সবাই  হৈ হৈ করতে করতে সিকদার সাদ রহমান ভাইকে ধরে ফেললো। উনি ইঞ্জা ভাইয়ের কাছ থেকে হাত ধোওয়া বাবদ ৫০০টাকা আদায় করেছেন।আমরা তাকে ছাড়বো? এবার সবাই মিলে তাঁকে হাত ধুইয়ে বখশিস আদায় করবো।কিন্তু ভাইয়াও কম না।  কোনো রকম টেবিলের নিচ দিয়ে পালিয়ে দৌড়ে বাহিরে চলে গিয়ে বাঁচলো। আমরাও বললাম,ঠিক আছে আজ পালিয়ে বাঁচলেন কিন্তু আগামী সপ্তাহে সোনেলার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে আপনাকে ঠিকই পাকড়াও করা হবে! সবাই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকলাম।

 জাকিয়া জেসমিন যূথী আপুর ফোনেই ঘুমটা  ভাঙলো।এ্যাই তুই কোথায়?ঘুম জড়ানো কন্ঠে জবাব দিলাম কেন আপু ? আমিতো বাসায়।তুই এখনো বাসায়? এক্ষুনি তৈরী হয়ে নে ।আমি তোকে নিতে আসছি। আমি বললাম কোথায় যাব? আপু আবারো ধমকের সুরে বললো তোর কি মনে নেই আজ সোনেলার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠান?ও হো ভুলেই গিয়েছিলাম আপু ।আচ্ছা আমি এক্ষুনি তৈরী হয়ে নিচ্ছি। কিছুক্ষণের মধ্যে যূথী আপু  সি.এন.জি নিয়ে বাসায় চলে এল। বললো চল। সুপর্ণা ফাল্গুনি ফোন করেছিলো,এক সাথেই যাব। আমি বললাম ঠিক আছে । ভালোই হবে তিনজন একসাথে গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে। আর অনুষ্ঠানে কে কি পরিবেশন করবো সেটা নিয়েও আলোচনা করা যাবে। 

 সিএনজি ওয়ালা কে শিল্পকলা একাডেমির দিকে যেতে বলা হলো। যূথী আপু জানালো সোনেলার এডমিনগণ নাকি ব্লগারদের জন্য এক বিশাল সারপ্রাইজ রেখেছেন । আমিতো শুনেই  পুলকিত  হলাম।ওহ! না জানি কি সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে! আজ আমরা তিনজনে ফন্দিও আঁটলাম সাদ ভাইকে ছাড়া যাবে না কোনো ভাবে।

 ঢাকা শহরের যানজট কাটিয়ে আমাদের শিল্পকলায় পৌছুতে প্রায় ঘন্টাখানেক  লেগে গেল। আমার,সুপর্নাদি আর যূথী আপুর তো তর সইছে না। কখন  অনুষ্ঠানে যেতে পারবো এই ভাবনায় অস্থির হয়ে থাকলাম।অবশেষে পৌছেইতো অবাক হয়ে গেলাম। চারিদিকে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। চমৎকার করে বেলুন,ফেস্টুন,ব্যানার ইত্যাদি দিয়ে সাজানো হয়েছে শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গন। বিশাল অক্ষরে ‘সোনেলা’ সেজেছে সোনালী রঙে।

 কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের জিসান ভাই,ইঞ্জা ভাই আর তৌহিদ ভাইকে হন্তদন্ত হয়ে ছোটাছুটি করতে দেখা গেল। পাশেই দেখি আরজু মুক্তা আপু,সাবিনা ইয়াসমিন আপু আর নীরা  সাদিয়া আপু মিলে কি যেন নিয়ে আলাপ করছে।আমাদের দেখে  তাঁরা বললেন,এত দেরি করে আসলে কেন? জানোনা প্রধান অতিথিরা এক্ষুনি চলে আসবেন?কিছুক্ষণের মধ্যেই উদ্বোধনী  ঘোষনা দেয়া হবে আমি বললাম,কি করবো আপু জ্যাম.. কথাটা শেষ হবার আগেই যূথী লআপু মুখের কথা কেড়ে নিল । আহা শুধু জ্যাম বুঝি? আপনি যে অনুষ্ঠানের কথা ভুলে  নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিলেন সেটা ভুলে গেলেন নাকি?এদিকে সুপায়ন দাদা আর নিতাই দাদা আমাদের দূর থেকে দেখেই ডাকলেন।কি ব্যাপার এখানে সময় নষ্ট  করলে হবে ? তাড়াতাড়ি  অডিটোরিয়মের  ভেতরে যান। ফুল টুল ঠিক ঠাক আছে কিনা দেখুন ।অতিথিদের বরণ  করতে  হবে না? আমি তো দাদাদের জিজ্ঞেস  করেই  ফেললাম, দাদা আজকের অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে কে থাকছেন? আমার দিকে তাকিয়ে সুপায়ন দা বললেন,সে তো সারপ্রাইজ!

 এডমিন গণ কাউকে জানায়নি।  সোনেলার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী  উপলক্ষ্যে ব্লগারদের জন্য এটা একটা বিশেষ একটা চমক ! সুতরাং অপেক্ষা করুন। কি আর করা আমরাও চমক দেখার অপেক্ষায় সামনে পা বাড়ালাম।

 যেতে যেতেই নাকে এলো লোভনীয় গন্ধ! আমি তো এদিক ওদিক তাকালাম।ও মা!! এ যে বিশাল আয়োজন!নানা রকম দেশীয় খাবারের আয়োজনে মুগ্ধ হতেই হলো। এঁচোর দিয়ে খাশির মাংস, রুই মাছের কালিয়া, চিংড়ি মালাইকারি, ইলিশের দোপেঁয়াজা,ঝিঙে পোস্ত,নিরামিশ, ছানার চপ,কুলফি আরো কত কি! এছাড়া লুচি,পরোটা,চা,পান,জর্দা তো আছেই।

এত সব দেশীয় খাবারের ব্যবস্থাপনা দেখে জিভে জল তো এলোই সঙ্গে মনে মনে এডমিনদের ধন্যবাদ দিতে ভুল হলো না।  হঠাৎ ইঞ্জা ভাই আর তৌহিদ ভাই আমাদের তাড়া দিলেন ।আরে কোথায় আপনারা তাড়াতাড়ি আসুন আমাদের অতিথিরা চলে এসেছেন। তাঁদের বরণ করার জন্য ফুলের মালা গুলো সাথে আনুন। আমরা দ্রুত পায়ে অতিথিদের বরণের জন্য প্রস্তুত হয়ে মূল তোরণের সামনে উপস্থিত হলাম।

 অধীর আগ্রহে চেয়ে আছি কারা এসে আমাদের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠান  আকর্ষনীয় করবেন!

হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেলাম!মূল  ফটক দিয়ে কে ঢুকছেন?সাদা আলখেল্লা,সফেদ দাড়ি,চুল। হাতদুটো পেছনে দিয়ে হাসিমুখে ভেতরে আসছেন। আমি স্তব্ধ! স্তব্ধ সমস্ত ব্লগার। মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। এ  আমি কাহাকে দেখিতেছি? ইহাও  সম্ভব?  #স্বপ্ন দেখছি না তো? অসম্ভব কে সম্ভব করা অনন্ত জলিলের  নয় আমাদের এডমিনের পক্ষেই সম্ভব।  

কারো মুখে কোনো কথা নেই। সবাই কয়েক মিনিটের জন্য হা হয়ে গেছে । হঠাৎ জিশান ভাইয়ের কথায় সবাই সচেতন হলো। আরে কি হলো সবাই আসুন,কবিগুরুকে বরণ করে  নিন! সবাই দৌড়ে আমাদের বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিলাম।কবিগুরু অত্যন্ত  আন্তরিকতার সাথে আমাদের দেয়া ফুলের মালা গ্রহণ করলেন। 

 আমাদের জন্য আরো চমক অপেক্ষা করছিলো। কিছুক্ষণের মধ্যে ঝাঁকরা চুলের দুখু মিয়া,আমাদের বিদ্রোহী কবি তাঁর চিরাচরিত বিদ্রোহী ভাব প্রকাশ করতে করতে সবার মাঝে উপস্থিত হলেন!ঢাকা শহরের যানজট নিয়ে তিনি মহা বিরক্ত। সময় মতো  আসতে তাই তাঁর দেরি হয়েছে।শ্রদ্ধেয় কবিদের কে আমাদের মাঝে পেয়ে আমরা হয়েছি বাকরুদ্ধ!কবির জন্যও ফুলের মালা,তোড়া নিয়ে আমরা সবাই তাঁকে বরণ করে নিলাম।

 অনুষ্ঠান উদ্বোধনের জন্য দুই কবি মঞ্চে আসীন হলেন। চারিদিকে বিভিন্ন টিভি ক্যামেরার আলো জ্বলে উঠলো। সব চ্যানেলে সোনেলার অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্রগুলো এসেছে খবর সংগ্রহের জন্য। 

আমাদের এডমিনগণ কি এক কান্ড করলেন! দুই কবিকে একসাথে একই মঞ্চে নিয়ে আসলেন! সকল ব্লগারদের জন্য এ এক পরম পাওয়া। 

 কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এবং বিশ্বকবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী ঘোষনা করলেন । চারিদিকে করতালি আর হর্ষ ধ্বনিতে মুখরিত হলো মিলনায়তন। কবি গুরু সোনেলার জন্য তাঁর লেখা একটি কবিতা আমাদের আবৃতি করে শোনালেন। আর বিদ্রোহী কবি উৎসর্গ করলেন তাঁর লেখা একটি  গান।আমরা সত্যিই ধন্য হলাম যেন।

 নানা আয়োজনের মধ্যে দিয়েই শেষ হলো সোনেলার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠান।এবার ভোজন পর্ব! আমাদের কারো আর তর সইছেনা। নানা রকম খাবারের সুগন্ধ নাকে এসে বারবার ধাক্কা দিচ্ছে! এতক্ষণে আমি বুঝলাম বাঙালি আয়োজনের হেতু! আমাদের বিশ্বকবি আর বিদ্রোহী কবির প্রিয় খাবারের ব্যবস্থাই করা হয়েছে  এখানে। বাব্বাহ! এডমিন ভাইয়ারা এত সচেতন! তাঁরা আমাদের প্রিয় অতিথিদের জন্য তাঁদের প্রিয় খাবার গুলো রেখেছেন খাবারের তালিকায় সেটা দেখেই মন ভরে গেল।

 অতি যত্ন করে ব্লগাররা এবং এডমিনরা অতিথিদের আপ্যায়ন করলেন। তাঁরা  খাওয়া শেষ করে তুষ্ট হলেন এবং রান্নার প্রশংসা করতে লাগলেন। এত কিছুর মধ্যে ব্লগাররা ভুলেই গেছেন সিকদার সাদ ভাইকে জব্দ করার বিষয়টি। খাওয়া পর্ব শেষ করেই আমাদের এডমিনগণ কবিগুরু এবং বিদ্রোহী কবির সাথে একে একে সকল ব্লগারদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। এবং আমাদের সুযোগ করে দিলেন, স্বরচিত গল্প,কবিতা পাঠ করে তাঁদের শোনাতে। আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম আমাদের এই দুই মনিষী কি আন্তরিকতার সাথে সবার লেখা শুনছেন এবং কিভাবে আরো লেখা সমৃদ্ধ করা যায় সে বিষয়ে আলাপ করছেন।

 আমার  পর্ব আসতেই আমি বেশ নার্ভাস হয়ে গেলাম! স্বয়ং কবিগুরু আমার সাথে কথা বলতে চান আমার লেখাগুলো নিয়ে, একি সহজ ব্যাপার নাকি? আমিতো ইতস্তত  বোধ করতে করতে  স্বরচিত কবিতা আবৃতি করতে লাগলাম।হঠাৎ আমার ফোনের রিংটোন বেজে উঠলো।কি মুশকিল!এখন ফোন আসার সময় হলো? কবিগুরু কি মনে করবেন? উফ! এখনও ফোন বেজেই চলেছে.,বেজেই চলেছে…বেজেই চলেছে..

 ধ্যাত্তেরি! গেল তো ঘুমটা ভেঙে! ঘুম জড়ানো চোখে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখি জাকিয়া জেসমিন যুথি আপুর ফোন। রিসিভ করতেই বলে উঠলো,কিরে কোথায় তুই?তোর কি মনে নেই আজ সোনেলার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠান!ওহো যুথি আপু দিলে তো ঘুমটা ভাঙিয়ে। আমি তো সোনালের অনুষ্ঠানেই ছিলাম..কবিগুরু কি  ভাবলেন বলোতো?কি বিড়বিড় করছিস বলতো? বললেন যুথি আপু। তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে নে আমি তোকে নিতে আসছি।আমাদের একসাথে যাওয়ার কথা ভুলে গেছিস? আমি বললাম না, না। আমি এক্ষুনি তৈরী হয়ে নিচ্ছি। বলেই ফোনটা রেখে দিলাম । পাশেই রাখা গল্পগুচ্ছ পড়তে পড়তে কখন যে ঘুমের সাগরে ডুব দিয়েছি তা আর মনে নেই! 

স্বপ্ন || ১০ (ব্লগারদের সম্মিলিত গল্প)

 

 

 

৪১৩জন ৩৪জন
0 Shares

৪৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য