২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট। আব্বা নেত্রীর সমাবেশে যোগ দিতে রংপুর থেকে ঢাকায় এসেছেন, সাথে আরও নেতাকর্মী। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার সুবাদে আমি তখন শ্যামলীতে থাকি। আব্বার সাথে দেখা করার জন্য বিকেল ৪ টার দিকে শ্যামলী থেকে পুরানা পল্টনের দিকে যাচ্ছিলাম। আব্বা বরাবরই সচিবালয়ের উলটোদিকের এক হোটেলে উঠতেন।

সেদিন রাস্তায় ভীষণ যানজটের চাপ ছিলো। আমার পৌঁছাতে দেরী হবার কারনে আব্বা তার দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে ইতোমধ্যেই সমাবেশে যোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে গিয়েছেন। আমার সাথে তাঁর দেখা হয় বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেটে, স্টেডিয়ামের সামনে। আমিও সমাবেশে যেতে চাইলে আব্বা নিষেধ করেন। পরেরদিন আমার বাসায় যাবেন, একথা বলে আমাকে ফেরত পাঠালেন। আমি বললাম- “আসি আব্বু, কাল অবশ্যই এসো।”

একথা বলে আমি হেঁটে হেঁটে জিপিও হয়ে প্রেসক্লাবের দিকে এসে চায়ের দোকানে চা খাচ্ছিলাম, উদ্দেশ্যে কিচ্ছুক্ষণ সময় মাইকে নেত্রীর ভাষণ শোনা। হঠাৎ মাথায় এলো সমাবেশে যোগ দেয়ার জন্য আজ (২১ আগস্ট ২০০৪) ঢাকায় মতিঝিলের আশেপাশে যত মানুষের জমায়েত হয়েছে, সমাবেশের শেষ অবধি অপেক্ষা করলে হয়তো ফিরতি বাসে সীটই পাবোনা।

এ কথা ভেবে শ্যামলীগামী বাসে উঠার জন্য প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তায় আসতেই বিকট কিছু আওয়াজ শুনতে পেলাম। পরপর কয়েকটি বিস্ফোরণ, এরপরেই গুলির শব্দ! ঠিক দশ বা পনেরো সেকেন্ড পরেই হাজারো মানুষের সমোচ্চারিত গগণবিদারী চিৎকারে পুরো মতিঝিল এলাকা যেন রণক্ষেত্রে পরিনত হলো। সেইসময়  ঘুণাক্ষরেও মনে হয়নি, আমার দেশের মাটিতে কাউকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে কেউ গ্রেনেড বিস্ফোরণের মতো ঘটনা ঘটাতে পারে, যা পরে জেনেছি।

নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন এমন বর্বরতা। টিভি চ্যানেলে দেখেছে যারা তারাও সংবরণ করতে পারেনি অশ্রুজল। পরদিন পত্রিকাগুলোতে বীভৎস ঘটনার ছবি দেখে তো দিশাহারা হওয়ার মতো। কী মর্মান্তিক দৃশ্য! চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। হাত-পা হারিয়ে কিংবা মাথায়-পিঠে মারাত্মক আহতাবস্থায় কাতরাচ্ছে অগণিত মানুষ।

বেঁচে থাকারা পাঁজাকোলে করে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল আহতদের। মনে হচ্ছিল সভার স্থানটি যেন এক কারবালা। কেন হল এমন হামলা? কাকে মারার জন্য? কেন মারা? অনেক প্রশ্ন তখনই সামনে এসেছিল? জবাব নেই।

পরে বোঝা গেল, প্রধান টার্গেট বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা, তখনকার বিরোধীদলীয় নেত্রী। আসলে টার্গেট ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সবাই। হামলাকারীরা চেয়েছিল তারা সম্পূর্ণ নির্মূল করে দেবে বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে। আছেই তো মাত্র দু’জন। এ দু’জনকে শেষ করতে পারলেই তো তাদের পোয়াবারো।

আমরা চাই না, দুর্বৃত্ত শ্রেণির লোকেরা রাজনীতিতে আসুক, তারা রাজনীতি নদীটার স্বচ্ছ পানিকে ঘোলা করে আপন স্বার্থসিদ্ধির জন্য জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় আর অর্থের জোগান দিয়ে রাজনৈতিক পরিবেশ নষ্ট করুক; সমরাস্ত্র চালিত গ্রেনেডের মতো বিধ্বংসী অস্ত্র সরবরাহ করে অসাধু রাজনৈতিক নেতারা জনগণকে হত্যার ধারা চালু রাখার সংস্কৃতি অব্যাহত রাখুক এবং ক্ষমতাসীন দলের কোনো ব্যক্তি অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবমূর্তি তৈরি করুক।

আমরা সর্বান্তকরণে কামনা করি, জনগণ নিশ্চিন্ত মনে রাজনৈতিক সমাবেশে, সভায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করুক এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শ, উদ্দেশ্য, কর্মসূচি ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান লাভ করুক।

২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট আমার জীবনে দেখা স্মৃতিতে জাগ্রত এক বিভীষিকাময় দিন। মতিঝিল থেকে সমস্ত যান চলাচল বন্ধ। সেদিন প্রাণভয়ে ওষ্ঠাগত, জীবন বাঁচাতে দৌড়েচলা মানুষের ভীড়ে আমি স্যান্ডেল হারিয়ে খালি পায়ে প্রায় দৌড়ে প্রেসক্লাব থেকে শ্যামলীতে ফিরেছি এক রুদ্ধশ্বাসকর ভীতিময় অনুভূতি নিয়ে। আমার মনে আব্বাকে নিয়ে শঙ্কা! তিনি বেঁচে আছেন তো? আমারতো এই দিনটাকে কিছুতেই ভোলার নয়।

আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা, এদেশকে নেতৃত্বশুন্য করতেই ‘৭৫ এ একটি ১৫ই আগস্ট হয়েছিলো। আমরা কেন ভুলে যাই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে এদেশে ২০০৪ সালেও একটি ২১শে আগস্ট ঘটনো হয়েছিলো।

আপনার আমার রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতেই পারে। কিন্তু আপনি যখন শোকাবহ আগস্টকে অস্বীকার করবেন, ১৫ এবং ২১ আগস্ট নিয়ে হাসাহাসি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবেন, আমি ধরেই নেবো আপনার রাজনৈতিক মতাদর্শ পক্ষপাতদুষ্ট এবং আপনি বাংলাদেশের রাজনীতিকে অপরাজনীতির ধারায় প্রবাহের পক্ষে আগেও ছিলেন, এখনো আছেন এবং হয়তো ভবিষ্যতেও থাকবেন।

আমরা চাই না, এ দেশে আর কখনও এমনতরো নৃশংস বর্বরোচিত রাজনৈতিক হামলা হোক; আপন দল ছাড়া অন্য কোনো দলের নেতাকর্মীকে বিধ্বস্ত করে দিয়ে দেশকে নেতৃত্বশূন্য করে কিংবা রাজনৈতিক দলের সভায় হামলা করে দেশে এমন অবস্থা তৈরি করা হোক যাতে তরুণরা রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠুক।

আমরা কোনোভাবেই কামনা করি না, রাজনীতি করা মানুষদের প্রতি অশ্রদ্ধার ভাব সৃষ্টি করা হোক কিংবা জনমনে চিরস্থায়ী আতঙ্ক তৈরি করা হোক। একজন গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে আমরা চাই এহেন কর্মকাণ্ডের কারণে আজকের এবং আগামীর প্রজন্ম মানুষ হত্যার রাজনীতির প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করুক।

১৯৪জন ১১৬জন
0 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ