বঙ্গবন্ধুর বুকে গুলিটা ঐদিন চালিয়েছিলো কে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আদালত রাষ্ট্রপক্ষের  ১, ৪ আর ৬ নাম্বার সাক্ষীর কথা রেফারেন্স হিসেবে টানেন।

আমরা ঘটনা পরম্পরায় জানতে পারি মেজর মহিউদ্দিন বঙ্গবন্ধুকে অনেকটা গ্রেফতার করার কায়দায় দোতলা থেকে নিয়ে যাচ্ছিলো এই বলে যে, “স্যার আপনাকে আমাদের সাথে একটু আসতে হবে”

বঙ্গবন্ধু এমন একটা অবস্থাতেও ঠান্ডা মাথায় তাঁর প্রিয় তামাকের পাইপ্টা হাতে নিয়েছিলেন। ইনফ্যাক্ট যখন গোলাগুলি শুরু হয়েছিলো এর কিছুক্ষন আগে তখন তিনি পাঞ্জাবি পরে নীচেও গিয়েছিলেন।

কাপুরূষ দা গ্রেট শফিউল্লা ফোনে বঙ্গবন্ধুকে পরামর্শ দেয় পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যাবার, কিন্তু এই ব্রেইভ হার্ট মানুষটা সেই কথার দুই পয়সা পাত্তা দেন নাই।

উলটা মহিউদিনকে দেখে বলেছিলেন, “এই বেয়াদপি করতেসস কেন? আমাকে কোথায় নিয়ে যাবি”

সাক্ষীদের সূত্রে জানা যায় এই ধমক খেয়ে ঐ অবস্থাতেও মহিউদ্দিনের হাত পা কাঁপাকাঁপি অবস্থা শুরু হয়ে গিয়েছিলো।

দোতলার সিঁড়িতে একটু নামতেই হঠাৎ করে নীচ থেকে যমদূতের মত উঠে এলো মেজর নূর আর মেজর বজলুল হুদা।

আদালতের রায়, সাক্ষীদের জবানী বা স্বীকারোক্তি অনুযায়ী হুদা আর নূর মহিউদ্দিন আর সাথের সৈনিকদের সরে যেতে বলে এবং হুদা ফায়ার ওপেন করে। পরে ক্রমাগত গুলি করতে থাকে নুর আর হুদা এবং বঙ্গবন্ধু সেখানেই মৃত্যু মুখে পতিত হন।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড নিয়ে আগেও লিখেছি বা বলেছি কিন্তু আজকের আমার এই লেখার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ অন্য।

যমদূতের মত এই খুনীদের ক্রুদ্ধ বন্ধুক, অস্ত্র, এত পাশবিকতা এসব নিজের চোখের সামনে দেখেও বঙ্গবন্ধু ঐ সময় ধমক দিয়েছিলেন মহিউদ্দিনকে। ঠান্ডা মাথায় পাইপ নেয়ার মত অসম্ভব সাহসী এক বুক ছিলো পিতার। এমন একটা সময়ে পাইপ নেয়ার মত সাহস কি একজন সাধারণ মানুষের হতে পারে কিংবা খুনীদের এত উঁচু গলায় ধমক কে দিতে পারে?

কাওয়ার্ড শফিউল্লাহর পরামর্শ মতে বঙ্গবন্ধু অনেক আগেই পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যেতে পারতেন। ইনফ্যাক্ট এই খুনের বর্ণনা, সাক্ষ্য, জবানবন্দী পড়ে আমার মনে হয়েছে বঙ্গবন্ধু খুব ভালোভাবেই পালিয়ে যেতে পারতেন যখন থেকেই গোলাগুলি শুরু হোলো। কিন্তু এই অসীম সাহসী মানুষটা পালান নি। পাহাড়ের মত অবিচল দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর সমস্ত সাহস নিয়ে।

ইচ্ছে করলেই পিতা না মারার জন্য অনুরোধ করতে পারতেন খুনীদের, পারতেন খুনীদের কাছে অনুনয় বিনয় করতে। কিন্তু এই খুনীর দলের সাক্ষ্য বা স্বীকারোক্তি কোনটা থেকেই এমন অনুনয় বা বিনয়ের গল্প পাওয়া যায়না। বরং পাওয়া যায় তাঁর গর্জন করা ধমকের সূত্র।

হ্যাঁ, জাতির পিতা মৃত্যুর আগে খুনীদের ধমক দিয়েছিলেন। এমন ধমক, যেখানে খুনীরা পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিলো।

শুধু বঙ্গবন্ধু কেন? বেগম মুজিবের কথাই আপনারা বিবেচনা করেন।

বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখে চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর শরীর ছুঁয়ে এক অপার্থিব যন্ত্রণায় তিনি কেঁদে উঠেছিলেন। বলেছিলেন, পরিবারের আর কাউকে না মারতে। শুধু তাঁকে যেন এখানেই মেরে ফেলে তাঁর স্বামীর পাশে।

ইচ্ছে করলে তিনি অনুনয় বিনয় করতে পারতেন। হাতে-পায়ে ধরতে পারতেন খুনীদের। বাঁচার আকুতি করতে পারতেন। কিন্তু করেছিলেন কি? উত্তর হচ্ছে, না। করেন নি। করবার চেষ্টাও করেন নি। স্বামীর সাথে সহমৃত্যু চেয়েছিলেন এই মানুষটি।

চিন্তা করে দেখেন, এই মহিয়সী নারীর কথা। তাঁর প্রেম আর ভালোবাসার কথা। যেই ভালোবাসা এই যুগের সস্তা ভালোবাসা নয়, এই যুগের পুতু পুতু আর ন্যাকা প্রেম নয়। এই প্রেম এমন-ই এক মানুষের প্রেম যিনি পিতার পাশে থেকে পিতাকে করেছেন আরো বড় এক ছায়া আর আর বড় এক মানুষ। ইয়েস, তিনিই বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব। বঙ্গমাতা।

স্বামীর লাশ দেখে তাঁর পাশেই খুন হতে চেয়েছিলেন বেগম মুজিব।

মৃত্যুর আগে এক চুল পরিমান ভয় পান নাই বঙ্গবন্ধু কিংবা বেগম মুজিব। বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। বুক চিতিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিলেন আমাদের এই অভাগা জাতির জনক।

কিন্তু একটা মজার ব্যাপার জেনে রাখেন যে, হুদা মৃত্যু থেকে যাতে বাঁচতে পারে সে কারনে হুদার আইঞ্জীবি ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ আল মামুন আদালতে এক হাস্যকর যুক্তি দেয়। সে বলে, হুদা সাইজে ছোটো ফলে এমন সাইজে ছোট মানুষের এমন গুলি চালাতে বা খুন করতে পারার কথা না। এই যুক্তি শুনার পর আদালতে হাসির রোল পড়ে যায়।

খুনীরা বাঁচার জন্য তার শরীর আকৃতি বা গঠন নিয়েও যুক্তি দিতে পিছপা হয়নি। অন্যদিকে ঐ পাহাড় সম মানুষ সমস্ত সাহস নিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে। এই হচ্ছে ছুঁচো আর বাঘের পার্থক্য।

আহমদ ছফা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে পরিমান সমালোচনা করেছিলেন সে পরিমাণ সমালোচনা আর কোনো লেখক বা কবি করবার সাহস দেখান নি। এত এত সমালোচনার ভীড়ে ছফা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন পিতার সাহসের কথা। বাধ্য হয়েই তিনি লিখেছিলেন-

“আজ থেকে অনেক দিন পরে হয়তো কোনো পিতা তার শিশু পুত্রকে বলবেন জানো, খোকা! আমাদের দেশে একজন মানুষ জন্ম নিয়েছিলো যার দৃঢ়তা ছিলো, তেজ ছিলো আর ছিলো অসংখ্য দুর্বলতা। কিন্তু মানুষটির হৃদয় ছিলো, ভালোবাসতে জানতেন। দিবসের উজ্জ্বল সূর্যালোকে যে বস্তু চিকচিক করে জ্বলে তা হলো মানুষটির সাহস। আর জ্যোস্নারাতে রূপোলি কিরণ ধারায় মায়ের স্নেহের মতো যে বস্তু আমাদের অন্তরে শান্তি এবং নিশ্চয়তা বোঁধ জাগিয়ে তোলে তা হলো তার ভালবাসা। জানো খোকা তার নাম? শেখ মুজিবুর রহমান”

২৬৯জন ৪১জন
0 Shares

৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ