স্মৃতি রোমন্থন

প্রদীপ চক্রবর্তী ১০ মে ২০২০, রবিবার, ০৯:১৩:০০অপরাহ্ন স্মৃতিকথা ১৯ মন্তব্য

শরৎ শোভায় সুশোভিত

নিপাট শৈশবসঙ্গী আর কিছুটা এলকোহলিক নেশা…

এ দিয়ে আমার স্মৃতিকথার অগ্রযাত্রা!

আমি গ্রামের সন্তান তাই গ্রাম আমার সভ্যতা ও সংস্কৃতির পাদপীঠ।

আমার গায়ে মা মাটির গন্ধ। নেই আভিজাত্যের আভাস।

সবুজ প্রকৃতির নিভৃত এক প্রীতিময় আবেগ ও স্নিগ্ধতায় সর্বাঙ্গ পরিপুষ্ট গ্রামে আমার জন্ম।

শৈশবকালে মায়ের কোলে হাসিতে আর খেলিতে একে একে শৈশবের স্মৃতি মেখে মেখে পদার্পণ করলাম কৈশোরকালে।

ছায়া সুনিবিড় গাঁয়ের কিশোর বন্ধুদের সঙ্গে যেতাম এদিক ওদিক। স্কুল থেকে ফেরার পথে ছুটে যেতাম ইটের ভাঁটায় কিভাবে ইট পুড়ে তা দেখতে।

একজন আরেকজনের স্কুলের ইউনিফর্মে লাগিয়ে দিতাম কয়লার কালোরঙ।

আর বাড়িতে ফিরে মায়ের বকুনি!

কখনো বন্ধুদেরকে নিয়ে ছুটে যেতাম পাশের বাড়ির নিরদ দাদুর আমবাগানে।

আমি, সুমন, রিফাত, নয়ন, রাহুল, জাবের, মারুফ,

তপু আর অপু এ দুজন ছিলো যমজ ভাই।

সবাই মিলে কত যে আম চুরি করে খেয়েছি তার ঠিক নেই। যদিও বাড়িতে ফলমূলের অভাব ছিলো।

অনেক আম,জাম, লিচু কত যে খেয়েছি বিশেষ করে নিরোদ দাদুর বাড়িতে।

বন্ধু জাবের সবাইকে বলতো পোকা আম নাকি খেলে সাঁতার শিখা যায় সহজে। তাই সবাই মিলে পোকা আম খেয়ে বৈশাখের ভ্যাপসা গরমকে উপেক্ষা করে সাঁতার কাটতাম কালভার্টের নিচে জলাধারে কখনো তপুদের পুকুরে।

নিরোদ দাদু হোমিও ডাক্তার হলে কি হবে মারাত্মক হাড় কিপটে ছিলেন। সহজে কোনকিছু বলে পাওয়া যেতো না।

আমি অনেকবার স্কুল পালিয়েছি। বাড়িতে হেডস্যারের বহু নোটিশ এসেছে।

পরেরদিন স্কুলে যাওয়ার পর বাংলা ম্যাডামের বেতের বাড়ি আর ব্রেঞ্চের নিচে তিন চার মিনিট মাথা ঢুকিয়ে রাখতেন।

শাস্তির পর আমার কষ্টের সমব্যথীত হতেন ম্যাডাম

আর ভালোভাবে বুঝাতেন যে মনযোগ সহকারে লেখাপড়া করার জন্য।

এভাবে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত দুষ্টুমি কত যে করেছি তার হিসাব আমি আর বাংলা ম্যাডাম জানেন।

এছাড়া অন্যান্য ম্যাডাম ও স্যারদের অনেক বেতের বাড়ি আর কান ধরে ওঠানামা এসব বহুবার করেছি। ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেয়েছি এবং বিদায়ের দিন ম্যাডাম আমায় ধরে কেঁদে ফেললেন।

তখন আমার মা আমার সাথে ছিলেন মাও কেঁদে ফেলেছেন। আর আমি তা দেখে মা ও ম্যাডামের চোখের দিকে চেয়ে থাকলাম নির্বাক হয়ে।

সকল স্যার ও ম্যাডামরা বিদায়বেলা আমাদেরকে মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করে দিলেন।

আজ শুধু স্মৃতি।

স্যার ও ম্যাডামরা আজও ভালোবাসেন।

তাঁদের কাছে আমি চির ঋণী।

তাঁদের আশীর্বাদে আমি আজ ছাত্রজীবনের একেকটা ধাপ ভালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছি।

স্কুল ছুটির পূর্বে বন্ধুদের বইয়ের ব্যাগে কত ইট ভরে রাখতাম। কখনো ব্যাগের ফিতা ব্রেঞ্চের সাথে বেঁধে রাখতাম।

কুয়াশায় নিমজ্জিত দূর্বাঘাস।

শরতের আনন্দলোকে আগমনী দেবীর বার্তা

আর শিউলি ঝরা ভোরে কাশফুলের গায়ে কুয়াশামাখা সকাল। মহালয়ার ঠিক কয়েকদিন পর চলে আসে দুর্গাপূজা। মনের মধ্যে কত আনন্দ জেগে উঠে রাজবেশে রাজধ্বনিতে সংস্কৃত মন্ত্রের আবাহনে দেবী দুর্গার আগমন।

দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজা আর শ্যামাপূজার মধ্যেই আনন্দই ছিল গ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে।

দুর্গাপূজার চার পাঁচদিন আগে বাড়ির সবাই মিলে কেনাকাটা করে নিতাম। এ কেনাকাটা নিয়ে মনের মধ্যে বেশ আনন্দের অনুভূতি জাগ্রত হতো যা বলে শেষ করা যাবেনা। বাবা হোমিও ডাক্তার ছিলেন ও এর পাশাপাশি যাজনিক কাজে যেতেন।

বাবার সাথে আমরা ভাইবোন সবাই মিলে কেনাকাটা করতে যেতাম।

মহালয়া থেকেই আগমনী বার্তা আর কাশফুলের গায়ে নিমজ্জিত কুয়াশা মনে করে দিতো আসছেন আমাদের মাঝে আগমনী দেবী দুর্গা।

এ নিয়ে বাড়ির পাশের রাজ রাজেশ্বরি মন্দির সাঁজানো এছাড়া মৃৎ শিল্পীর কাজের ধুম পড়ে যেতো।

মন্দিরে গিয়ে সারাদিন বসে থাকতাম মৃৎশিল্পী অধীর কাকুর কাছে। কখনো তুলি এনে সিংহের গায়ে রঙ লাগিয়ে দিতাম। কখনো অসুরের গোঁফ লাগিয়ে দিতাম। কখনো বা নিজে পাটের আঁশ রঙ করে নিজের গোঁফ নিজে লাগাতাম।

বিশেষ করে ষষ্ঠী থেকেই পূজা আড়ম্বরের সহিত পালিত হতে চলে। বাড়িতে ফলমূলের কথা বাঁদ দিলাম। মা ও ঠাকুমার হাতে বানানো নারিকেলের নাড়ু, পিঠা,সন্দেশ, পাটিচাপটা, ইত্যাদি ইত্যাদি যা পূজা শেষে প্রসাদ হিসেবে খেতাম।

বিশেষ করে আমি নারিকেলের নাড়ু খেতে পছন্দ করি তাই মা আমায় নাড়ু বলে ডাকেন। আবার গ্রামের অনেকে এবং বন্ধুরা নাড়ু না বলে মজা করে এখনো লাড়ু বলে ডাকে কিন্তু মা এখনো আদর করে নাড়ু বলে ডাকেন।

তবে এই নামটা আমার হাইস্কুলের অনেক স্যার ম্যাডামরা জানেন। মাঝেমধ্যে গণিতের স্যার আমায় বলতেন প্রদীপ অনেকদিন হলো লাড়ু খাইনি তখন আমি বলতাম স্যার লাড়ু নাড়ু।

লক্ষীপূজা আসলে খাবেন স্যার। আর ক্লাসের সবাই আমার এ নাম নিয়ে হাসতো।

আর বাবা কুটুবাবা বলে ডাকেন ঠাকুমা কখনো কুম্ভকর্ণ কখনো তপু বলে ডাকেন।

তবে ঠাকুমা অধিকাংশ আমায় কুম্ভকর্ণ বলে ডাকেন।

এ নামটা শতবর্ষী ঠাকুমার মুখস্থ ও ঠুটস্থ হয়ে গিয়েছে।

আমি নাকি বেশি ঘুমাই তাই ঠাকুমা নাম রেখেছেন কুম্ভকর্ণ। আর এ ঘুমের জন্য মা মাঝেমধ্যে জমিদারের পুত্র বলে ডাকেন।

মায়ের নাড়ু ডাকটা আমায় মুগ্ধ করে তুলে।

ছোটবেলা পূজাপার্বণে উপোস রাখার জন্য লেগেই পড়তাম। কিন্তু মা,ঠাকুমা না করতেন উপোস না রাখতে। অবাধ্য হয়ে আরকি খেয়েদেয়ে আমার উপোস পালন!

ষষ্টি থেকে দশমী পর্যন্ত ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে বন্ধুরা সবাই মিলে ফুল তুলতে যেতাম একগ্রাম হতে অন্যগ্রামে চাদর দিয়ে মুখ ডেকে।

আর এ ভূরবেলায় মনের মধ্যে একটা ভাবনা আসতো যদি ফুল গাছে কোন ভূত থাকে তাহলে তো উপায় নেই।

ছোটবেলা ঠাকুমার মুখে কত ভূতের গল্প শুনেছি আর এসব হঠাৎ মনে হলে এখনো ভয় জাগে।

তাছাড়া মনে এখনো ভূত দেখার ভাবনা জাগে

আজও ভূত দেখতে পাইনি।

মাঝেমধ্যে উপোস রাখতাম অন্যের দেখাদেখিতে।

উপোস থেকে সবাই মিলে অঞ্জলী নিতাম।

তারপর পূজা শেষ হলে প্রসাদ খেয়ে ছুটে যেতাম একপাড়া থেকে অন্য পাড়ায়।

বিশেষ করে ছোটবেলা গ্রামে পূজাপার্বণ দেখতাম।

ক্লাস নাইনে সব বন্ধু মিলে গিয়েছিলাম পূজা দেখতে শ্রীমঙ্গল।

ইদানিং কয়েক বছর থেকে বাবা মা ভাইবোন সবাই মিলে পূজা দেখতে একজায়গা থেকে অন্যজায়গায় যাই। সবাই মিলে একসাথে পূজা দেখার আনন্দ আলাদা।

পূজার দিনে সাধু সন্ন্যাসীর গান বাজনা যা আমার শুনতে খুবি ভালো লাগে।

বাড়ি ফেরার পথে পূজোর মেলা থেকে গজা, বাতাসা, খই, মন্ডা আর হাওয়াই মিঠাই এগুলো ছাড়া পূজোর মজা যেন অসম্পূর্ণই থেকে যেতো।

 

দশমীতে দেবী দুর্গাকে বিসর্জন দিয়ে বাবা,কাকু,দাদা ও আমি বাজারে যেতাম। বাজার থেকে কিনে আনা হতো ইলিশ মাছ,পাঁচ জাতের মিষ্টি এছাড়া গ্রামের নববধূদের জন্য সিঁদুর আনতেন বাবা। মন্দির থেকে একে একে সবাই আসতো আমাদের বাড়িতে। কোলাকুলি, মিষ্টি খাওয়া, বড়দের প্রণাম আর ছোটদের স্নেহ প্রীতি জানিয়ে সমাপ্ত হতো দশমীর আনন্দঘন রেশ।

 

২০১৩ সালে কলকাতায় পূজা দেখেছি সাথে ছিলেন বাবা ও কাকু। কলকাতার পূজার আনন্দ যা লিখে শেষ করা যাবেনা। পুরো চারদিন পূজা দেখেছি। আর কত যে খাবার খেয়েছি। এসব মনে হলেও জিভে জল আসে।

দুর্গাপূজার পর লক্ষীপূজা।

লক্ষীপূজা আসলে তো আর উপায় নেই অনেক পিঠা, নাড়ু চুরি করে কত খেয়েছি তার হিসাব নেই।

বিশেষ করে নারিকেলের সন্দেশ ও নাড়ু এ দুই ছিলো আমার খুবি প্রিয়।

আহা কী আনন্দ!

তারপর কালীপূজা আসলে ২০৮ টা মোমবাতি দিয়ে পুরো বাড়ি আলোক সজ্জায় সজ্জিত করতাম।

আলোয় আলোয় ভরে যেত মনপ্রাণ কী মুগ্ধতা জড়ানো।

ফানুস, বাজি, পিয়াজিবোম,ইত্যাদি ফুটাতাম।

শৈশবের অনেক স্মৃতি কিছুটা হারিয়ে গেলেও এসব থেকে পিছুপা হয়নি এখনো।

শৈশব, কৈশোরে প্রতিটি অনুষ্ঠানে আমার বাল্যবন্ধুদের আনাগোনা ছিলো।

কে মুসলিম আর কে হিন্দু অনুষ্ঠানে এসব দেখার বিষয় ছিলোনা। যা আজও বিদ্যমান।

পাশের বাড়ির মুসলিম সম্প্রদায়ের এক চাচা ছিলেন যিনি আমাদের সুখেদুঃখে সবসময় পাশে দাঁড়াতেন। বাবা এ চাচার নাম রেখেছিলেন মিয়া।

আর এ নামটা ধীরে ধীরে সুপরিচিত হয়ে ওঠে।

এ মানুষটা আজ থেকে পাঁচবছর পূর্বে মারা গিয়েছেন।

সত্যিকারের একজন ধর্মপ্রাণ লোক ছিলেন।

আমাদের প্রতি উনার স্নেহ মমতা কখনো বলে শেষ করা যাবেনা।

এছাড়া আমাদের বাড়ির পক্ষ থেকে পাড়া প্রতিবেশিকে রমজান মাসে ইফতারি দেওয়া ও ঈদের সময় পিঠাপুলির জন্য নারিকেল দেওয়ার রেওয়াজ ছিলো।

দুর্গাপূজা আসলে নারিকেল ও মকরসংক্রান্তিতে মাছ দিয়ে থাকতেন।

যা আজও কয়েক পরিবারের মধ্যে আমাদের এ রেওয়াজ প্রচলিত আছে।

আর আমাদের বাড়িটি ঠাকুরবাড়ি নামে বেশ সুপরিচিত। এছাড়া বাবা ফুটবলে কিপার ছিলেন।

দূরদূরান্তে অনেক জায়গায় গিয়ে খেলেছেন।

গ্রামের প্রতিটি মানুষের সাথে আমাদের আত্মিক বন্ধন আজও অটুট হয়ে আছে।

আর আমার শৈশবের স্মৃতি আমার কাছে হেমস্বরূপ।

শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতি আজ চোখের সামনে যখন ভেসে উঠে তখন মন চায় ফিরে যেতে।

আমার বাল্যকাল আর কৈশোরকাল কাটিয়েছি হাসিতে আর খেলিতে। যৌবনে পদার্পণ করে সুখদুঃখ সবকিছু নিয়ে সৃষ্টিকর্তার কৃপায় বেশ ভালো আছি।

ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, নিরাপদে থাকুন।

 

১১৯জন ১৪জন
0 Shares

১৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ