স্মৃতি অমলিন

তৌহিদ ২৯ এপ্রিল ২০২০, বুধবার, ০৫:১৩:১২অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৩০ মন্তব্য

এখন সিয়াম সাধনার মাস, মুসলমানদের জন্য অন্যতম পবিত্র মাস রামাদান(রমজান) চলছে। রোজার মাস এলেই প্রতিবছর এই সময়ে মনে কত উল্লাস উদ্দীপনা কাজ করতো। অফিস করে ক্লান্ত হয়ে বাসায় আসার পথে ইফতারি কিনে নিয়ে আসতাম। আম্মা, ছোটবোনেরা, আমার গিন্নী সবাই মিলে মুখরোচক বেগুনী, পেঁয়াজু, বুন্দি, খিচুড়ি, সেমাই, সুজি, হালুয়া, রুটি-পড়াটা, শরবত একেকদিন একেক পদের খাবার রান্না করতেন। ইফতারির আগে কিছু সময় আমরা দাবা, লুডু, ক্যারাম খেলতাম। এরপর নিম গাছের ডাল কেটে বানানো দাঁতন দিয়ে দাঁত মাঝতে মাঝতে উঠোনে হাঁটাহাঁটি করা হতো আমার। রাস্তা দিয়ে যারাই যেত ইফতারের দাওয়াত দিতাম। আমাকেও দিত অনেকেই।

এরকম অনেকবার হয়েছে দাওয়াত দেয়নি কিন্তু তাদের জন্য ইফতারি কিনে নিয়ে কোন পরিচিত বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন কিংবা পাড়াপড়শির বাসায় হুট করে চলে গিয়েছি। প্রিয় মানুষগুলোর সাথে বসে ইফতার করবো, তাদের হাসিমুখ দেখতে পাবো এটা সৌভাগ্যের বিষয়। তারা হয়তো নিজেদের জন্য সামান্য রান্নাবান্না করেছে। আমি এসে বিপদে ফেলা! এ কারনেই ইফতারি কিনে নিয়ে যেতাম। হাসিমুখে সবার সাথে ইফতারি করার মাঝে অন্যরকম আনন্দ আছে। আমি ইফতারির পরে বলতাম তাহলে ভাত খেয়েই যাই। এদিকে এটা রেওয়াজ। যিনি ইফতার করান মাগরিবের নামাজের পরে অতিথিদের ভাতও খাওয়ান তারা।

এই দিনগুলিতে সবচেয়ে মজা হয় যখন নানাবাড়ি, খালাদের বাড়িতে যাই। তারাও আসেন আমাদের বাড়িতে। এ যেন অন্যরকম এক আনন্দঘন পরিবেশ থাকে পুরো মাস জুড়ে। আমাদের বাসায় প্রতিদিন দুই থেকে তিনজন মিসকিন, এতিম খায়। এটা আব্বা বেঁচে থাকতে চালু করেছিলেন। রোজার মাসে মসজিদের ইমাম, মোয়াজ্জিন, এতিমখানার কিছু বাচ্চা পুরোমাস জুড়ে আমাদের বাসায় আনাগোনা থাকবেই। রোজাদারকে ইফতার করাতে মনে যে আনন্দ পাওয়া যায় সে খুশি অন্য কিছুতেই নেই।

আব্বার চাকরি, রাজনীতি, বিভিন্ন সংগঠন এসবকিছুর সাথে জড়িত থাকার সুবাদে আমাদের বাড়িতে প্রচুর লোক সমাগম হতো। রোজার সময় এলেই কি হিন্দু কি মুসলিম আমরা সবাই একই সাথে বসে ইফতার করতাম তখন। ছোটবেলায় সবচেয়ে আনন্দ হতো যখন বাসায় একমাসে অন্তত দশ থেকে বারোদিন ইফতার পার্টি হতো। গুড়ের জিলাপি আমার খুব পছন্দের। আর রোজার মাসে আব্বা প্রতিদিন নিজে আনতে না পারলেও মামা, খালু, খালাদের কেউনাকেউ আসতেনই জিলাপি নিয়ে। আব্বা মারা যাওয়ার পরেও এটি চালু ছিলো শুধু আমার জন্যে। আমার বড়খালা অত্যন্ত আনন্দ নিয়ে আমার জন্য বাসায় জিলাপি পৌঁছানোর কাজটি করতেন। একদিন পরপর দশ কি.মি রাস্তা অটোরিক্সাতে করে এসে তিনি জিলাপি আনতেন। বড়খালা মারা যাবার পরে আমার সেই জিলাপির আনন্দে ভাটা পড়েছে। ইফতারিতে জিলাপি খেতে গেলেই খালার কথা খুব মনে পড়ে।

রোজার মাসে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় ঈদের কেনাকাটা করা। আম্মা প্রতি ঈদেই গরীব দুঃখীদের কাকে কি দেবেন তার তালিকা করেন। আমরা সবাই সেখানে নিজেদের সাধ্যমতো অংশীদার হই। সবাই মিলে বাজারে যাই, পছন্দমত জামাকাপড় কিনি। সবার নজর দোকানের কাপড়ের দিকে থাকলেও আমার নজর থাকতো আম্মার দিকে। তাঁর যে জামাটি পছন্দ হতো তিনি না নিলেও পরে গোপনে কিনে তাকে সারপ্রাইজ দিতাম। কারন আব্বা বেঁচে থাকতে আমি দেখেছি তিনি নিজের জন্য কিছুই নেননি কিন্তু আমাদের জন্য ঠিকই নতুন কাপড় কিনেছেন। আর আম্মাকে সবার আড়ালে শাড়ি উপহার দিতেন যদিও ধরা পরতেন আমাদের চোখে।

করোনার এই বিষণ্ণ সময়ে আরও কতো স্মৃতি মনে পড়ছে এই মুহূর্তে! অথচ এবারে সেসবের কোন বালাই নেই। কেউ কোথাও যেতে পারছেনা। কারো মনে আনন্দ নেই। তারাবীর নামাজ পড়তে মসজিদে গেলে কত মানুষের সাথে দেখাসাক্ষাৎ হতো, খোঁজখবর নেয়া হতো। অনেকদিন কারো সাথে দেখা নেই। কে কেমন আছে তাও জানতে পারছিনা। আমার বোধ হবার পরে এইবারই প্রথম বাসায় ইফতারির সময় কাউকে দাওয়াত দিতে পারছিনা। এর যে কি কষ্ট তা লিখে বোঝানো সম্ভব নয়।

আমার বিবাহিত জীবনের সবচেয়ে মন খারাপ করা সময় যাচ্ছে এখন। রোজা এলেই বউয়ের চোখেমুখে হাসি ফুটে উঠতো। হরেক ইফতার বানানো, সন্ধ্যার পরে এক রিক্সায় দুজনে বাজারে যাওয়া-আসা সবই মাটি হয়েছে এবার। যেহেতু প্রতিদিন বাজারে যাওয়া সমস্যা তাই খাবারের মেনুতে পরিবর্তন আনতে হয়েছে। কত গরীব অসহায় দু’বেলা ঠিকমত খেতে পারছেনা সেসব কথা মনে হলে ইফতারিতে গলা দিয়ে খাবার নামেনা।

আমরা ঠিক করেছি, করোনায় দেয়া ছুটির পরে বাজার খুললেও এবারের ঈদে নিজেদের জন্যে কোন নতুন জামাকাপড় কিনবোনা। সেই টাকা দান করে দেব। আর যৎসামান্য যাকাত যা আসতো সেটা দিয়ে আগেই করোনা ছুটিতে ঘরবন্দি অসহায় কিছু পরিবারকে চাল, ডাল, তেল, আলু কিনে বণ্টন করা হয়েছে। সামনে ঈদের সময়ে সেমাই, চিনি, মশলা কিনে দিতে হবে কিছু মানুষকে। এতটকু করি কারন তাঁদের মুখে একটু হাসি ফোটাতে পারলেই মানুষ হিসেবে স্বার্থক মনে হয় নিজেকে।

করোনা বিষণ্ণতায় জীবনের অমলিন এই স্মৃতিগুলোকেই আশার পরশ পাথর বানিয়ে
একেকটি দিন পার করছি। অন্ধকার কেটে একদিন আলো আসবেই। মাত্র অল্প ক’দিনের পৃথিবী! কি লাভ টাকা পয়সা অর্থকড়ি জমিয়ে রেখে। একজন মানুষের উপকারে আসতে পারলেও এটাই জীবনের স্বার্থকতা। আসলে করোনা মহামারীর এই বিভীষিকাময় ক্রান্তিকালে এর চেয়ে বড় কোন চাওয়া কিংবা প্রাপ্তি এই মুহূর্তে আমার কাছে আর কিছুই নেই।

সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ্য থাকুন।

(ফিচার ছবি- নেট থেকে সংগৃহীত)

২১২জন ৩৬জন
0 Shares

৩০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য