সবাই যখন নৌকায় উঠলো নৌকা কাত হয়ে ‘সোনেলার বাবুরা’ সব পানিতে পড়ে হাবুডুবু খেতে লাগলো, সাথে সুন্দরবনের টলটলে সুস্বাদু পানি। এবার তৌহিদ ভাইরে বন্যা আপু আর সাবিনা আপু পানি থেকে উঠিয়ে আনলো, আস্তে আস্তে বললো , “বাবু পানি আর খাইবা? কিপটামি ছাড়ো তা না হলে আরো পানি খাওয়ামু।” সবাই ভিজে টিজে একাকার হয়ে পাড়ে উঠলো । সবাই একসাথে বলে উঠলো, ‘ বাবুরা সুন্দরবনের পানি খাইছো?’ 

 

আবার নৌকা ঠিক করে সবাই ধীরে সুস্থে সুন্দরবন থেকে রওনা দিলাম। আমরা নারী ব্লগাররা নাকি বেশি খাই ! অদ্ভুত! প্রায় সব পর্বেই নারীদের কে হেয় করা হয়েছে এখানেও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। মানিনা, মানবো না এমন বৈষম্য। বন্যা আপু আর সাবিনা আপুরে বললাম আপনারা দুজনে মিলে দায়িত্ব নেন এর একটা বিহিত করতেই হবে। বন্যা আপু মুখ দিয়ে ফুঁচ করে পানের পিক ফেলাইয়া কইলো, “চিন্তা কইরো না ছোটদি , মুই আছি কি হরতে?এমন জেলাপীর প্যাচ মারুম যে নাকের হ্যাত , চোখের হানি এক হইয়া ঠোঁট বাইয়া বাইয়া  পড়বো আর খাইবো।”

 

খুলনা পৌঁছাতে প্রায় ঘন্টা দুই লেগে গেল, সবাই সাবধানে নামলাম। ওমা একি দেখলাম!! চোখতো সবার চড়কগাছে উঠে গেল । মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এসেছে সুন্দরবন ভ্রমনে তাই দেখে তৌহিদ ভাই আর রেহানা আপুর বর তাদের বৌকে আড়াল করে রাখলো । বেটার যে লুইচ্চামি স্বভাব মেয়ে মানুষ দেখলেই খালি গাল বেয়ে লালা বেরিয়ে আসে আর ছুঁড়ুৎ করে টান মারে? আমরা নারীরা সবাই যার যার গায়ের জামাকাপড় সাবধানে ঠিকঠাক করে নিলাম , মেয়েদের পোশাকের কারনেই নাকি পুরুষদের তেঁতুলের কথা মনে পড়ে আর খাইতে মন চায়। 

 

ট্রাম্প ব্যাটা তো লাফাতে লাফাতে শিপাঞ্জির মতো মুখ ভ্যাটকাইয়া বলছে , “আই অ্যাম করোনা নেগেটিভ, প্লিজ হান্ডশেক। ” সবার সাথে হ্যান্ডশেক করতে চলে আসলো। যাইহোক সবাই দেখি খুব উৎসাহ নিয়ে তার সাথে সেলফি তুলতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে গেল শুধু তৌহিদ ভাই আর আমাদের সবার দুলাভাই এদিক ওদিক উঁকি মারছে বৌদের নিয়ে।  মিষ্টি রেহানা আপু এমন ধমক দিলো যে  হঠাৎ ঠাডা পড়ার মতো গর্জনে সবাই চমকে গিয়ে ট্রাম্পের উপর হুড়মুড় করে পড়ে গেল। ফলাফল ট্রাম্পের কি অবস্থা হলো তাতো সবাই আন্দাজ করতেই পারছেন!  ট্রাম্প এই অবস্থায় সুন্দরবন যাওয়া বাদ দিলো। আহারে বেচারার কত শখ ছিলো সুন্দরবনে স্বজাতি শিপাঞ্জি, হনুমানের সাথে সেলফি তুলবে , বাঘ মামার ঘাড়ে উঠে বীরের বেশে ছবি তুলবে তা আর হলো না।  

 

ট্রাম্পের গাড়ি বহর ফিরে গেল সার্কিট হাউসে সাথে আমাদের বাস ও খুলনা সার্কিট হাউসে পৌঁছালো। সবার পেটের মধ্যে ক্ষুধায় ছুঁচো বুকডন দিচ্ছিল।

 

গরম ভাত সাথে নানারকম ভর্তা, ঘন ডাল, খাসির রেজালা, গরুর মাংসের কোরমা, নদীর নানান মাছ আর দই , মিষ্টি দিয়ে দুপুরের লাঞ্চ শেষ করলাম। বাপরে একেকজন এতো খেয়েছে যে পটকা মাছের মতো পেট ফুলে উঠেছে। মাসুদ ভাইয়ারে রুকু আপু জিজ্ঞাসা করলো, ‘বাবু কয় মাস?’

 

আমাদেরকে ডিনারের দাওয়াত দিলো ট্রাম্প। আমরা তো সবাই হৈ হৈ করে উঠলাম।  হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো সবাই তাই দেখে তা ধিন ধিন তা নাচতে শুরু করলো। ওমা তৌহিদ ভাই দেখি ভাবীরে নিয়ে গাল হা করে বৃষ্টি খাচ্ছে, তৌহিদ ভাইয়ের মনে হয় পদ্মার পানি খেয়ে মন ভরেনি; বাকীরাও কম বেশি তাই করছে । হঠাৎ বন্যা আপু হাচ্চি দিলো আর  মুখ থেকে পানের পিক গিয়ে একদম ট্রাম্পের গালে গিয়ে পড়লো। ট্রাম্প ব্যাডার মুখটাই এমন যে সে হাসতেছে না রাগতেছে বোঝা গেল না, শুধু বললো, “ইটস ওকে, নো প্রবলেম।” সবাই একটু ভয় পেয়ে গেল। কিন্তু ভিতরে ভিতরে সবাই পেট চেপে হাসতে ছিল।

 

ট্রাম্পের সাথে ডিনারটা খুব  ভালো হলো। ইলিশ মাছ খেতে গিয়ে গলায় কাঁটা বিঁধে গেল পারভীন আপুর , সেতো একটু চঞ্চল টাইপের তাই ইলিশের কাঁটা হান্দাইয়া গেল গলায়। পড়ে যাইহোক ওয়াক, ওয়াক করে গলা থেকে সে কাঁটা বের করলো। খাসির হাড্ডি থেকে মাংস ছিড়তে গিয়ে  হালিম ভাইয়ের হাত ফসকে হাড্ডিটা  ছিটকে মুড়িঘন্টের বাটির মধ্যে পড়ে গেলো । বাটির মুড়িঘন্ট মহী ভাইয়ের গায়ের উপর পড়লো, মহী ভাইতো রাগে আগুন হয়ে কটমট করে তাকিয়ে থাকলো সবার দিকে। ট্রাম্প ভাই বললো, ‘ কুল ম্যান, কুল।’ সবাই মিটমিট করে হাসছিল। 

 

ডিনার শেষে সবাই হিন্দি গানের সাথে নাচ শুরু করলো, “হাওয়া মে উড়তা যায়ে, মেরা লাল দোপাট্টা……। কেউ কেউ ট্রাম্পের সাথে লুঙ্গি ড্যান্স দিল। আবার কেউ কেউ তোয়ালে নিয়ে দু’ঠ্যাঙ্গের মাঝখানে সালমান খানের স্টাইলে নাচলো।”

 

এদিকে শুনলাম নাজমুল ভাইয়ের ক্রাশের নাকি বিয়ে ঠিক হয়েছে তাই বেচারা ছোট ভাইয়ের মন খারাপ। আমরা ঠিক করলাম সবাই বিয়ে বাড়িতে যাবো, মেয়েকে তুলে নিয়ে আসবো যদি মেয়ের গার্ডিয়ান তেড়িবেড়ি করে মেয়েকে আটকে রাখে। ইঞ্জা ভাই, হেলাল ভাই, শামীম ভাই, সারোয়ার ভাই, মমি ভাই, নিতাই দাদা , সুপায়ন দাদা এরা দেখি পালোয়ানদের মতো পোশাক পড়ে নিল, হাতে দু’নালা বন্দুক।

 

ট্রাম্পের কাছ থেকে বিদায় ও আশীর্বাদ নিয়ে আমরা সবাই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। বাসে উঠে প্রদীপ দাদা প্যারোডি গান ধরলো, “সে যে কেন বোঝে না,মজা দেখাবো আজ ক্রাশরে, ‘তা না তা না রে’ ।” সাথে সাথে রেজোয়ান আপু, পৌষি ভাবী, মুক্তা আপু, আরজু আপু গলা মেলানো শুরু করলো।

 

বিয়ে বাড়িতে ঢুকতেই দেখি বাংলা সিনেমার ভিলেনরা সব জড়ো হয়ে আছে। আমাদের দেখেই বিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিতে চাইলো। আমরা বের হতে চাইনি তাই আমাদের মারতে আসলো, আমরাও সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লাম; অমনি দেখি আমি খাটের নীচে পড়ে আছি। কোমরে এমন ব্যথা পাইছি যে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলাম। 

 

হায়রে ভগবান! আমিতো এতোক্ষণ ঘুমের মধ্যে #স্বপ্ন দেখেছি। সোনেলাতে স্বপ্ন নিয়ে কি লিখবো ভেবে ভেবেই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

 

নোট: নাজমুল ভাইয়ের কারণে বন্যা আপুর জেলাপীর প্যাঁচটা আপাতত এই পর্বে স্থগিত রাখা হলো। আগামী কোনো পর্বে কোনো নারী ব্লগার বিষয়টি নিয়ে খুব সুন্দর করে উপস্থাপন করবেন আশা করি।

স্বপ্ন।। ২২ (ব্লগারদের সম্মিলিত গল্প)

৩৯২জন ৩৩জন
0 Shares

৬২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য