১৯৮৩ সনে ছাত্রাবস্থায়ই বুঝে গিয়েছিলাম যে ব্যবসা করতে হবে আমাকে। চাকুরীতে পোষাবে না। যেমন ভাবা তেমনই কাজ। পেশা হিসেবে নিয়ে নিলাম ঠিকাদারি ব্যবসা। সবাই লেখা পড়ার পাশাপাশি পার্ট টাইম কিছু করে। আর আমি ব্যবসার পাশাপাশি পার্ট টাইম লেখা পড়া আরম্ভ করলাম।
একটাই অভিষ্ট লক্ষ্য- প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। সেই যে দৌড় আরম্ভ এখনো চলছে। সারা সময় কেটে যেতো কিভাবে কাজ পাবো, কিভাবে চলতি কাজ দ্রুত শেষ করবো, কাজ শেষ হবার পরে বিল তুলবো। এর ফাঁকে ফাঁকে পড়াশুনা। সময় কই মাস কাল এর হিসেব করা?

পড়ালেখার পাট শেষ করার পর আমাকে আর কে ফেরায়? কখন কোন ঋতু আসে তার কোন খেয়াল আর নেই। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেই মটর বাইক নিয়ে বেড় হতাম বিভিন্ন দিন বিভিন্ন সাইটে। এমনো হয়েছে, শীতের দিন কুয়াশা ভরা সকালে জ্যাকেট টুপি মাফলার গায় জড়িয়ে হেড লাইট জ্বালিয়ে ছুটছি দ্রুত, ৭০ কিলোমিটার দূরের কাজের সাইটে গিয়ে দেখতাম লেবাররা ঘুমে তখনো। শীতের সকাল ছয়টা তখন, ঘুমাবে না কি করবে? ডেকে তুলতাম তাঁদের, আজ যে ব্রিজের ফাউন্ডেশন ঢালাই, জোয়ার হবে দুপুর একটায় তার আগেই ঢালাই শেষ করতে হবে যে।

শীত নেই, বর্ষা নেই ছুটেছি এমনি করে ঝড়ের বেগে। প্রচন্ড বৃষ্টির রাত দুইটায় রেইনকোট গায়ে দিয়ে পটুয়াখালী ছুটেছি দাতে দাঁত টক টক করে আওয়াজ করতে করতে। তখন তো আর মোবাইল ছিল না যে ইঞ্জিয়রকে বলব অপেক্ষা করতে সকালে আসবো। উনি সকাল ছয়টায় ঢাকা রওয়ানা দিবেন তাই ঝড় উপেক্ষা করেই বেড় হয়েছি।

দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর খুব সকালে বের হয়েছি, সাইট- অফিসের কাজ শেষ করে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরেছি। বাসায় ফিরে আবার নিজের অফিসে- রাত বারোটা , একটা পর্যন্ত জেগে আগামী কালের প্রগ্রাম বানিয়েছি।

বর্ষা, শীত, বসন্ত হেমন্ত আসার সময় কোথায় আমার কাছে? ঠিকাদারি ব্যবসার জন্যই ১৯৯৬ সনে আরম্ভ করলাম ব্রীক ফিল্ডের ব্যবসা। ধীরে ধীরে সাইটে যাওয়া কমিয়ে দিলাম। স্টাফদের দিয়ে সাইট মেইনটেইন করতাম।

হেমন্ত শুরু তো কার্তিক মাস থেকে। কার্তিক মাসের প্রথম দিন থেকেই ব্রীক ফিল্ডের কাজ শুরু হয়। ইট বানানোর মাঠ পরিষ্কার করা, দশ বারোটা অস্থায়ী সেড নির্মান করা, প্রায় চারশত অস্থায়ী শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা, সব কিছু নিখুঁত ভাবে সম্পন্ন করতে করতেই কার্তিক মাসের অর্ধেক শেষ। এরপর ইট বানানো, তা শুকানো, তা ইট পোড়ানো ক্লিনের মধ্যে দেয়া, ইটা পোড়ানো , ইট বেড় করে তা স্টক দেয়া, জ্বালানী সংগ্রহ করা, মাটির হিসেব করা, ইট বিক্রী করা এসব তদারকিতে চলে যেত জৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত। হেমন্ত আর আসেনা আমার কাছে গত ছত্রিশ বছর যাবত।

তারপরেও প্রানের মাঝে নিজেকেই যেন বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টায় ছাদ বাগান করি। প্রচুর গাছ লাগিয়ে সবুজ একটা বেষ্টনী তৈরী করেছি। সবুজের মাঝে বেঁচে থাকার ইচ্ছে যে আমার প্রবল। ফুলের উপরে শিশির কনা দেখে বুঝতে পারি শীত এসেছে প্রকৃতিতে।

আগুন, ইট, পাথরের মাঝে থেকেও চেষ্টা করি ফুল ফুটাতে। ফুলেদের সাথে হাসি আনন্দে থাকি। কথা বলি আমার নতুন সৃষ্টির সাথেই। বেশী দিন দূরে থাকলে অভিমানী ফুলেদের গায়ে মমতার হাত বুলাই। তাঁদের বলি, ইচ্ছে না থাকলেও তোমাদের থেকে দূরে থাকতে হয় মাঝে মাঝে।

শখের বসে একটি বটবৃক্ষ লাগিয়েছি আমারই ব্রীকফিল্ডের পাশ থেকে বয়ে যাওয়া শান্ত নদীর তীরে। অদ্ভুত এক অনুভুতি জাগে মনের মাঝে এই বটবৃক্ষের কাছে আসলেই।

একদিন হয়ত এখানে বসবে হরিয়াল, বক, ঘুঘু
বাবুই ও চড়ুই এর কিচিরমিচির হবে সারাক্ষণ
ফিঙ্গে, টুনটুনি, মৌটুসি,  ঠিকানা পেয়ে বাসা বাঁধবে এ বৃক্ষে
কাঠ ঠোকরা ঠক ঠক করে জানান দেবে তার অস্তিত্ব
হলদে পাখি বসবে ডালে
খঞ্জনা পাখি এসে বলবে ‘নামটি আমার খঞ্জনা’
নাম না জানা পাখিরা এসে রঙ্গিন ঠোটে ক্ষুধা নিবারণে ফল ঠোকরাবে
পরিযায়ী পাখিরা আসবে হয়ত দূর কোন দেশ হতে।

হয়ত এর নীচে বসে প্রচণ্ড গরমে কোন পথিক পাবে শীতলতা
হয়ত কোন পথিক লাল বৃত্তাকারে শুয়ে থেকে পাখির গানে ঘুমিয়ে যাবে
হয়ত বাজার বসবে এই বৃক্ষের নীচে নাম হবে হয়ত বটতলা।

পাখিরা কি জানবে তাদের এই আশ্রয়স্থল কে গড়ে দিয়েছিলো
অথবা পথিক ?

আশাবাদঃ
সবার হেমন্ত যেন আসে প্রতিবছর কাশ ফুলের নরম ছোঁয়ায়।

 

৩৩১জন ৩৩১জন
40 Shares

৩৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য