গ্রীষ্ম বর্ষা শরতের শেষে শুরু হয় হেমন্তের হাঁক-ডাক। হেমন্তের মূলমন্ত্র হচ্ছে নবান্ন উৎসব। নবান্ন মানে নতুন ধন থেকে নতুন চাল। সেই চাল থেকে অন্ন। এই হলো, নবান্ন। যদিও বাঙালির ‘নবান্নের’ উৎসব শুরু হয় পয়লা অগ্রহায়ণ থেকেই। তবে এখন আর অগ্রহায়ণের দিকে কেউ তাকিয়ে থাকে না। আগাম জাতের ধান কাটা-মাড়াই শুরু হওয়ায় হেমন্ত ঋতু শুরুর আগে থেকেই নতুন ধানের ঘ্রাণে মুখরিত হয়ে উঠে বাংলা ৬৮ হাজার গ্রাম। যদিও দীর্ঘদিন ধরে শহরে বসবাস। তবু্ও কোনও-না-কোনও হেমন্তে মনের অজান্তে কোনও গ্রামে যাওয়া হয়। তখন কৃষকের জমিতে সোনালি ধান দেখে হেমন্তের ঘ্রাণযুক্ত বাতাস শরীরে লাগতে শুরু করে। তখন আর বুঝতে অসুবিধা হয় না যে সময়টা কী? কৃষকের খেতে পাকা আমন ধানের ঘ্রাণেই বলে দেয় এখন হেমন্তকাল।

হেমন্তের সকাল মানেই প্রকৃতি ঢাকা ঘোর কুয়াশা। যা শহরে থেকেও ঢের টের পাওয়া যায়। আর গ্রামে যাঁদের বসবাস, তাঁরা তো শরতের শেষে হেমন্তের আগমনেই টের পায়, দেখতে পায়। সেই কুয়াশার চাদর ভেদ করে উঁকি দেয় সকালের রক্তিম সূর্য। হেমন্তের মৃদু বাতাসে দোল খায় কৃষকের খেত ভরা সোনালি ধানে। তাই হেমন্তে বাংলার কোনও জোলার কোনও গ্রামে গেলে রাস্তার দু’পাশে যতদূর চোখ যায়, একটা হলুদ মাঠ ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ে না। মনে হয় এখন মাঠে মাঠে শুরু হয়েছে ধানকাটা উৎসব। কৃষকের ঘরে ঘরে চলছে নতুন ধানের নতুন চালের পিঠাপুলির আয়োজন।

হেমন্তের বাতাসে এখন ভেসে বেড়াচ্ছে পাকা ধানের মিষ্টি ঘ্রাণ। দিনভর খাটুনি খেটে ধান কাটার পর মাড়াই শেষে কৃষক ঘরে তুলে গোলা ভরছে। সেই ধান থেকে নতুন চালের নতুন অন্ন। আর নতুন খেজুরের রসে বানানো হবে কতরকমের বাহারি পিঠাপুলি আর মিষ্টান্ন পায়েস। হেমন্তের শেষে তীব্র শীতে দেখা যাবে আমন ধানের খেতে রবিশস্য সরিষা, আলু, টমেটো, বাদাম। আবার কোথাও কোথাও গাঁদাফুলের বাহার। ফসলের এসব বাহার শুধু গ্রামাঞ্চলেই দেখা যায়। দেখা যায় না ইটের গাঁথুনির শহরে। শহরে হেমন্ত নেই!

শহরে হেমন্ত নেই!
করিতে পারি না আমি হেমন্ত বন্দনা
ইটের শহরে হেমন্তের রূপ কেউ দেখে না
এই শহরে দেখা যায় গ্রীষ্ম বর্ষা শরত–
আর শীত বসন্তের কিছু শোভিত নমুনা
কিন্তু হেমন্ত নেই, হেমন্তকে কেউ চেনে না
হেমন্তকে ডাকে না, হেমন্ত কী তা জানেও না!

যেখানে আছে হেমন্ত!
গ্রাম ছেড়ে গ্রামান্তরে বাংলার চিরসবুজ প্রান্তেরে
শরতের শেষে মিষ্টি শীতে কৃষকের ঘরে ঘরে
অল্প জলে ভেসে থাকা শাপলা ফুলের ছোঁয়ায়–
সোনালি ধান কাটার শেষে কৃষকের গানের সুরে!
কুয়াশার সকালে সারিবদ্ধ খেজুরগাছ খেতের দ্বারে
শহরে আছে দূষিত বাতাস, তাই হেমন্ত নেই শহরে।

এখানে হেমন্তের গন্ধ নেই!
কৃষক নেই কৃষাণী নেই ফসলের জমি নেই
মৌসুমি রবিশস্য নেই আমনধানের গন্ধ নেই
আছে শহরের চারদিকে গড়ে উঠা অট্টালিকা–
শিল্প কল-কারখানা, বাগান নেই গাছপালা নেই!
চাষের জমি নেই, পিঠাপুলির আয়োজন নেই
আছে বর্জ্যের স্তুপ পঁচা দুর্গন্ধ, হেমন্তের গন্ধ নেই!

২৩৩জন ২১জন
15 Shares

৩৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য