উদ্বাস্তু জীবন

ইসিয়াক ১ এপ্রিল ২০২০, বুধবার, ০৫:৫৪:৪০অপরাহ্ন গল্প ১৪ মন্তব্য

[১]
আজ প্রচন্ড গরম পড়েছে। সাথে বাতাসহীন একটি রাত। চৈত্রের এইসব দিনগুলিতে রাত নামার সাথে সাথে তাপমাত্রা কমে আসতে থাকে। আজ তাপমাত্রা কমার কোন লক্ষণ নেই। রাতে যে ঠিক মত ঘুম হবে না তা বোঝাই যাচ্ছে।
সুলেখা ভাঙা পাখা দিয়ে ক্রমাগত জোরে বাতাস করে চলেছে। বাতাস গায়ে লাগছে বলে মনে হচ্ছে না।গরমে দম বন্ধ হয়ে আসছে যেনো। নিজের কথা সুলেখা খুব একটা ভাবে না কিন্তু বাচ্চা দুটোর কষ্ট দেখলে তার বুক ফেটে যায়।
সবসময় সে আল্লাহর কাছে দোয়া করে আল্লাহ তুমি আমার পাপের দায় মাসুম বাচ্চা দুটোর উপর চাপিয়ো না। আল্লাহ শোনেন কিনা কে জানে। তিনি তো মহান ।তিনি যা করেন ভালোর জন্য ই করেন হয়তো আমরা পাপী বান্দা তার কাজ গুলি বুঝতে পারি না।
মারুফের দুচোখের পাতা কিছুতেই এক হচ্ছে না। এত গরম পড়লে ঘুমানো যায় না।
-মা তুমি ঘুমাইছো?
-না বাবা,তুই ঘুমাও।আমি বাতাস করছি।চোখ বন্ধ কর ঘুম এসে যাবে।
-মা,বাবা কবে আসবে।
ছেলের এই কথার উত্তর সত্যি সত্যি সুলেখার জানা নেই। সে চুপ করে থাকে। সবার অলক্ষে তার দুচোখ দিয়ে ক’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে।সে কিছুতেই মারুফের বাপের কথা মনে করতে চায় না।নিজেকে সামলে নিয়ে সে কোন রকমে উত্তর দেয়।
-জানি নারে বাবু,আমি সত্যি জানি না ।
বিউটির চোখেও ঘুম নেই সে অভিযোগ করে,
-মা বাবা না খুব পঁচা।বাবা আইলে তুমি বাবাকে খুব করে বকা দিবা।
-নারে মা তোর বাবা আর যাই হোক বেইমান না।কিছু না কিছু বিপদ তো হয়েছে। নাইলে লোকটা ফিরবো না কেন?
তারপর হঠাৎ চুপচাপ তিনটা্ দুঃখী মানুষ চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে নিশ্চল ভাবে যেনো নিঃশব্দে তাদের কষ্ট ভাগাভাগি করে নেয়। রাত বাড়ে ।সময় গড়িয়ে চলে । এক সময় অসহায় তিনটি প্রাণির চোখে ঘুম আসে প্রাকৃতিক নিয়মে।
[২]
সুলেখা আর আবুবকর দুজন দুজনকে ভালোবাসে পাগলের মতো।সুলেখার স্কুলে যাবার পথেই পরিচয় আবুবকরের সাথে।তার কথাবার্তা আচার আচরণ সবকিছু সুলেখাকে খুব করে টানে ।প্রেম হতে সময় লাগে না যেমনি, তেমনি তাদের প্রেমের খবর বাড়ি অবধি পৌছাতেও সময় নেয় না। চরম অশান্তি শুরু হয়।একসময় তারা সিদ্ধান্ত নেয় পালিয়ে বিয়ে করবে যা থাকে কপালে। কারণ তারা ভালো করেই বুঝতে পারে পারিবারিক বংশগৌবর তাদের মিলনের পথে বড় বাধা। সেক্ষেত্রে যা করার নিজেরাই করতে হবে।
যেই ভাবা সেই কাজ খুব তাড়াতাড়ি তারা বিয়ের কাজটা শেষ করে জেলা শহরে তারা একটা ঘর ভাড়া নিয়ে বসবাস করা শুরু করে।দিনগুলো ভালোই কাটছিলো। আবুবকরের গরুর ব্যবসা।কাঁচা পয়সার আমদানি ভালোই হতে লাগলো ।একে একে দুই সন্তান এলো সুলেখার কোল জুড়ে।
বাচ্চারাও বড় হতে লাগলো দ্রুত কিন্তু মানুষের জীবনে বোধহয় সুখ চিরদিন স্থায়ী হয় না। গত কুরবানি ইদে আবুবকর গরু নিয়ে চিটাগাং যাবার নাম করে বাড়ি ছাড়ে।প্রতিবার সাধারণত ইদের রাতে বা ইদের দিন হাট শেষ করে আবুবকর বাড়ি ফেরে কিন্তু এবার ইদের একে একে পাঁচদিন পার হয়ে গেলেও সে কোন রকম বাড়ি ফেরে না।অথচ ইদের রাতেও তার সাথে মোবাইলে কথা বলে সুলেখা ।কি করবে কি হবে ভেবে ভেবে যেনো অথৈ সাগরে পড়ে সে।থানা পুলিশ খোঁজ খবর কোনটাই করতে বাকী রাখে না সে।কিন্তু লোকটার কোন হদিস মেলে না। নানা চিন্তা ভাবনায় দিশেহারা হয়ে পড়ে। একদিন সে তার দুই সন্তান নিয়ে আবুবকরের বাড়ি গিয়ে ওঠে। হাজার হোক তাদেরই তো সন্তান ঠিক হয়তো তাকে খুঁজে বের করতে পারবে।
কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক। তাদের আগমনে যেনো পুরো পাড়া ভেঙে পড়ে। সারা বাড়ি লোকে লোকারণ্য ।এমনিতে গ্রামের লোক আবুবকরের বউকে সেভাবে দেখেনি সাথে ছেলে মেয়ে দুটো ও নাকি এসেছে। তার উপর বড় খবর আবুবকর নাকি হারিয়ে গেছে। আরে বাবা আবুবকর কি ছোট বাচ্চা হারিয়ে যাবে।মুহুর্তে সারা গ্রাম জুড়ে রটে যায় আবুবকরের বউ একটা খারাপ মেয়ে ছেলে। সেই পরপুরুষের সাথে ইটিশ পিটিম করে আবুবকরকে গুম করে দিয়েছে। এখন সে আবুবকরকে খোঁজার নাম করে নাটক করতে আসছে।
সারাদিন চলে গেলেও কেউ  অসহায় তিনটি  প্রাণিকে এক মুঠো খেতে দিলো না।আরো বরং আবু বকরের বড় ভাই ভয় দেখালো সুলেখা যদি আর কোন দিন ভুল করেও এই গ্রামে পা দেয় তবে আবুবকরকে খুন করার অপরাধে তাকে পুলিশে তুলে দেবে।
[৩]
সুলেখা কোন রকমে পালিয়ে ফিরে আসে নিজের আশ্রয়ে। আশ্রয় বলতে ছোট এই এক কামড়ার ঘর। ভাড়াবাড়ি । হাতে খুব বেশি নগদ অর্থও নেই যে তাই দিনে কয়েকমাস চলবে।নানারকম ভাবনা চিন্তার পর সে সিদ্ধান্ত নেয় নিজের বাবার বাড়িতে ফিরবে। তার বাবা নিশ্চয় তাকে ফিরিয়ে দেবে না।সে দু একদিনের মধ্যে নিজের যথসামান্য যা কিছু ছিলো তাই নিয়ে নিজের বাপের বাড়ির গ্রামে ফিরে আসে এক বিকেল বেলা।
যথারীতি সবাই তাকে দেখে একটু অবাক হয়।মধ্যে অনেকগুলো বছর পার হয়ে গেছে দুর থেকে টুকটাক খবর ঠিকই পাওয়া যেতো যেমন পাওয়া গেছে আবুবকরের নিখোঁজ হবার খবর। নিচু বংশের ছেলেকে বিয়ে করেছে বলে সুলেখার খোঁজ নেবার প্রয়োজন বোধ করেনি বাড়ির কেউ। আর যাই হোক এলাকায় তাদের একটা সম্মান আছে। সুলেখা আবুবকরকে বিয়ে করে এমনিতে তাদের পরিবারের সম্মান ক্ষুন্ন করেছে ।পুরো  তাদের গ্রামের মাথা হেট করে দিয়েছে।
জমির মিয়ার বয়স হয়েছে ইতিমধ্যে বড় দুই ছেলেকে বিয়ে দিয়েছেন। আজকাল বাতের ব্যথায় সব কাজ নিজে সামলাতে পারেন না।তাই ঠিক তিনি বড় দুই ছেলেকে জমি জায়গা আদায় পত্রর কিছু কাজ বুঝিয়ে দিয়েছেন।
সুলেখার ব্যপারে তার সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা স্বাভাবিক ভাবেই তার আর একক ভাবে নেই্ । অনেক  মিটিং এর পরে সিদ্ধান্ত হলো সুলেখাকে এই বাড়িতে আশ্রয় দেয়া যেতে পারে কিন্তু বাচ্চা দুটিকে কে নয়।করণ হিসাবে বলা হলো ওদের শরীরে নিচু জাতের রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে ।সমাজে মল্লিক বাড়ির একটা সুনাম আছে।
মানুষ যখন তার শেষ অবলম্বন টুকুও হারাতে বসে তখন সে বেপরোয়া হয়ে যায়। সুলেখাও এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ করে সে সজোরে ঘোষণা করে তাকে আর তার দুই সন্তানকে এই বাড়িতে আশ্রয় না দিলে এই বাড়ির সামনে সে ও তার দুই সন্তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আত্নহত্যা করবে। অবশেষে এই বলে রফা হলো সুলেখাকে এই বাড়িতে কাজের বিনিময়ে থাকতে দেয়া হবে। তার ছেলেমেয়ে দুটোও ফাই ফরমায়েশ খাটবে তবে স্কুলে যেতে চাইলে যেতে পারে।এবং তাদের জন্য বরাদ্দ হলো নিচতলায় ফল রাখার গুদোম ঘরটা। এই আশ্রয় টুকুই সুলেখার কাছে অনেক কিছু।তাই সে সব মর্ত মেনে রাজী হয়ে গেলো।
[৪]
এই বাড়ির সেজো ছেলে জহির।সুলেখার তিন নম্বর ভাই।সুলেখার পিঠাপিঠি, তার বিয়ের কথা চলছে। কিন্তু বাড়িতে জনগন আগের তুলনায় অনেক বেড়ে যাওয়ায় নতুন বউ এসে ঠিক কোথায় উঠবে তাই নিয়ে ব্যস্ত সবাই।অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো তিনতলায় দুইরুমের একটা অংশ সম্প্রসারিত করা হবে।
যেই ভাবা সেই কাজ ,একদিনের মধ্যে ইট বালি সিমেন্ট রাজমিস্ত্রি সব এসে হাজির হলো।
মল্লিক বাড়ির ঐতিহ্য হিসাবে প্রথমদিনের কাজ শুরু হলে খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করা হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। সাদা পোলাও ,মুরগীর রোষ্ট খাসীর মাংস। এলাহি ব্যপার ।
মারুফ আর বিউটির আজ অনেক কাজ, অনেক দায়িত্ব পড়েছে তাদের। ছোট ছোট হাত দুটো ইট বয়ে ফুসকা উঠে গেছে।তবুও মনের মধ্যে ভালো খাবার খাওয়ার লোভে সব কষ্ট কে তারা জয় করার চেষ্ট করছে। আজ আর মায়ের সাথে দেখা হয়নি তাদের।স্কুল ও বন্ধ। মা রান্নায় ব্যস্ত।বেলা গড়িয়ে যেতে সুলেখা ছেলেমেয়ে দুটোকে ডেকে নেয়।নিজের হাতে গোসল করিয়ে। হাতের তালুতে নারকেল তেল লাগিয়ে দেয় যাতে করে ফুসকাগুলো জ্বালা না করে।আজ ওরা নিজের হাতে ভাত খেতে পারবেনা , ভাবতেই সুলেখার চোখে জল আসে।সে দুই সন্তানকে জড়িয়ে ধরে একটু আদর করে দেয়।
এখন খেতে হবে বেলা গড়িয়ে যায় যে ……
তারা তিনজন রান্না ঘরে আসতেই দেখে সুলেখার মেজো ভাবি সেখানে ঘুর ঘুর করছে। সুলেখার মেজো ভাবি তাদের দেখে বলে
– ও মেজো আপা খাওয়া দাওয়া হয়ে গেছে ?
এমনিতে মেজোভাবি অনেক বেশি অহংকারী টাইপের।সুলেখা এই বাড়িতে আসা অবধি কোনদিন ই খুব বেশি কথা বলেনি বিশেষ দরকার ছাড়া। তাছাড়া বাড়ির কাজের লোকের সাথে কেইবা বেশি কথা বলে!
সুলেখা মেজো ভাবির প্রশ্নের উত্তরে বলল
-না ভাবি খাওয়া হয়নি।এদের গোসল করাতে গেছিলাম।তুমি খেয়েছো?
-ও হো তাহলে তো মস্ত বড় ভুল হয়ে গেলো দেখছি।আল্লাহ ছি! ছি ! কি হবে বলো দেখি।
-কেন কি হয়েছে ভাবি?
-খাবারগুলি বুঝি তোমাদের জন্য ঢাকা দেওয়া ছিলো, বিশ্বাস করো আমি একদমই বুঝতে পারিনি। আমার ছোট ভাইকে আসতে বলেছিলাম আজকে। ও না আসতে একটু দেরি করে ফেলেছে কি আর করা কিছুই তো ছিলো না সব ফুরিয়ে গেছে। আমি তোমাদের খাবার গুলো ওকে খেতে দিয়েছি।কি হবে বলতো?
সুলেখা কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছিলো না।বাচ্চা দুটোকে কি জবাব দেবে?
মেঝো ভাবি আবার বলল,
-শোন তুমি না হয় এক কাজ করো, দুটো ভাত ফুটিয়ে নাও আলু ভাতে দিয়ে। কি বলো?
সুলেখার আর কি বা বলার আছে? কিছুই বলার নেই। বাচ্চা দুটোর কথা ভেবে তার দুচোখ ফেটে পানি চলে আসতে চাইছে।

১২৭জন ৩৪জন
3 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য