স্মৃতিতে কান্নার বীণ

হাফেজ আহমেদ রাশেদ ৭ জুলাই ২০১৯, রবিবার, ০৯:১৬:২৪অপরাহ্ন গল্প ১৪ মন্তব্য

গল্প

স্মৃতিতে কান্নার বীণ
“”””””””””” পর্ব(১)
হাফেজ আহমেদ রাশেদ

আম্মা আম্মা ও আম্মা ভাত কি এখনো হয় না!আর কতক্ষণ? ক্ষুদার যন্ত্রণা আর সহ্য হচ্ছে না যে,সন্ধ্যার আজানের সময় থেকে রান্না করতেছো এখনো ও কি শেষ হচ্ছে না।আচ্ছা আজ কি এমন রান্না করতেছো? চেঁচাতে চেঁচাতে আরমান রান্না ঘরের দিকে অগ্রসর হলো।কিন্তু কি আশ্চর্য রান্না ঘরে তার মা নেই।আরমান ভাবলো হয়তো পাশের ঘরে গিয়েছেন,অনেক্ষণ পার হয়ে গেলো এখনো আসতেছেন না দেখে আরামান মাকে ডেকে ডেকে বাড়ির বাহিরের দিকে যাচ্ছে, আর তার পিছনে ছোট বোন আয়শা কেঁদে কেঁদেে তাকে অনুসরণ করে আসতে লাগলো! বাড়ির বাহিরে চৌরাস্তার সম্মুখে এসে দেখতে পেলো একটি মেয়ে খুবই সেজেগুজে দাড়িয়ে আছে,পড়নের শাড়িটি একটু পরাতন মনে হলেও বেশ আকর্ষণীয় রঙের, আরমান বেশ কয়েক মিনিট দেখে নিলো!২৪/২৫ বছরের যুবতী মেয়ে মনে হলো আরমানের। আরমান ভাবতে লাগলো এই নির্জন রাতে একাকি মেয়েটা এখানে দাড়িয়ে আছে কেনো?নাকি পথ হারিয়ে এখানে আসলো,পূর্বে কখনো দেখেছি বলে মনে হয়না!তাছাড়া এতক্ষণ তো মুখ খোলা ছিলো আমাদেরদে দেখে মুখ ঢেকে ফেলল, আজব তো?! আচ্ছা মেয়েটিকে কি জিজ্ঞেস করবো কে সে,আর কেন এখানে দাড়িয়ে আছে?
পরে আবার ভাবলো না থাক!মাকে খুঁজতে হবে রাত অনেক গভীর হয়ে গেছে, একে তো ক্ষিধে পেয়েছে বোনটিও কেঁদে কেঁদে অস্থির হয়ে পড়ছে! যাই মা’কে খুঁজি।
আরমান নিজের মনকে প্রশ্ন করে আচ্ছা এই মেয়েটিকে জিজ্ঞাস করবে কি যে, এদিকে মধ্য বয়সের কোনো মহিলা যেতে দেখেছেন কি? আবার ভাবলো মেয়েটি নিজে হয়তো কোনো পেরেশানিতে আছে, তাকে জিজ্ঞাসা করে বিরক্ত করার কি প্রয়োজন!
আরমান ও তার বোন তাদের এলাকা তন্নতন্ন করে খুঁজলো কিন্তু কোথায় ও তার মাকে পেলো না,
এরকম আরো কয়েকবার ও হয়েছে, হঠাৎই এভাবে রাতের বেলা তার মা না বলে কোথায় যে চলে যান, আবার রাতেই কিবা ভোরে ফিরে আসেন।কোথায় যান সেটা আরমান অনেক বার জানতে চাইলেই বিনিময়ে কয়েকশো বকা ছাড়া আর কিছুই উত্তর পায়নি। তাই আরমানের এতো বেশি টেনশন হচ্ছিল না,সে ভাবলো রাতে না হয় ভোরে ফিরে আসবেনই তো, কিন্তু সে আয়েশাকে স্বান্তনা দিতে পারছে না,অনেক কিছু বলে কয়ে ছোট বোন আয়েশাকে নিয়ে আরমান ঘরে গেলো,আয়েশা ভাইকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে হারিয়ে গেলো ঘুমের দেশে,আরমান এখনো ভাবছে তার মা কোথায় যায় কি করে,কিন্তু ৫-৬বছরের বয়সি আরমানের ভাবনা কি আর গভীরে যেতে পারে,ভাবতে ভাবতে আরমান ও ঘুমিয়ে পড়ে।
শেষরাতে আরমান নিচুস্বরে কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলো, সে বিছানা ছেড়ে উঠে মায়ের রুমে এসে দেখতে পেলো যে,তার মা নামাজ শেষে মুনাজাতে কি সব বলে কাঁদতেছেন। আরমান কিছুক্ষণ নিরব দাড়িয়ে তার পর নিজের রুমে চলে আসবে এমন সময় দেখলো যে রাতে যে শাড়িটা পড়ে চৌরাস্তায় একটি যুবতী মেয়ে দেখছিলো সে শাড়ি তার মায়ের বালিসের পাশে ভাঁজ করে রাখা!
তখনই বউয়ের বকাবকির আওয়াজে আরমানের ঘুম ভেঙে যায়।
আরমান ঘুম থেকে উঠে বেলকনিতে বসে রাতের স্বপ্নের কথা ভাবতে লাগলো। এ দিকে আরমানের বউ চেচাঁমেচি করতেছে, কি হলো ঘুম থেকে উঠেই মহারাজ যেন রাজ্য পরিদর্শনে বেরিয়ে গেলেন! দু’দিন হলো ভুয়া আসেনি আমার আর ছেলের অনেক বাশি জামা/কাপড় জমা পরেছে,এগুলো ধুয়ে নিয়ে আসো।বাসায় বসে থেকে কি করবা আজ তো আর অফিস নেই, আর হ্যাঁ রুম গুলোও কেমন ঝাপসা হয়ে আছে এসে তা পরিস্কার করতে হবে তো!দুপুরে একটু বান্ধবীর বাসায়ও আমাকে যেতে হবে , রিকশা আনতে যেতে হবে তোমাকে, আর দুপুরে রান্না করতে হবে না,আমি যাবার সময় করিম চাচাকে বলে যাবো যে পাঁচটাকার একটি কেক আজানের সময় পাঠাতে এটা পানিতে ভিজিয়ে ্ খেয়ে নিও। মনে থাকে যেনো কেক একটির চেয়ে বেশি যেনো না হয়,সাড়াটি মাসে কয়টাকা বেতন পাও সে হিসেব মনে রেখো!আর হ্যাঁ বাতরুম দুটি ভালো করে পরিস্কার করবে,তারপর আজ বাজারের পুকুরে গোসল করে নিও,বাতরুম পরিস্কার করে এখানে আবার তোমার নোংরা শরীরের পানিতে দূর্গন্ধ ছড়বে তো! বিকেলে রাতের রান্নাটা করে রাখবে,ফ্রীজে মাছ আছে এটা দিয়ে দু’তরকারি রান্না করে নিও,আর গতসাপ্তাহে তো তোমার ফোনে ১৫টাকা দিয়েছিলাম, আজ না দিলে হবে তো!আর তোমার ফোনে এতোটাকার কি বা দরকার, মাসে নিজের ইনকাম কতো জানোই তো।আজ ফোনে টাকা দেওয়া সম্ভব নয়,এই যে এখনো বসে আছো কেনো, কথা কি কানে পৌঁছতেছে না? নবাবশাহ হয়ে বসে থাকলে হবে না, যাও কতকাজ পরে আছে। উঠে ডাস্টবিনটা পরিস্কার করে হাতমুখ ধুয়ে আসো।আজ আমার শরীরটা কেমন করছে এতো ভালো নেই, একটু তাড়াতাড়ি চা’বানিয়ে নিয়ে আসো!আরমান বউয়ের কথাগুলো শুনছিলো নিচের দিকে থাকিয়ে, বসা থেকে উঠে কাঁধে গামছা ঝুলিয়ে ডাস্টবিন পরিস্কার করতে চলে যায়।এক এক করে বউয়ের আদেশানুযায়ী দিনের সকল কাজে ব্যস্ত হয়ে পরে,বিকেলের রান্না করে আরমান বিছানায় শরীরটা রাখা মাত্রই মনে পড়ে গেলো গতরাতের স্বপ্নের কথা।আরমান ভাবতে লাগলো স্বপ্নের কথা। হঠাৎ মন পড়লো, যে স্বপ্ন দেখেছে এটা শুধু স্বপ্ন নয় তার জীবনে ঘটে যাওয়া বাস্তব চিত্র। একটু একটু করে আরমানের ছোট বেলার অনেক কথা মনে পড়তে লাগলো,পাঁচ বছরের আরমান জানতো না বুঝতোনা অনেক কিছু ,আর তাও বুঝতো না ঘরের খাবার না থাকলে রাতের আঁধারে হঠাৎ তার মা বাড়ি থেকে বেড়িয়ে কোথায় যেতেন?
কিন্তু আজ সে এক সন্তানের বাবা। সেই বুঝতে না পারা কারণ গুলো এখন তার সহজেই অনুমেয়। রাতের স্বপ্নের চিত্র চোখের সামনে ভাসতে লাগলে আরমানের, আর অশ্রু ভেয়ে পড়তে লাগলে ঝরঝর করে।
আরমান তার পাল্টে যাওয়া জীবনের স্মৃতিতে ডুব দিলো,।
তখন ছিলো ২০০৯সাল। আরমানের মা নিজের স্বামীর রেখে যাওয়া একমাত্র জমিটি বিক্রি করে আরমানকে ঢাকায় একটি কলেজে ভর্তি করেন। আরমান খুবই সাদামাটা সহজ সরল স্বভাবের ছেলে ছিলো, পড়া লেখায় যথেষ্ট ভালোই ছিলো, গরীব মায়ের ছেলে ৪বছর বয়েসেই পিতাহারা।সব সময় নিরব থাকতো,কারো সাথে তেমন মিশতে যেতোনা! খুবই প্রয়োজণ ছাড়া কথা বলতো না।কলেজের প্রায় ছেলে মেয়ে যখন দলে দলে আড্ডায় লিপ্ত থাকে,তখন আরমান বই নিয়ে ব্যস্ত থাকতো।
একটি মাত্র বোন ও মায়ের জন্যে প্রতিটি রাতের একটি অধ্যায় তার কেঁদে কেঁদে যেত। নিরব স্বভাবের জন্য কলেজের অনেকে যদিও তাকে নিয়ে আড়ালে হাসাহাসি করতো,কিন্তু ক্লাস চলাকালে সবার দৃষ্টি তার উপরেই থাকতো।আরমান খুবই সুরেলা কন্ঠে গান গাইতে পারতো,কলেজের নবীন বরণ অনুষ্ঠানে তার কন্ঠে গান শুনে সবাই আপ্লুত হয়েছিলেন,তার গানের কলি গুলো ছিলো আনকোরা নতুন, যা তার পূর্বে আর কারো কন্ঠে কেহ শুনেনি,এবং এতই ব্যথাতুর ছিলো যে অধিকাংশ শ্রুতা অজান্তেই চোখের জল ফেলতে বাধ্য হতেন।
বেশ কয়েকদিনে ধীরে ধীরে আরমানের নিরব স্বভাবের কিছু পরিবর্তন হতে লাগলো!তবে তা ছিলো সীমিত রুমমেট দু’চারজনের মধ্যে। প্রায় চার মাস পর কলেজ থেকে গ্রামে যায় আরমান,গ্রামে মায়ের অবস্থা দেখে আর ঢাকায় আসতে মন চায় না ।কিন্তু আরমানের মা’য়ের স্বপ্ন তার ছেলে পড়ালেখা করে মানুষের মতো মানুষ হবে, সমাজের সেবা করবে,বড় চাকরি করবে, তখন তার আর এই কষ্ট থাকবে না,তখন সুখের সাগরে ভাসবে তাদের পরিবার,আরমানকে অনেক বুঝিয়ে আবার ঢাকা পাঠানো হয়।এবার কলেজে এসে আরমান লেখা পড়ায় দ্বিগুণ মনোযোগ দেয়। তার ভাষা ও ব্যবহারে কলেজের সবাই আরমানের আদর্শে মুগ্ধ। সে যেমন লেখা পড়ায় প্রসংশনীয় চেহারা ও তার মাশাল্লাহ তেমনি প্রসংশনীয়। আরমানের কোনো মেয়ে বন্ধু নেই।অনেকেই মিশতে চায় কিন্তু সে নিজের পরিবার ও নিজের অবস্থান ভেবেই সব এড়িয়ে চলে। দেখতে দেখতে কলেজের পরীক্ষা এসে গেলো! আরমান তার পরিশ্রমের সুফলও পেলো,কলেজের অনেক মেয়েদেরই দৃষ্টিতে আরমানের প্রতিচ্ছবি ভাসছে,এসব নিয়ে তার মাথা ব্যথা নেই। একদিন মেস থেকে আরমান কলেজে আসছে,যখন কলেজ গেটের কাছে আসে দেখতে পায়, রাস্তা পার হচ্ছে একটি কলেজ ছাত্রীকে আর তখনই দ্রুতগামী বাস ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দেয় ছাত্রীটিকে,অনেক লোক সমবেত হলো, কিন্তু কেউই মেয়েটিকে কোনো ভাবে সাহায্য করছে না,ডাক্তারেও নিয়ে যাচ্ছে না।আরমান খুউব তড়িঘড়ি করে গাড়ি ডেকে মেয়েটিকে হাসপাতালে নিয়ে যায়!!

চলবে,,,,

২২২জন ১১৬জন
4 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য