#স্বপ্ন পর্ব ৬

ভোরে উঠেই মনটা ভার হয়ে গেল। মেঘলা আকাশ, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। অন্যদিন হলে এই বৃষ্টি দেখে নেচে উঠতো মন, কিন্তু আজ, আজ তো…!
এদিকে আমার কন্যাদের বাবা মুখে মিটিমিটি হাসি নিয়ে দেখছে আমাকে। গা জ্বলে গেল আমার। আমার মনের এই অবস্থা, আর সে কি-না মিটিমিটি হাসছে! চোখ পাকিয়ে বললাম, “হাসছো কেন?” আমার পাকানো চোখকে হেলায় উড়িয়ে দিয়ে বলে কিনা,
“চলো ছাদ থেকে ঘুরে আসি। এদের ছাদটা না খুব সুন্দর। আর এই ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ভিজলে তোমার মনটাও ফুরফুরে হবে।”

মরণ…! এসেছি ঢাকায়, বইমেলায় যাবো বলে, উঠেছি ভাসুরের ছেলের বাড়িতে। চেনা নেই, জানা নেই ফট করে সেই বাড়ির ছাদে উঠে যাবো? বুঝেছি, সিগারেট খাওয়ার জন্য ছাদে গিয়ে আগেই দেখে আসা হয়েছে। কতবার বলেছি, বেড়াতে যাচ্ছি, সিগারেট কম খাবে। তা কে শোনে কার কথা! যত্তসব!!
একে ফেব্রুয়ারিতে বৃষ্টি, তাই আবার বইমেলা, তাতে আবার আমাদের সোনেলার নিজস্ব একটা স্টল এবারের মেলায়, মনের যা-তা অবস্থা। এই অবস্থায় কি-না প্রকৃতি বিরূপ। মেজাজ ঠিক রাখা যায়?
সেই খিঁচড়ে যাওয়া মেজাজ নিয়েই গেলাম ছাদে। ওপর ওপর যতই রাগ দেখাই না কেন, ওঁর কথা কি আর ফেলতে পারি!

লিফটে উঠে সাঁই করে চলে গেলাম ছাদে। কিন্তু এ কী, ছাদে এরা কারা? কলকল ছলছল করছে! এ যে দেখি সোনেলা পরিবারের সব আপনজন! কিন্তু সবাই এখানে কেন? বইমেলায়-ই তো সবার একজোট হওয়ার কথা! জমবে আড্ডা, সোনেলা প্রকাশনার প্রথম স্টল নিয়ে সবার কত কত আশা-আকাঙ্ক্ষা! আনন্দে ভাসবে সবাই। তা না, এই ছাদেই বেশ জটলা পাকিয়ে কি নিয়ে যেন হেসে হেসে গড়িয়ে পড়ছে সকলেই। সেই জটলার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে আমাদের মিষ্টি মিষ্টি শবনম মুশতারি ভাবি। আমাকে দেখেই বন্যা আপু দৌড়ে এলেন।
বললেন, “আরে উকিল আপু, জলদি আসেন, দেখেন কি অবস্থা! আপনে যে কইছিলেন মাথা ঠাণ্ডা রাইখা প্রতিশোধ নিতে, নেওয়া শেষ। তয় হালকার উপর দিয়া নিছি। ছুডু ভাই বইলা কথা! ঠিক কি-না?”

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ব্যাপারখানা বোঝার চেষ্টা করতেই কানে ভেসে এল পুরুষকণ্ঠের তীব্র প্রতিবাদ। দেখি কি, পানির ট্যাঙ্কির সাথে যে ট্যাপ লাগানো, সেখানে তৌহিদ ভাই। মুখ তার ঢেকে আছে সাবানের ফেলায়, আর সমানে চিল্লাচ্ছে…
“মানি না, মানবো না, এইডা কুনু প্রতিশোধ হইলো? পুরা মুখ আমার কালি দিয়া ঢাইক্কা দিলো। কালি তো এমুন কালি, মনে হইতাসে উঠবো না কুনুদিন। একঘণ্টা ধইরা সাবান ডলতে ডলতে আন্ধা হইতে বসছি, কিন্তু কালি যাওয়ার নামই নেয় না!”

রমণীকূল সমস্বরে হইহই করে উঠলো তার এই প্রতিবাদে৷ বেচারা ঘাবড়ে গিয়ে আবার সাবান ঘষতে লাগলো মুখে৷ সাবিনা আপু ধমক দিয়ে বললেন, তেড়িবেড়ি না করে তাড়াতাড়ি মুখ ধোওয়া শেষ করেন, পান আনতে কিন্তু আপনাকেই যেতে হবে, মনে আছে?

এদিকে ইঞ্জা ভাইসহ অন্যান্য ভাই দাদারা আমার উনির সাথে গল্প জুড়ে দিলেন খোশমেজাজে। বিশাল ছাদের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট জটলায় ভাই দাদারা গল্পে মশগুল। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি চলছেই। দেখছি তা নিয়ে কারও মাথা ব্যথাই নেই। বৃষ্টি, তা যে সময়েই হোক না কেন, মন বোধহয় ফুরফুরে করে দেয় সবার।
সব আপুরা যেন ডানা মেলে শূন্যে ভাসবে এমন অবস্থা। সবাইকে আপন আপন সাজে কী সুন্দর-ই না লাগছে! আমার পরনের হালকা বেগুনিরঙ শাড়ি আর ম্যাচিং সাজুগুজু নিয়ে কেউ বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখালো না দেখে আমি অযথাই আঁচলের কারুকাজে হাত বোলাতে বোলাতে বললাম,
“আঁচলের এই হলদে রঙের ফুলগুলো কেন যেন মানাচ্ছে না, তাই না সুপর্ণা আপু?”

সুপর্ণা আপু মিষ্টি হেসে বলেন, “না না আপু, খুব সুন্দর আপনার শাড়িটা।”

যাক, তবু শাড়ির ব্যাপারে মন্তব্য পাওয়া গেল! কিন্তু সাজুগুজু? একেবারেই কি বাজে হয়েছে? কই সুপর্ণা আপু তো একটি কথাও খরচ করলেন না! কায়দা করে শাড়ির ব্যাপারটা জেনে নিয়েছি, তেমন করে কি জেনে নেবো? কষ্ট করে সাজলাম কিন্তু কেউ প্রশংসা করলো না, সেই দুঃখ মনে চেপেই দেখলাম
আমাদের হেলাল ভাই এসবের মাঝেই কখন ছাদের এককোণে গিয়ে উদাস হয়ে চেয়ে আছেন আকাশের দিকে। নিশ্চয়ই তাঁর মাথায় কঠিন কঠিন শব্দের সমাহারে একটা কবিতা সাজানোর চিন্তা চলছে। জিসান ভাই খেয়াল করেননি তা। যখন খেয়াল করলেন, ঝড়ের বেগে গিয়ে হেলাল ভাইয়ের পিঠে এক থাবড়া দিয়ে বললেন,
“এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কবিতা ভাবিস না, চল, আমের হিসাব নিই। জিলাপি-টিলাপি তো কিছুই জোটেনি কপালে, তৌহিদের হাঁড়িভাঙা মিষ্টিও না, বন্যার বিরিয়ানি আর পুডিং তো আনার সাথে সাথেই কখন যে হাওয়া হয়ে গেল টেরই পেলাম না। চল দেখি, বীথি ওর চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম এনেছে কি-না আমাদের জন্যে।”

এই শুনে তো আমি ওই মনোরম পরিবেশেও দেদার ঘামতে শুরু করলাম। জিসান ভাইয়ের কি মাথা খারাপ হয়ে গেল, এই ফেব্রুয়ারিতে আম পাবো কোথায় যে আনবো? কিন্তু ততক্ষণে সবার কানে পৌঁছে গেছে জিসান ভাইয়ের কথা। সবাই আম চায়। গোপালভোগ, ক্ষিরসা , ল্যাংড়া, ফজলী সব আমের নামই দেখি সবার মুখস্ত। ফাঁপড়ে পড়ে তো আমি দিশেহারা। আমার বর কিন্তু মিটিমিটি হেসেই যাচ্ছে। মেজাজ আবারও গরম হয়ে গেল। কাছে গিয়ে কানে কানে কড়া গলায় বললাম, “হাসছো কেন?”
ওমা, উত্তরে সে আমাকে চোখ মারলো, কী অসভ্য! যদি কেউ দেখে ফেলে!!

কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ করে সবাই এমন উল্লসিত হয়ে উঠলো কেন? ব্যাপার কী রে ভাই! তাকিয়ে দেখি, মমি ভাই দুটো ঝুড়ি নিয়ে হাজির। বললেন, “দুলাভাই চাঁপাই থেকে রওনা দেয়ার আগেই এই দুই ঝুড়ি আম কুরিয়ারে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আমাকে বলেছিলেন চেপে যেতে।”
আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই মমি ভাই পকেট থেকে একটা ছোট্ট চাকু বের করে ঝুড়ির মুখের বাঁধন কেটে ফেললেন পট পট করে। বেরিয়ে পড়লো একেবারে টসটসে পাকা আম। আমের সুবাসে ম ম হয়ে গেল পুরো ছাদ। আম বলে কথা, তারওপর চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম, রসালো এই ফলের স্বাদ নিতে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো। ছিলাছিলির বালাই নেই, সবাই হাতে হাতে আম নিয়ে ট্যাঙ্কির ট্যাপে ধুয়ে কামড় বসাতে লাগলো। যেন অমৃতের সাগরে ভাসছে, সবার চোখেমুখে এমনই এক অদ্ভুত ভালোলাগা।
ধন্ধে পড়ে গেলাম আমি, ফেব্রুয়ারিতে আমার বর আম পেল কোথায়, সে কি জাদু জানে?

বহুদূর থেকে যেন ভেসে এল কলিংবেলের আওয়াজ। বাজছে… বেজেই চলেছে…। ফট করে ঘরের লাইটটা জ্বলে উঠলো। আমার বর মশারির এক কোণা তুলে আমাকে বলছে, ওঠো, তোমার রানীর মা চলে এসেছে…

স্বপ্ন || ৫ ( ব্লগারদের সম্মিলিত গল্প )

৫৮২জন ৪৮জন
0 Shares

৮৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য