করোনাভাইরাসে কাঁপছে গোটা বিশ্ব। এই মারণ ভাইরাসকে সামলাতে যখন সবাই হিমশিম খাচ্ছে এরই মধ্যে নতুন করে আবির্ভাব হলো হান্টাভাইরাস নামক নতুন একটি নাম। ঘটনা প্রবাহে আবার সেই চীন! গতকাল থেকে ফেসবুক, ট্যুইটার এবং ইনস্টাগ্রামসহ সকল অনলাইন মাধ্যমে নতুন একটি ভাইরাস নাম- হান্টাভাইরাস নিয়ে অনেকেরই মনে আবারো নতুন করে ভীতি সঞ্চার হয়েছে।

গত সোমবার দেশটির ইউন্নান প্রদেশে হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে একজনের। চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস থেকে জানা যায়- শেনডং প্রদেশ থেকে ইউন্নান প্রদেশে যাওয়ার পথে একটি বাসে মৃত্যু হয়েছে ঐ ব্যক্তির। তার শরীর থেকে নমূনা পরীক্ষা করে দেখা যায় হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। আর সে কারনেই বাকি ৩২ জন যাত্রীর নমুনাও পরীক্ষা করা হয়েছে।

সোনেলার পাঠকদের সকল ভীতি দূর করার জন্য হান্টাভাইরাসের আদ্যপ্রান্ত নিয়ে বিস্তারিত থাকছে আজকের লেখায়। আমি পাঠকদের আশ্বস্ত করে বলতে চাই- লেখাটি পড়ার আগেই হান্টাভাইরাস নিয়ে গুজবে কান দেবেননা, আতঙ্কিতও হবেননা। অনুগ্রহ করে সবাই নির্ভয়ে থাকুন, তবে সতর্ক থাকুন।

হান্টাভাইরাস কী এবং এর নামকরণের ইতিবৃত্ত –

কিছু ব্যক্তি হান্টাকে একটি নতুন ভাইরাস বলে অভিহিত করছেন, তবে এটি মোটেই নতুন ভাইরাস নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজিক ইনফরমেশন (NCBI) এর একটি জার্নালে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায় যে, বর্তমানে হান্টাভাইরাসের জিনগতভাবে ২১ টিরও বেশি প্রজাতি রয়েছে।

হান্টাভাইরাস চীনে মানুষকে হত্যা করেছে, ভয় ছড়িয়েছে, তবে এটি কোনও নতুন ভাইরাস নয়। চীনা রাষ্ট্র-সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ‘হান্টাভাইরাস’-এর কারণে একজন চীনা ব্যক্তি মারা গিয়েছেন আর এমন একটা সময়ে সে আতঙ্ক ছড়িয়েছে যখন বিশ্ব করোনাভাইরাস মহামারী নিয়ে লড়াই করছে। তবে হান্টাভাইরাস কোনও নতুন ভাইরাস নয় এবং বহু দশক ধরে এটি মানুষকে সংক্রমিত করছে।

১৯৭৮ সালে কোরিয়ান হেমেরলজিক জ্বর দক্ষিণ কোরিয়ার হান্টান নদীর কাছের একটি মঠে ছোট আকারে সংক্রমিত হয়ে পড়েছিল। হান্টান নদীর নামানুসারে ভাইরাসটির নামকরণ করা হয়েছিল হান্টাভাইরাস। প্রাথমিকভাবে আবিষ্কৃত এই ভাইরাসের প্রভাবকে বৈজ্ঞানিক বিভিন্ন পন্থায় বিশ্লেষণ করে (১৯৫১-১৯৫৩) দেখা যায়- কোরিয়ান যুদ্ধের পরে জাতিসংঘের সেনা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে কোরিয়ান হেমোরজিক ফিভারের আক্রান্ত প্রায় ৩০০০ এরও বেশি ঘটনা পরিলক্ষিত হয়।

১৯৮১ সালে, বুনিয়াভিরিড পরিবারে “হান্টাভাইরাস” নামে পরিচিত একটি নতুন জেনাস চালু হয়েছিল, যার মধ্যে রেনাল সিনড্রোমের hemorrhagic fever with renal syndrome [HFRS] রক্তক্ষরণ জ্বর হওয়ার ভাইরাসগুলিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

হান্টাভাইরাস CDC United States ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন সেন্টারস (সিডিসি) এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়- হান্টা ভাইরাসগোত্রীয় একটি পরিবার যা মূলত মৃৎশিল্পীদের দ্বারা ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি সারা বিশ্বে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন রোগের সিন্ড্রোম সৃষ্টি করতে পারে।

সিডিসি বলছে, সংক্রমণের ব্যাপ্তি পর্যালোচনা করে হান্টাভাইরাসগুলিকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে।

– নিউ ওয়ার্ল্ড হান্টাভাইরাস
– ওল্ড ওয়ার্ল্ড হান্টাভাইরাস

আমেরিকাতে হান্টাভাইরাসগুলি ”নিউ ওয়ার্ল্ড” হান্টাভাইরাস হিসাবে পরিচিত এবং এই হান্টাভাইরাস সংক্রমণে পালমোনারি সিনড্রোম hantavirus pulmonary syndrome [HPS] হতে পারে।

অন্যদিকে -“ওল্ড ওয়ার্ল্ড” হান্টাভাইরাস নামে পরিচিত অন্যান্য হান্টাভাইরাস বেশিরভাগ ইউরোপ এবং এশিয়াতে পাওয়া যায় এবং এর সংক্রমণে রেনাল সিনড্রোম (HFRS) এর সাথে রক্তক্ষয়জনিত জ্বর হতে পারে।

ক্ষতিকারক হ্যান্টাভাইরাস বহনকারী ইঁদুরের সংস্পর্শে আসা যে কোনও পুরুষ, মহিলা বা শিশু HPS পেতে পারে।

অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রজাতি (বিড়াল, কুকুর, কোয়োটস) সেই ভাইরাস বহনকারী ইঁদুরদের সাথে সংস্পর্শের মাধ্যমে সংক্রামিত হতে পারে তবে তারা ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটাতে পারে না।

এর মানে হচ্ছে হান্টাভাইরাস ইঁদুরের মাধ্যমেই সংক্রমিত হয়। কুকুর, বেড়াল এসব পশুর দেহ এই ভাইরাস ইঁদুরের মাধ্যমে আক্রান্ত হলেও তারা অন্যকে সংক্রমিত করতে পারেনা।

হান্টাভাইরাসের লক্ষণগুলি কী কী?

এই ভাইরাস বহনকারী ইঁদুর বা ইঁদুরের কাছাকাছি হওয়ার এক থেকে পাঁচ সপ্তাহ পরে সংক্রমিত মানুষ অসুস্থ বোধ করবে। প্রথমে এইচপিএস hantavirus pulmonary syndrome [HPS] সংক্রমিত ব্যক্তিরা এই লক্ষণগুলি পাবেন- জ্বর, গুরুতর পেশী ব্যথা, ক্লান্তি, কিছু দিন পরে তাদের নিঃশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হবে। কখনও কখনও মানুষের মাথা ব্যথা, মাথা ঘোরা, ঠান্ডা লাগা, বমি বমি ভাব, ডায়রিয়া এবং পেটে ব্যথা হয়।

সাধারণত এই ভাইরাস সংক্রমনে মানুষের সর্দি, নাক, কান, গলা ব্যথা, র‍্যাস বা ফুসকুড়ি হয় না।

হান্টাভাইরাসের ক্ষতিকর প্রভাব –

নর্থ আমেরিকায় শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু ইঁদুর যেমন- ডিয়ার মাউস, রাইস মাউস, হোয়াইট ফুটেট মাউসের নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতির মাধ্যমেই এই ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে। তবে সব ইঁদুর এই ভাইরাসের জীবানু বহন করেনা।

ইঁদুরের বিষ্ঠা, মুত্র ও মৃতদেহ থেকে এই ভাইরাস ছড়ায়। ১৯৫০ থেকে ২০০৭ পযর্ন্ত চীনে প্রায় ৫০,০০০ মানুষ মারা গেছেন এই ভাইরাসের প্রভাবে। কোরিয়াতেও এই ভাইরাসের প্রভাবে অনেক মানুষ মারা গেছেন। এই ভাইরাসে যদিও মুম্বাইতে ২০১৬ সালে একজন মারা গিয়েছিল, তবুও এটি সব ইঁদুরের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

চাইনিজরা ইঁদুর এর সাথে মাখামাখি করে পুরোনো এই ভাইরাসকে আবার ফেরত এনেছে। এটি ইঁদুরের মূত্র, বিষ্ঠা ও লালার মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। তবে ইঁদুরের এতে কিছুই হয় না। সেই ইঁদুরের মূত্র, লালা বা কোন ফ্লুইডের সংস্পর্শে আসলেই মানুষ ইনফেক্টেড হয়। এই ভাইরাসটি পুরাতন হলেও এরও ভ্যাক্সিন আছে।

এই ভাইরাসে সংক্রমিত হলে জ্বর, শ্বাসকষ্টের সমস্যা আর শরীর তীব্র ব্যথা হয়ে থাকে এবং ফুসফুসে পানি জমে রোগী মারা যায়।

চিকিৎসা পদ্ধতি-

হান্টাভাইরাস সংক্রমণের জন্য নির্দিষ্ট কোনও চিকিৎসা, নিরাময় বা ভ্যাকসিন নেই। তবে প্রাথমিক সনাক্তকরণের মূল বিষয়টি রয়ে গেছে। ইউরোপ এবং এশিয়ায় আমেরিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রগুলির মতে, “ওল্ড ওয়ার্ল্ড” হ্যান্টাভাইরাস এর প্রতিষেধক পাওয়া যায়।

ইউরোপীয় সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল বলছে- হান্টাভাইরাস রোগের চিকিৎসা মূলত লক্ষণাত্মক। তরল ভারসাম্য বজায় রাখা, যখন কোনও সম্ভাব্য অলিগুরিক রোগীর ওভার-হাইড্রেশন এড়ানো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এরকম ক্ষেত্রে রেনাল অপর্যাপ্ততার ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হতে পারে।

তবে প্রাথমিক লক্ষণ প্রকাশ পেলে যে ভ্যাকসিন ব্যবহৃত হচ্ছে সেটি হলো- HANTAVAX

একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জেনে রাখুন- ইসিডিসি বলছে, যেহেতু ইউরোপীয় হান্টাভাইরাসগুলি মানুষের থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েনা, তাই কোনও বিচ্ছিন্নতার (আইসোলেশন) প্রয়োজন হয়না। ইউরোপে মারাত্মক হ্যান্টাভাইরাস সংক্রমণে ব্যবহৃত একমাত্র ওষুধ রিবাভাইরিন।

হান্টাভাইরাসের ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা-

অন্যান্য হান্টাভাইরাসের প্রতিষেধক হিসেবে জন্য যে ভ্যাকসিনগুলি ব্যবহার করা হয় সেগুলির মধ্যে রয়েছে – সিওল (SEOV) ভাইরাস। তবে এই ভ্যাকসিনটি ইউরোপীয় হ্যান্টাভাইরাসগুলি পুওমালা [Puumala] (PUUV) এবং ডব্রভা-বেলগ্রেড [Dovrava-Belgrade] (DOBV) ভাইরাসগুলিতে কার্যকর বলে মনে করা হয় না।

২০১২ সাল পর্যন্ত ইউরোপ বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনও হান্টাভাইরাস ভ্যাকসিন ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত হয়নি। এখন পর্যন্ত মানবদেহের HTNV / PUUV ডিএনএ হান্টাভাইরাস ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ধাপের গবেষণা চলছে।

হান্টাভ্যাক্স ছাড়াও আরও তিনটি ভ্যাকসিন যাদের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের ক্লিনিকালি এখনো পরীক্ষা চলছে । এগুলির মধ্যে একটি রিকম্বিন্যান্ট ভ্যাকসিন এবং এইচটিএনভি এবং পিইউইভি ভাইরাস থেকে প্রাপ্ত ভ্যাকসিন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে তাদের সাফল্যের স্পষ্টতা এখনো দৃশ্যমান হয়নি। তাই প্রাইমারী স্টেজে এই ভাইরাস সংক্রমণে চিকিৎসা সম্ভব।

পরিশেষে-

হান্টাভাইরাস নিয়ে অযথা আতঙ্কগ্রস্থ হবেননা। আশার বাণী হচ্ছে, এটি ছোঁয়াচে নয়। তাই মনুষ্য থেকে ছড়ানোর ভয় নেই। আর ভারতবর্ষে এই প্রজাতির ইদুঁর পাওয়া যায় না। এই ভাইরাস মানুষের থেকে মানুষের দেহে ছড়ানোর যেহেতু কোনো প্রমাণ নেই তাই নির্ভয়ে থাকুন। তবে হ্যা, অবশ্যই সতর্ক থাকুন। যারা মাটি নিয়ে কাজ করেন, ক্ষেতে-খামারে কিংবা শেডের নীচে যেখানে ইঁদুরের উপদ্রব আছে সেখানে অবশ্যই সচেতনতা অবলম্বন করুন।

সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ্য থাকুন।

লক্ষ্যকরুন-

যেহেতু হান্টাভাইরাস নিয়ে গবেষণালব্ধ জার্নালগুলো ইংরেজীতে প্রকাশিত তাই মেডিকেল টার্মের এসব বৈজ্ঞানিক তথ্য পাঠকদের জন্য সহজভাবে বাংলায় বিশ্লেষণ করা আমার কাছে অত্যন্ত দূরহের একটি বিষয় ছিলো। আশাকরি যেকোন ধরনের অযাচিত এবং অনিচ্ছাকৃত ভূলভ্রান্তি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কোন তথ্যে ভূল থাকলে আমাকে জানাবেন আমি এই লেখায় তা সংশোধন করে দেব।

তথ্যসূত্রঃ

A. https://www.cdc.gov/hantavirus/

B. Lee HW, Ahn CN, Song JW, Back LJ, Seo TJ, Park SC. Field trial of an inactivated vaccine against hemorrhagic fever with renal syndrome in humans. Arch Virol. 1990;1(Suppl):35–47.

C. Schmaljohn, C. S. (2012). “Vaccines for hantaviruses: Progress and issues”. Expert Review of Vaccines. 11 (5): 511–513. doi:10.1586/ERV.12.15. PMID 22827236

D. Cho HW, Howard CR. Antibody responses in humans to an inactivated hantavirus vaccine (Hantavax). Vaccine. 1999;17:2569-75.

E. https://www.who.int/csr/don/archive/disease/hantavirus_pulmonary_syndrome/en/

৩৬০জন ৭২জন
62 Shares

৩৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ