২৫ মার্চ ১৯৭১ দিবাগত রাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী হত্যা লুণ্ঠন অগ্নিসংযোগ ধর্ষণ গ্রেফতার ইত্যাদির মাধ্যমে ঢাকা থেকে যে বর্বরতম অপারেশন শুরু করেছিল তার তাণ্ডব অত্যন্ত দ্রুতই ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল সারাদেশে। এমনকি গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যন্ত তা প্রসারিত হয়।

পূর্ব পাকিস্তানের যেসব রাজনৈতিক সংগঠন সচেতনভাবে এ ব্যাপারে পাকিস্তানীদের সহায়তা করে তার মধ্যে জামাত ইসলামী, ইসলামী ছাত্র সংঘ, মুসলিম লীগ, পি.ডি.পি, প্রভৃতি দল ও তাদের প্রতিষ্ঠিত রেজাকার, আলবদর, আলশামস এবং শান্তি কমিটি ছিল অন্যতম।

অবরুদ্ধ বাংলাদেশে স্বাধীনতার জন্য লড়াইরত মুক্তিবাহিনীকে প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে ১৯৭১ সালের মে মাসে খুলনায় প্রথম রাজাকার বাহিনী গঠিত হয়। খানজাহান আলী রোডের একটি আনসার ক্যাম্পে ৯৬ জন জামায়াত ইসলামী কর্মী সমন্বয়ে জামায়াত ইসলামীর পূর্ব পাকিস্তান শাখার সহকারী আমির মাওলানা এ.কে.এম ইউসুফ প্রথম রেজাকার বাহিনী গঠন করেন।

তবে পরবর্তীকালে জনগণের কাছে ‘রেজাকার’ শব্দটি ‘রাজাকার’ শব্দে পরিণত হয়। যারা জামায়াত ইসলামীর সদস্য ছিলেন, তারা রেজাকার বাহিনীতে স্বেচ্ছায় নাম লিখিয়েছিলো- বাংলাদেশের জন্মকে প্রতিরোধ করার জন্য। তবে পরবর্তীকালে টিক্কা খানের সরকার সারাদেশে বাধ্যতামূলকভাবেও অনেক চোর-ডাকাত ও অন্যান্য সমাজবিরোধীকে রেজাকার বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করে। রেজাকার বাহিনী কোরান ছুঁয়ে এই বলে শপথ নিতো-

I shall bear true alligience to the constitution of Pakistan as framed by law and shall defend Pakistan, it necessary, with my life.

অর্থাৎ তারা কোরান ছুঁয়ে নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও পাকিস্তান ও পাকিস্তানের সংবিধানকে রক্ষা করার শপথ নিতো।

তবে রাজাকার বাহিনী গঠিত হবার আগেও এদেশে শান্তিবাহিনী গঠিত হয়। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক নেতাবৃন্দ ঢাকায় এক বৈঠকে মিলিত হয়ে পাকিস্তানকে রক্ষা ও বাংলাদেশের জন্ম সম্ভাবনাকে প্রতিরোধ করার জন্য শান্তি কমিটি গঠন করেন। খাজা খয়েরউদ্দিন কমিটির আহ্বায়ক নিযুক্ত হন। গোলাম আযম, দুদু মিঞা, এ.এস.এম সোলায়মানসহ ১৪৯ জন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নিযুক্ত হন। সারা দেশেই এর শাখা কমিটি গঠন করা হয়।

শান্তি কমিটি গঠনের পর ১৩ এপ্রিল এই কমিটি ঢাকায় একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিলে নেতৃত্ব দেন গোলাম আযম, খান এ সবুর, সৈয়দ আজিজুল হক (নান্না মিয়া), মতিউর রহমান নিজামী, মাওলানা মাসুম, কবি বেনজীর আহমদ প্রমূখ। এরা পাক সীমান্তে ভারতীয় সৈন্য মোতায়েনের বিরোধীতা করে ইন্দিরা গান্ধীর একটি কুশপুত্তলিকাতে জুতার মালা পড়িয়ে তা সাথে বহন করে এই মিছিলটি করেছিলো।

তথাকথিত ইসলামপন্থীদের উদ্যোগে আল শামস সশস্ত্র গোষ্ঠীটি গড়ে উঠেছিল মূলত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত বিহারী ও অবাঙালিদের নিয়ে। পাকিস্তান রক্ষার নামে বাঙ্গালিদের উপর নির্যাতন চালানোর জন্যই এদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর মিরপুর ও মোহাম্মদপুরে অবস্থিত বিহারি-বাঙালি মুসলমানরা সেখানে কি ভয়াবহ তান্ডব সৃষ্টি করেছিল বই-পুস্তকে সেসবের বর্ণনা পড়লে কিংবা সে সমকালীন ভূক্তভোগীদের মুখে সেসব বর্বরতার কথা শুনলে আমাদের লোমকূপ দাঁড়িয়ে ওঠে। এসব হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলো নিজ উদ্যোগে আমাদের সকলেরই জানা প্রয়োজন বলে মনে করি।

রেজাকার বাহিনী’র মতোই আলবদর বাহিনীও প্রথমে কেন্দ্রীয়ভাবে সংগঠিত হয়নি। আলবদর বাহিনী গঠিত হয় ১৯৭১ সালের ২২ এপ্রিল জামালপুরে, ইসলামী ছাত্রসংঘের ময়মনসিংহ জেলার সভাপতি মুহম্মদ আশরাফ হোসাইনের নেতৃত্বে।

আলবদর সম্পর্কে দৈনিক সংগ্রাম লেখে-

“আলবদর একটি নাম। একটি বিস্ময়! আলবদর একটি প্রতিজ্ঞা। যেখানে তথাকথিত মুক্তিবাহিনী, আলবদর সেখানেই। যেখানেই দুষ্কৃতকারী, আলবদর সেখানেই। ভারতীয় চর কিংবা দুষ্কৃতিকারীদের কাছে আলবদর সাক্ষাৎ আজরাইল।”

পরে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রসংঘের হাইকমান্ড তাদের নেতা কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে পরীক্ষামূলকভাবে ময়মনসিংহে আলবদর বাহিনীর জন্য তাদের বিশেষ ট্রেনিং দেয়া শুরু করে। এরপরপরই সারাদেশের ইসলামী ছাত্র সংঘের শাখাগুলিকে আলবদর বাহিনীতে রুপান্তরিত করা হয়। ইসলামী ছাত্র সংঘের তৎকালীন জেলা প্রধানগন স্ব স্ব জেলার রেজাকার বাহিনী প্রধান নিযুক্ত হন।

৭ নভেম্বর ১৯৭১ ইসলামী ছাত্রসংঘ সারাদেশে সারাদেশে বদর দিবস পালনের ডাক দেয়। উল্লেখ্য, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র সংঘের উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধকে প্রতিরোধ করতে আলবদর বাহিনী নামের এই বাহিনী গঠন করা হয়। মোহাম্মাদ শামসুল হকের সভাপতিত্বে বায়তুল মোকাররমে অনুষ্ঠিত এক গণজামাতে পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ চার দফা ঘোষণা দেন।

ওই ঘোষণায় বলা হয়- ” দুনিয়ার বুকে হিন্দুস্থানের কোন মানচিত্রে আমরা বিশ্বাস করি না। যতদিন পর্যন্ত দুনিয়ার বুক থেকে হিন্দুস্থানের নাম মুছে না দেয়া যাবে ততদিন পর্যন্ত আমরা বিশ্রাম নেব না।”

জামায়াত মূলত পাকিস্তানকে মুসলমান রাষ্ট্র এবং পূর্ব পাকিস্তান ও ভারতকে হিন্দুস্থান নামে অবহিত করত। ইসলামী ছাত্র সংঘের (বর্তমান ছাত্র শিবিরের পূর্ব নাম) এ বদর দিবস পালনের পর থেকেই সারাদেশে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, শাঁখারী বাজার, তাঁতীবাজার, ই.পি.আর (বর্তমান বিজিবি সদরদপ্তর) এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইন খান সেনাদের অব্যাহত ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। রাজার বাগ পুলিশ লাইনে পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ-জামায়াত করা হয় পশ্চিম পাকিস্তানী এই পুলিশরা আসার পর থেকে ঢাকা শহরের রাস্তাঘাট বাসগৃহে নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। প্রতিদিন সারাবেলা চোখ বেঁধে ধরে এনে রাজার বাগ পুলিশ লাইনে মানুষদের জামায়াত করা হত এবং সন্ধার পরে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে হত্যা করা হতো ।

স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের এবং ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বালিকা যুবতী মেয়ে ও সুন্দরী রমণীদের নিয়মিত ধরে আনা হতো। দেহের যাবতীয় পোশাক-পরিচ্ছদ খুলে তাদের সম্পূর্ণভাবে উলঙ্গ করে মাটিতে ফেলে কুকুরের মত ধর্ষণ করতো। যে সকল বাঙালি যুবতী তাদের প্রমত্ত পাশবিকতার শিকার হতে অস্বীকার করতো তৎক্ষণাৎ পাঞ্জাবী সেনারা ওদের চুল ধরে টেনে টেনে স্তন ছিড়ে ফেলে দিয়ে তাদের যোনিতে, গুহ্যদ্বারে বন্দুকের নল, বেয়োনেট কিংবা ধারালো ছুরি ঢুকিয়ে তাদের পবিত্র দেহটি ছিন্নভিন্ন করে দিতো।

মুক্তিযোদ্ধারা কোথায় সংঘটিত হচ্ছে, কাদের বাসায় আশ্রয় নিচ্ছে, কার বাসায় তরুণ-তরুণী আছে সমস্ত খবরই রাজাকার আলবদর বাহিনীর সদস্যরা পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে পৌঁছে দিত এবং তাদের পাশবিক নির্যাতন করে মেরে ফেলা হতো। এই করুণ চিত্র সারাদেশেই মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন নয় মাস বিরামহীন গতিতে চলে। ঘরে ঘরে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগীরা এ ধরনের অপকর্মকে “গনিমতের মাল” বলে অভিহিত করে ইসলামের পবিত্রতাকে ধ্বংস করেছে।

জামায়াত ইসলামী এবং তাদের দোসররা বাংলাদেশের নাম চিরতরে মুছে ফেলতে এমন কোন অপকর্ম নেই যা করেনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশে চরম অস্থিতিশীলতা তৈরী করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে, মা বোনের ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে তারা। এদেশের স্বাধীনতাকামী দেশপ্রিয় মানুষ যতদিন বেঁচে থাকবে জামায়াতে ইসলামী রাজাকারদের প্রতি তীব্র ঘৃণা ছাড়া আর তাদের কাছে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমির বিষয়ে জানা আমাদের প্রতিটি নাগরিকের অবশ্য কর্তব্য। এদেশের স্বাধীনতাকে খর্ব করতে জামায়াতে ইসলামী এবং এর দোসরদের অপতৎপরতা এত ছোট পরিসরে বর্ণনা করা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। আমি চেষ্টা করেছি বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য বই থেকে কিছু কিছু মূল বিষয় পাঠকদের কাছে তুলে ধরতে। আপনাদের জন্য এতটুকু করতে পেরে এবং রাজাকারদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে কিছু লেখার মনোবাসনা সোনেলার মাধ্যমে পূরণ করতে পেরে সত্যিই নিজেকে গর্বিত মনে হচ্ছে।

(সমাপ্ত)

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী’র অপতৎপরতা- দ্বিতীয় পর্ব

তথ্যসূত্রঃ

★ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস
★ ১৯৭১ সালে প্রকাশিত পত্রিকা সংকলন।
★ স্বাধীনতার দলিল (২য় খন্ড)

লেখার কিছু কিছু অংশ তথ্যসূত্রে উল্লেখিত বইগুলি থেকে হুবহু তুলে ধরা হয়েছে। কারন ইতিহাস মনগড়া নিজের মত করে কিংবা বানিয়ে লেখা অনূচিত বলে মনে করি।

৩৩০জন ৩৩০জন
57 Shares

২৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ