স্মৃতি

বন্যা লিপি ২৯ জুলাই ২০২২, শুক্রবার, ০২:৫৬:০৭পূর্বাহ্ন স্মৃতিকথা ১৩ মন্তব্য

মিষ্টি টাইপ একটা রং, তার ভেতরে সেনালী কালোয় জলছাপ একটা দারুন ফিনফিনে জর্জেট শাড়ি,ম্যাচিং শার্টিনের ব্লাউজ। ধবধবে ফর্সা গায়ের রংয়ে যেন বৃ্ষ্টি ভেজা গোলাপের মত একটা মানবীয় মুখ। কনে বৌয়ের কপালে লাল টিপ,চোখে গাঢ় কাজলে টানা চোখ। রাঙা ঠোঁটে লাজুক হাসি। সামান্য গহনায় ঐশ্বর্যের খামতি নেই। চোখমুখে দৃঢ় একটা দৃশ্যায়ন চোখে পড়ল আমার।  ওটা আসলে কিসের দৃশ্যায়ন, আমি তখন তার ব্যাখ্যা জানিনি। আজ যখন স্মৃতিচারণে বসেছি! স্পষ্ট যেন দেখতে পাচ্ছি সেদিনের ১০০ পাওয়ার বাল্বের আলোতে টিন কাঠের দোতলা বাড়ির মাঝখাটালের ঘর ভরে আছে অন্যরকম দ্যুতিময় আলোয়। তখনো আলোচনা চলছে কনে বৌকে কোথা থেকে কিভাবে নিয়ে যাওয়া হবে।

সিদ্ধান্তহীনতায় ঢিবঢিব করছে আমার বুক। কাকিমার কানের কাছে চুপি চুপি বললাম- তোমাকে কি আজ নিয়ে যেতে পারব না? কাকিমা গলায় জোড় টেনে আস্তে করে বললো- গেলে, আজকেই যাব দেখে নিও। আমি দৃঢ়তার পেছনে একটু থতমত খেয়ে গেলাম। নতুন বৌ এমন করে বললো কি করে?                                    বাইরের ঘর থেকে ডাক পড়ল ততক্ষণে,,, আমাদের চলে যাবার সময় হয়েছে। তখন রাত প্রায় সারে নয়টা। মাসুমাদের বাসা থেকে আমাদের বাসার পথ সামান্যই। হাঁটা পথ। দাদুর বাসায় ফিরে এলাম আমরা সবাই,,,, কানাঘুষো নয়, এবার জোড়েসোড়ে আলোচনা চলছে কুট্টি কাকা, হিরু কাকা এদের মধ্যে কখন কোথা থেকে নতুন বৌকে আনতে যেতে হবে! দেড় ঘন্টা বাদে নিশ্চিত হওয়া গেলো আমরা এবার যাচ্ছি আমাদের পাড়া ছেড়ে আরেক পাড়ায়। আমাদের ছোট্ট শহর একেকটা পট্টি নামে পরিচিত। কামার পট্টি, শাঁখারি পট্টি, কুমার পট্টি, তরকারি পট্টি,কাপুড়িয়া পট্টি, হোগলা পট্টি, টিন পট্টি এরকম যেমন আছে তেমনি….  আমতলা রোড, কালিবাড়ি রোড, রোনালস রোড, পালবাড়ি, চাঁনকাঠি, জাইল্লা পাড়া। কামারপট্টি রোনালস রোডে আমাদের বাসা( দাদদার বাসা+আমার বাবার বাসা)।  মাসুমাদের বাসা আমাদের বাসা থেকে সোজা হেঁটে গিয়ে ফায়ার সার্ভিস রোডে পড়েছে। এখন আমরা যাব কাঠ পট্টি উদ্বোধন স্কুল রোডে। স্কুলের পেছনদিকে কনে বৌএর মামার বাসা থেকে বৌ নিতে রওয়ানা হলাম রাত সাড়ে দশটার দিকে। ওখানে খাওয়া দাওয়া শেষ করে বৌ নিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত তিনটা। তারপর মা চাচিদের হাসি মস্করা শেষ হতে হতে প্রায় রাত কাবার।  তার দু’ দিন  পর ছোটকা একাই সিলেট চলে গেলেন। ২/৩ মাস পরে এসে কাকিমাকে সাথে করে নিয়ে গেলেন। মাঝের এই ২/৩ মাস কাকিমা আমাদের সাথেই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলেন।

পরিবার বেশ বড়, কাকিমার সময় কাটাতে কোনো সমস্যা নেই। সমবয়সী মুক্তি আমি ভীষণ পিছু পিছু থাকি। থাকে পলি ফুপুও। ভাসুর ঝি কম আমার বন্ধুর চেয়েও বন্ধু হয়ে গেলো কাকিমা। সিলেট চলে যাবার পরে আমাদের চিঠি পর্ব শুরু হলো। নিয়মিত যেমন কাকিমা চিঠি লেখে! তেমনি আমিও। বছর ঘুরে কাকিমা এলেন অন্তস্বত্বা হয়ে। কাকিমার রক্তের গ্রুপ ভিন্ন রকম বলে ডাক্তার পরামর্শে আগে থেকেই ইঞ্জেকশন রেডি করে রাখতে হবে। দেশে সে ইঞ্জেকশন পাওয়া যায়না। দেশের বাইরে থেকে আনাতে নানা রকম বন্ধু, আত্মীয় স্বজনের সাথে যোগাযোগ করে আনিয়ে রাখা হলো। যথা সময়ে প্রথম কন্যা সন্তানের জন্মও হলো এক অক্টোবরের ২ তারিখে। মাঝে কিছুদিন বড়দের  সম্পর্কে কিছুটা বরফ জমে গিয়েছিলো। কুট্টি কাকার বিয়ে ও এরই মাঝে সম্পন্ন হয়ে গেলো। কুট্টি কাকার বৌ তখন নতুন বৌ পরিবারে। মাসুমার বিয়ের অনুষ্ঠানে আবার কাকিমার আর বড়দের বরফ গলার সুযোগ হলো। কাকিমা নবজাতক শিশু কন্যাকে নিয়ে আমাদের বাসায় এসে উঠলেন। বেশ কয়েক মাস আমার সাথেই ছিলেন। তনুকে আমি ভীষণ আদরে রাখি। সকালে কাকিমা তনুকে আমার গায়ে এসে ছেড়ে দেন। তনুটাও খিল খিল করে হাসে আমার বুকে উঠে। আমি কপট ধমক দিয়ে বলি- খবরদার আমার মুখের ওপর আবার হিসু করে দিসনা যেন! বজ্জাত  তনুটা বলতে  দেরী আর সত্যি সত্যি আমার বুকের ওপরেই হিসু করে দিলো। রাগ জিদ দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করি, মুখে বলি- তুই এহন আরেকটু বড় হইলে ঠাঁটাইয়া কিল দিতাম তর পিঠে। তনু কি আর বোঝে! কাকিমা  হেসেই গড়ায় আমার হাল দেখে।  ভালো,মন্দ সব কাকিমার সাথে শেয়ার করতাম। একজন বন্ধুর মত গাইড করত কাকিমা। এক বিকেলে বেড়াতে গিয়েছিলাম কাকিমার সাথে,,,, আমার কোলে তনু,,, সুর্য  তখন বিদায় নেবার জন্য পশ্চিমের পথে কমলা রোদ ঢেলে দিচ্ছিলো। আমি আনমনে সেদিকেই তাকিয়ে ছিলাম, কাকিমা কখন পাশে এসে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার মুখের দিকে…. কি দেখছ কাকিমা?

: তোমাকে

– মানে!!

: এই মুহুর্তে আমার হাতে একটা আয়না নয়ত একটা ক্যামেরা নেই… আফসোস

– মানে কী! ক্যামেরা বা আয়না হলে কি হতো?

: ওই গোধূলির রং তোমার মুখে এসে পড়াতে তোমাকে কেমন দেখাচ্ছে সেটা ধরে রাখতাম নয়তো আয়নাতে তেমায় দেখাতাম। সত্যি বলছি….. এই তোমাকে এর আগে এমন দেখিনায় মনে হয় আমি।

আমি প্রচন্ড লজ্জায় কাকিমাকে উল্টো কথায় ফিরিয়ে নিয়ে গেলাম। ভাগ্যিস!!! ঠিক তখনই তনুটা আবারো আমার ভিজিয়ে দিলো হিসু করে। আমি রেহাই পেলাম উদ্ভুত পরিস্থিতির হাত থেকে।

ঘটনাগুলো যেন দ্রুত ঘটে গেছে বছরের হিসেব মেলাতে মেলাতে। মাঝে আরো কতকিছু ঘটে গেছে! বছর যেন লাফিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে গিয়ে আমিও বাবার বাড়ির নাইওর হয়ে গিয়েছি। বাবার বাড়ি ছেড়ে আমিও ডেড়া গেড়েছি ঢাকা এসে। কাকিমা আর আমার চিঠি আদান প্রদান নিয়মিত চলে। প্রতি চিঠিতে তার একটা কথা থাকেই- তুমি কবে আসবে সিলেট বেড়াতে? এখানকার সবাই তোমাকে দেখতে চায়। আমি এত বলেছি তোমার কথা এদের ( কাকিমার প্রতিবেশি) কাছে! তারাও এখন অপেক্ষায় আছে তোমাকে দেখার জন্য।

আমার বর চাকরি সুবাদে প্রায়ই ট্যুরে সিলেট,হবিগঞ্জ  যাতায়াত করেন বলে বেড়াতে যাবার একটা সুযোগ তো থাকেই! কিন্ত…. আমাকে নিয়ে যাবার সুযোগ কখনো হয়ে ওঠেনি। আমার সংসার নিয়ে আমি এতটাই ব্যস্ততায় কাটিয়েছি দিনগুলো! এরপর ভুলেও গেছি সিলেট বেড়াতে যাবার কথা।  একে একে আমিও দুই বাচ্চার মা হয়েছি। তাদের স্কুল পড়াশেনা। যৌথ পরিবারের বড় বউএর ঝক্কি। যৌথ পরিবার থেকে আলাদা ভাড়া বাসা নিয়ে আলাদা হয়ে গেলাম এক সময়। এখন তো আরো মনে নেই কোথাও বেড়াবার কথা। একক সংসারে আসার পর আমি তৃতীয়বারের মত সন্তান সম্ভবা হলাম। ক্রমশ দিনগুলো কেটে যেতে যেতে বুঝতে পারছি, প্রসব কালীন সময়ে ঢাকায় থাকা সম্ভব না। মায়ের কাছে চলে গেলাম। জানলাম কাকিমাও দ্বিতীয়বারের মত প্রেগন্যান্ট। প্রসবের তারিখ  আমার থেকে মাসখানেক দেরীতে। তনু তখন সিক্সে পরে। এই দীর্ঘ সময়ে কাকিমা ইচ্ছে করেই আর সন্তানের কথা ভাবেননি।

জুলাইয়ের ২২ তারিখ রাত থেকেই আমি অসুস্থ।  ২৩ তারখ সকাল ৮:৪৩ মিনিটে তৃতীয় সন্তান ছোট ছেলে সাকিনের জন্ম হলো। ২৪ তারিখ সকাল- ঃ আম্মা রান্না ঘরে। আমি ছেলে নিয়ে আমার রুমে।  রান্নাঘর থেকে আম্মা ছুটে এসে আমাকে ডাকছেন। তিনরাত পর আমি বেঘোরে ঘুম। আম্মার ডাকে যখন চোখ খুলে গেলো! আমার ডান হাতের তর্জনী চলে গেলো মুখে। নীচের পাটির দাঁতে। দাঁতে আঙুল রেখে আমি আম্মার দিকে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছি…. আম্মা জিজ্ঞেস করলেন- কি? কোনো স্বপ্ন দেখছিস? : আম্মা!! আমার এই দাঁতটা কী পইড়া গেছে? আমি কি তাইলে স্বপ্ন দেখছি এতক্ষণ?   হঠাৎ আম্মার মুখ অন্ধকার হয়ে গেলো। বললেন- দাঁত পইড়া যাওয়া স্বপ্ন দেখলে তো….. মনের ভেতর খচখচ করতে লাগলো। আল্লাহ্ ভালো জানেন কি রেখেছেন কার কপালে।

দুপুর ২টার দিকে দাদুর বাসা থেকে খবর এলো- সিলেট থেকে ফোন আসছে কাকিমাকে  হাসপাতালে নেয়া হয়েছে গতরাতে। ডেলিভারির সময় হয়নি এখনো, তাহলে? প্রেসার বেড়ে গিয়ে অবস্থার অবনতি হওয়াতে দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। ২৩ তারিখ কাকিমা তার প্রতিবেশি দাওয়াত দিয়ে খাইয়েছেন নিজের হাতে রান্না করে। আমার কাকিমা অনেক মিশুক।  মেহমান আপ্যায়নে ভীষণ আনন্দ পান। কাকিমার কাছে তার মা ছিলেন। নানু কম খাটনি করতে বললেও কাকিমা বলছিল – আমার হাতে ভাই- ভাবি শেষবারের মত খাবে, এরপর তো আর আসবে না। তারা তো বদলী হয়ে চলেই যাচ্ছে….।

ডাক্তার কাকিমার অবস্থা দেখে দ্রুত ইমারজেন্সীতে নিয়ে গেলেন। প্রেসারের ঔষধ সময়মত নিতে ভুলে গিয়েছিল কাকিমা। ক্যাডেট কলেজ থেকে ফোন করে জানানো হলো ঝালাকাঠি থেকে ছোটকার আপনজনদের কেউ যেন দ্রুত রওয়ানা হয়ে যায় সিলেটের উদ্দেশ্যে। মেজো চাচা, সেজো চাচা  তখন ঢাকাতেই কাজে অবস্থান করছিলেন। আব্বার পক্ষে তখন যাওয়া সম্ভব না। বাকি আরো দুই চাচাও নিজেদের কাজে ব্যস্ত। মেজো,সেজো চাচার সাথে যোগাযোগ করা হলো, কাজ শেষ করেই যেন ঢাকা থেকে সিলেট চলে যায়। উৎকন্ঠায় সময় পার হচ্ছে এদিকে। কখন একটা খবর পাওয়া যায়! ২৫ তারিখ সন্ধ্যার পরে খবর এলো,,,, সিজারের মাধ্যমে কন্যা সন্তানের জন্ম হয়েছে। কাকিমা এখনো বিপদ মুক্ত নয়। ডাক্তার বলছেন ৭২ ঘন্টা না গেলে কিছুই বলা যাচ্ছে না। ছেটকা জুম্মার নামাজ কায়েম করলেন হযরত শাহজালাল মাজার মসজিদে। একজন খাদেম ছোটকার কান্না দেখে জানতে চাইলেন কি হয়েছে! ছোটকা বলার পরে, একটা ফুল দিয়ে বললেন,,, আল্লাহর নাম নিয়ে এই ফুল আপনার স্ত্রীর শিয়রে রেখে দেন। আল্লাহ্ চাইলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

ছেটকা ফিরে এসে ফুলটা নার্সের হাতে দিয়ে বলেছিলেন কাকিমার শিয়রের বালিশের নিচে রাখতে। ডাক্তার নার্স ছোটকাকে আর বলেননি…কাকিমা তখন কি পরিস্থিতী মোকাবেলা করছেন! হাই প্রেসারের কারনে ব্রেইন স্ট্রোক করেছেন তখন অলরেডি। ধনুকের মত বাঁকা হয়ে যাচ্ছেন কিছুক্ষণ পর পর। সর্বোচ্চ চেষ্টার ত্রুটি করেননি ডাক্তার টিম। ৭২ ঘন্টার মরণপণ যুদ্ধে ২৭ জুলাই সকাল সাড়ে দশটার দিকে কাকিমা আমার হেরে গেলেন ———- দুদিনের শিশু কন্যার নাম রাখা হলো—- স্মৃতি

১৮৭জন ১৭জন
0 Shares

১৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ