হিমালয়: 

হিমালয় এখানে একসময় ছিলনা, ছিলনা পাকভারত উপমহাদেশও 

Geology Of Himalayaঃ 

 

কেমন করে হিমালয় হলো  

‘গণ্ডয়ানা ’ ( Gondwana)’  এক বিরাট এলাকা । এই পৃথিবীর উপরি ভাগে ৫৫০ মিলিওন বছর আগে এক সংগে মিলিত ভাবে ছিল। এই মিলিত থাকা এলাকাটিকে গণ্ডয়ানা বলা হয়।

 গণ্ডয়ানা 

 

প্রায় ১৮০ মিলিওন বছর আগে জুরাসিক আমলে এই এক সংগে থাকা এলাকাটি বিছিন্ন হতে থাকে এবং সঞ্চালন হতে থাকে। 

এর কারন হল জিওলজিক্যাল প্রসেস( Geological Process)।  এই প্রসেসের মাধ্যমে tektonik প্লেট গুলোর প্রান্ত সীমানায় একটা  বিশেষ ব্যাপার  সংঘটিত হতে থাকে ।  

টেকটনিক প্লেটঃ 

Tektonik প্লেট হল পৃথিবীর সবচেয়ে উপরের স্তর। পৃথিবীর চারটি স্তর আছে।

 টেকটনিক প্লেট 

এই স্তরটি দুইটি প্রপার্টি দ্বারা তৈরি । হয় কেমিক্যাল না হয় মেকানিক্যাল প্রপার্টি । এই প্লেট গুলো সঞ্চারণশীল হওয়াতে এই গুলো বিভিন্ন দিকে পরিভ্রমণ করে। 

পাকভারত উপমহাদেশ একসময় অস্ট্রেলিয়ান প্লেটের সাথে ছিল । সেখান থেকে বিছিন্ন হয়ে উপরে যেতে  থাকে। একসময় ইউরেশিয়ান প্লেটের সাথে গিয়ে ধাক্কা দায় । ইন্ডিয়ান প্লেট তুলনামূলক ভাবে কঠিন ভাবে গঠন হওয়াতে নিচে প্রবেশ করে এবং ইউরেশিয়ান প্লেট ঊর্ধ্বগামী হতে থাকে। যতদূর পর্যন্ত এই এলাকা বিস্তৃত তত দূর জুড়ে ভাজ পড়তে থাকে এবং এই ভাজ গুলোই হল পর্বতমালা। আর এই ভাবেই হিমালয় পর্বত মালা সৃষ্টি হয়। এবং পাক ভারত উপমহা দেশ এসে এখানে জুড়ে বসে।+  ইন্দো অস্ট্রেলিয়ান ( Indo Australian)  প্লেট এখন পর্যন্ত তিব্বেতের প্লেটের নিচের দিকে শক্তিশালী ভাবে প্রবেশ করছে। যার  ফলে এই অঞ্চলে ভূমিকম্প লেগেই থাকে। এই এলাকা খুব বেশি Geologically active । প্রতি বছরে এক সেন্টিমিটার করে হিমালায় উপরের দিকে বর্ধিত হচ্ছে। 

দুই দিকে যে দুই কোনা দেখা যাচ্ছে সেই দুটি কোনা এখনো জীবন্ত

হিমালয়ের পশ্চিমের নাঙ্গা পর্বত এবং পূর্বের নামচা বড়ুয়া এত বেশি জীবন্ত যে সেখানে এখনো এই পরিবর্তন খালি চোখে দেখা যায়। জীবন্ত বলে এই দুইটি অঞ্চলে ভূমীধ্বস এবং ভূমিকম্প খুব বেশি হয়।   ব্রম্ভপুত্র নদ যা তিব্বত এলাকাতে ট্যাঁসংপো নামে পরিচিত তা মানসসরোবর হ্রদ থেকে উৎপত্তি হয়ে  চীনের Boney county  অঞ্চলে প্রথম বাঁক নায়। যাকে বলে ‘ The Great Turn Of Tsangpo’ । এখান থেকে এই নদী পর্বত অঞ্চলে প্রবেশ করে।সব চেয়ে  বেশি ভুমকম্প এই  দুটো স্থানেই  ঘটে ।   + 

পৃথিবীর উপরিভাগে ৭টি বড় এবং ৪ টি ছোটো প্লেট আছে। ১) Antartika, ২) North American ৩) Eurasian এই গুলোর মধ্যে কয়েকটি। 

প্লেট গুলো ১২৫ কিমি. পুরু। সমুদ্রের প্লেট ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার পুরু। 

Subduction বা অধোগমনঃ 

যখন একটা মহাদেশীয় বা মহা সাগরীয় প্লেট আর একটা মহাদেশীয় বা মহা সাগরীয় প্লেটের নিচে সঞ্চালিত হয়, তখন তাকে অধোগমন বলা হয়।  +

হিমালয়ের  অবস্থান ( Geography Of Himalayasঃ 

হিমালয় কে বলা হয় পৃথিবীর যতো মাউনটেন রেঞ্জ আছে তার মধ্যে নুতুন রেঞ্জ  এবং সবচেয়ে বেশি উঁচু এবং ব্যাপক বিস্তৃত। সবচেয়ে বেশি পর্বত শৃঙ্গের মধ্যে আটটির এর অবস্থান এখানে। এই রেঞ্জে সবচেয়ে বেশি মানুষ বাস করে। এর 

 উত্তরে আছে তিব্বত। হিন্দুকুশ ৮০০ কি মি , কারাকরাম পর্বত শ্রেণী ৫০০ কি মি লম্বা। দক্ষিণে আছে ইন্দো গ্যাঙ্গেটিক সমতল ভূমী। পুর্ব  হিমালয় পর্বত শ্রেণী ৫৯৫,০০০ sq মিটার জুড়ে অবস্থিত। চওড়া ১৫০ থেকে ৩৫০ কি মি । এর মধ্যে যে যে দেশ আছে সেগুলো হল চীন, ইন্ডিয়া, পাকিস্থান, নেপাল এবং  ভুটান। আফগানিস্থান, মায়ানমার এবং বাংলাদেশে কিছু অংশ প্রসারিত আছে ।  

জলবায়ু ( Climate) ঃ 

পুরো পাকভারত উপমহাদেশের জলবায়ু হিমালয় দ্বারা প্রভাবিত হয়। উত্তরের (সাইবেরিয়া) ঠাণ্ডা থেকে এই পর্বত শ্রেণী ব্যারিয়ার হিসাবে কাজ করে। উত্তরের শুকনো বাতাস এখানে আসতে  পারেনা। 

দক্ষিণ পুর্ব থেকে আসা মৌসুমী বাতাস এসে হিমালয়ে ধাক্কা লাগে এবং ফলস্বরূপ এদিকে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় । কিন্তু উত্তর দিকে তিব্বত অঞ্চলে তেমন বৃষ্টি হয়না। ইন্ডিয়ান ওস্যান এ সূর্যর প্রখর তাপে পানি বাষ্পে পরিণত হয় এবং এই জ্বলিও  বাষ্পের   কাল মেঘ  হিমালয়ে ধাক্কা লেগে বৃষ্টিতে পরিণত হয়। 

সিরিজ অফ মাউনটেন 

এই হিমালয়ে কয়েকটি সিরিজ অফ মাউন্তেন আছে। ১) তিব্বতিয়ান হিমালয়, ২) গ্রেটার হিমালয়, ৩) লেসার হিমালয়, ৪) সিওয়ালিক হিমালয়। এগুলো পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে লম্বালম্বি ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। 

হিমালয় পর্বত কে আবার এলাকা ভিত্তিক নাম দেয়া হয় যেমন ১) দি ওয়েস্টার্ন, ২) সেন্ট্রাল, ৩) ইস্টার্ন হিমালয়।    

গ্লেসিয়ার 

পৃথিবীর উত্তর মেরু ( নর্থ পোল ) আর্টিক অঞ্চল  এবং দক্ষিণ মেরুতে (Antertika ,  south pole)  যতো বরফ জমা আছে ঠিক সেই রকম বরফ এই হিমালয় অঞ্চলে জমা আছে এই জন্য একে বলা হয় ‘থার্ড পোল’ ।  এই হিমালয়ে গ্লেসিয়ার আছে ১৫,০০০ এর কাছাকাছি । প্রধান গ্লেসিয়ার হলো  ১) Gangotri, ২) khumbu, ৩) Yamunotri,৪) Zmu 

গ্লেসিয়ার হলো  ঘন, শক্ত এবং জমাট একটা বড় এলাকাজুড়ে ও পরিমাণে অনেক বরফের স্তূপ যা ক্রমাগত ভাবে নিজের ওজনেই সঞ্চালিত হয়।

নদী 

এই অঞ্চলের প্রধান প্রধান নদী গুলো এই গ্লেসিয়ার থেকে উৎপত্তি হয়েছে। যেমন গঙ্গা,ব্রম্ভপুত্র, সিন্ধু, yamuna, মেকং, নিঝাং, ইয়াঞ্চী, হয়াংহ, ইরাবতী। 

 

লেক 

হিমালয়ে অনেক লেক আছে যেমন পাঙ্গনা, Tilicho, gurudongmar, shephoks undo, মানস সরবর,এবং  Tsongmo । ৫৩ মিলিওন মানুষ  এখানে বসবাস করে। 

পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বত 

এখানে আছে এভারেস্ট, কাঞ্চন জংঘা , K 2, ধবল গীরি , মাছ পুছারি, অন্নপূর্ণা, মাকালু, Lhotse, Chooyu, নাংগা পর্বত, Broad, Gasherbrun, Manslu,Shishr Pangma,কৈলাস পর্বত  এবং নামচা বড়ুয়া । 

পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর গর্জ এখানে আছে যা কিনা কলরাডো গর্জের চেয়ে দ্বিগুণ । যে গর্জের মধ্যে দিয়ে ব্রম্ভপুত্র নদী যা সেখানে স্যাংপ নদী নামে পরিচিত তা পর্বতের মধ্যে প্রবেশ করেছে। গর্জ হলো  দুই সুউচ্চ পর্বতের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত নদী।

 ইকোলজি 

হিমালয় বিশেষ বৈশিষ্ট্য এর জন্য বিখ্যাত । আর সেটা হল এর নানা রকম ইকলজিক্যাল সিস্টেম। যেখানে কম altitudes সেখানে ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্ট দেখতে পাওয়া যায়। মধ্যম ধরনের altitudes যেখানে আছে সেখানে সাব ট্রপিক্যাল ফরেস্ট যেমন broad leaved গাছ  জন্মে , যেখানে খুব বেশি altitudes সেখানে coniferous ফরেস্ট এবং গ্র্যাস ল্যান্ড চোখে পড়ে । এবং তার উপরে আর কোন গাছ বা ঘাস কিছুই জন্মাতে পারেনা। কারণ অতিরিক্ত ঠাণ্ডা এবং অতিরিক্ত গতি সম্পন্ন ঠাণ্ডা বাতাস। 

হিমালয় বিখ্যাত কারন এখানে বৈচিত্র্যময় অদ্ভুত জীবজন্তু বসবাস করে। যেমন স্নো লেপার্ড, musk deer, তিব্বতিয়ান ভেড়া, বন্য ছাগল, লাল পাণ্ডা, বড় আকারের  পাণ্ডা, ক্লাউ ডেড  লেপার্ড, ভুটান তাইকুন এবং নানান ধরনের পাখী । 

যে কোন রকমের সন্দেহ দূর করে বলা যায় পৃথিবীর মধ্যে এটা একটা চমকপ্রদ এলাকা। যে কেউ এখানে গেলে যখন ফিরে আসবে তখন নিয়ে আসবে অতি আশ্চর্য এক স্মৃতি।  

তথ্য সূত্রঃ Maya Wei Haas, National Geographic, উইকিপেডিয়া। 

নিজস্ব ভ্রমণ অভিজ্ঞতা

ফটো ক্রেডিট ঃ উইকিপেডিয়া 

৩৬১জন ১জন
0 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ