স্বপ্নের সোনালী দরজাটা

রেহানা বীথি ১৪ অক্টোবর ২০১৯, সোমবার, ১০:০৭:১৭অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ২৫ মন্তব্য

মাঝে মাঝেই স্বপ্নের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাই। হোঁচট খেয়ে ফিরে আসে মন। একটা দোকান — চাটাইয়ের ওপর মাটির লেপ। ছনের চাল। দোকানের ভেতরে ডলি বিস্কুটের কৌটো, বুনবুনি বা নানা রঙের টিকটিকির ডিমগুলোর কাঁচের বয়াম ভেদ করে পিটপিট তাকানো, মচমচে চানাচুর, বিলাতি দুধ, আচার, কাঠি লজেন্স। এসব ছাড়াও সর্ষের তেল আর জর্দার সুবাস। পুরো দোকান ম ম। খুচরো পয়সা, ধান, চাল — বিনিময়ে সাধের লজেন্স, ডলি বিস্কুট, টিকটিকির ডিম, চানাচুর! খেলার সাথীদের সাথে ভাগ করে পরমানন্দে খেতে খেতে ছোটা, ছুটতে ছুটতে খাওয়া । কলমির ঝোপ পেরিয়ে খাল, খাল পেরিয়ে বিল, বিল পেরিয়ে সবুজে সয়লাব ধানক্ষেত! কখনও বৃষ্টিশেষে রোদের ঝিলিক, ওই দূর আকাশে রঙধনুর সাতটি রঙ।

আহা!! কোথায় সেসব? হারিয়ে গেছে আমাদের সেই ছোটবেলা। ফ্ল্যাটে বন্দি আজকের শৈশব আকাশই দেখে না, রঙধনু কোথায় পাবে? অলিগলিতে ফাস্টফুডের দোকান। বার্গার, পিজজা, স্যান্ডউইচ, চাউমিন, পাস্তা, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই.. .. ডেজার্ট। হাই, হ্যালো বিদেশী কেতা, বিজাতীয় শব্দসম্ভারে আমরা বড় বেশি আধুনিক। আন্তরিকতা আছে কি? আছে কি মাটির টান, মায়া, দেশের প্রতি আবেগ? থাকলে কেন কথায় কথায়, শব্দে শব্দে গেঁথে ফেলছি বিদেশী শব্দমালা? নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে কেন সরে যাচ্ছি দূরে আরও দূরে?

মনে পড়ে কয়েক বছর আগের কথা, ট্রেনে করে রাজশাহী থেকে খুলনায় যাওয়ার সময় পাশে বসা কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রীর কথোপকথন —–

— জানিস, চাঁপাই নবাবগঞ্জের মানুষ নাকি কালাইয়ের রুটি খায়, বাড়িতে অতিথি গেলেও ওই রুটি দিয়ে নাস্তা করায়, হি হি হি……

— আর বলিস না, ওরা একেবারেই গাঁইয়া! ওসব খাওয়ার জিনিস? ছিঃ ছিঃ!!

— ঠিক বলেছিস, একেবারেই আনকালচার্ড ওরা। কথাও বলে কেমন হামি হামি করে, শুনেছিস?

লজ্জা পেয়েছিলাম ভীষণ । চাঁপাই নবাবগঞ্জে জন্ম এই কারণে নয়। লজ্জা পেয়েছিলাম, আমাদের সন্তানদের এই মনোভাবের জন্য। চাঁপাই নবাবগঞ্জ বাংলাদেশের বাইরে নয়। দেশের প্রত্যেকটি অঞ্চলের আছে কথা বলার নিজস্ব ঢঙ, আছে নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য, নিজস্ব কিছু আচার -অনুষ্ঠান । সেগুলো আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের দেশের সম্পদ। সার্বিকভাবে আমাদের সেগুলো নিয়ে গর্ব করা উচিত। আর এসব ঐতিহ্য আগলে রাখা উচিত আমাদেরই। তা না করে আমরা উপহাস করি।
আর আমরা গর্ব করি কী নিয়ে? কে কতটা বিদেশী ভাবধারা, ভাষা আয়ত্ব করতে পেরেছে, তাই নিয়ে। হাস্যকরভাবে অনুকরণ করি বিজাতীয় রীতি। আর এসব করতে গিয়ে হারিয়ে ফেলছি আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ঐতিহ্য। এরচেয়ে লজ্জাজনক আর কিছু হতে পারে না। নিজস্বতা বিবর্জিত একটা জাতি, অবশ্যই একটা খোঁড়া জাতি। আর যে জাতি নিজেদের নিয়ে উপহাস করে, সে জাতি অন্যের কাছেও উপহাসের পাত্র।

ভাষা- সাহিত্য – সংস্কৃতির যে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য আমাদের আছে, ভালোবাসি তা। দেশকে ভালোবাসি, আগলে রাখি দেশের ঐতিহ্য সংস্কৃতিকে। সুশিক্ষিত হই। হিংসাটুকু নয়, নিজের মাঝে যেটুকু আলো আছে, ছড়াতে চেষ্টা করি তা আশেপাশে। একসময় দেখবো… অবশ্যই দেখবো হোঁচট খেয়ে ফিরে না এসে স্বপ্নের সোনালী দরজাটা খুলছে একটু একটু করে চোখের সামনে।

১৫৪জন ১২জন
15 Shares

২৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য