যদিও আমি ব্যক্তিগতভাবে ভিন্ন আদর্শের রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করি তবে বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে মরহুম এরশাদ সাহেব সম্পর্কে অনেকের মন্তব্য দেখে মনে হচ্ছে দেশের একজন সাবেক সেনাপ্রধান এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নয় একজন কুলাঙ্গার মারা গিয়েছেন আর সমালোচনা করতে উঠেপড়ে লেগেছেন কিছু কথিত বুদ্ধিজীবী। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে তাদের অনেকেরই জন্ম ৮০’র দশকেও হয়নি আর হলেও সেই সমসাময়িক রাজনীতি বিষয়ে সে অজ্ঞ। আপনাদের এহেন কর্মকান্ডে ব্যথিত মন নিয়ে আমার আজকের এই লেখার অবতারণা করেছি। কোনো পক্ষপাতিত্ব নয়, দেশের একজন নাগরিক হিসেবে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সাফল্য ব্যর্থতার ঘটনাবহুল বর্ণীল এক জীবন সম্পর্কে আজ আপনাদের কিছুটা ধারণা দেবার চেষ্টা করবো।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাংলাদেশের একজন সাবেক সেনাশাসক এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তার শাসনামলে নিজেকে কবি বলে দাবী করতেন তিনি। জেনারেল জিয়ার পরে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সামরিক শাসক হিসেবে দীর্ঘ প্রায় একদশক বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজের একছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন এরশাদ।

শারীরিক অসুস্থতার দরুন ২০১৯ সালের ২৬ জুন তাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে ৪ জুলাই তাকে নেওয়া হয় লাইফ সাপোর্টে। তিনি ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি রক্তে হিমোগ্লোবিনের স্বল্পতা, ফুসফুসে সংক্রমণ ও কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার দেশ পরিচালনাকে অনেকেই সামরিক একনায়তন্ত্রের সাথে তুলনা করেন। তিনি জাতীয় পার্টি নামক রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন যা পরবর্তীতে বেশ কিছু উপদলে বিভক্ত হয়। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৩ আসন হতে তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং তিনি একাদশ জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

এরশাদ ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তারিখে তিনি দিনহাটা শহর, কোচবিহার জেলা, জলপাইগুড়ি বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য, ভারতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রংপুর জেলায় শিক্ষাগ্রহণ করেন এবং ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৫১ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসার্স ট্রেনিং স্কুলে (কোহাটে অবস্থিত) যোগ দেন এবং ১৯৫২ সালে কমিশনপ্রাপ্ত হন। ১৯৬০ – ১৯৬২ সালে তিনি চট্টগ্রাম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কেন্দ্রে অ্যাডজুট্যান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৬৭ সালে তিনি কোয়েটার স্টাফ কলেজ থেকে স্টাফ কোর্স সম্পন্ন করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি শিয়ালকোটে ৫৪ ব্রিগেডের মেজর ছিলেন। ১৯৬৯ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে পদোন্নতি লাভের পর ১৯৬৯ – ১৯৭০ সালে ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর অধিনায়ক ও ১৯৭১ – ১৯৭২ সালে ৭ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর অধিনায়ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় এরশাদ ছুটিতে রংপুরে ছিলেন। কিন্তু, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে তিনি পাকিস্তান চলে যান। পাকিস্তান থেকে আটকে পড়া বাঙালিরা যখন ১৯৭৩ সালে দেশে ফিরে আসে তখন তিনিও প্রত্যাবর্তন করেন। শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর সময় আগ্রা ক্যান্টনমেন্টে জাতীয় প্রতিরক্ষা কোর্সে অংশগ্রহণ করেন।

পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরার পর ১৯৭৩ সালে তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১২ ডিসেম্বর ১৯৭৩ সালে তিনি কর্নেল ও ১৯৭৫ সালের জুন মাসে ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি পান। ১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্ট ভারতে প্রশিক্ষণরত অবস্থায় তিনি মেজর জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি পান ও উপসেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পান। ১৫ অগাস্ট সামরিক অভ্যুত্থানের পর এরশাদ বাংলাদেশের দিল্লি মিশনের মাধ্যমে দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা জানিয়ে বার্তা পাঠান। ১৯৭৮ সালে তাকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং এরশাদ একই বছরের ডিসেম্বরে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব বুঝে নেন।

সামরিক অভ্যুত্থান ও রাষ্ট্রপতিত্বঃ

৩০ মে ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হবার পর, এরশাদের রাজনৈতিক অভিলাষ প্রকাশ হয়ে পড়ে। ২৪ মার্চ ১৯৮২ সালে এরশাদ রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। ১১ ডিসেম্বর ১৯৮৩ সাল নাগাদ তিনি প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে দেশ শাসন করেন। ঐ দিন তিনি দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এ.এফ.এম আহসানুদ্দিন চৌধুরীর কাছ থেকে নিজের অধিকারে নেন।

১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই দলের মনোনয়ন নিয়ে ১৯৮৬ সালে পাঁচ বছরের জন্য দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তৎকালীন বিরোধী দলগুলির আন্দোলনের মুখে রাষ্ট্রপতি এরশাদ ৭ ডিসেম্বর ১৯৮৭ সালে সেই সংসদ বাতিল করেন। ১৯৮৮ সালের সাধারণ নির্বাচন সকল দল বয়কট করে। এরশাদের স্বৈরাচারের বিরূদ্ধে দেশের জনগণকে সাথে নিয়ে সকল বিরোধী দল সম্মিলিতভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে তাকে ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করে।

ক্ষমতা হারানোর পর এরশাদ গ্রেফতার হন এবং ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না-আসা পর্যন্ত কারারূদ্ধ থাকেন। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি কারাগার থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং রংপুরের পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচিত হন। বি.এন.পি সরকার তার বিরুদ্ধে কয়েকটি দুর্নীতি মামলা দায়ের করে। তার মধ্যে কয়েকটিতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন এবং সাজাপ্রাপ্ত হন। ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনেও তিনি পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচিত হন। ছয় বছর আবরুদ্ধ থাকার পর ৯ জানুয়ারি ১৯৯৭ সালে তিনি জামিনে মুক্তি পান। তার প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি ২০০০ সালে তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে, যার মধ্যে মূল ধারার তিনি চেয়ারম্যান। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর জাতীয় নির্বাচনে তার সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং তার স্ত্রী রওশন এরশাদ প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা হন।

তাঁর বিরুদ্ধে মামলাগুলোর কয়েকটিতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। কোনটিতে খালাসও পেয়েছেন। এসব মামলার কারণে তিনি স্বাধীন অবস্থান নিয়ে রাজনীতি করতে পারেন নি। জাতীয় পার্টি কয়েকটি ভাগে বিভক্তও হয়েছে। এরপরও ভোটের রাজনীতিতে তাঁর দল জাতীয় পার্টির একটা অবস্থান তৈরি হয়। রংপুর অঞ্চলের ১৭টি আসনে জাতীয় পার্টির ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। নির্বাচন এলেই আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি – প্রধান দুই দলই তাঁকে সাথে নেয়ার চেষ্টা করে। তবে গত কয়েকটি নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে আওয়ামী লীগের সাথেই থাকতে হয়েছে।

সাফল্য ব্যর্থতার এক বর্ণিল জীবনঃ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বরারই একটি আলোচিত এবং বিতর্কিত নাম। নয় বছর এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালীন যেসব কাজ করেছেন সেগুলো প্রভাব নানাভাবে পড়েছে পরবর্তী সময়ে।

জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় থাকার সময় উপজেলা পদ্ধতি চালু করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, সরকারী সুবিধাদি জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্যই এ ব্যবস্থা নেয়া। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে উপজেলা পরিচালনার পদ্ধতি চালু করা হয়। যারা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলেন, তাদের অনেকের কাছেই এই পদ্ধতি প্রশংসা পেয়েছিল।

তিনি উপজেলাসমূহে সাবকোর্ট এবং সাবজেল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যাতে জনগনের দুর্ভোগ কমে যায় এবং আইনের শাসন সু-প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। জনগন এর সুফলও ভোগ করেছিলো সেসময়।

হাইকোর্টের ছয়টি বেঞ্চ ঢাকার বাইরে স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। উচ্চ আদালতের বিচারের জন্য যাতে ঢাকায় আসতে না হয় সেজন্যই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু আইনজীবীদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত সেটি বাস্তবায়ন করতে পারেনি এরশাদ সরকার।

১৯৮২ সালে এরশাদ সরকার দেশ একটি ঔষধ নীতি প্রণয়ন করে। এর ফলে ঔষধের দাম যেমন কমে আসে, তেমনি স্থানীয় কোম্পানিগুলো ঔষধ উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করে। ঔষধ নীতিতে উল্লেখ করা হয়েছিল যে ভিটামিন ট্যাবলেট/ক্যাপসুল এবং এন্টাসিড বিদেশী কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের ভেতরে উৎপাদন করতে পারবে না। এসব ঔষধ উৎপাদন করবে শুধু দেশীয় কোম্পানি। এর ফলে দেশীয় কোম্পানিগুলো আর্থিকভাবে লাভবান হয় এবং বিদেশী কোম্পানিগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে তারা অন্য ঔষধ উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ করতে পারে। তাছাড়া সে নীতির আওতায় সরকার সব ধরণের ঔষধের দাম নিয়ন্ত্রণ করতো।

জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় থাকার সময় রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি নিয়ে যেসব কাজ করেছিলেন সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা। এর মাধ্যমে রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব আরো বেড়ে যায়।

ক্ষমতায় টিকে থাকতে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য জেনারেল এরশাদ সামরিক গোয়েন্দাদের ব্যবহার করেন। এ অভিযোগ ছিল বেশ জোরালো। এছাড়া সামরিক বাহিনীর সহায়তা নিয়ে তিনি ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ সালে দুটি বিতর্কিত নির্বাচন করেন। অভিযোগ রয়েছে, সেনাবাহিনীর সদস্যদের তুষ্ট রাখার জন্য সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে সেনা কর্মকর্তাদের নিয়োগ ব্যাপকতা লাভ করে জেনারেল এরশাদের শাসনামলে ।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে উঠে তখন সেনাবাহিনী এরশাদের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে এবং বিষয়টি তাকে জানিয়ে দেয়। এরপর তিনি পদত্যাগ করেন।

ক্ষমতায় থাকাকালীন এবং ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর জেনারেল এরশাদের দুর্নীতি নিয়ে নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। ১৯৮৬ সালে ব্রিটেনের দ্য অবজারভার পত্রিকা এরশাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। মরিয়ম মমতাজ নামে এক নারী নিজেকে এরশাদের দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করে দ্য অবজারভার পত্রিকাকে বলেন, জেনারেল এরশাদ আমেরিকা এবং সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে ১৫০ মিলিয়ন ডলার পাচার করেছেন।

এছাড়া বিভিন্ন সময় এসোসিয়েটেড প্রেস এবং ওয়াশিংটন পোস্ট সহ নানা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এরশাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের শিরোনাম হয়েছিল। ক্ষমতাচ্যুত হবার পর দুর্নীতির মামলায় কারাগারেও থাকতে হয়েছে তাকে।

জেনারেল এরশাদের শাসনামল নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক না কেন, ক্ষমতাচ্যুত হবার পরেও তিনি কখনো নির্বাচনের পরাজিত হননি। এমনকি কারাগারে থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে পাঁচটি আসনে জয়লাভ করেন এরশাদ।

জাতীয় পার্টি রাজনীতিতে টিকে গেলেও জেনারেল এরশাদ এবং তাঁর দল নিয়ে মানুষের মাঝে আস্থার কিছুটা অভাব আছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের সময় জেনারেল এরশাদ তাঁর বক্তব্য বা অবস্থান বার বার বদল করেছিলেন। ফলে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়েছিল।

পারসোনালিটি কাল্ট বা ব্যক্তি জনপ্রিয়তা এদেশের রাজনীতির একটা বড় অংশ, যা জেনারেল এরশাদের মধ্যেও ছিল। কিন্তু এধরণের আরো অনেক দল যেমন, মাওলানা ভাসানী কিংবা এ কে ফজলুল হকের মতো ক্ষমতাশালী ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর তাদের দলগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

আমার বক্তব্যঃ

শুধু বাংলাদেশ কেন, পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তি/নেতা খুঁজে পাবেননা যিনি নিজের মতামতের প্রাধান্য দিতে গিয়ে অন্যের সামান্য হলেও অপকার করেননি বা হয়নি। রাজনীতিতে নিজের আদর্শ বাস্তবায়ন করতে গেলে এটা হবেই। এতে কারও উপকার হবে কারও ক্ষতি হবে।

এরশাদ সাহেবকে ব্যক্তিগতভাবে আমি অনেকবারই অনেক কাছে থেকে দেখেছি, তার সাথে কথা বলেছি। একজন অমায়িক ভদ্র মানুষ ছিলেন তিনি। পিওর জেন্টেলম্যান যাকে বলে। তার কাছ থেকে কেউ খালি হাতে ফিরেছে এমন একটি মানুষও খুঁজে পাবেননা।

বর্ণিল এ মানুষটিকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের উপরে ওঠার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছে। আর দেশের রাজনীতিতে নিজেকে, নিজের দলকে টিকিয়ে রাখতে এরশাদ সাহেব কিছুটা পরমুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছিলেন। আমার মনে হয় এটি তার প্রবল রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার বহিঃপ্রকাশ। তবে তার শাসনামলে দেশের রূট লেবেল বা গ্রাম পর্যায় থেকে শুরু করে যে সমস্ত কার্য সম্পাদিত হয়েছে পরবর্তীতে সে সকল সরকার এসেছে তারা এরশাদের সমকালীন সে সব কাজের উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকেই বজায় রেখেছেন। নতুন করে কেউ কিছু করেছে কিনা তা পাঠকদের কাছেই প্রশ্ন রেখে গেলাম।

সাফল্য ব্যর্থতা নিয়েই মানুষের জীবন। এরশাদ সাহেবকে আমরা সৈরাচারী শাসক আখ্যা দিয়েছি। দীর্ঘ এক দশক যেভাবে একছত্র দেশ শাসন করেছেন তাতে তা দেয়ার যৌক্তিকতাও আছে। তাকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের দাবীর আন্দোলনে নূর হোসেন, ডা.মিলন শহীদ হন এ ব্যথাইবা আমরা ভুলি কিভাবে? তবে বিএনপি কিংবা আওয়ামীলীগকে ক্ষমতা থেকে অপসারনের আন্দোলনে কিংবা গত দুই তিন বছরের বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলনেও কিন্তু অনেকে অকাল মৃত্যুবরণ করেছেন। আসলে আন্দোলনে এটা হবেই। তাই বলে এরশাদ সাহেব ব্যক্তি হিসেবে খারাপ এমনটা নয়।

রাজনৈতিক এমন ব্যক্তিত্বকে নিয়ে অশালীন কথা বলা, মন্তব্য করা রাজনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত। এটা মানবতার পর্যায়ে পরেনা। গুগল সার্চ করলেই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সাহেব সম্পর্কে দেশের বরেণ্য রাজনৈতিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ব্যক্তিবর্গের করা ভদ্রতাসুলভ মন্তব্যগুলি দেখতে পাবেন যারা জীবিত এরশাদের মতাদর্শকে কখনওই মেনে নেননি। কারও মৃত্যুর পরেও তাকে সম্মান করা শালীনতার পর্যায়ে পড়ে। সে শত্রুও হোক তাতে কি? যে সারে তিনহাত মাটির তলে তিনি যাবেন সেই একই যায়গায় আপনাকেও যেতে হবে, কি ভুলে গিয়েছেন সে কথা?

মানুষের মৃত্যুর পরে তার মন্দ কর্মের সমালোচনা না করে পারলে দু’একটি ভালো গুনও বর্ণনা করা উচিত। আসলে আমাদের অভ্যাসই হচ্ছে যাকে ভালোলাগেনা তার চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করা। আর জীনগতভাবে এই কালচার প্রাকটিস করতে করতে আমরা ভুলেই গিয়েছি যার সম্পর্কে বলছি তিনি আর বেঁচে নেই, চলে গিয়েছেন না ফেরার দেশে।

তৌহিদ,রংপুর

১৫/০৭/২০১৯

———

তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া, বিবিসি নিউজ।

★যেহেতু উইকিপিডিয়া নির্ভরযোগ্য তথ্য ভান্ডার, তাই তা থেকে সংগৃহীত তথ্যের দায়ভার থেকে লেখক এবং সোনেলা সম্পূর্নরূপে মুক্ত থাকবে।

৫২১জন ১৩২জন
28 Shares

৩৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ