আমার বাবা

রেজওয়ানা কবির ১৯ জুন ২০২১, শনিবার, ০৯:৩৮:১০অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ২২ মন্তব্য

 

বাবা দিবস বলে আসলে কিছু নেই এটা আমার ধারনা। বাবাকে ভালোবাসার জন্য প্রতিটি দিন, প্রতিটি সময়, প্রতিটি মুহূর্ত দরকার,তাই আমার কাছে বাবা দিবস প্রতিদিন। পৃথিবীর সকল বাবার প্রতি আমার শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।

“হও যদি তুমি নীল আকাশ,

আমি তোমার সেই বিস্তৃত আকাশের মাঝে ছোট্ট তাঁরা।

হও যদি তুমি বিশাল সমুদ্র,

আমি তোমার সেই সমুদ্রের গভীরতা পরিমাপের ফ্যাদোমিটার,

“হও যদি তুমি হিমালয়ের সর্বোচ্চ চূড়া,

আমি সেই চূড়ায় পৌছানোর পথ।”

কবিতার ভাষা শেষ। এবার আসি নিজের ভাষায়, তোমার তুমিটার মাঝেই আমাদের বিচরন। প্রজাপতির মত ঘুরে বেড়াই সেই তুমিটার মাঝে।  সবই ঠিক আছে, কিন্তু তোমার একটা গুন বলব না দোষ বলব সেটা হলো,কাউকে ভালোবাসলে গভীরভাবে ভালোবাসা,সেটা নিজের ক্ষতি করে হলেও,আর খুব সহজে মানুষকে আপন করে তাদের বেড়াজালে আটকে সেখান থেকে আর বের হওয়ার যন্ত্রনা খুবই ভয়ানক 😭😭😭যা আমিও এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি।

“বাবা”” শব্দটার মধ্যে অদ্ভুত এক ধরনের শক্তি কাজ করে। যেকোন খারাপ সময়ে, যেমন হোঁচট খেলে, জ্বর  আসলে,এরকম যেকোনো বিপদেই মনের অজান্তেই ও বাবা শব্দটা চলে আসে। বাবা কে নিয়ে আমি প্রায়ই আমার ডায়েরীতে লিখি,তাই নতুন করে লেখার কিছু নাই,তবে যতটুকুই লিখি না কেন?যত লিখি মনে হয় কম হয়ে যাবে৷

বুকের ভিতর বাবার প্রতি আমার  অনেক অনেক অনেক বেশি  অভিমান,আর অভিমান মানেই  আমার কাছে টান,ভালোবাসা। আমার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়েই আমার বাবা।

বাবার সাথে কাটানো সময়গুলো শুধু বুকের ভিতর সবসময়  নাড়া দেয় যা চাইলেও আর সেই আগের মত ফিরে পাওয়া যায় না কেননা সময়তো আর বেঁধে রাখা যায়  না।

গভীর রাতের রংপুর রিকশায় দেখা,সন্ধ্যার পর কফি খাওয়া,বৈশাখে বাবার সাথে নতুন শাড়ী পরে ঘোরা , প্রথম চাইনিজ খাওয়া, কবিতা কি?শেক্সপিয়ার কে?রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র এমনকি হুমায়ুন আহমেদের প্রথম পরিচয় শুনি আমার বাবার কাছে। কিভেবে গল্প লিখতে হয়, কবিতার শব্দচয়ন, নতুন শব্দের অর্থ খোঁজাও আমার বাবার কাছে।  বাংলা সিনেমার নায়ক নায়িকা রাজ্জাক শাবানা , হিন্দি সিনেমার অমিতাভ থেকে শুরু করে মাধুরী দিক্ষিত, টাইটানিকের রোজকেও প্রথম চেনা আমার বাবার কাছ থেকে।

জীবনে সপ্ন দেখতে শেখা,স্বপ্নের কাছাকাছি পৌছাতে চাওয়া, বাস্তবে তার রুপ দেয়ার চেষ্টা ও আমার বাবার কাছ থেকে শেখা।

অতিরিক্ত আবেগের মত চরম বিরক্তিকর জিনিসও আমার  বাবার কাছে শেখা যার ফলে কতবার অকারনে কাঁদতে হয় এখনো। কাউকে গভীর ভাবে ভালোবাসতে শেখাও  আমার বাবার কাছে। শহীদ মিনারে ফুল দেয়া,স্টেডিয়ামে প্রোগাম দেখা,শহর যখন ঘুমন্ত, তখন বাবার স্বরচিত কবিতা শোনা,প্রথম গল্পের বই পড়া,মেলায় যাওয়া,নতুন গান শুনলেই বাবাকে শোনানো,খুব খারাপ লাগলে বাবাকে জড়ায় ধরা,বাবার গায়ের গন্ধ নেয়া,খুব জ্বরে  সারারাত বাবার জলপট্টি  দেয়া,সারারাত জেগে থাকা,নতুন মুভি আসলে বাবার সাথে হলে গিয়ে  দেখা, রাত জাগার মত বাজে অভ্যাস শেখাও বাবার কাছে।

ঘুমালে বাবার ডান হাতের আঙুল ধরে ঘুমানো, পরীক্ষার সময় বাবার রাত জেগে বসে থাকা,হরলিক্স করে দেয়া,তুমি পারবেই এরকম সাহস  বাবার দেয়া।   পৃথিবীতে বাবার  কোন  বিনিময় হয় না। আমার বাবা আমার জীবনের মহানায়ক। আমার জীবনের  চলার পথ আবিস্কারকও  আমার বাবা।

ভুল করলে তা থেকে মুখ থুবড়ে না পরে আবার উঠে সেখান থেকে নতুন শিক্ষা নেয়াও আমার বাবার কাছ থেকে শেখা। তবে যাইহোক না কেন? যে কোন বিপদেই প্রথম যে হাতটা এগিয়ে আসে, যেকিনা বিনা দ্বিধায় চোখ বন্ধ করে আমার হাতটি শক্ত করে ধরে রাখে সে আর কেউ না আমার বাবা। “বাবা” যার হাত ধরে হাটি হাটি পা করে আজ এই খানে আমার আসা।

বাবা যখন আমায় ভার্সিটিতে পড়ার  সময় বাসে উঠানোর পর পানি চিপস কিনে দিয়ে যতক্ষন গাড়ি চোখের আড়াল হত না ততক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে থাকত।

আজও যখন বাবার পাশে ঘুমাই, তখন বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে নিরবে চোখের পানি ফেলে, তবে ছোটবেলায় গভীর ঘুমে টেরই পেতাম না যে বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে নিরবে কাঁদে। এখন বুঝি আর বাবার কাঁদার পর বাবার হাতটা ঘুমের ভান করে আমি শক্ত করে জড়িয়ে ধরি। বাবা এর অর্থ বোঝে কিনা জানি না, তবে আমি বুঝি ❤️। তাই  আমিও এখন শুধু ঘুমের ভানে অপেক্ষায় থাকি কখন বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে। এই হলো আমার পাগল বাবার আধপাগলী মেয়ে আমি।

আমার বাবা,আমার পৃথিবী,আমার মাঝে বাবার ভাল গুনাবলীগুলো সবই নাকি বিরাজমান এই কথাটা আমার আপনজনের কাছে শোনা। আমার বাবা আমার কফি খাওয়ার সঙ্গী, বাবা আমার রংপুরের সব রাস্তার সঙ্গী।  খারাপ সময়ে বাবা কে জরায় ধরা,ভাল সময়ে বাবার হাত ধরে থাকা,আমার ভাল মন্দ সবকিছুতে ছাতার মত সব ঝর হাওয়া থেকে আমাকে রক্ষা করত আমার বাবা।

“”বাবা কে নিয়ে লিখলে কখনো শেষ হবে না। শুধু এটুকুই বলতে পারি আমার বাবা আমার ভিতরে শুন্যতা পুরনের সঙ্গী। এরকম অসংখ্য স্মৃতি বাবার সাথে আমার। এগুলোই আমার বাকি জীবনের বেচেঁ  থাকার  অনুপ্রেরনা। এসব আকঁড়েই বাকিটা পথ পাড়ি দিতে চাই। । তবে এটা সত্যি আমার বাবার সাথে আমার খুব অভিমানের সম্পর্ক।

বাবা, তুমি আছো বলেই আজও আমি শতকিছুর পরও আমার সবকিছুতেই তোমাকে অনুভব করি, লিখতে পারি, শক্তি পাই বেঁচে থাকার।

সময় বদলেছে, আমি বড় হয়ে গেছি,বাবা বুড়ো হয়ে গেছে🤪বয়স বেড়েছে, অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে, আচরনে চেঞ্জ এসেছে, আবেগ লুকানোর প্রসেসিং এও পরিবর্তন হয়েছে আমার আর বাবার দুজনেরই কিন্তু  অনুভূতিগুলোও একই আছে,বাবার গায়ের গন্ধ ও একইরকম আছে। শুধু অনুভূতি প্রকাশভঙ্গীর কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। খুব ভালোবাসি বাবা তোমাকে❤️❤️❤️ভালো থেক, সুস্থ থেক বাবা।।।।

ছবিঃ নিজের।

২৯৮জন ৪৮জন
0 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য