মিল অভ্যন্তরে থাকা সমবয়সী ছেলেরা আমাকে দেখে একরকম ঘৃণাই করতো। হাসতো, ভেংচি দিতো। এতে আমার খুব রাগ হতো। অনেক সময় বেশি রাগ হয়ে যেতো। তখন মিল অভ্যন্তরে অনেক ছেলেকে ধামধুম মেরে নিজেদের বাসায় এসে বসে থাকতাম। আর বাড়ি থেকে সাথে আনা পুরানো বইগুলো নিজে নিজেই পড়তাম। এভাবে আস্তে আস্তে নিজে নিজেই নারায়ণগঞ্জের কিছু আঞ্চলিক ভাষা রপ্ত করে ফেললাম। বাসার বাইরে যেতাম। মিলের ভেতরে স্থায়ীভাবে থাকা সমবয়সী ছেলেরাও আস্তে আস্তে আমাকে কাছে ডাকতে শুরু করলো। ওঁদের সাথে খেলতে বলতো। আমিও ওঁদের সাথে মিশতাম, খেলতাম। যখন যা-ই করতাম, বাসায় এসে নিয়মিত পুরানো বইগুলো একা একা নেড়ে-চেড়ে পড়তাম। স্কুলে ভর্তি করে দেওয়ার জন্য মায়ের কাছে কেঁদে কেঁদে বলতাম। মা শুনতেন, কিন্তু আমার কথায় সায় দিতেন না। কারণ আদর্শ কটন মিলের ফ্যামিলি কোয়ার্টারে সব ফ্যামিলিদের মধ্যে আমরাই ছিলাম একেবারে নিকৃষ্ট ফ্যামিলি। মানে অভাবগ্রস্ত ফ্যামিলি।

তখন আমাদের সংসার ছিল মা-বাবা, দাদা-বৌদি, দুকজন ভাতিজা, একজন ভাতিজী, অবিবাহিত দুই বোন ও আমি-সহ মোট নয়জন সদস্যের বিরাট এক সংসার। ইনকাম করার মতো ছিল আমার বাবা আর বড়দাদা। তাও ছিল নামমাত্র বেতন। মাসের প্রত্যেক দিনই তিনবেলার মধ্যে শুধু দুপুরবেলাই আমাদের কপালে ভাত জুটতো। আর দিনের দুইবেলার মধ্যে কোনো-কোনো সময় শুধু একবেলা খেতে পারতাম। আর একবেলা থাকত হতো আকাশ পানে চেয়ে। তখন মিল কর্তৃপক্ষ থেকে প্রত্যেক শ্রমিক ও স্টাফের রেশন কার্ড দেওয়া ছিল। আমাদেরও ছিল। বাবারও ছিল। বড় দাদারও ছিল। রেশন কার্ডে শুধু চাল, গম, চিনি পেতাম। আমাদের সংসার মাসের অর্ধেক সময় রেশন কার্ডের উপর নির্ভর থাকতো। কোনো-কোনো সময় নগদ টাকা না থাকার কারণে রেশন তুলতে পারতাম না। তখন সামান্য লাভে রেশন বিক্রি করে দিতে হতো। ওই রেশন বিক্রির লাভের টাকা দিয়ে অন্য কারোর রেশন থেকে গম কিনে নিতাম। সেই গম থেকে আটা করে সকাল-বিকাল আটার রুটি খেতাম। সময়টা তখন ১৯৭৩ সালের শেষদিকে। এরই মধ্যে দেশে দেখা দিতে শুরু করলো দুর্ভিক্ষ। এমন অবস্থার মধ্যে আমাকে আবার স্কুলে ভর্তি করানো যেন মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে দাঁড়ালো। তবুও আমার পড়ার আগ্রহ দেখে সংসারের অভাব অনটনের মধ্যেও ১৯৭৪ সালের জানুয়ারি মাসে আমার বড়দাদা নিকটস্থ দক্ষিণ লক্ষ্মণ খোলা ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি করে দেয়।

তখন দেশের চারদিকে দুর্ভিক্ষ! জায়গায় জায়গায় মানুষ না খেয়ে মরছে, এমন খবর সবসময়ই সবার মুখে মুখে থাকতো। সেসময় আমাদের মতো কষ্ট এদেশে আর কেউ হয়তো করেনি। দুইবেলা আটার জাউ ছিল আমাদের সংসারের নিয়মিত খাবারের তালিকায়। আর দুপুরবেলা চালের সাথে বেশি করে আলু কুচি দিয়ে ভাত রান্না করা হতো। মানে চালের উপর চাপ কমানো। চাল কম, আলু বেশি। সেসময় অভাব অনটন যে কী তা আমি এতো বুঝতাম না। আমি স্কুলে যাওয়ার সময় তামার দুই পয়সার জন্য মায়ের কাছে চেয়ে কাঁদতাম। কোনও দিন পেতাম। কোনও দিন আবার পেতাম না, কাঁদতে কাঁদতে বই বগলে নিয়ে স্কুলে চলে যেতাম। স্কুলে গিয়ে দেখতাম আরও দশজন সমবয়সী মনের আনন্দে আইসক্রিম খেতো, বুট ভাজা খেতো, এটা খেতো, সেটা খেতো। আমি চেয়ে চেয়ে দেখতাম, আর চোখের জল ফেলতাম। তবুও পারতপক্ষে কোনও দিন স্কুলে যাওয়া বন্ধ করিনি। আমি আমার ক্লাসে সবসময়ই নিয়মিত ছিলাম। ঘরে খাবার না থাকলেও, আমি বান্দা স্কুলে যেতাম।

সেই স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ১নং ঢাকেশ্বরী কটন মিলের হাইস্কুলে ভর্তি হলাম ঠিক, কিন্তু সংসারের অভাব অনটন আমাকে দুর্বল করে তোলে। স্কুল থেকে বাসায় আসার পর যখন দেখতাম ভাতের হাঁড়িতে ভাত নেই, তখন কাউকে কিছু না বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে শীতলক্ষ্যা নদী ঘেঁষা আদর্শ কটন মিলের খেলার মাঠের এককোণে নিরিবিলি বসে থাকতাম অথবা সমবয়সী বন্ধুদের সাথে খালি পেটে খেলায় মেতে থাকতাম। অনেকসময় সন্ধ্যাবেলা বন্ধুদের সাথে লক্ষ্মণখোলা জনতা ক্লাবে টেলিভিশন দেখতে চলে যেতাম। তখন আদর্শ কটন মিলে টেলিভিশন ছিল না। তখনকার সময়ে টেলিভিশনের খুবই দাম ছিল, মান ছিল, সম্মান ছিল। এখনকার মতো ঘরে ঘরে, মহল্লার আনাচে-কানাচে, হাটবাজারে টেলিভিশন ছিল না। টেলিভিশন ছিল সাতরাজার ধন, মানিক রতন। যা ছিল স্বপ্নের ব্যাপার-স্যাপার।

অনেকসময় টেলিভিশন দেখতে গিয়ে লক্ষ্মণখোলার স্থানীয় ছেলেদের হাতে মাইর-গুতা খেয়ে বাসায় ফিরতাম। বাসায় এসে দেখতাম রাতের খাবার তখনও জোগাড় হয়নি। না খেয়ে ওমনি বই নিয়ে পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে থাকতাম। অনেক রাতে বড় দিদিরা ভাত খেতে ডাকতো। কোনও দিন ওঠে খেতাম। কোনও দিন আর উঠতাম না। না খেয়েই ঘুমিয়ে থাকতাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ ধুয়ে জল দেওয়া পান্তাভাত খেয়ে আবার পড়তে বসতাম। স্কুলে যাবার সময় হলে শীতলক্ষ্যা নদীতে স্নান করে তাড়াতাড়ি স্কুলে চলে যেতাম। স্কুল ছুটির পর বাসায় এসে কোনও দিন দেখতাম ভাতের হাঁড়িতে ভাত আছে, কোনও দিন দেখতাম ভাত নেই। এভাবেই সেসময়কার দিনগুলো আমাদের অতিবাহিত হতে লাগলো। দেশের দুর্ভিক্ষও তখন আস্তে আস্তে হাত নেড়ে দূরে যেতে লাগলো। কিন্তুক আমাদের সংসারে লেগে থাকা দুর্ভিক্ষ তখনও দূর হয়নি। বারোমাসি দুর্ভিক্ষ আমাদের সংসারের লেগেই থাকলো। সেসময় স্কুলে যাওয়ার মতো পোশাকও আমার ছিল না। বাবা ও বড়দাদা মিল থেকে পাওয়া রিজেক্ট কাপড় দিয়ে বড়দি’র হাতে বানানো জামা- হাফপ্যান্ট পরে স্কুলে যেতাম। পায়ের স্যান্ডেলও ছিল না।

চলবে…

জীবনের গল্প-৩  

জীবনের গল্প-১

২৫৮জন ২৭জন
0 Shares

২৮টি মন্তব্য

    • নিতাই বাবু

      আমি এখনো অনেক কষ্ট করে দিনাতিপাত করে থাকি দাদা। তবুও আগে চেয়ে অনেক অনেকগুণ ভালো আছি। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি, যাতে জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো এভাবেই পার করতে পারি। মহা স্রষ্টা যেন আমার সহায় হয়।
      মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদের সাথা শুভকামনাও থাকলো, শ্রদ্ধেয় দাদা।

  • মোঃ মজিবর রহমান

    পড়তে পড়তে অতিশয় চোখের জলে আসল। এই হইতো বিধাতার চাওয়া বা পাওয়া।
    এতো কষেটের যাদের জিবন ফ্রি বৃথা যায়না। আপনার আপ্রান চেষ্টায় পড়াশুনা যা করেছেন সুন্দর ও নান্দনিক গল্প উপহার দিচ্ছেন
    এই টা আপনার জিবনের সফলতা। একজন একাডেমিক শিক্ষিত ব্যাক্তি হাজার চেষ্টা করেও কবিতা, গল্প লিখতে সার্থক হচ্ছেনা।
    এগুয়ে যান। আল্লাহ সফলতা দেবেই। ইনশাল্লাহ।

  • প্রদীপ চক্রবর্তী

    জীবনের গল্প করুণ আর কঠিন বাস্তবতা নিয়ে লেখা।
    পড়ে চোখেরজল এসেছে।
    আপনারা কঠিন হতে কঠিনতর পথ অতিক্রম করে এসেছেন।
    কঠিন একদিন সহজ হয়ে আসে।
    শুভকামনা দাদা।
    আপনি জীবনযুদ্ধে হার না মানা এক অগ্র সৈনিক।

    • নিতাই বাবু

      মনে হয় আমার জীবনের কষ্ট জীবন শেষ পর্যন্তই সাথী হয়ে থাকছে, দাদা। কারণ, আমিতো এখনো অনেক কষ্ট করে দিনাতিপাত করছি। তাতে কোনও দুঃখ আমার নেই! তবে হ্যাঁ, আগের চেয়ে অনেক অনেকগুণ ভালো আছি। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি, যাতে জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো এভাবেই পার করতে পারি। মহান স্রষ্টা যেন আমার সহায় হয়।

      মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদের সাথা শুভকামনাও থাকলো, শ্রদ্ধেয় দাদা।

  • খাদিজাতুল কুবরা

    আপনার বলা জীবন গল্প আমি আমার মায়ের কাছে যা শুনেছি তার সাথে হুবহু মিলে গেছে। যুদ্ধের সময় তিনি ছোট ছিলেন,কিছু কিছু স্মৃতি মনে আছে আমাদেরকে সবসময় বলেন। আমার নানুর বাড়ি নাটেশ্বর।

    আপনার গল্পটা এক লড়াকু যোদ্ধার।
    লিখুন দাদা আমরা এখনকার প্রজন্মের জানা উচিৎ কতো কষ্ট মানুষ পড়াশোনা করেছে এবং সৎপথে থেকেছে।
    শুভকামনা রইল দাদা।

    • নিতাই বাবু

      শ্রদ্ধেয় দিদি, যদিও আমার নোয়াখালীতে জন্ম, তবুও আমার নাটেশ্বর কখনো যাওয়া হয়নি আমার। তবে হ্যাঁ, নাটেশ্বর নাম শুনেছি। আর যাবোই বা কী করে বলুন! আমিতো সেই ছোটবেলা থেকে বাড়িছাড়া। নাবালক থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জই আমার বসবাস। তবে মাটির টানে মাঝেমধ্যে কয়েকবারই দেশের বাড়িতে গিয়েছিলাম। তাছাড়াও আমার মামা বাড়ি সোনাপুর রেলস্টেশনের পশ্চিমে বারাইপুর গ্রামে। আমার মাসিমার বাড়ি সোনাপুর রেলস্টেশনে পূর্বে রাজুরগাঁ গ্রামে। আমার এক বায়রা বাড়ি চৌমুহনীর আগে জমিদার হাট সংলগ্ন। তাই এখনো মাটি টানে আর আত্মীয়দের আত্মার টানে মাঝেমধ্যে যাওয়া হয়। নিজেদের বাড়ি গিয়ে ঘুরেফিরে দেখে আসি। বাড়ির উঠোনের মাটি গায়ে মেখে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে আসি। পরিশেষে সুন্দর মন্তব্যের জন্য আপনাকে অজস্র ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সাথে শুভকামনাও থাকলো শ্রদ্ধেয় দিদি।

    • নিতাই বাবু

      আমিতো এখনো অনেক কষ্ট করে দিনাতিপাত করছি। তবে হ্যাঁ, আগের চেয়ে অনেক অনেকগুণ ভালো আছি। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি, যাতে জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো এভাবেই পার করতে পারি। মহান স্রষ্টা যেন আমার সহায় হয়।

      মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদের সাথা শুভকামনাও থাকলো, শ্রদ্ধেয় দাদা।

  • সুপর্ণা ফাল্গুনী

    দাদা আপনার জীবনের ঘটনা গুলো আমার বাবা-জ্যাঠার সাথে মিলে যায়। আমার ঠাকুরদা হিসেবী ছিলো না আর সৌখিন ছিল বলে তাকে তার প্রাপ্য সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে তার ভাইয়েরা। ঠাকুরদা মারা যাবার সময় ছোট পিসির বয়স ছিলো এক বছর, তারপর খুব কষ্ট করে জ্যাঠামনি জমির কাজ করে পাঁচ ভাই বোন আর মায়ের পেট চালিয়েছে। আপনাদের তো দুই বেলা খাবার জুটতো তাদের তাও জুটতো না। আটা দিয়ে জাউ রান্না করে খেতো, চাউলের খুদ রান্না হতো। আমার বাবা পড়াশোনায় ভালো ছিলো বলে স্কুল তাকে অনেক সাহায্য করতো। মেট্রিক পরীক্ষার ফরম ফিলাপের টাকা দেবার কথা বলেও তার জ্যাঠা টাকা দেয়নি। তখন আমার ঠাকুরমা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের হাতে পায়ে ধরে ফরম ফিলাপের টাকা মওকুফ করেন অর্ধেকটা। আপনার চেয়েও আমাদের অবস্থা খুব খারাপ ছিলো। কেউ কোন সাহায্য করেনি । আপনার লেখা পড়ে সেইসব কথা মনে পড়ে গেল। আমি যখন শুনতাম খুব খারাপ লাগতো এসব শুনে ।

  • সুপায়ন বড়ুয়া

    জীবনের গল্প বড়ই কষ্টের
    আর কঠিন ও কঠোর বাস্তবতা নিয়ে লেখা।
    পড়ে মনটা ভারী হয়ে আসছে
    জীবন আবার সুন্দর স্বাভাবিক হোক
    জীবনযুদ্ধে হার না মানা এক সৈনিক।
    ভাল থাকবেন। শুভকামনা দাদা।

    • নিতাই বাবু

      আমিতো এখনো অনেক কষ্ট করে দিনাতিপাত করছি, শ্রদ্ধেয় দাদা । তবে হ্যাঁ, আগের চেয়ে অনেক অনেকগুণ ভালো আছি। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি, যাতে জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো এভাবেই পার করতে পারি। মহান স্রষ্টা যেন আমার সহায় হয়।

      মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদের সাথা শুভকামনাও থাকলো, শ্রদ্ধেয় দাদা।

    • নিতাই বাবু

      আমিতো এখনো অনেক কষ্ট করে দিনাতিপাত করছি, শ্রদ্ধেয় কবি মহারাজ। তবুও অনেকে ভাবে, আমি অনেক পয়সাওয়ালা। তা ভাবাটাও স্বাভাবিক! কারণ আমার চালচলন সবকিছুই জমিদারি ভাব! আমার এলাকার সবাই বলে,”আপনি সত্যিই জমিদার।” তাঁদের কথায় আমি প্রত্যুত্তরে বলি, এসব মহান সৃষ্টিকর্তা আর আপনাদের সকলের আশীর্বাদ।”
      তবে হ্যাঁ, আগের চেয়ে অনেক অনেকগুণ ভালো আছি। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি, যাতে জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো এভাবেই পার করতে পারি। মহান স্রষ্টা যেন আমার সহায় হয়।

      মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদের সাথা শুভকামনাও থাকলো, শ্রদ্ধেয় কবি মহারাজ।

  • সুরাইয়া নার্গিস

    শ্রদ্ধেয় দাদা আপনার লেখাটা পড়তে গিয়ে চোখের কোণে পানি চলে আসলো।
    মানুষের জীবনের কত কঠিন সময় আসে,কষ্ট আসে সেটা আপনার লেখায় পেলাম।
    জীবনে হয়ত এতটা বাস্তবতার সমুক্ষীন হইনি তবে অন্যের জীবনে দেখেছি, জীবন যুদ্ধে হার না মানা একজান সৈনিক আপনি স্যালুট দাদা।দোয়া রইল এগিয়ে যান আল্লাহ আপনার পরিবারের সহায় হোন।

    ভালো থাকুন, শুভ কামনা রইল।

    • নিতাই বাবু

      আমিতো এখনো অনেক কষ্ট করে দিনাতিপাত করছি, দাদা। তা তো আপনি নিশ্চয়ই জানেন। তবে হ্যাঁ, আগের চেয়ে অনেক অনেকগুণ ভালো আছি। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি, যাতে জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো এভাবেই পার করতে পারি। মহান স্রষ্টা যেন আমার সহায় হয়।

      মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদের সাথে শুভকামনাও থাকলো, শ্রদ্ধেয় দাদা।

  • পর্তুলিকা

    শুনেছি গুটি বসন্ত হলে শুধু চেহারাই কুৎসিত হয়না অনেক মানুষ চিরতরে অন্ধ হয়ে যায়। অনেকদিন পর ব্লগে এসে আপনার লেখা পড়ে আমার মনটা মর্মাহত হলো। মানুষের জীবনে কত লুক্কায়িত সত্য থাকে তা আমরা কল্পনায়ও আনতে পারি না

    • নিতাই বাবু

      হ্যাঁ, গুটিবসন্ত হলে অনেক মানুষ চিরতরে অন্ধ হয়ে যায়, তা একশো-তে-একশো সত্য। আমি অন্তত বছরখানেক অন্ধ মানুষের মতো ছিলাম। আমার দু’চোখের মনিতেই উঠেছিল। বছর দুএক আগে আমার চোখে সমস্যা হয়েছিল। তখন আমি নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে চোখের ডাক্তারের কাছে যাই। ডাক্তার তখন আমার চোখ পরীক্ষা করে দেখে আমার চোখের মনির ঠিক মাঝখানে তিলের মতো কালো একটা দাগ। ডাক্তার তখন আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “আপনার চোখের মনিতে আমি একটা কালো ফোটা দেখতে পাচ্ছি। এইরকম কালো ফোটা চোখের মনিতে আমি আজ পর্যন্ত আর কারোই চোখেই দেখিনি। এটা কিসের কালো ফোটা? আপনি কি কখনো দু’চোখে একসাথে কখনো কোনপ্রকার আঘাত পেয়েছিলেন?”
      আমি বললাম না! ‘আমি আমার চোখে কোনদিন মারাত্মক আঘাত পাইনি। তবে মায়ের কাছে শুনেছি আমার চার বছর বয়সের সময় আমার সমস্ত শরীরে গুটিবসন্ত উঠেছিল এবং সেসময় আমি তিনমাস পর্যন্ত বিছানায় শয্যাশায়ী ছিলাম। পরবর্তীতে আমি অন্তত বছরখানেক চোখে দেখিনি। অন্ধ মানুষের মতো দু’হাত নেড়েচেড়ে চলেছি। তাই মনে হয় এই কালো ফোটা মনে হয় সেই গুটিবসন্তেরই দাগ হতে পারে।’
      কিন্তু তাতে ডাক্তারের বিশ্বাস হলো না। তিনি আরও চারজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ নিয়ে আমার চোখের ব্যাপারে আলোচনায় বসলেন। আমার চোখ ঐ চারজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখলেন। আমার চোখ দেখে সবাই অবাক হয়ে গেলো। আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “এতো বছর আপনি কি আমাদের মতো স্পষ্ট দেখেছিলেন?”
      আমি বললাম, হ্যা, ‘আমি এই চোখ নিয়ে এতো বছর কাপড়ের মিলে সুতোর কাজ করেছি। যদি চোখে তেমন সমস্যা থাকতো, তাহলে কি আমি সুতোর কাজ করতে পারতাম?’ চার-পাঁচ জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তখন দস্তুরমত অবাক হয়ে গেল! তারপরও আমাকে তাঁরা ঢাকা জাতীয় চক্ষু ইনিস্টিউটে পেয়েছিল, উন্নত যন্ত্রের সাহায্যে ভালো করে চোখ পরীক্ষা করার জন্য।
      এ-বিষয়ে লিখতে গেলে ছোটখাটো একটা ব্লগপোস্ট হয়ে যাবে। তাই আজ এ-বিষয়ে এপর্যন্তই থাকুক।
      পরিশেষে আপনার সুন্দর মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

  • সাবিনা ইয়াসমিন

    দেশের মানুষ ধনী হয়, দেশে দুর্ভিক্ষ এসে চলেও যায়, কিন্তু কিছু মানুষের ভাগ্য একই জায়গায় আটকে থাকে। কখনো কখনো মনেহয় ৭১ থেকে ৭৬ পর্যন্ত আমাদের দেশের উপর দিয়ে যেসকল ভয়াবহ দুর্যোগ গেছে তার মধ্যে দুর্ভিক্ষের স্মৃতিটাই মানুষ বেশি মনে রেখেছে। রোগ-শোক সহ যেকোনো কষ্টের স্মৃতি এক সময়ে ঝাপসা হয়ে এলেও ক্ষুধার কষ্ট কেউ সহজে ভুলতে পারে না। আমার মায়ের মুখে শুনেছি, যুদ্ধের সময় তার নয়/দশ বছর ছিলো। নানা-নানির সাথে তারা ছয় ভাইবোন প্রত্যন্ত গ্রামে তাদের এক দুর সম্পর্কের আত্মীয়র বাড়ি উঠেছিলেন। তারা সেসময় আলু খেয়ে থাকতেন। গ্রামের সবাই নাকি তাই-ই খেতো।

    উপরের একজনের কমেন্ট এর জবাবে আপনার গুটি বসন্ত সম্পর্কে পড়লাম। উপরওয়ালা আপনার মায়ের কঠোর সাধনা ব্যর্থ হতে দেননি, তাই তিনি আপনার দুচোখ সহ আপনাকে পরিপূর্ণ সুস্থতা দান করেছেন।

    লেখা চলুক, সাথে থাকার আশা করছি।
    ভালো থাকুন দাদা,
    শুভ কামনা 🌹🌹

    • নিতাই বাবু

      যে যত কষ্টই করুক, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের মতো এমন কষ্ট মনে হয় আর কেউ করেনি। আর ১৯৭৪ সালে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেওয়ার সময়ও সবচেয়ে বেশি কষ্ট আমারাই মনে হয় করেছি। ভুলতে পারি না সেসময় কষ্টের কথস, দিদি।
      আর হ্যাঁ, আমি গুটিবসন্ত রোগ থেকে মুক্তি পেয়েছি মহান সৃষ্টিকর্তার কৃপা ও আমার মা-বাবা-সহ পরিবারের সকলের আপ্রাণ চেষ্টার কারণে।
      সুন্দর গঠনমূলক মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদের সাথে শুভকামনাও থাকলো শ্রদ্ধেয় দিদি। আশা করি এই সময়ে সপরিবারে ভালো থাকবেন।

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য