তিনদিন পর নুসরাতকে বাসায় নিয়ে আসা হয়।নুসরাত তার পরিবারের সবাইকে বলে যে,কেউ যেন আরমানের পরিচয় সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস না করে,,যা জানার সে সব ধীরে ধীরে আরমানের কাছ থেকে জেনে নিবে।

আরমান এখন নুসরাতদের বাসায় থাকে।এখান থেকেই কলেজে যাওয়া আসা করে।আরমান, নুসরাত ও তার পরিবারের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে লাগলো।যে আরমান কোনোদিন পেট ভরে খেতে পারেনি সে আরমান আজ কতো রকমের খাবার খাচ্ছে আর উন্নত কাপড় পরছে।
প্রথম প্রথম নুসরাতদের বাসায় দামী খাবার গুলো খেতে আরমানের খুউব কষ্ট হতো,কি জানি তার মা বোন গ্রামের বাড়িতে কি খাচ্ছে,না ক্ষুধার্ত ভাবেই দিনপাত গুজার করছে।

দু’তিন সপ্তাহ পার হয়ে গেল,এখন আরমানের তেমন মন খারাপ হয় না,মা’বোনের কথা বেশ মনেও পরে না।নুসরাত ও আরমান অনেকটা ঘনিষ্ঠ হয়ে গেছে।কিছুদিন থেকে নুসরাত আরমানের কাছ থেকে তার পরিচয় ও পরিবার সম্পর্কে জানতে চাইছে,আরমান কোনো ভাবে বাহানা করে এড়িয়ে চলছে পরিচয়দানের বিষয়টি।তার মনে তুলপাড় সৃষ্টি করছে,সঠিক পরিচয় দিবে,নাকি পরিচয় গোপন রাখবে। কিছু ভেবে পাচ্ছে না।
এদিকে আরমান যে নুসরাতদের বাসায় থাকে,তা তাদের কলেজের প্রায় সবাই জানে।আরমানের পরিচয় সম্পর্কে তার রুমমেট আদনান ব্যতীত আর কেউই জানে না।

আদনান আর আরমানের মধ্যে খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।আরমানের সকল দুঃখ-কষ্ট সব আদনানের কাছে শেয়ার করতো।আদনান নাম করা একজন শিল্পপতির ছেলে।আরমানের ব্যবহার আর তার ব্যবহারের মধ্যে আকাশ/পাতাল পার্থক্য।কিন্তু আরমানের সাথে থার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হওয়ার কারণ হচ্ছে, আরমান ও আদনান যে রুমে থাকতো, তার ভাড়া আদনান একাই দিতো। আদনান নিজেই আরমানকে তার সাথে থাকতে বলেছিল,তবে একটি শর্ত দিয়ে।কলেজের পড়া গুলো লেখা ও নোট করা থেকে প্রয়োজনীয় যা যখন লাগে, তা আরমান ঠিকঠাক করে দিতে হবে।আরমান ও সেই শর্তে রাজী হয়ে যায়।আদনানের মুখের কথাবার্তা খুবই মিষ্টি ছিল।আরমান যেকোনো কিছু তার সাথে শেয়ার করলে সে খুব সহজেই সান্ত্বনা দিতে পারতো।আদনানের মেয়ে বন্ধু আর প্রেমীকার সংখ্যা দশের উপরে ছিল,শিল্পপতির ছেলে কিছুরই অভাব নেই তার। টাকা পয়সা এমন কি নিজের কাপড় দিয়েও আরমানকে সে সহায়তা করতো।
আরমান আদনানের কাছে এসে বলে,নুসরাত তার পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাচ্ছে।কি জবাব দিবে সে খুৃঁজে পাচ্ছে না।
আদনান বলে আমি তোকে কঠিন একটা পরিচয়ের কথা বলবো,পারবে কি তুই সেটা মেনে নিতে?
আরমান বলে খুলে বল কি কঠিন স্বীদ্ধান্ত।আদনান বলে দেখ ভাই,পৃথিবীটা কেমন অদ্ভুত একটা জায়গা।সেটা আমার চেয়ে শত গুন বেশি তুই অনুভব করতে পারছিস। আর মানুষ কতোটা পাষণ্ড ও স্বার্থবাদী তা তুই সিঁকি ভাগও অনুমান করতে পারিস নি,পারবেও না।অনেক দুঃখে কষ্টে তোর জীবন গিয়েছে ও যাচ্ছে। আমি তো সব জানি।তাই বলছি তুই সুখের সন্ধান পেতে হলে একটু ত্যাগ করতে হবে।
হয়তো তোর কাছে খুবই কষ্টকর মনে হবে এটা। কিন্তু তুই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে আমার কথাটি মানতেই হবে।

আদনান বলতে থাকে!জানিস মানুষ মানুষের অসহায়ত্ব ও তার দূর্ভলতা জানতে পারলে সেটাকে নিখুঁত ভাবে কাজে লাগিয়ে স্বার্থ উদ্ধার করতে জানে।
দেখ আজ নুসরাতের বাবা মা তোকে জায়গা দিয়েছে তাদের মেয়েকে তুই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ায় ও নিজ জীবন বাজী রেখে রক্তদান করায়। এখন ওরা তোকে করুণা করছে।তুই আমার কথায় উত্তেজিত না হয়ে বাস্তবিকতার সাথে মিলিয়ে দেখ।

নুসরাত তোকে বিয়ে করতে চায়,কিন্তু সে যদি শুনে তোর বাবা নেই!মা গ্রামের বাড়িতে মানুষের বাড়ি গিয়ে কাজ করে খায়,নুসরাতদের বাড়িতে যে চাকরবাকর আছে তাদের ঘরবাড়ি তোর বাড়ি থেকে শত গুনে অনেক ভালো।তুই নিজেই মাতা রাখার যায়গা নেই।
এগুলো শুনে কি নুসরাত আর তোকে বিয়ে করতে চাইবে।মেনে নিলাম নুসরাত বড় ভালো মেয়ে,তোকে অনেক ভালোবাসে। সে তোকে বিয়ে করবে।কিন্তু নুসরাতের বাবা একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি।তার ভাই একটি রাজনৈতিক দলের অন্যতম নেতা।উনারা কি এসব শুনে নুসরাতকে তোর হাতে তুলে দিবে।নিশ্চয়ই না।বরং তোকে তাদের বাসায় রেখে দয়া দেখিয়ে বেশি থেকে বেশি ক’দিন লেখা পড়ার খরছ দিবে।তারপর বলবে তুমি তো আমাদের একজন। আমাদের ছোটখাটো এই কাজ ঐ কাজ গুলো দেখাশোনা করো বলে কাজের লোকের মতো খাটাবে।

তাই বলছি এক কাজ কর।যাতে তুই নুসরাতকে পাবে ও নিজের পায়েও দাঁড়াতে পারবে।কাল তুই নুসরাতকে জানিয়ে দিবে যে তোর বাবা/মা আমেরিকা থাকেন।আর তোর এক বোনও আছে তাদের সাথে।দেশে তুই একা থাকিস।বাকিটা কখন কি করতে হয় তা আমি দেখবো।

আর দেখ তুই এই সুযোগ হারালে নুসরাতকে হারাবে এবং নিজেও কোনোদিন নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারবে না।
একটু ভেবে দেখ তো!কত’কষ্ট করে লেখাপড়া করতেছিস। কিন্তু যখন লেখা পড়া শেষ করবে,তখন না এই পৃথিবীটাকে তোর নরক মনে হবে। বুঝলে।সার্টিফিকেট দিয়ে কাজ হয় না,, এইসব এখন নামে মাত্র। মোটা অংকের ঘুস আর মামু খালু লাগে চাকরি পেতে হলে।
সে কি আর তোর আছে।তখন না তুই এই লেখাপড়া করাকে অভিশাপ মনে করবে।
ভেবে দেখ আমি তোর ভালোর জন্যেই বলছি।আর বাস্তবতা বলছি।

আদনানের কথা গুলো আরমানকে খুব টাচ্ করলো।অনেক চিন্তা ভাবোনার পর আরমান নুসরাতকে জানিয়ে দেয় তার পরিচয় ও বাবা মা সম্পর্কে।নুসরাত শুনে মনে মনে খুব খুশি যে,তার বাবা আর আপত্তি করার কিছু পাবেন না।নুসরাত আরমানের সব পরিচয় ও পরিবার সম্পর্কে জানিয়ে দেয়। ফারুক সাহেব এক মাত্র মেয়ের সুখের কথা ভেবে ও বড়লোক ঘরের ছেলে পেয়ে শুভ কাজ আদায় করতে আর বিলম্ব করতে চান না।
তিনি নুসরাতকে জানান যে আরমানকে বলো তার বাবা/মাকে দেশে আসার কথা বলতে।উনারা দেশে আসলেই তোমাদের বিয়েটা আমি নিজ হাতে দিব।নুসরাতের আনন্দনের অন্ত নেই।

নুসরাত আরমানকে জানায় তার বাবা যা বলেছেন।
আরমান প্রতি উত্তরে জানায় যে, এবছর তার বাবা মা’ খুবই ব্যস্ত। দেশে আসা সম্ভব নয় তাদের।
তবে আমি কথা বলেছি তাদের কোনো অমত নেই,আর আমি তাদের একটি মাত্র ছেলে তারা আমার কথা কি ফেলতে পারেন।

আরমানের জবাব শুনে নুসরাতের বাবা ২০আগষ্ট বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করে নেন।
নুসরাত আরমানকে জানিয়ে দেয় যে বিয়ের সকল আয়োজন তার বাবা নিজে করবেন,তাকে কোনো কিছু করতে হবে না।
আরমান শুনে মনে শান্তি পেল।দিন ঘনিয়ে আসল আরমান ও নুসরাতের বিয়ে হয়ে যায়।বিয়ের কয়েক মাস পর আরমানকে ফারুক সাহেব তার একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান করে সকলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন।
বিয়ের বছর খানেক পর নুসরাত তার বাবাকে বলে আরমানকে নিয়ে নতুন বাসায় উঠে।বেশ ভালো ও সুখে শান্তিতে কাটতে থাকে আরমান ও নুসরাতের দাম্পত্যজীবন।
একদিন আরমান অফিস থেকে আসতেই নুসরাত তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে,আদুরী সুরে গুণগুণ করে বলতে থাকে ওগো শুনছো! একটা দারুণ খুশির খবর আছে বাবার বাসায় যাবো মিষ্টি নিয়ে আসো।
আরমান বায়না ধরে বলে কি খুশির খবর সেটা আগে বলো।নুসরাত কিছুতেই বলতে চাচ্ছিল না,আরমানের অনেক জুরাজুরিতে লজ্জায় লাল হয়ে আঁচলে মুখ ঢেকে বলে,আমাদের ঘরে নুতন মেহমান আসছেন যে,আমি মা আর তুমি বাবা হতে যাচ্ছ।তাই যাও আমি আর বলতে পারবো না,এখনি মিষ্টি নিয়ে আসো।যাও আর তাড়াতাড়ি চলে আসবে কিন্তু। আরমান আনন্দে আপ্লুত হয়ে যায় মহানন্দের সংবাদ শুনে।স্ত্রী নুসরাতের কপলে ভালোবাসার পতীক চুমে এঁকে দিয়ে মিষ্টি নিয়ে আসতে চলে যায়।
নুসরাত মনে খুউব লজ্জা পাচ্ছে, আবার কতো কিছুই ভাবছে।একা একা গল্প করছে তার ভিতরে থাকা একজনের সাথে,সে কতো রকমের যে গল্প।কিছুক্ষণ পর দু’হাত ভর্তি মিষ্টি ব্যাগ নিয়ে আরমান চলে আসে।আরমানের চেহারার দিকে তাকিয়ে নুসরাত বাকরুদ্ধ হয়ে যায়।আরমানের চোখ দু’টি বড় বড় আর চেহারা লাল হয়ে আছে।কেমন কেমন বিষণ্ণতার ছাপ আর অস্বস্তি বোধ করছে মনে হচ্ছে।একটু আগেও অনেক কেঁদেছে বুঝা যাচ্ছে ।কিন্তু কেন,যাবার সময় তো বেশ হাসিখুশিতেই মিষ্টি আনতে গিয়েছিল।

চলবে,,,,

১৬৪জন ৬৪জন
22 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য