হঠাৎ ভোরে

রাফি আরাফাত ৩১ মে ২০১৯, শুক্রবার, ০১:০৬:২১পূর্বাহ্ন গল্প ১৯ মন্তব্য

ভোরে উঠার মতো কোন প্রকার অভ্যাস ছিলো না আমার। কিন্তু তারপরও সেদিন কেন জানি কিছুতেই ঘুম আসছিলো না। চারদিকে পাখির ডাক শুনা যাচ্ছে। ভোর হয়েছে, হালকা আলো আসছে জানালা দিয়ে। যাই একটু বাইরে থেকে হাটে আসি।


বড় রা ঠিকি বলে, সকাল বেলার হাওয়া বেশ মুল্যবান। কি নির্মল হাওয়া, কি সুন্দর শান্ত পরিবেশ অথচ আমি আজ না আসলে জানতেই পারতাম না একটা সকাল কতটা সুন্দর হয়। কি জানি ভাবতেছিলাম, আর হাটছিলাম। আনমনে হয়তো ভাবতেছিলাম কাল থেকে প্রতিদিন হাটতে আসবো।

অনেকদূর হাটার পর বেশ ক্লান্ত হয়ে পরলাম। রাস্তার পাশে থাকা বসার মতো এক টং এ বসলাম। চারদিকে শান্ত পরিবেশে বেশ ভালো লাগছিলো। হঠাৎ কেউ একজন আমার পাশে এসে বসলো। তার পায়ে কোন জুতা বা স্যান্ডেল ছিলো না। পা গুলাও বেশ ধুলা মাখা। কিন্তু কেন জানি সুন্দর লাগছে তার পা। হয়তো সৌন্দর্য নিজে এসে ধরা দিয়েছে তার পায়ে।

পরনে সাদা শাড়ি। অবহেলিত আঁচলটা মাটিতে লেগে ময়লা হয়ে গেছে তার শাড়ির। তবুও কেন জানি সাদা শাড়িটা তাকে ভালোই মানিয়েছে। যদিও তার শাড়ির গঠন ঠিক ছিলো না কিন্তু তারপরও কেন জানি বেশ সুন্দর লাগছিলো। হাতে তেমন কিছু না থাকলেও দুই হাতে দুইটা চুড়ি আছে। এক হাতে একটা সাদা চুড়ি, আর আরেক হাতে একটা লাল চুড়ি। এমন করে চুড়ি পরার কারন তখন ঠিক বুজলাম না। কিন্তু তারপরও কেন জানি হাতগুলো বেশ সুন্দর লাগছিলো। চুড়ি কম এই জন্য খারাপ লাগছিলো না,বরং দুই হাতে দুই চুড়ি এটাই কেন জানি ঠিক লাগছিলো।

চুলগুলো তার উসকোখুসকো। কোনোটাই যেন সমান নেই। শেষ কবে চিরুনি করছে তা হয়তো তার মনে নাই। কিন্তু এভাবেই ঠিক আছে। হয়তো চিরুনি করলেই তাকে খারাপ লাগতো। কি অদ্ভুত তাই না। স্বাভাবিকতা তার কাছে অসুন্দর, আর অস্বাভাবিকতা তার কাছে সুন্দর।

তার চেহারায় এক মায়া আছে। যা বার বার আমাকে তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করেছে। লজ্জা হয়তো তখন লজ্জা পেয়েছে। কেন তার দিকে তাকিয়ে আছি তা আমি জানি না। কিন্তু না তাকিয়ে থাকতে পারবো না সেটা আমি জানি। এভাবেই প্রায় ঘন্টা খানেক চলে গেলো।

এরপর থেকে প্রতিদিন সকালে উঠা আমার অভ্যাসে পরিণত হলো। প্রতিদিন সকালে উঠে হাটার ছল করে তাকে দেখা। এভাবে বেশ কিছুদিন চলে গেলো। অনেকদিন তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেও পারিনি। তাকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করেও তার কোন উত্তর পাইনি আমি। কিন্তু একদিন সে কথা বললো।
– আচ্ছা আপনি প্রতিদিন সকালে উঠে এখানে আসেন কেন?
– এমনি ইচ্ছে করে তাই।
– আপনার নাম কি?
– রাত্রি।
– আপনি কি কিছু বুজতে পারেন না?
– কি বুজবো?
– না কিছু না। কেউ আপনাকে ভালবাসি বললে কি বলবেন আপনি?
– ভালবাসি, ভালবাসার মানুষকে, ভালবাসার জায়গায়, ভালবাসার সময়ে বলতে হয়। কিন্তু এখন আমার জীবনে কোনটাই নেই। উত্তরটা এখন বুজে নেন।

সেদিনের পর আমি আর তাকে দেখিনি। বেশ অস্থির লাগছিলো। কেন নাই সে। কোথায় গেছে। বেশ খোজাখুজির পর তার বাসা জানতে পারলাম। দেরি না করে সেদিন সকালেই চলে গেলাম তার বাসায়। বাসায় গিয়ে দেখি এক বৃদ্ধ ছাড়া আর কেউ নেই।

– আচ্ছা চাচা রাত্রি কোথায়?
– কে ওই মেয়েটা? সে তো কাল বিকেলে চলে গেছে।
– কোথায় গেছে? আর তার সাথে আপনার কি সম্পর্ক?
– কোথায় গেছে জানি না। আর সে আমার কিছু হয়না। কিছুদিন আগে আমার বাড়ির বাইরে পরে ছিলো। পরে শুনি তার থাকার মতো কোন জায়গা নেই। তাই আশ্রয় দেই আমার বাসায়। কিন্তু কাল বিকেলে সে কিছু মানুষ আসে তাকে নিয়ে যায়। জিজ্ঞেস করলে জানতে পারি একজন তার বাবা। তিনি বলেন, রাত্রির স্বামী মারা যাওয়ার প্রায় ২ বছর হয়ে গেছে। তখন থেকে সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে। কখন কোথায় যায় জানে না।

আচ্ছা তাহলে সেদিন রাত্রি যা বললো তা কি সে ভেবে বলেনি? হয়তো ভেবেই বলেছে। কিন্তু সে এভাবে বললো কেন? কোন ভারসাম্যহীন মানুষ তো এভাবে কথা বলতে পারে না। হয়তো সে আমাদের কাছে মানসিক ভারসাম্যহীন। কিন্তু নিজের ভালোবাসার কাছে সেই প্রিয় ব্যাক্তিটি।

রাত্রির প্রতি আমার অনুভূতি কি ইঙ্গিত করে তা আমি জানি না। কিন্তু হয়তো তাকে পাওয়ার একটা আকাঙ্খা আমাকে কিছুদিন অথবা সারাজীবন তাড়া করবে। সে তাদের কাছে পাগল যারা তার অতীত জানে, কিন্তু আমাদের কাছে সে স্বাভাবিক।

এখনো সকাল হলেই উঠে আসি আমি। জানি রাত্রি আসবে না। কিন্তু তারপরও আসি। যদি কখনো আবার এক সকালে সাদা শাড়ি পরে, উসকোখুসকো চুল, আর ধুলা মাখা পা নিয়ে রাত্রি আসে আমার পাশে বসে!

* আমাদের ভালবাসাগুলো অপেক্ষা নামক শব্দটার কাছে বন্দী। আর অপেক্ষা শব্দটা অনিশ্চিয়তা শব্দটার কাছে বন্দী।*

৫৪১জন ৪২৪জন
2 Shares

১৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ