স্বপ্ন আমরা কেন দেখি?তাও ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে।সহজ হিসাব সারাদিন যা করি,ভাবি তারমধ্যে সবচেয়ে যে জিনিসটা নিয়ে বেশি ভাবি তাই আমরা আংশিকভাবে দেখে থাকি।

আমাদের মস্তিষ্কে কয়েকটা অংশ থাকে।কোনটা দ্যাখে,কোনটা শোনে,কোনটা সেভ করে এবং কোনটা ভাবে। দুঃখের হলে ভেবে কাঁদতে থাকে এবং এ সময়ের স্বপ্নগুলো বিষাদময় হয়। আনন্দের হলে স্বপ্নগুলোও রোমান্টিক হয়।

তিনচার বছর বয়সে স্বপ্ন কেমন দেখতাম।মা  হারিয়ে গেছে।কাঁদতে কাঁদতে ঘুম ভেঙে পাশে হাতরাতে থাকি।মা বুকে টেনে নেয় তারপর শান্তি।বাবা বাজার থেকে মধ্যরাতে সন্দেশ মিষ্টি এনেছে অন্যরা সেটা চুরি করে খেয়ে ফেলেছে।খেলনা-পুতুল গুলো সব পাশের বাড়ির মরিয়ম চুরি করে লুকিয়ে রেখেছে এরকম।

একটু একটু বয়স বাড়ে আমাদের স্বপ্নের পরিসীমা বাড়তে থাকে।তখন স্বপ্নের রুপ, রং ও পরিবর্তিত হয়। টিভি দেখা,স্কুলে যাওয়া এসব শুরু হয় তাই ডোরেমন পোকেমনকে নিয়ে মধুর স্বপ্ন শুরু হয়।ভয় কাটতে থাকে।

এগার বার বছর থেকে স্বপ্ন একটু অন্য দিকে মোড় নেয়। শারীরিক মানসিক বিভিন্ন পরিবর্তনের সাথে সাথে হরমোনের পরিবর্তন হতে থাকে।সবচেয়ে বেশি তৈরি ও ক্ষয় হয় আবেগজাতীয় হরমোন। টিভিতে আর ডোরেমন ভালো লাগে না। মুভি,নাটক দেখতে ইচ্ছে করে।তাও রোমান্টিক।শাবনুর সালমান শাহের মুভি দেখার পর মাথা কেমন হয়ে যায়। প্রেম প্রেম ভাব হতে থাকে।তখন পাশের বাড়ির কালো শুটকু ছেলেটা/মেয়েটাকেও ভালো লাগে।রাতে স্বপ্নে কেউ শাবনুরকে নিয়ে বিভোর হয় কেউ সালমানেকে নিয়ে।

সতের আঠারো বছর পর্যন্ত এমন চলতে থাকে।কেউ কেউ প্রেমে পড়ে যায়।তাও আবার জীবন মরন প্রেম। হাঁটতে গেলে দরজায় ধাক্কা লাগে,সিঁড়িতে লাগে,রাস্তায় গাছে ধাক্কা লাগে।কারন তখন আসেপাশের কাউকেই খেয়াল থাকেনা।বাবামা,ভাইবোন সব থাকার পরও তেমন অনুভূত হয়না। মনোযোগের অভাব দেখা দেয়, উদাস উদাস ভাব চলে আসে।মা বলছে আর সে শুনছে কিন্তু কিছুই শোনা হয়নি। সারাদিন পাশের বাড়ির ছেলেটি বা মেয়েটি মাথায়, তাঁর ভাবনায় মশগুল থাকতেই ভালো লাগে।ঘুমের ভেতর স্বপ্নগুলোও তাঁকে ঘিরে হয়।এ বয়সের রাতগুলো হয় অত্যন্ত মধুর।কেউ বিরক্ত করছে না। নিশ্চিতে কোলবালিশ জড়িয়ে তাঁকে ভাবতে ভাবতে ঘুম।তারপর ঘুমে আবার কতকিছু।

অতি আবেগী মানুষরা এ বয়সেই অতিআবেগী স্বপ্নের কারনে নষ্ট হয়ে যায়।পালিয়ে বিয়ে করে কিংবা নেশা সহ অন্যকিছুতে জড়িয়ে যায়।

আঠার বিশ মোটামুটি একটা বাস্তবতা বোঝার বয়স।এ সময় ভালো ভালো স্বপ্ন গুলো ঘুরপাক খায়।এখন দেখা গেল কেউ তার স্বপ্নের মত করেই সব পেল তখন তার স্বপ্ন উন্নততর হতে থাকে আর যে মানুষটির মনের মত কাজটি হয়নি তার রাতের বিশেষকরে ঘুমের স্বপ্ন গুলো ভয়ঙকর হয়। যেমন-খুব ঘন গহীন জঙ্গলে সে একা,রাস্তা হারিয়ে গ্যাছে,খুব চিৎকার করার পরও কেউ শুনছেনা।গা ভিজে ছপছপ করছে,পানির পিপাসা নিয়ে ঘুম ভাঙ্গে।কিংবা যাকে ভালোবাসে তার সমকক্ষতা না আসায় সে তাকে ছেড়ে অন্য কারও সাথে চলে যাচ্ছে।

 

পড়ালেখা শেষ হবার সময়গুলোতে স্বপ্ন হয় ভালো চাকরি এবং বিয়ে।একটা ইন্টারভিউ দিয়ে আসার পর রাতে স্বপ্নে জয়েনিং লেটার চলে এসেছে।তারপর খুব চমৎকার একজনের সাথে বিয়ের কথা চলছে স্বপ্নে ফুলশয্যা,বাচ্চা সব হয়ে যায়। স্বপ্ন ভেঙ্গে যাবার পর মনে হয় এমন মধুর স্বপ্ন কেন যে শেষ হয়!সত্যি না হলেও সারাদিন বেশ আমেজেই কাটে।

বিয়ে থা হয়ে গেলে আমরা যাকে বলি সংসারী হওয়া।এ সময় জীবনের কিছু কিছু ভালোলাগা হারিয়ে যেতে থাকে।আমরা স্বপ্ন দেখি বাড়ি,গাড়ি,কিছু ব্যাংক ব্যালেন্স।ছেলেমেয়ের পড়াশুনা তাদের বিয়ে এসব। অনেকগুলো বছর দেখতে দেখতেই কেটে যায় স্বপ্নের মত শত ব্যস্ততায়। বাস্তবতা আর বাস্তব স্বপ্নে।

 

একসময় ছেলেমেয়ে,সংসার সব থেকে একটা বিচ্ছিন্নতা আসে।ছোটবেলার মত নিরাপত্তা হীনতা আবার ফিরে আসতে থাকে। ষাটের পরের সময়গুলো ভীষন একা একা কাটে।চাইলেও কেউ কাছে থাকতে পারেনা। একাকিত্বতা আর মৃত্যু চিন্তায় রাতে ঘুম কম হয়। তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্হাতেও স্বপ্ন চলে আসে।তাই এসময়ের স্বপ্ন গুলো হয় ভয়ঙকর মৃত্যু নিয়ে।মৃত মানুষরা স্বপ্নে আসতে থাকে। তাঁরা নিয়ে যেতে চায়।এটিই মানুষের জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়।

 

আমি সবসময়ই দুএকটা স্বপ্নই ঘুরে ফিরে দেখি। পরীক্ষার হলে বসে প্রশ্ন কমন পড়েনি, কিছু লিখতে পারছি না। পরিচিত কেউ আশেপাশে নেই এরকম।কালো কুৎসিত একটা সাপ কিংবা বুনো কালো হাতি বা বড় বড় গরু পেছনে দৌড়াচ্ছে।জীবনপন দৌড়ানোর পরও লাভ হয়না।সাপ পায়ে কামড়ে দেয় কিংবা হাতি গুঁতো মারে।একটা কালো নোংরা পাগল পথ আগলে দাঁড়ায়। কুৎসিত অংগভঙ্গী করে,লাল দাঁত বের করে হাসে এবং জড়িয়ে ধরতে আসে।

 

সকালে মাকে বললে,মা সুরা  জ্বীন পড়ে ফুঁ দিয়ে বলে,জ্বীনের আঁচড় পড়েছে।ছোটবেলা থেকে তোর গা বিড়ালের মত নরম।শুলে সেটা আরও নরম হয়।এটা জ্বীনের পছন্দ।ক্যামনে বুঝাই মেয়েরা এমনই হয়।আমার মায়েরও শুলে গা নরম হয়। লুকিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে।

আমি মনে মনে খুশিই হই। আমার কত শখ উড়ে বেড়ানোর।হলে তো ভালোই হয়।বিনা পয়সায় শখের ভ্রমণ।

পাঁচ ফিট পাঁচ একটা কালো মোটা মানুষ আমি কোন দুঃখে জীন আসে। জীনের পছন্দ দুধে আলতা রং(আমাদের শ্রদ্ধাভাজন দুধে আলতা রং ব্লগারগন একটু সাবধানে জ্বীন পরী ধরবে)।

“ডিয়ার জিন্দেগী” একটি সাইক্রিয়াটিক মুভি। প্রেম ও পরিবার থেকে অবহেলিত আলিয়া ভাট নিজের স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিজেই করে ফ্যালে।আমিও আমার স্বপ্নের কারন বুঝতে পারি।সাপ,পাগল এসব আমি ভীষন ভয় পাই।CARE Bangladesh এ জবের সময় লম্বা চুল অলা পাগলটা আমার স্কুটি আটকিয়ে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল।”এতদিন কোথায় ছিলে,আমাকে আর ছেড়ে যেও না। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না”।

অনেক লোকজন এসে আমায় বাঁচিয়েছিল।পরে শুনেছি তিনি মেডিকেলে পড়ার সময় কাউকে ভালোবেসেছিলেন মেয়েটির সাথে হয়ত আমার কোথাও মিল ছিল।তাই এ অবস্থা।আমি জীবনেও ও রাস্তা দিয়ে হেঁটে কিংবা স্কুটি কোনটাতেই যাইনি।

এখন কলেজ যাবার পথে ন্যাংটা পাগলটা কাপড় চোপড় ছাড়া হাঁটে।অদ্ভুত চোখে তাকায়।ভয়ে রিক্সায় উঠি।তার থেকেই এসব স্বপ্ন আসে।তবে একটা আনন্দের স্বপ্ন দেখি এখন।মনে মনে হাসি,একা একা আনন্দিত হই।সেদিনটা ভালোই কাটে।

জীবন সুন্দর ও সুন্দর স্বপ্নের জন্য সুস্হ একটা পরিবেশ খুব জরুরি।আমরা নিজেরাও চেষ্টা করব এবং আশেপাশের সবাই কে দেবার চেষ্টা করব।সবাই ভালো থাকুন। সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখুন। এটাই প্রত্যাশা।

৩৬৭জন ৭২জন
0 Shares

২৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য